শিরোনাম

বইয়ের গন্ধে বেঁচে থাকা এক ঐতিহ্যের নাম বাংলাবাজার

শেখ শাহরিয়ার হোসেন
শেখ শাহরিয়ার হোসেন
বইয়ের গন্ধে বেঁচে থাকা এক ঐতিহ্যের নাম বাংলাবাজার
বাংলাবাজারের একটি দোকান থেকে বই কিনছেন ক্রেতারা। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা ‘বাংলাবাজার’ শুধু একটি বাজার নয়, এটি দেশের প্রকাশনা ও বই ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র। প্রত্যেক বইপ্রেমীর কাছে বাংলাবাজার যেন বইয়ের এক স্বর্গ। ছোট ছোট গলি, থরে থরে সাজানো বইয়ের স্তূপ। বইয়ের গন্ধ, প্রকাশকদের আনাগোনা আর লেখক-পাঠকদের পদচারণায় মুখর এই জনপদ যুগের পর যুগ ধরে বহন করে চলেছে বাংলাদেশের বই ব্যবসার ঐতিহ্য। সময়ের সঙ্গে বদলেছে এর অবকাঠামো, বেড়েছে ব্যবসার পরিধি। তবে বইকে ঘিরে বাংলাবাজারের প্রাণচাঞ্চল্য এখনো অটুট রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পঞ্চাশের দশকে বাংলাবাজারে বই ব্যবসার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। সে সময় মূলত পাঠ্যপুস্তকের ব্যবসাই বেশি ছিল। দেশভাগের আগে কলকাতাকেন্দ্রিক প্রকাশনা ব্যবসার প্রভাব বাংলাবাজারেও ছিল। তখন পুরান ঢাকার অল্প কয়েকজন প্রকাশক কলকাতা থেকে সৃজনশীল বই এনে ব্যবসা করতেন। মল্লিক ব্রাদার্সের মতো প্রতিষ্ঠান সে সময় বাংলাবাজারে সৃজনশীল বইয়ের ব্যবসা শুরু করে।

পরবর্তীতে দেশভাগের পর ধীরে ধীরে স্থানীয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে শুরু করে। নওরোজ কিতাবিস্তান, স্টুডেন্ট লাইব্রেরি, গ্রেট ইস্ট লাইব্রেরি, আল হামারা কিতাব মহল, মালিক লাইব্রেরি, খোশরোজ কিতাব মহল, হার্ডসন অ্যান্ড কোম্পানি ও পুঁথিপত্রের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের প্রকাশনা শিল্পের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সে সময় অনেক প্রকাশক নিজেও লেখক ছিলেন। তাদের মধ্যে শিশু সাহিত্যিক মোহাম্মদ নাসির আলী, যিনি নওরোজ কিতাবিস্তানের কর্ণধার ছিলেন অন্যতম।

বইয়ের গন্ধে বেঁচে থাকা এক ঐতিহ্যের নাম বাংলাবাজার ২
বাংলাবাজারের পুরাতন বইয়ের দোকানে বই দেখছেন এক ক্রেতা। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

বর্তমানে বাংলাবাজারে প্রায় দুই হাজার বইয়ের দোকান ও চার শতাধিক প্রকাশনা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সহায়ক পাঠ্যপুস্তক ও সৃজনশীল বই সরবরাহের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এটি। বাংলাবাজারে প্রতিদিন কোটি টাকার বেশি মূল্যের বই লেনদেন হয় এবং মুদ্রণ, বাঁধাই, পেস্টিং ও পরিবহনসহ বইশিল্পকে ঘিরে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

প্রকাশকরা জানান, ষাট ও সত্তরের দশকে বাংলাবাজারের অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছিল টিনের তৈরি একতলা ঘরে। সময়ের পরিক্রমায় সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন বাংলাবাজারজুড়ে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন ও আধুনিক মার্কেট। যার মধ্যে মান্নান মার্কেট অন্যতম, যেখানে নিচতলা থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত রয়েছে বইয়ের দোকান।

বর্তমানে দেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা ও উপজেলা ছাড়িয়ে বাংলাবাজারের বই পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও। বিশেষ করে আশির দশক থেকে বাংলাবাজারে প্রকাশনা ব্যবসার ব্যাপক প্রসার শুরু হয়। এ সময় আগামী, সময় প্রকাশন, অনন্যা, বিদ্যা প্রকাশ, আফসার্স ব্রাদার্স ও অনুপমসহ বহু প্রতিষ্ঠান বই প্রকাশে যুক্ত হয়। ফলে আশির দশককে বাংলাবাজারের প্রকাশনা ব্যবসার স্বর্ণসময় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

দীর্ঘ পথচলায় বাংলাবাজারে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বইয়ের মার্কেট। মান্নান মার্কেট ছাড়াও ইসলামি টাওয়ার, ৩৮ নম্বর মার্কেট, গিয়াস গার্ডেন মার্কেট, বিশাল বুকস মার্কেট, কম্পিউটার কমপ্লেক্স, রোমি মার্কেট, কওমি মার্কেট ও বই বিচিত্রা মার্কেট বই ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

একসময় নর্থব্রুক হল রোডকেন্দ্রিক থাকলেও বর্তমানে প্যারিদাস রোড ও হেমেন্দ্র চন্দ্র দাশ রোড পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে বইয়ের বাজার। বাংলাবাজার সংলগ্ন বিউটি বোর্ডিং একসময় ছিল দেশের কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডার অন্যতম কেন্দ্র। সেই আড্ডার জৌলুস আগের মতো না থাকলেও এখনো বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বসে লেখক-প্রকাশকদের মিলনমেলা।

বইয়ের গন্ধে বেঁচে থাকা এক ঐতিহ্যের নাম বাংলাবাজার ৩
ব্যস্ত বাংলাবাজারের চিত্র। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

নতুন বই প্রকাশকে কেন্দ্র করে দেশের নানা প্রান্ত থেকে লেখক ও সাহিত্যপ্রেমীরা প্রতিদিনই ছুটে আসেন বাংলাবাজারে।

বই কিনতে আসা কবি নজরুল সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী সাবরিনা আক্তার বলেন, ‘আমি প্রায়ই বাংলাবাজারে বই কিনতে আসি। এখানে এক জায়গায় বিভিন্ন প্রকাশনীর বই পাওয়া যায়, যা অন্য কোথাও এত সহজে পাওয়া যায় না। বিশেষ করে বাংলাবাজার মোড়ে শিক্ষার্থীদের জন্য পুরোনো বই অনেক কম দামে পাওয়া যায়। খুচরা বইয়ের দামও অনেক সময় অন্য জায়গার তুলনায় কম থাকে। পুরোনো ও দুর্লভ বইয়ের সন্ধানও এখানে মেলে। বইয়ের গন্ধ, দোকানগুলোর পরিবেশ এবং বইপাড়ার আবহ আমাকে সবসময় আকৃষ্ট করে।’

বাংলাবাজারের বই নিকেতনের স্বত্বাধিকারী আব্দুল কাদের বলেন, ‘প্রায় ২৫ বছর ধরে বাংলাবাজারে বইয়ের ব্যবসা করছি। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে বই কিনতে আসেন। অনলাইনভিত্তিক বিক্রি বাড়লেও পাঠ্যপুস্তক এবং সহায়ক বইয়ের চাহিদা এখনো বেশ ভালো। বাংলাবাজার শুধু একটি বাজার নয়, এটি দেশের প্রকাশনা শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। এখানকার সঙ্গে হাজারো মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে।’

/এফআর/