শিরোনাম

হিজল বনে ঘেরা মনোরম স্থান ‘দিল্লির আখড়া'

কিশোরগঞ্জ সংবাদদাতা
হিজল বনে ঘেরা মনোরম স্থান ‘দিল্লির আখড়া'
দিল্লির আখড়া। ছবি: সংবাদদাতা

কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা মিঠামইনের কাটখাল ইউনিয়নে হিজল বনে ঘেরা এক মনোরম স্থান ‘দিল্লির আখড়া’। বর্ষায় দর্শনার্থীদের প্রিয় গন্তব্য এই ‘দিল্লির আখড়া’। হাওরের পানিতে জেগে থাকা শত শত হিজল গাছ এখানকার অন্যতম আকর্ষণ।

চারশো বছরের পুরোনো এই দিল্লীর আখড়া সম্পর্কে সুন্দর একটি গল্প আছে। তা হলো এক সাধক এখানে এসেছিলেন ধ্যান করতে। তার ধ্যান ভাঙার জন্য কিছু দৈত্য তাকে নানাভাবে বিরক্ত করতো। একদিন ওই সাধক মহাবিরক্ত হয়ে তার দীক্ষাগুরুর মন্ত্র বলে এই দৈত্যগুলোকে হিজল গাছ বানিয়ে ফেলেন। সাধুর বানিয়ে রাখা সেই হিজল গাছগুলো এখনো দাঁড়িয়ে আছে।

জায়গাটির নাম দিল্লির আখড়া কীভাবে হলো? সেটি আরেক গল্প। দিল্লির সম্রাট জাহাঙ্গীরের লোকজন একদিন ওই ধ্যানমগ্ন সাধকের পাশ দিয়ে নৌকার বহর নিয়ে নদীপথে যাচ্ছিলেন। এ সময় সোনার মোহর ভর্তি একটি নৌকা পানিতে ডুবে যায়। নৌকার যাত্রীরা ডুব দিয়ে দু’একটি মোহর তুলেও আনে।

সারিবদ্ধ হিজল গাছ। ছবি: সংবাদদাতা
সারিবদ্ধ হিজল গাছ। ছবি: সংবাদদাতা

কিন্তু সেই মোহরগুলোও চোখের ইশারায় পানিতে ফেলে দেন ওই সাধক। পরে নৌকার যাত্রীদের অনুরোধে তিনি সোনার মোহরগুলো মাছের ঝাঁকের মতো পানির ওপর ভাসাতে থাকেন। পরে মোহরগুলো তুলে নেন যাত্রীরা।

এই ঘটনা শুনে সম্রাট জাহাঙ্গীর অভিভূত হন। পরে তিনশত একর জমি তাম্রলিপির মাধ্যমে সেই সাধুর আখড়ার নামে দান করে দেন। সেই থেকে এটি দিল্লির আখড়া।

হিজলের বন ভেদ করে একবার আখড়ায় পৌঁছতে পারলেই দেখা যাবে সেই সাধুর স্মৃতি। আখড়ার নির্জনতায় আপনারও মনে হবে, সত্যি এটি ধ্যান করার মতো চমৎকার একটি স্থান বটে।

আখড়ায় রয়েছে ধর্মশালা, নাটমন্দির, অতিথিশালা, পাকশালা ও বৈষ্ণবদেব থাকার ঘর। বর্তমানে আখড়ায় সেবায়েত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অনন্ত দাস মোহন্ত গোসাঁই। এখানে আশ্রিত হয়ে আছে ৪০ থেকে ৫০ জন শ্রমজীবী মানুষ। সবাই নিরামিষভোজি। থাকে একটি যৌথ পরিবারের মতো।

দিঘি। ছবি: সংবাদদাতা
দিঘি। ছবি: সংবাদদাতা

রাতে এখানে দর্শনার্থীদের থাকারও ব্যবস্থা আছে। আখড়ার পাশে রয়েছে ঘের দেওয়া দুটি পুকুর। ইচ্ছে করলে পুকুরের ঘাটলায় বসে কাটিয়ে দেওয়া যাবে চমৎকার একটা বিকাল।

ঐতিহ্য গবেষক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ রওশন আলী বলেন, এ আখড়াটি শুধু বিশেষ ধর্মাবলম্বী মানুষের বিশ্বাসের প্রতীক নয়; বরং বাঙালি জীবনের সাড়ে চারশ বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পটভূমির মেলবন্ধন। তিনি এখানে যাতায়াত ব্যবস্থা আধুনিকীকরণের দাবি জানিয়েছেন।

দিল্লির আখড়ায় ঘুরতে আসা জুয়েল মিয়া জানান, সাড়ে ৪০০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক ‘দিল্লির আখড়া’। লোকমুখে প্রচলিত আছে, সাধক নারায়ণ গোস্বামীর আধ্যাত্মিক শক্তিতে এখানে হাজার হাজার দানব রূপ নিয়েছিল সারি সারি হিজল গাছে। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের অনুদানে পাওয়া সুবিশাল প্রাঙ্গণ এখন আর কেবল পুণ্যার্থীদের তীর্থস্থান নয়, রূপ নিয়েছে পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণীয় লীলাভূমিতে।

অপর এক পর্যটক আলমগীর হোসেন জানান, হিজল গাছের নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিনই ভিড় জমান দেশ-বিদেশের ভ্রমণপিয়াসীরা। দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর এই ঐতিহাসিক স্থানটির যাতায়াত ব্যবস্থা আধুনিক করা হলে এটি হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম সেরা পর্যটন কেন্দ্র।

/এসআর/