শিরোনাম

খাদ্য ব্যবসায় বাধ্যতামূলক হচ্ছে অনলাইন রেজিস্ট্রেশন

খাদ্য ব্যবসায় বাধ্যতামূলক হচ্ছে অনলাইন রেজিস্ট্রেশন
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের লোগো

খাদ্য ব্যবসায় রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করে ‘নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা ২০২৬’ গেজেট জারি করেছে সরকার। গত ১৬ জুলাই এই গেজেট জারি করা হয়েছে। তবে এই প্রবিধানমাল়া পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন-বিএসটিআইয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, যেসব খাদ্যপণ্য বিএসটিআই নিয়ন্ত্রণ করছে না সেগুলো নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ দেখবে। বিষয়টি বিএসটিআইয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না। বিএসটিআইও বলছে, বিষয়টি সাংঘর্ষিক হবে না।

জানতে চাইলে বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক কাজী এমদাদুল হক বলেন, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ খাদ্যের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে। আর বিএসটিআই প্যাকেটজাত পণ্য নিয়ে কাজ করে। দুটি সংস্থার মধ্যে আইনগত কোনো বিরোধ হওয়ার সুযোগ নেই। এরপরও গেজেটটি ভালোভাবে পড়ে দেখা হবে তাদের মধ্যে কোনো বিষয় সাংঘর্ষিক হচ্ছে কি না? যদি সাংঘর্ষিক হয় তাহলে সেটি নিয়ে তারা কথা বলবেন।

এই বিষয়ে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (আইন ও নীতি) আনোয়ার হোসেন সরকার বলেন, যেসব খাদ্যপণ্য বিএসটিআই দেখছে না সেগুলো নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ দেখভাল করবে। বাজারে অসংখ্য খাদ্যপণ্য রয়েছে। সবগুলো বিএসটিআইয়ের পক্ষে দেখভাল করা সম্ভব নয়। যেসব খাদ্যপণ্য তারা নিয়ন্ত্রণ করবেন সেগুলোর তালিকা গেজেটে রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএসটিআই এ পর্যন্ত ৬৭৫টি খাদ্যপণ্যের জাতীয় মান (স্ট্যান্ডাডর্স) প্রণয়ন করেছে। এসব খাদ্যপণ্যের মধ্যে মাত্র ১২১টি বিএসটিআই দেখভাল করছে। অর্থাৎ ৮২ শতাংশ খাদ্যপণ্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে। তবে দেশের সব খাদ্যপণ্যের নিরাপত্তা দেখার দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।

নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা-২০২৬ গেজেট অনুযায়ী, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ মূলত ‘নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩’ এর কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ধারার ক্ষমতাবলে খাদ্যপণ্যের রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করেছে।

৮৭ ধারার অধীনে কর্তৃপক্ষকে প্রবিধানমালা প্রণয়নের সাধারণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

ধারা ৩১ (খাদ্য ব্যবসায়ের রেজিস্ট্রেশন): এই ধারার ক্ষমতাবলে দেশের যেকোনো খাদ্য ব্যবসায়ীর জন্য কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে বাধ্যতামূলকভাবে রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন নেওয়ার বিধান নিশ্চিত করা হয়েছে।

ধারা ৩২: এই ধারার ক্ষমতাবলে নির্দিষ্ট ক্যাটাগরির খাদ্য ব্যবসা এবং খাদ্য তৈরির স্থাপনার (প্রিমিসেস) জন্য লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

ধারা ৪৪ (খাদ্যপণ্যের মোড়কাবদ্ধকরণ ও লেবেলিং): এই ধারার ক্ষমতাবলে বাজারে বিক্রয় হওয়া খাদ্যপণ্যের সুনির্দিষ্ট ব্র্যান্ড রেজিস্ট্রেশন এবং বাণিজ্যিক মোড়কীকরণের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।

প্রকাশিত গেজেটে আরও বলা হয়, এখন থেকে দেশে যেকোনো ধরনের খাদ্যপণ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মজুত, সরবরাহ, আমদানি কিংবা বিক্রির সঙ্গে জড়িত ছোট-বড় সব ধরনের প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে বাধ্যতামূলকভাবে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে রেজিস্ট্রেশন এবং ক্ষেত্রবিশেষে ত্রিমাত্রিক লাইসেন্সিং ও ব্র্যন্ডিং প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

প্রবিধানমালার প্রবিধি ৪ অনুযায়ী, খাদ্য ব্যবসা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে আবেদন করে রেজিস্ট্রেশন নিতে হবে। অনলাইনে আবেদন জমা দেওয়ার পর লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ মাত্র সাত কার্যদিবসের মধ্যে একটি নম্বরযুক্ত সাময়িক রেজিস্ট্রেশন সনদ ইস্যু করবে। পরে সরেজমিন পরিদর্শন ও যাচাই-বাছাই শেষে এটি চূড়ান্ত করবে।

রেজিস্ট্রেশন নেওয়ার পর তিন বছর ব্যবসা শুরু না করলে বা চালু ব্যবসা টানা ৩ বছর বন্ধ থাকলে, তা বাতিল বলে গণ্য হবে। যদি কোনো ব্যবসায়ী রেজিস্ট্রেশনের পর খাদ্য ব্যবসার লাইসেন্স গ্রহণ করেন, তাহলে সেটির মেয়াদের সঙ্গে রেজিস্ট্রেশনের মেয়াদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বিত হবে। এতে আলাদাভাবে কোনো ফি লাগবে না।

গেজেটে বলা হয়, তফশিল ২-এ উল্লিখিত সুনির্দিষ্ট খাদ্য ব্যবসার (যেমন: স্বাস্থ্য সহায়ক খাদ্য, বংশগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনকৃত খাদ্য ইত্যাদি) ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন করার পর এই লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক। এটির মেয়াদও ৩ বছর। তবে লাইসেন্স পাওয়ার ২ বছরের মধ্যে ব্যবসা শুরু করতে ব্যর্থ হলে তা বাতিল হবে। খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ বা মজুদের জন্য ব্যবহৃত প্রতিটি আলাদা কারখানা বা গুদামের জন্য পৃথক প্রিমিসেস লাইসেন্স নিতে হবে। একাধিক শাখা বা স্থাপনা থাকলে প্রতিটির জন্য আলাদা ফি দিয়ে এই লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক। তফশিল ৪ ভুক্ত ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রতিটি আলাদা পণ্যের জন্য উৎপাদন বা আমদানি লাইসেন্স লাগবে। শুধু তাই নয়, পণ্যটি যদি কোনো সুনির্দিষ্ট ব্র্যান্ড বা প্যাকেজিংয়ের আওতায় বাজারজাত করা হয়, তবে প্রতিটির পরিমাপ ও ওজন ভেদে আলাদা খাদ্যপণ্য রেজিস্ট্রেশন (ব্র্যান্ড রেজিস্ট্রি) করতে হবে।

জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় এই প্রবিধানমালায় কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ বছরে অন্তত একবার প্রতিটি খাদ্যপণ্য ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করবে। কোনো ব্যবসায়ী শর্ত লঙ্ঘন করলে তাকে প্রথমে ১৪ কার্যদিবসের মধ্যে ত্রুটি সংশোধনের নোটিশ দেবে। ব্যর্থ হলে শুনানি শেষে লাইসেন্স স্থগিত করতে পারবে। তবে গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকটের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ কোনো নোটিশ বা শুনানি ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে লাইসেন্স স্থগিত করতে পারবে।

প্রবিধানমালার ১৯ ও ২০ প্রবিধি অনুযায়ী, এটির বিধান লঙ্ঘন করে রেজিস্ট্রেশন বা লাইসেন্স ব্যতিরেকে খাদ্য ব্যবসা পরিচালনা, উৎপাদন, মজুত বা আমদানি করলে তা নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর ধারা ৩১ বা ৩৯-এর সরাসরি লঙ্ঘন হিসাবে গণ্য হবে। এই অপরাধের জন্য ধারা ৫৮ ও ৫৯ অনুযায়ী ফৌজদারি দণ্ড ও অর্থদণ্ড করতে পারবে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি ও ফেডারেশন অব চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট হেলাল উদ্দিন বলেন, সরকারি সংস্থার কেউ ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। সরকারি সংস্থাগুলোর এই আচরণে ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে। হোটেল-রেস্তোরাঁর লাইসেন্স নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ দিলে সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা কী করবে? সরকারি এসব সংস্থার দৌরাত্ম্য কমাতে না পারলে দেশে ব্যবসা করা সম্ভব হবে না।

জানতে চাইলে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) জানায়, সংস্থাগুলোর মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতা রয়েছে। সংগঠনের সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এত সক্ষমতা হয়নি যে তারা খাদ্যপণ্যের লাইসেন্স বা রেজিস্ট্রেশন দেবে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছিল। তখন কিছু অবজারভেশন দিয়ে কেবিনেট বিভাগে পাঠিয়েছিল। দেশের সংস্থাগুলো যে যার মতো ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে চাচ্ছে।

/এমআর/