জ্বালানি সংকট যে কারণে অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত

জ্বালানি সংকট যে কারণে অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত
মরিয়ম সেঁজুতি

বাংলাদেশের অর্থনীতি নতুন করে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে । মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে দেশে দেখা দিয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। এতে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে চাপ কয়েকগুণ বেড়েছে। বিশেষ করে পরিবহন, শিল্প ও কৃষি খাতে ইতোমধ্যেই ভয়াবহ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
দেশে দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নামছে না। মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের জীবনে কষ্ট বাড়ছে। বিনিয়োগ, ব্যবসা -বানিজ্য, রপ্তানি আয়- কোথাও স্বস্তির খবর নেই। ব্যাংকিং খাত এখনো নড়বড়ে অবস্থায়। এসব বিষয় অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।
রাজস্ব সংগ্রহ কম হওয়ায় সরকারের আয়ও কমেছে অনেক। এতে বিভিন্ন খাতের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও মাত্র ৮ শতাংশের মতো।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জ্বালানি সংকটে শিল্প উৎপাদন থেমে গেলে অর্থনীতির ওপর বহুমাত্রিক চাপ তৈরি হয়। এতে কর্মসংস্থান কমে, রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে। তাই শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া জ্বালানি আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি। বন্দর, সংরক্ষণাগার এবং পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন করা সম্ভব।
- জ্বালানি সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে
- আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাত ও ডলার সংকট অর্থনীতির মূল ঝুঁকি
- শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ও কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব
- নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও নীতিগত সংস্কার ছাড়া সমাধান নেই
বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পায়ন এবং কৃষি- সব খাতের মূল চালিকাশক্তি এই জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সরকারের জন্য একটি বড় অগ্নিপরীক্ষা।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় করণীয় সম্পর্কে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, সৌর, বায়ু ও বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়িয়ে মদানিনির্ভরতা কমাতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতিমালায় কাঠামোগত সংস্কার এনে প্রতিযোগিতা, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
মার্কিন সংস্থার সতর্কবার্তা
মার্কিন ক্রেডিট রেটিং সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সতর্কবার্তা এসেছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা সামষ্টিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কিছু চিহ্ন দেখালেও আমদানি করা জ্বালানির ওপর অত্যাধিক নির্ভরশীলতা কারণে ‘অধিক ঝুঁকিতে’ রয়েছে। প্রতিবেদনে বিশেষ করে উল্লেখ করা হয়েছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ বিঘ্ন এসব দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঈদুল ফিতরের আগে থেকেই সারা দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে একরকম তুলকালাম চলছে। দেশে এখনও পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল থাকার পরও কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি করে মানুষকে ভোগান্তি দেওয়া হচ্ছে। ইরানের হামলার কারণে কাতার এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করায় এর প্রভাবও দৃশ্যমান হচ্ছে।
জ্বালানি সমস্যা সমাধানে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, আগামী এপ্রিল পর্যন্ত জনগণের জ্বালানি তেলের চাহিদা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে সরকার। বহির্বিশ্বের অস্থিরতার মধ্যেও সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি।
দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ৭০-৮০ শতাংশই আমদানি নির্ভর। অপরিশোধিত তেল আসে মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। আর পরিশোধিত তেল আসে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও চীন থেকে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলমান থাকায় জ্বালানি তেলের দাম বর্তমানে ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে পৌঁছেছে।
জ্বালানির পরিসংখ্যান
বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কৃষি সেচ, সড়ক পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্র দেশে প্রধান জ্বালানি ডিজেলের ওপর নির্ভর করে চলে। তাই ডিজেলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ডিজেলের বার্ষিক চাহিদা ছিল ৪৩ দশমিক ৫০ লাখ টন। সেই হিসাবে, মাসিক চাহিদা ৩ দশমিক ৬০ লাখ টন ও দৈনিক গড় চাহিদা ১২ হাজার টন।
দেশে মোট ৬ দশমিক ২৪ লাখ টন ডিজেল সংরক্ষণের সক্ষমতা আছে। গত ২৩ মার্চ পর্যন্ত সরবরাহযোগ্য ডিজেল মজুত ছিল ১ দশমিক ৮৫ লাখ টন। অর্থাৎ দেশে বর্তমানে ১৪ দিনের ডিজেল মজুত আছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে অকটেনের চাহিদা ছিল ৪ দশমিক ১৫ লাখ টন। এর মধ্যে দুই লাখ টনের কাছাকাছি দেশে উৎপাদন হয়েছিল, বাকিটা আমদানি করা হয়েছিল। দেশে অকটেনের মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা ৫৩ হাজার ৬১৬ টন। এখন মজুত আছে প্রায় ১১ হাজার টন, যা দিয়ে প্রায় ৯ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে পেট্রোলের চাহিদা ছিল ৬ দশমিক ৬২ লাখ টন। পেট্রলের মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা ৩৭ হাজার ১৩ টন। এর মধ্যে গত ২৩ মার্চ পর্যন্ত মজুত আছে ১৬ হাজার ৬০৫ টন, যা দিয়ে প্রায় ১১ দিন চলবে।
এছাড়া ফার্নেস তেলের মজুত রয়েছে ৭০ হাজার ৮৩৩ টন, যা প্রায় ২৯ দিনের চাহিদা পূরণ করবে। আর জেট ফুয়েলের মজুত ৩৪ হাজার ৮৭৭ টন, যা প্রায় ২৩ দিন চাহিদা পূরণ করবে। কেরোসিনের মজুত আছে ৮ হাজার ৫৭১ টন, যা দিয়ে ৪৬ দিনের চাহিদা মেটানো যাবে। মেরিন ফুয়েলের মজুত আছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ হাজার টন, যা দিয়ে ৪৪ দিন সরবরাহ সম্ভব।
অন্যদিকে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ২৩ মার্চ পর্যন্ত ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল মজুত ছিল। দৈনিক গড়ে সাড়ে ৪ হাজার টন পরিশোধন সক্ষমতা বিবেচনায় এই মজুত দিয়ে ১৭ দিন উৎপাদন চালানো সম্ভব। তবে নতুন চালান সময়মতো না এলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি সংকটের নেপথ্যে
বর্তমানে এই খাতে সংকটের প্রধান কারণ হলো ডলারের বিনিময় হার। বিগত দুই বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার মান প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে যাওয়ায় আমদানিকৃত তেলের মূল্য পরিশোধে সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে যখন ৮০ থেকে ৯০ ডলারের উপরে অবস্থান করে, তখন ভর্তুকির চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। বকেয়া পাওনা পরিশোধে বিলম্ব হওয়ায় অনেক সময় বিদেশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তেল পাঠাতে অনীহা দেখাচ্ছে, যা দেশের কৌশলগত মজুতের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
পরিবহন, শিল্প ও কৃষি খাতে প্রভাব
জ্বালানি তেলের এই অস্থিরতা কেবল একটি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবহন, শিল্প ও কৃষি খাতে।
পরিবহন খাতে অস্থিরতা
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি পরিবহন ভাড়ায় প্রভাব ফেলে। তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাস, ট্রাক এবং নৌ-যানের ভাড়া ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এর ফলে পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে গিয়ে নিত্যপণ্যের বাজারে গত এক বছরে মুদ্রাস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে চলে গেছে।
শিল্প উৎপাদনে স্থবিরতা
শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন ক্ষমতা গড়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমে গেছে বলে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের মতো রপ্তানিমুখী শিল্পে জেনারেটর চালানোর জন্য বাড়তি ডিজেলে ব্যয় বাড়ছে। এতে পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে এবং রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
কৃষি খাতে প্রভাব
কৃষি প্রধান বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে ডিজেলে চালিত সেচ পাম্পগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বোরো ও আমন মৌসুমে ডিজেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকলে সেচের কাজ মারাত্মকভাব ব্যাহত হয়। এছাড়া চাষাবাদের ট্রাক্টর ও মাড়াই যন্ত্রের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রান্তিক কৃষকদের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। ফলে বাজারে চালসহ অন্যান্য ফসলের দাম অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
এ বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ উপাচার্য জাহাঙ্গীর আলম খান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটে কৃষি খাতে সেচ ব্যবস্থা এবং সার সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে। এখন বোরা মৌসুম চলছে। বোরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ফসল কারণ, প্রায় ৫৪ শতাংশ চাল আসে এই বোরো ধান থেকে। এখন বোরো ম্যেসুমের মাঝামাঝি সময়। কোথাও কোথাও ধানে থোর এসেছে। তাই এই সময়ে সেচ থাকাটা খুবই জরুরি। আমাদের দেশে ৩০ শতাংশ সেচ হয় বিদ্যুৎচালিত পাম্পের মাধ্যমে, আর ৭০ শতাংশ হয় ডিজেলে। এখন ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে বোরো ফসলের খেতে চাহিদা অনুযায়ী সেচ দেওয়া যাচ্ছে না।
সংকট সমাধানে সরকারের পদক্ষেপ
বিদ্যমান এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে।
জ্বালানি আমদানিতে অগ্রাধিকার ও এলসি সহজীকরণ
বৈদেশিক মুদ্রার সংকট থাকলেও সরকার জ্বালানি আমদানিতে বিশেষ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে জ্বালানি আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার ক্ষেত্রে বিশেষ ডলার কোটা বা সহায়তার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যাতে বকেয়া পরিশোধ করে আমদানি সচল রাখা যায়।
সরবরাহ উৎস বহুমুখীকরণ ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি
একটি মাত্র দেশের ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকার বিভিন্ন দেশের সাথে জি-টু-জি চুক্তির পরিধি বাড়াচ্ছে। ভারত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাশাপাশি রাশিয়া থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি আমদানিব বিকল্প উৎসগুলো বিষয়ে সরকার সক্রিয়ভাবে খোঁজ-খবর নিচ্ছে।
ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন
ভারতের শিলিগুড়ি থেকে বাংলাদেশের দিনাজপুর পর্যন্ত প্রায় ১৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আমদানি শুরু হওয়া একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল সাশ্রয়ী মূল্যে এবং দ্রুত উত্তরাঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এটি পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করেছে।
মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি ও রিফাইনারির আধুনিকায়ন
দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের কাজ সরকার দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করছে। এটি বাস্তবায়িত হলে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের ক্ষমতা আরও ৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন বৃদ্ধি পাবে, যা বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ঘটাবে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন পয়েন্টে তেলের মজুদ সক্ষমতা বর্তমানের ৪৫-৫০ দিনের পরিবর্তে আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি
আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি মাসে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় বা ‘অটোমেটিক প্রাইসিং ফর্মুলা’ চালু করা হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে দাম কমলে দেশের মানুষ তার সুবিধা পাচ্ছে এবং সরকারি ভর্তুকির ওপর চাপ কিছুটা কমেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারকে আরও কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। যেমন আমদানিনির্ভরতা পুরোপুরি কাটানো সম্ভব না হলেও নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। সরকারের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের স্থিতিশীলতা- এই দুইয়ের সমন্বয়েই কেবল দেশের জ্বালানি খাতের অনিশ্চয়তা দূর করা সম্ভব।

বাংলাদেশের অর্থনীতি নতুন করে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে । মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে দেশে দেখা দিয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। এতে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে চাপ কয়েকগুণ বেড়েছে। বিশেষ করে পরিবহন, শিল্প ও কৃষি খাতে ইতোমধ্যেই ভয়াবহ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
দেশে দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নামছে না। মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের জীবনে কষ্ট বাড়ছে। বিনিয়োগ, ব্যবসা -বানিজ্য, রপ্তানি আয়- কোথাও স্বস্তির খবর নেই। ব্যাংকিং খাত এখনো নড়বড়ে অবস্থায়। এসব বিষয় অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।
রাজস্ব সংগ্রহ কম হওয়ায় সরকারের আয়ও কমেছে অনেক। এতে বিভিন্ন খাতের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও মাত্র ৮ শতাংশের মতো।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জ্বালানি সংকটে শিল্প উৎপাদন থেমে গেলে অর্থনীতির ওপর বহুমাত্রিক চাপ তৈরি হয়। এতে কর্মসংস্থান কমে, রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে। তাই শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া জ্বালানি আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি। বন্দর, সংরক্ষণাগার এবং পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন করা সম্ভব।
- জ্বালানি সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে
- আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাত ও ডলার সংকট অর্থনীতির মূল ঝুঁকি
- শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ও কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব
- নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও নীতিগত সংস্কার ছাড়া সমাধান নেই
বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পায়ন এবং কৃষি- সব খাতের মূল চালিকাশক্তি এই জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সরকারের জন্য একটি বড় অগ্নিপরীক্ষা।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় করণীয় সম্পর্কে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, সৌর, বায়ু ও বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়িয়ে মদানিনির্ভরতা কমাতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতিমালায় কাঠামোগত সংস্কার এনে প্রতিযোগিতা, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
মার্কিন সংস্থার সতর্কবার্তা
মার্কিন ক্রেডিট রেটিং সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সতর্কবার্তা এসেছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা সামষ্টিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কিছু চিহ্ন দেখালেও আমদানি করা জ্বালানির ওপর অত্যাধিক নির্ভরশীলতা কারণে ‘অধিক ঝুঁকিতে’ রয়েছে। প্রতিবেদনে বিশেষ করে উল্লেখ করা হয়েছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ বিঘ্ন এসব দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঈদুল ফিতরের আগে থেকেই সারা দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে একরকম তুলকালাম চলছে। দেশে এখনও পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল থাকার পরও কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি করে মানুষকে ভোগান্তি দেওয়া হচ্ছে। ইরানের হামলার কারণে কাতার এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করায় এর প্রভাবও দৃশ্যমান হচ্ছে।
জ্বালানি সমস্যা সমাধানে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, আগামী এপ্রিল পর্যন্ত জনগণের জ্বালানি তেলের চাহিদা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে সরকার। বহির্বিশ্বের অস্থিরতার মধ্যেও সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি।
দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ৭০-৮০ শতাংশই আমদানি নির্ভর। অপরিশোধিত তেল আসে মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। আর পরিশোধিত তেল আসে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও চীন থেকে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলমান থাকায় জ্বালানি তেলের দাম বর্তমানে ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে পৌঁছেছে।
জ্বালানির পরিসংখ্যান
বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কৃষি সেচ, সড়ক পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্র দেশে প্রধান জ্বালানি ডিজেলের ওপর নির্ভর করে চলে। তাই ডিজেলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ডিজেলের বার্ষিক চাহিদা ছিল ৪৩ দশমিক ৫০ লাখ টন। সেই হিসাবে, মাসিক চাহিদা ৩ দশমিক ৬০ লাখ টন ও দৈনিক গড় চাহিদা ১২ হাজার টন।
দেশে মোট ৬ দশমিক ২৪ লাখ টন ডিজেল সংরক্ষণের সক্ষমতা আছে। গত ২৩ মার্চ পর্যন্ত সরবরাহযোগ্য ডিজেল মজুত ছিল ১ দশমিক ৮৫ লাখ টন। অর্থাৎ দেশে বর্তমানে ১৪ দিনের ডিজেল মজুত আছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে অকটেনের চাহিদা ছিল ৪ দশমিক ১৫ লাখ টন। এর মধ্যে দুই লাখ টনের কাছাকাছি দেশে উৎপাদন হয়েছিল, বাকিটা আমদানি করা হয়েছিল। দেশে অকটেনের মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা ৫৩ হাজার ৬১৬ টন। এখন মজুত আছে প্রায় ১১ হাজার টন, যা দিয়ে প্রায় ৯ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে পেট্রোলের চাহিদা ছিল ৬ দশমিক ৬২ লাখ টন। পেট্রলের মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা ৩৭ হাজার ১৩ টন। এর মধ্যে গত ২৩ মার্চ পর্যন্ত মজুত আছে ১৬ হাজার ৬০৫ টন, যা দিয়ে প্রায় ১১ দিন চলবে।
এছাড়া ফার্নেস তেলের মজুত রয়েছে ৭০ হাজার ৮৩৩ টন, যা প্রায় ২৯ দিনের চাহিদা পূরণ করবে। আর জেট ফুয়েলের মজুত ৩৪ হাজার ৮৭৭ টন, যা প্রায় ২৩ দিন চাহিদা পূরণ করবে। কেরোসিনের মজুত আছে ৮ হাজার ৫৭১ টন, যা দিয়ে ৪৬ দিনের চাহিদা মেটানো যাবে। মেরিন ফুয়েলের মজুত আছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ হাজার টন, যা দিয়ে ৪৪ দিন সরবরাহ সম্ভব।
অন্যদিকে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ২৩ মার্চ পর্যন্ত ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল মজুত ছিল। দৈনিক গড়ে সাড়ে ৪ হাজার টন পরিশোধন সক্ষমতা বিবেচনায় এই মজুত দিয়ে ১৭ দিন উৎপাদন চালানো সম্ভব। তবে নতুন চালান সময়মতো না এলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি সংকটের নেপথ্যে
বর্তমানে এই খাতে সংকটের প্রধান কারণ হলো ডলারের বিনিময় হার। বিগত দুই বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার মান প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে যাওয়ায় আমদানিকৃত তেলের মূল্য পরিশোধে সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে যখন ৮০ থেকে ৯০ ডলারের উপরে অবস্থান করে, তখন ভর্তুকির চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। বকেয়া পাওনা পরিশোধে বিলম্ব হওয়ায় অনেক সময় বিদেশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তেল পাঠাতে অনীহা দেখাচ্ছে, যা দেশের কৌশলগত মজুতের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
পরিবহন, শিল্প ও কৃষি খাতে প্রভাব
জ্বালানি তেলের এই অস্থিরতা কেবল একটি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবহন, শিল্প ও কৃষি খাতে।
পরিবহন খাতে অস্থিরতা
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি পরিবহন ভাড়ায় প্রভাব ফেলে। তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাস, ট্রাক এবং নৌ-যানের ভাড়া ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এর ফলে পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে গিয়ে নিত্যপণ্যের বাজারে গত এক বছরে মুদ্রাস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে চলে গেছে।
শিল্প উৎপাদনে স্থবিরতা
শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন ক্ষমতা গড়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমে গেছে বলে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের মতো রপ্তানিমুখী শিল্পে জেনারেটর চালানোর জন্য বাড়তি ডিজেলে ব্যয় বাড়ছে। এতে পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে এবং রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
কৃষি খাতে প্রভাব
কৃষি প্রধান বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে ডিজেলে চালিত সেচ পাম্পগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বোরো ও আমন মৌসুমে ডিজেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকলে সেচের কাজ মারাত্মকভাব ব্যাহত হয়। এছাড়া চাষাবাদের ট্রাক্টর ও মাড়াই যন্ত্রের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রান্তিক কৃষকদের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। ফলে বাজারে চালসহ অন্যান্য ফসলের দাম অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
এ বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ উপাচার্য জাহাঙ্গীর আলম খান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটে কৃষি খাতে সেচ ব্যবস্থা এবং সার সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে। এখন বোরা মৌসুম চলছে। বোরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ফসল কারণ, প্রায় ৫৪ শতাংশ চাল আসে এই বোরো ধান থেকে। এখন বোরো ম্যেসুমের মাঝামাঝি সময়। কোথাও কোথাও ধানে থোর এসেছে। তাই এই সময়ে সেচ থাকাটা খুবই জরুরি। আমাদের দেশে ৩০ শতাংশ সেচ হয় বিদ্যুৎচালিত পাম্পের মাধ্যমে, আর ৭০ শতাংশ হয় ডিজেলে। এখন ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে বোরো ফসলের খেতে চাহিদা অনুযায়ী সেচ দেওয়া যাচ্ছে না।
সংকট সমাধানে সরকারের পদক্ষেপ
বিদ্যমান এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে।
জ্বালানি আমদানিতে অগ্রাধিকার ও এলসি সহজীকরণ
বৈদেশিক মুদ্রার সংকট থাকলেও সরকার জ্বালানি আমদানিতে বিশেষ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে জ্বালানি আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার ক্ষেত্রে বিশেষ ডলার কোটা বা সহায়তার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যাতে বকেয়া পরিশোধ করে আমদানি সচল রাখা যায়।
সরবরাহ উৎস বহুমুখীকরণ ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি
একটি মাত্র দেশের ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকার বিভিন্ন দেশের সাথে জি-টু-জি চুক্তির পরিধি বাড়াচ্ছে। ভারত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাশাপাশি রাশিয়া থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি আমদানিব বিকল্প উৎসগুলো বিষয়ে সরকার সক্রিয়ভাবে খোঁজ-খবর নিচ্ছে।
ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন
ভারতের শিলিগুড়ি থেকে বাংলাদেশের দিনাজপুর পর্যন্ত প্রায় ১৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আমদানি শুরু হওয়া একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল সাশ্রয়ী মূল্যে এবং দ্রুত উত্তরাঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এটি পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করেছে।
মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি ও রিফাইনারির আধুনিকায়ন
দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের কাজ সরকার দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করছে। এটি বাস্তবায়িত হলে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের ক্ষমতা আরও ৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন বৃদ্ধি পাবে, যা বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ঘটাবে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন পয়েন্টে তেলের মজুদ সক্ষমতা বর্তমানের ৪৫-৫০ দিনের পরিবর্তে আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি
আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি মাসে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় বা ‘অটোমেটিক প্রাইসিং ফর্মুলা’ চালু করা হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে দাম কমলে দেশের মানুষ তার সুবিধা পাচ্ছে এবং সরকারি ভর্তুকির ওপর চাপ কিছুটা কমেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারকে আরও কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। যেমন আমদানিনির্ভরতা পুরোপুরি কাটানো সম্ভব না হলেও নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। সরকারের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের স্থিতিশীলতা- এই দুইয়ের সমন্বয়েই কেবল দেশের জ্বালানি খাতের অনিশ্চয়তা দূর করা সম্ভব।

জ্বালানি সংকট যে কারণে অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত
মরিয়ম সেঁজুতি

বাংলাদেশের অর্থনীতি নতুন করে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে । মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে দেশে দেখা দিয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। এতে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে চাপ কয়েকগুণ বেড়েছে। বিশেষ করে পরিবহন, শিল্প ও কৃষি খাতে ইতোমধ্যেই ভয়াবহ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
দেশে দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নামছে না। মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের জীবনে কষ্ট বাড়ছে। বিনিয়োগ, ব্যবসা -বানিজ্য, রপ্তানি আয়- কোথাও স্বস্তির খবর নেই। ব্যাংকিং খাত এখনো নড়বড়ে অবস্থায়। এসব বিষয় অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।
রাজস্ব সংগ্রহ কম হওয়ায় সরকারের আয়ও কমেছে অনেক। এতে বিভিন্ন খাতের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও মাত্র ৮ শতাংশের মতো।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জ্বালানি সংকটে শিল্প উৎপাদন থেমে গেলে অর্থনীতির ওপর বহুমাত্রিক চাপ তৈরি হয়। এতে কর্মসংস্থান কমে, রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে। তাই শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া জ্বালানি আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি। বন্দর, সংরক্ষণাগার এবং পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন করা সম্ভব।
- জ্বালানি সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে
- আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাত ও ডলার সংকট অর্থনীতির মূল ঝুঁকি
- শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ও কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব
- নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও নীতিগত সংস্কার ছাড়া সমাধান নেই
বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পায়ন এবং কৃষি- সব খাতের মূল চালিকাশক্তি এই জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সরকারের জন্য একটি বড় অগ্নিপরীক্ষা।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় করণীয় সম্পর্কে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, সৌর, বায়ু ও বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়িয়ে মদানিনির্ভরতা কমাতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতিমালায় কাঠামোগত সংস্কার এনে প্রতিযোগিতা, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
মার্কিন সংস্থার সতর্কবার্তা
মার্কিন ক্রেডিট রেটিং সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সতর্কবার্তা এসেছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা সামষ্টিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কিছু চিহ্ন দেখালেও আমদানি করা জ্বালানির ওপর অত্যাধিক নির্ভরশীলতা কারণে ‘অধিক ঝুঁকিতে’ রয়েছে। প্রতিবেদনে বিশেষ করে উল্লেখ করা হয়েছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ বিঘ্ন এসব দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঈদুল ফিতরের আগে থেকেই সারা দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে একরকম তুলকালাম চলছে। দেশে এখনও পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল থাকার পরও কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি করে মানুষকে ভোগান্তি দেওয়া হচ্ছে। ইরানের হামলার কারণে কাতার এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করায় এর প্রভাবও দৃশ্যমান হচ্ছে।
জ্বালানি সমস্যা সমাধানে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, আগামী এপ্রিল পর্যন্ত জনগণের জ্বালানি তেলের চাহিদা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে সরকার। বহির্বিশ্বের অস্থিরতার মধ্যেও সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি।
দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ৭০-৮০ শতাংশই আমদানি নির্ভর। অপরিশোধিত তেল আসে মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। আর পরিশোধিত তেল আসে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও চীন থেকে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলমান থাকায় জ্বালানি তেলের দাম বর্তমানে ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে পৌঁছেছে।
জ্বালানির পরিসংখ্যান
বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কৃষি সেচ, সড়ক পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্র দেশে প্রধান জ্বালানি ডিজেলের ওপর নির্ভর করে চলে। তাই ডিজেলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ডিজেলের বার্ষিক চাহিদা ছিল ৪৩ দশমিক ৫০ লাখ টন। সেই হিসাবে, মাসিক চাহিদা ৩ দশমিক ৬০ লাখ টন ও দৈনিক গড় চাহিদা ১২ হাজার টন।
দেশে মোট ৬ দশমিক ২৪ লাখ টন ডিজেল সংরক্ষণের সক্ষমতা আছে। গত ২৩ মার্চ পর্যন্ত সরবরাহযোগ্য ডিজেল মজুত ছিল ১ দশমিক ৮৫ লাখ টন। অর্থাৎ দেশে বর্তমানে ১৪ দিনের ডিজেল মজুত আছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে অকটেনের চাহিদা ছিল ৪ দশমিক ১৫ লাখ টন। এর মধ্যে দুই লাখ টনের কাছাকাছি দেশে উৎপাদন হয়েছিল, বাকিটা আমদানি করা হয়েছিল। দেশে অকটেনের মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা ৫৩ হাজার ৬১৬ টন। এখন মজুত আছে প্রায় ১১ হাজার টন, যা দিয়ে প্রায় ৯ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে পেট্রোলের চাহিদা ছিল ৬ দশমিক ৬২ লাখ টন। পেট্রলের মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা ৩৭ হাজার ১৩ টন। এর মধ্যে গত ২৩ মার্চ পর্যন্ত মজুত আছে ১৬ হাজার ৬০৫ টন, যা দিয়ে প্রায় ১১ দিন চলবে।
এছাড়া ফার্নেস তেলের মজুত রয়েছে ৭০ হাজার ৮৩৩ টন, যা প্রায় ২৯ দিনের চাহিদা পূরণ করবে। আর জেট ফুয়েলের মজুত ৩৪ হাজার ৮৭৭ টন, যা প্রায় ২৩ দিন চাহিদা পূরণ করবে। কেরোসিনের মজুত আছে ৮ হাজার ৫৭১ টন, যা দিয়ে ৪৬ দিনের চাহিদা মেটানো যাবে। মেরিন ফুয়েলের মজুত আছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ হাজার টন, যা দিয়ে ৪৪ দিন সরবরাহ সম্ভব।
অন্যদিকে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ২৩ মার্চ পর্যন্ত ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল মজুত ছিল। দৈনিক গড়ে সাড়ে ৪ হাজার টন পরিশোধন সক্ষমতা বিবেচনায় এই মজুত দিয়ে ১৭ দিন উৎপাদন চালানো সম্ভব। তবে নতুন চালান সময়মতো না এলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি সংকটের নেপথ্যে
বর্তমানে এই খাতে সংকটের প্রধান কারণ হলো ডলারের বিনিময় হার। বিগত দুই বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার মান প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে যাওয়ায় আমদানিকৃত তেলের মূল্য পরিশোধে সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে যখন ৮০ থেকে ৯০ ডলারের উপরে অবস্থান করে, তখন ভর্তুকির চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। বকেয়া পাওনা পরিশোধে বিলম্ব হওয়ায় অনেক সময় বিদেশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তেল পাঠাতে অনীহা দেখাচ্ছে, যা দেশের কৌশলগত মজুতের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
পরিবহন, শিল্প ও কৃষি খাতে প্রভাব
জ্বালানি তেলের এই অস্থিরতা কেবল একটি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবহন, শিল্প ও কৃষি খাতে।
পরিবহন খাতে অস্থিরতা
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি পরিবহন ভাড়ায় প্রভাব ফেলে। তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাস, ট্রাক এবং নৌ-যানের ভাড়া ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এর ফলে পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে গিয়ে নিত্যপণ্যের বাজারে গত এক বছরে মুদ্রাস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে চলে গেছে।
শিল্প উৎপাদনে স্থবিরতা
শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন ক্ষমতা গড়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমে গেছে বলে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের মতো রপ্তানিমুখী শিল্পে জেনারেটর চালানোর জন্য বাড়তি ডিজেলে ব্যয় বাড়ছে। এতে পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে এবং রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
কৃষি খাতে প্রভাব
কৃষি প্রধান বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে ডিজেলে চালিত সেচ পাম্পগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বোরো ও আমন মৌসুমে ডিজেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকলে সেচের কাজ মারাত্মকভাব ব্যাহত হয়। এছাড়া চাষাবাদের ট্রাক্টর ও মাড়াই যন্ত্রের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রান্তিক কৃষকদের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। ফলে বাজারে চালসহ অন্যান্য ফসলের দাম অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
এ বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ উপাচার্য জাহাঙ্গীর আলম খান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটে কৃষি খাতে সেচ ব্যবস্থা এবং সার সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে। এখন বোরা মৌসুম চলছে। বোরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ফসল কারণ, প্রায় ৫৪ শতাংশ চাল আসে এই বোরো ধান থেকে। এখন বোরো ম্যেসুমের মাঝামাঝি সময়। কোথাও কোথাও ধানে থোর এসেছে। তাই এই সময়ে সেচ থাকাটা খুবই জরুরি। আমাদের দেশে ৩০ শতাংশ সেচ হয় বিদ্যুৎচালিত পাম্পের মাধ্যমে, আর ৭০ শতাংশ হয় ডিজেলে। এখন ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে বোরো ফসলের খেতে চাহিদা অনুযায়ী সেচ দেওয়া যাচ্ছে না।
সংকট সমাধানে সরকারের পদক্ষেপ
বিদ্যমান এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে।
জ্বালানি আমদানিতে অগ্রাধিকার ও এলসি সহজীকরণ
বৈদেশিক মুদ্রার সংকট থাকলেও সরকার জ্বালানি আমদানিতে বিশেষ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে জ্বালানি আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার ক্ষেত্রে বিশেষ ডলার কোটা বা সহায়তার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যাতে বকেয়া পরিশোধ করে আমদানি সচল রাখা যায়।
সরবরাহ উৎস বহুমুখীকরণ ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি
একটি মাত্র দেশের ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকার বিভিন্ন দেশের সাথে জি-টু-জি চুক্তির পরিধি বাড়াচ্ছে। ভারত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাশাপাশি রাশিয়া থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি আমদানিব বিকল্প উৎসগুলো বিষয়ে সরকার সক্রিয়ভাবে খোঁজ-খবর নিচ্ছে।
ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন
ভারতের শিলিগুড়ি থেকে বাংলাদেশের দিনাজপুর পর্যন্ত প্রায় ১৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আমদানি শুরু হওয়া একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল সাশ্রয়ী মূল্যে এবং দ্রুত উত্তরাঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এটি পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করেছে।
মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি ও রিফাইনারির আধুনিকায়ন
দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের কাজ সরকার দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করছে। এটি বাস্তবায়িত হলে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের ক্ষমতা আরও ৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন বৃদ্ধি পাবে, যা বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ঘটাবে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন পয়েন্টে তেলের মজুদ সক্ষমতা বর্তমানের ৪৫-৫০ দিনের পরিবর্তে আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি
আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি মাসে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় বা ‘অটোমেটিক প্রাইসিং ফর্মুলা’ চালু করা হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে দাম কমলে দেশের মানুষ তার সুবিধা পাচ্ছে এবং সরকারি ভর্তুকির ওপর চাপ কিছুটা কমেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারকে আরও কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। যেমন আমদানিনির্ভরতা পুরোপুরি কাটানো সম্ভব না হলেও নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। সরকারের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের স্থিতিশীলতা- এই দুইয়ের সমন্বয়েই কেবল দেশের জ্বালানি খাতের অনিশ্চয়তা দূর করা সম্ভব।




