শিরোনাম

ধানমন্ডিবাসীর পাম্পের জমিতে বিআরবির বাণিজ্যিক ভবন

ধানমন্ডিবাসীর পাম্পের জমিতে বিআরবির বাণিজ্যিক ভবন
গ্রাফিকস: সিটিজেন জার্নাল

জমি বরাদ্দ ছিল পেট্রোল পাম্পের জন্য। একটা সময়ে সেখানে পেট্রোল পাম্প ছিলও। কিন্তু পাম্পটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর রোডের সেই জমিতে নিয়ম ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বরখাস্ত হওয়া আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলামের স্ত্রী বিসিএস ১৭তম ব্যাচের কর্মকর্তা সায়লা ফারজানার মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয়। অথচ ইউটিলিটি সেবার জন্য বরাদ্দ জমির শ্রেণি পরিবর্তনের কোনো আইনগত সুযোগ নেই। বিআরবি কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, সবকিছুই আইন মেনে করা হয়েছে। তবে নগরবিশেষজ্ঞ ইকবাল হাবীব বলছেন, এমন স্থাপনার অনুমোদন দিয়ে রাজউক গুরুতর অনিয়ম করেছে।

নথি ঘেঁটে দেখা যায় প্লট হস্তান্তরের ফাইলে দেওয়া শর্তে স্পষ্ট করে বলা ছিল, ‘জমিটি শুধু একটি পেট্রোল পাম্প এবং সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের জন্য ব্যবহৃত হবে এবং কোনো অবস্থাতেই উপরোক্ত উদ্দেশ্যের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ অন্য কোনো যন্ত্রপাতি এখানে স্থাপন করা যাবে না।’ বিআরবি শুধু বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করেই ক্ষান্ত হয়নি, গিলে ফেলেছে একটি সড়কদ্বীপও। তারা নিয়ম লঙ্ঘন করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কাছ থেকে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য নামমাত্র বিজ্ঞাপন মূল্যে পেট্রোল পাম্পের জমির পাশের সড়কদ্বীপটি ইজারা নিয়েছে।

Soundorzo
সায়েন্স ল্যাব এলাকার সেই সড়কদ্বীপ। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

সড়কদ্বীপটিতে আগে বটসহ বিভিন্ন প্রজাতির বেশ কয়েকটি বড় গাছ ছিল। সরেজমিনে দেখা গেছে, সৌন্দর্যবর্ধনের নামে সেগুলো কেটে সেখানে বনসাই গাছ আর লতাগুল্ম লাগানো হয়েছে। নিজেদের নবনির্মিত ১৪ তলা অফিস ভবনটির সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলতে বিআরবি সড়কদ্বীপটিকে একপ্রকার পৈতৃক সম্পত্তির মতো ব্যবহার করছে।

২০১৫ সালের ২৫ জানুয়ারি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপসচিব সায়লা ফারজানা স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়, ধানমন্ডির আবাসিক এলাকার প্লট নম্বর ‘এ’ (পুরোনো) নতুন প্লট নম্বর–২, রোড নম্বর–৩ এ অবস্থিত ১৩ দশমিক ৮০ কাঠা জমির ওপর পেট্রোল পাম্পের পরিবর্তে শর্তসাপেক্ষে বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কাঠাপ্রতি দুই লাখ টাকায় সর্বমোট ২৭ লাখ ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করা হয়।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজের নামে বরাদ্দ ও শ্রেণি পরিবর্তনের ফাইলে সই করেন তৎকালীন মন্ত্রী সদ্য প্রয়াত ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন, সচিব মো. গোলাম রব্বানী, উপসচিব শায়লা ফারজানাসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা। ২০১৪ সালের ১৫ জুলাই ফাইলটি অনুমোদন দেওয়া হয়।

টাকার জোরে জমির শ্রেণি পরিবর্তনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরবি গ্রুপের পরিচালক মফিজুর রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘ওই সময়ের মন্ত্রী–সচিব আইন মেনেই জমির শ্রেণি পরিবর্তন করেছেন। প্রথম মাস্টার প্ল্যানে সেখানে পেট্রোল পাম্প ছিল না। যে পেট্রোল পাম্পটি ছিল, সেটি অকেজো হয়ে গিয়েছিল। পরে পেট্রোল পাম্পের পরিবর্তে গ্যাস পাম্প করা হয়। কিন্তু স্থানটি উঁচু থাকায় গ্যাসের চাপ কমে যায়। সেখানে ৩–৪টার বেশি গাড়ি ঢুকতে পারতো না। এ কারণে আগের মালিক সরকারের সাবেক সচিব ফজলুর রহমান জমির শ্রেণি পরিবর্তন করেন। এরপর বিআরবি গ্রুপের কাছে হস্তান্তর করেন। এখানে বাণিজ্যিক থেকে বাণিজ্যিকই করা হয়েছে। এখানে বিআরবি গ্রুপের কোনো হাত নেই।’

ধানমন্ডির তিন নম্বর সড়কে পেট্রোল পাম্পের জমিতে বিআরবি গ্রুপের বহুতল ভবন নির্মাণের বিষয় জানতে চাইলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর সিটিজেন জার্নালকে বলেন, এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখব।

বিআরবি যে ফজলুর রহমানের কাছ থেকে জমি হস্তান্তর নেওয়ার কথা বলছে, তিনি এখন আর বেঁচে নেই। প্রয়াত ফজলুর রহমান পাকিস্তান আমলে উপমন্ত্রী এবং সিএসপি কর্মকর্তা ছিলেন। তার হাত ধরেই ১৯৬০–এর দশকে ধানমন্ডির ৩ নম্বর সড়কে গ্রিন ভিউ ফিলিং স্টেশন প্রতিষ্ঠা হয়। ফজলুর রহমানের মৃত্যুর পর এই সম্পত্তি দেখাশোনা করেন তার ছেলে ফয়জুর রহমান। ফয়জুর রহমানের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী, বর্তমানে যিনি আমেরিকা প্রবাসী, তিনি এটি দেখাশোনা করে আসছিলেন। এখন তাদের জমি ও বাড়িসহ আনুষাঙ্গিক সবকিছু দেখভাল করছেন সালমান শাকিল নামে এক ব্যক্তি। সালমান শাকিল সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ২০১২ সালে বিআরবি গ্রুপকে তারা এই জমি হস্তান্তর করেন। তবে শ্রেণি পরিবর্তন তাদের পক্ষ থেকে করা হয়েছিল কিনা, সেটি তার জানা নেই। উল্লেখ্য পাম্পটি বন্ধ হয়ে যায় ২০১৫ সালে।

শ্রেণি পরিবর্তন যিনিই করে থাকুন, রাজউকের নতুন বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) অনুযায়ী, আবাসিক ব্লকে নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক জোন ছাড়া ঢালাওভাবে শ্রেণি পরিবর্তন করার সুযোগ নেই। এটি ড্যাপের মূল নকশার বাইরে হলে তা ‘নগর উন্নয়ন আইন-১৯৫৩' এর সরাসরি লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে। এই আইনের ৭৫ ধারায় বলা আছে, মাস্টার প্ল্যান বা ড্যাপের জমির যে ব্যবহার নির্দিষ্ট করা আছে, তার বাইরে গিয়ে জমি ব্যবহার করা নিষিদ্ধ।

ইউটিলিটির জন্য বরাদ্দকৃত জমি (যেমন পেট্রোল পাম্প, পার্ক বা খেলার মাঠ) অন্য কাজে ব্যবহার করা বাংলাদেশের প্রচলিত একাধিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। বিধিমালার মূল অংশে বলা আছে, রাজউক থেকে যে শ্রেণির জন্য নকশা অনুমোদন করা হয়েছে, সেই শ্রেণি পরিবর্তন করে অন্য কাজ করা যাবে না।

একাধিক আইন লঙ্ঘন করে বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজকে কেন জমির শ্রেণি পরিবর্তনের অনুমোদন দেওয়া হলো- খুদে বার্তার মাধ্যমে পাঠানো এমন এক প্রশ্নের জবাবে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপসচিব সায়লা ফারজানা সিটিজেন জার্নালকে বলেছেন, ‘আমি তখন শাখা অফিসার হিসেবে কাজ করেছি। সে কারণে হয়তো আমার স্বাক্ষর পেয়েছেন। এখনকার বিষয় এই মুহূর্তে তো মনে করতে পারছি না। ফাইল দেখে বলা যেতে পারে।’ ওই সময়ে চিঠির কপি তার কাছে পাঠানো হলে তিনি অপর এক বার্তায় বলেন, ‘১৯৯৫ সালের পরিপত্র অনুযায়ী প্লট কনভার্সন হয়েছে। তবুও বলবো ফাইল নোটেই হয়তো বিস্তারিত উল্লেখ আছে।’

পাকিস্তান আমলে ১৯৫০ সালে ভূমি অধিগ্রহন করে গড়ে তোলা হয় সুপরিকল্পিত ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা। ধানমন্ডিতে একটা সময় শিশুদের জন্য অনেক খেলার মাঠ ছিল, হাঁটাচলার জন্য ছিল প্রশস্ত ফুটপাত। চিত্তবিনোদনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল পার্ক আর ধানমন্ডি লেক। কিন্তু আইন লঙ্ঘন করে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ধানমন্ডির সেই আবাসিক এলাকার ঐতিহ্য।

Untitled design (24)
পরিবেশবিদ ও নগরবিশেষজ্ঞ ইকবাল হাবীব। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

পেট্রোল পাম্পের জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ার বিষয়ে পরিবেশবিদ ইকবাল হাবীব সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘ট্রাফিক ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসম্যান্ট (টিআইএ) না করেই সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিয়ে রাজউক চরম অন্যায় করেছে। দুটি রুটের সংযোগ স্থলে নির্মিত বহুতল ভবন চালু করলে আশপাশে ব্যাপক ট্র্যাফিক জ্যাম হবে। ভবনের সামনের জমিতে একজন নারী প্রজাপতির বাগান তৈরি করেছিলেন। কিন্তু বিআরবি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে নানাভাবে ফুসলিয়ে ওই নারীর বরাদ্দ বাতিল করে সে জমিটি নিজেদের নামে করিয়ে নেয়।’ এটি বেআইনি ও অবৈধ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অনেক সময় আবাসিক এলাকায় প্লটগুলো বাণিজ্যিক ব্যবহারের ফি দিয়ে বাণিজ্যিক ভবনে রূপান্তরিত করা হচ্ছে, যা নিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদদের মধ্যে উদ্বেগও রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ–রাজউকের পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ শাখা) মোহাম্মদ কায়ছার সিটিজেন জার্নালকে বলেন, মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র ছাড়া সেখানে বহুতল ভবন করার কোনো সুযোগ নেই। কীভাবে মন্ত্রণালয় ছাড়পত্র দিলো সে বিষয়ে ফাইল না দেখে মন্তব্য করা যাবে না। বিষয়টি নিয়ে অথরাইজড অফিসারের সঙ্গে কথা বলে মন্তব্য করা হবে।

ধানমন্ডির তিন নম্বর সড়কে পেট্রোল পাম্পের জমিতে বিআরবি গ্রুপের বহুতল ভবন নির্মাণের বিষয় জানতে চাইলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর সিটিজেন জার্নালকে বলেন, এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখব।

অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) কর্তৃক সড়কদ্বীপের সৌন্দর্যবর্ধন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট আইন ও নীতিমালা অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সাধারণত এই ধরনের কাজে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করার কথা। যদি দরপত্র ছাড়া বা প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কোনো প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়, সেটা আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। বিআরবিকে ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি তৎকালীন ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল এই বরাদ্দ দেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বিআরবি ক্যাবলকে অনেক আগেই এই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখানে কোন রুলস বা রেগুলেশনের বিষয় না। যে কোম্পানিগুলোকে এই কাজ দেওয়া হচ্ছে, তাদের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হচ্ছে। এ সমস্ত প্রতিষ্ঠান নিজস্ব খরচে সৌন্দর্যবর্ধন করছে এবং সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণও করছে। পাশাপাশি সেখান থেকে তারা সিটি কর্পোরেশনকে রেভিনিউ দিচ্ছে।’

জহিরুল ইসলাম এরপর অবশ্য যোগ করেন, ‘রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সৌন্দর্যবর্ধনের যে সমস্ত কাজগুলো আগে দেওয়া হয়েছিল, অনেকেই তা যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে করছে না। কেউ কেউ আবার সেগুলো হস্তান্তর করতে চাচ্ছে।’ এগুলো অন্য প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে বলে জানান তিনি।

সিটি করপোরেশনের জমিতে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ নেওয়ার ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘন করার বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরবি গ্রুপের পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, ডিএসএসসির সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন এটি করেছেন। আইন অনুযায়ী সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে অনুমোদন নিয়েছেন তারা।