শিরোনাম

বিশ্বাস বিল্ডার্সকে কাজ দিয়ে ভুগছে গণপূর্ত

বিশ্বাস বিল্ডার্সকে কাজ দিয়ে ভুগছে গণপূর্ত

গণপূর্ত অধিদপ্তরে গত দেড় দশক ধরে বেশ দাপটের সঙ্গে ঠিকাদারি কাজ করে যাচ্ছেন বিশ্বাস বিল্ডার্স লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম। ঢাকা এবং চট্টগ্রামসহ জেলা শহরেও রয়েছে এ প্রভাবশালী ঠিকাদারের কাজ। কিন্তু তিনি যতটা চেষ্টা-তদবির আর প্রভাব বিস্তার করে কাজ বাগিয়ে নেন, বাস্তবায়নে ঠিক ততটাই উদাসীন থাকেন। ক্ষেত্র বিশেষ কিছু প্রকল্প থেকে সংশ্লিষ্টদের নানামুখী চাপে ফেলে কাজের অতিরিক্ত বিল নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। গত কয়েক বছরে চলমান প্রকল্প সময়মতো শেষ না করায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সরকার। বিষয়টি নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরও ভুগছে রীতিমতো। বাধ্য হয়ে তাই বিশ্বাস বিল্ডার্সকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে গণপূর্ত অধিদপ্তর।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নরসিংদী জেলখানা ও চট্টগ্রামের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মিত আবাসিক ফ্ল্যাট প্রকল্পে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও কাঙ্ক্ষিত কাজ না করায় শেষ পর্যন্ত দুটি প্রকল্পের চুক্তিই বাতিল করতে হয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তরকে। এতে একদিকে সময়মতো প্রকল্প শেষ হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে সরকারকে এ কাজের জন্য গুনতে হবে বাড়তি অর্থ। নরসিংদী জেলা কারাগার নির্মাণ প্রকল্প এবং চট্টগ্রামে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পের নথি বিশ্লেষণে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। একই অবস্থা বিশ্বাস বিল্ডার্স লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিশ্বাস ট্রেডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনের বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের বহুতল ভবন নির্মাণ প্রকল্পেও।

১৪ মাসের কাজ, প্রায় তিন বছর পরও অসম্পূর্ণ

নথি ঘেঁটে দেখা যায়, নরসিংদী জেলা কারাগার নির্মাণ প্রকল্পের পূর্ত-১ (সি) প্যাকেজের আওতায় প্রশাসনিক ভবন, সাক্ষাৎকার ভবন, মাল্টিপারপাস হল, গার্ড হাউজ, ভিজিটর ওয়েটিং রুম, কর্মকর্তাদের কোয়ার্টার, ওয়ার্ডেন ব্যারাক, মসজিদ, গ্যারেজ, মেইন গেট, পাওয়ার সাবস্টেশন, পাম্প হাউস, ক্যান্টিন, স্টোরসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের কথা ছিল। এ কাজের জন্য বিশ্বাস ট্রেডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনের সঙ্গে চুক্তি হয় ২০২১ সালের ২২ ডিসেম্বর। কার্যাদেশ অনুযায়ী কাজ শেষ করার সময় ছিল ২০২৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি, অর্থাৎ ১৪ মাস। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও কাজ শেষ হয়নি। ২০২৫ সালের শেষ দিকে প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ছিল ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের প্রায় তিন বছর পরও প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ বাকি ছিল।

নথিতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন ভবনের কাঠামোগত কাজ শেষ হলেও টাইলস, দরজা, থাই অ্যালুমিনিয়াম, স্যানিটারি ফিটিংস, অভ্যন্তরীণ বৈদ্যুতিক কাজ ও রংসহ গুরুত্বপূর্ণ ফিনিশিং কাজ বাকি ছিল। দুটি অবজারভেশন টাওয়ার, সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি), পুকুর এবং ভূমি উন্নয়নের কিছু কাজও অসম্পন্ন ছিল। কাজের গতি বাড়াতে ঠিকাদারকে কমপক্ষে ৮ বার চিঠি দিয়ে তাগাদা দেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।

বৈঠকে বার বার প্রতিশ্রুতি, সাইটে লোকবল নেই

নরসিংদী জেলা কারাগার নির্মাণ প্রকল্পের নির্ধারিত প্যাকেজের কাজ শেষ করার বিষয়ে ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর সভাপতিত্বে একটি বৈঠক হয়। সেখানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিশ্বাস ট্রেডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনের প্রধান প্রকৌশলী ও অপারেশন ম্যানেজার উপস্থিত ছিলেন। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মালিক নজরুল ইসলাম সভায় উপস্থিত হতে না পারলেও মোবাইল ফোনে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে আশ্বস্ত করেন– তিন দিনের মধ্যে সাইটে পুরোদমে কাজ শুরু করা হবে এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করা হবে। কিন্তু পরবর্তী পরিদর্শনে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন পাওয়া যায়নি।

এর মধ্যে ২০২৫ সালের ৮ ও ৯ ডিসেম্বরে গণপূর্ত অধিদপ্তরের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। সে সময় প্রকল্প এলাকায় নিরাপত্তা প্রহরী, স্টোর কিপার ও সাইট ম্যানেজার ছাড়া কাজ করার মতো কোনো লোকবল পাওয়া যায়নি। এরপর ২১ ডিসেম্বর আরেক দফায় পরিদর্শনে গিয়েও কোনো ধরনের ভৌত অগ্রগতি পাওয়া যায়নি বলে সাইট অর্ডার বুকে উল্লেখ করেন দায়িত্বশীল প্রকৌশলীরা।

বিধিমতে, প্রকল্প ব্যবস্থাপকের অনুমতি ছাড়া একটানা ২৮ দিনের বেশি নির্মাণকাজ বন্ধ রাখা চুক্তির মৌলিক শর্ত লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে। নানা টালমাটাল পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত চুক্তি বাতিল করা হবে না কেন– তা জানাতে ঠিকাদারকে ২৮ দিনের সময় দিয়ে নোটিশ প্রদান করে গণপূর্ত অধিদপ্তর। কিন্তু ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বিশ্বাস বির্ল্ডাসের পক্ষ থেকে কোনো জবাব দেওয়া হয়নি।

এরপর ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের চুক্তি বাতিল, নির্ধারিত ক্ষতি ও চুক্তি অনুযায়ী জরিমানা আরোপ এবং দুই বছরের জন্য নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নরসিংদী জেলা কারাগার নির্মাণ প্রকল্পের কাজ বাতিল করার বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. উজির আলী বলেন, ‘কাজের বিলম্বের কারণেই মূলত তাদের চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। তবে আমরা চেষ্টা করেছিলাম এই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে দিয়েই কাজটি সম্পন্ন করার। এর জন্য আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমেও তাদের (ঠিকাদার) তাগাদা দিয়েছিলাম। তারা বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও কাজ বন্ধ করে রেখেছিল। তাই আমাদের বাধ্য হয়ে চুক্তি বাতিলসহ নানা ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।’

চট্টগ্রামেও একই চিত্র

বিশ্বাস বিল্ডার্সের সঙ্গে কাজের একই চিত্র উঠে আসে চট্টগ্রামে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পেও। গণপূর্ত অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন ‘চট্টগ্রামের ৩৬টি পরিত্যক্ত বাড়িতে সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ’ প্রকল্পের আওতায় তিনটি বাড়ির নির্মাণকাজ বিশ্বাস ট্রেডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনকে দেওয়া হয়। এ জন্য ২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর ২৪ মাস মেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২১ সালের ৪ নভেম্বর।

কিন্তু চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও কাজ শেষ হয়নি। নথি অনুযায়ী, নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির ৩১/বি-২ নম্বর বাড়ির সাইট হস্তান্তরের পর ৩৬ মাস পেরিয়ে গেলেও কাজের ভৌত অগ্রগতি ছিল ৫৪ শতাংশ। ২৬/এ-২ নম্বর বাড়ির অগ্রগতি ছিল ২৬ শতাংশ। আর ৩০/বি-২ নম্বর বাড়ির সাইট হস্তান্তরের ২৫ মাস পরও অগ্রগতি ছিল মাত্র ২৩ শতাংশ। তিনটি কাজ মিলিয়ে সামগ্রিক ভৌত অগ্রগতি ছিল মাত্র ৩৩ শতাংশ। বিপরীতে আর্থিক অগ্রগতি ছিল ১ হাজার ৩৬৫ দশমিক ৪২ লাখ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ১৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। কাজ নিয়ে বিপাকে পড়ে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো, কার্যসম্পাদন জামানতের মেয়াদ বৃদ্ধি, কাজের গতি ত্বরান্বিত করা এবং হালনাগাদ কর্মপরিকল্পনা দেওয়ার জন্য একাধিকবার চিঠি দিয়ে নির্দেশনা দেওয়া হলেও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি খুব একটা আমলে নেয়নি। একপর্যায়ে চুক্তির মৌলিক শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগে চুক্তি বাতিলের নোটিশ দিয়ে তা কার্যকর করা হয়। সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিকে দুই বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করা হয়।

চট্রগ্রামের আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প থেকে বিশ্বাস ট্রেডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনকে বাতিল করার প্রসঙ্গে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চট্টগ্রাম জোন) কাজী আবু হানিফ সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘কাজ নেওয়ার পর ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি চরম অবহেলা করে আসছিলো এবং দীর্ঘ সময় কাজ ঝুলিয়ে রেখেছে। আমরা বারবার তাদের কাজ সম্পন্ন করার জন্য চিঠি দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা কোনো উদ্যোগ নেয়নি। যার ফলে বিধি অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।’

ঝুলে আছে বিএফডিসির আধুনিকায়ন প্রকল্পও

চলচ্চিত্রশিল্পের আধুনিকায়নে ২০১৮ সালে শুরু হওয়া ‘বিএফডিসি কমপ্লেক্স’ নির্মাণের কাজ এখনো শেষ হয়নি। ছবি: সিটিজেডএন টোয়েন্টিফোর
চলচ্চিত্রশিল্পের আধুনিকায়নে ২০১৮ সালে শুরু হওয়া ‘বিএফডিসি কমপ্লেক্স’ নির্মাণের কাজ এখনো শেষ হয়নি। ছবি: সিটিজেডএন টোয়েন্টিফোর

চলচ্চিত্র শিল্পের আধুনিকায়নের লক্ষ্যে বিএফডিসি কমপ্লেক্স নির্মাণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্প নেয় সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি)। তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদকে হাত করে প্রকল্পটির কাজ বাগিয়ে নেয় বিশ্বাস ট্রেডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন। গত ২০১৮ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মূল বাজেট ছিল ৩২২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, যা কয়েক দফা মেয়াদ বাড়ানোর পর বর্তমানে প্রায় ৩৬৫ কোটি টাকায় এসে ঠেকেছে। তবে দীর্ঘ ৭ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ৫০ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের চরম গাফিলতির কারণে প্রকল্পটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি বলে অভিযোগ করেন তথ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ঠিকাদারের পক্ষ থেকে দক্ষ প্রকল্প পরিচালক ও প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হওয়ার ফলে ভবনের মূল সিভিল বা কাঠামোগত কাজ বছরের পর বছর ঝুলে রয়েছে। মূল বিল্ডিং তৈরি না হওয়ায় সেন্ট্রাল এসি, জেনারেটর ও লিফট স্থাপন করা যাচ্ছে না এবং সিনেপ্লেক্সের আধুনিক যন্ত্রপাতি ও ডিজিটাল ক্যামেরা আমদানির প্রক্রিয়াও পুরোপুরি আটকে আছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এই খামখেয়ালিপনার কারণে এফডিসির পুরনো শুটিং ফ্লোরগুলো আগেই ভেঙে ফেলায় বর্তমানে বিএফডিসির নিজস্ব আয় বন্ধ হয়ে গেছে। যার ফলে কর্মচারীদের বেতন দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে সংস্থাটিকে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে বিশ্বাস বিল্ডার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নজরুল ইসলামের মুঠোফোনে দুই দিন (৭ ও ৮ সেপ্টেম্বর) একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। টেক্সট মেসেজ পাঠালেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

/আরএ/