শিরোনাম

১০০ টাকা ব্যয়ে ১৪ টাকা যাবে ঋণের সুদ পরিশোধে

নিজস্ব প্রতিবেদক
১০০ টাকা ব্যয়ে ১৪ টাকা যাবে ঋণের সুদ পরিশোধে

উন্নয়ন ব্যয় চালিয়ে নেওয়া ও সরকারি কার্যক্রম পরিচালনায় আগের সরকারগুলোর মতো বর্তমান সরকারও ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। কিন্তু সরকারের আয় বাড়ছে ধীরগতিতে। ফলে একদিকে ঋণের পরিমাণ বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে সেই ঋণের সুদ পরিশোধের চাপও।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮৮ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ১০১ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার এবং বৈদেশিক ঋণ ৮৭ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার।

ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় বাড়তে থাকায় বাজেটের ভারসাম্য রক্ষা এবং নতুন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন সরকারের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, সরকারি ব্যয় ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালিয়ে নিতে গিয়ে এখন বাজেটের প্রতি ১০০ টাকা ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ১৪ টাকা রাখতে হচ্ছে শুধু সুদ পরিশোধের জন্য।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেটে শুধু সুদ পরিশোধেই ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের ১৩ দশমিক ৭০ শতাংশ যাবে পুরোনো ঋণের সুদ পরিশোধে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিদেশি ঋণে বাস্তবায়িত অনেক বড় প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় এখন কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি ডলারের দামের অস্থিরতা এবং সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ বৃদ্ধির কারণেও সুদ ব্যয় বাড়ছে। তাদের ধারণা, বছর শেষে সংশোধিত বাজেটে এই ব্যয় আরও ২ থেকে ৩ শতাংশ বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, ঋণের সুদ পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো খাতে বরাদ্দের সুযোগ কমে যায়। কারণ, বাজেটের বড় অংশ বাধ্যতামূলকভাবে সুদ পরিশোধে চলে যায়।

এর আগে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শুধু সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। সে সময় বাজেটের সংশোধিত ব্যয়ের মোট আকার ছিল ৭ লাখ ১৪ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। সেই হিসাবে, প্রতি ১০০ টাকা ব্যয়ের মধ্যে ১৬ টাকা গেছে সুদ পরিশোধে।

অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। ওই বছর সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, প্রতি ১০০ টাকা ব্যয়ের মধ্যে ১৭ টাকার বেশি গেছে পুরোনো ঋণের সুদ শোধে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, রাজস্ব আয় প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়ায় সরকারকে এখনও ঋণনির্ভর ব্যয়ের পথেই থাকতে হচ্ছে। বাজেট ঘাটতি পূরণে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। এছাড়া মূল্যস্ফীতি ও ডলারের বাজারের অস্থিরতাও সুদ ব্যয় বাড়াচ্ছে।

এদিকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সরকার ঋণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। এজন্য কম সুদের বৈদেশিক ঋণ, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং রাজস্ব আয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধের চাপ কমানো যায়।

/এফসি/