শিরোনাম

গণভোটের প্রচারে ব্যাংক খাত থেকে গিয়েছে পৌনে ৪ কোটি টাকা

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
গণভোটের প্রচারে ব্যাংক খাত থেকে গিয়েছে পৌনে ৪ কোটি টাকা
প্রতীকী ছবি।

গণভোটের ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণায় ব্যাংকগুলোর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রান্তিক মানুষের জন্য রাখা তহবিল থেকে মোট ৩ কোটি ৭২ লাখ ৮৪ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আদেশের প্রেক্ষিতে গণভোটের প্রচারণায় তহবিল ছাড় দেওয়ার কথা বলছে বাংলাদেশ ব্যাংক। স্টুডেন্টস এগেইন্স্ট ডিসক্রিমিনেশন ফাউন্ডেশন, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ও ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি নামের তিনটি সংগঠনকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এবিবি এ টাকা দেয়।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, সিএসআর তহবিল সাধারণ মানুষের প্রাপ্য। এ অর্থ রাজনৈতিক প্রচারণায় ব্যবহার অশনিসংকেত, অনৈতিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার চরম লঙ্ঘন। ২০২৬ এর নির্বাচনের আগে বড় ব্যানার টানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের চত্বরেই হয় ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা, যা ছিল দৃষ্টিকটু।

তথ্য অনুযায়ী, গণভোটের প্রচারণায় আর্থিক সহায়তা নিতে ‘স্টুডেন্ট এগিনেস্ট ডিসক্রেমিনেশন ফাউন্ডেশনের আবেদনে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ এর রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর নির্বাচনের আগে অর্থাৎ ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি নিবন্ধিত হয়। একমাসেরও কম সময়ের সংগঠনটি নির্বাচনে গণভোট সফল করতে তিনটি প্রকল্পে ১২ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার টাকার আবেদন করে। অনলাইন রেফারেন্ডাম প্রচারণা, কনসার্ট ও স্ট্র্যাটেজিক ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড এ ন্যাশনওয়াইড ইয়ুথ এনগেজমেন্ট ক্যাম্পেইন- এই তিন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য অর্থ চাওয়া হয়। সে প্রেক্ষিতে ১ কোটি টাকা মঞ্জুর করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এছাড়া ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারে এবিবি থেকে আড়াই কোটি টাকা নেয় সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। এছাড়া, ২০ লাখ ৮৪ হাজার টাকা অনুদান পায় ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর) থেকে গণভোট ২০২৬ উপলক্ষে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আর্থিক সহায়তা বাবদ স্টুডেন্টস এগেইন্স্ট ডিসক্রিমিনেশন ফাউন্ডেশনকে এক কোটি টাকা দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, অর্থ খরচের পূর্ণাঙ্গ অডিট রিপোর্ট জমা দেওয়ার শর্তে এক কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। অনুদানের অর্থ খরচের বিষয়ে অডিটেড রিপোর্ট জমা দিয়েছে ‘স্টুডেন্টস এগেইন্স্ট ডিসক্রিমিনেশন ফাউন্ডেশন’। যা পর্যালোচনাধীন রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী এই অর্থ দেওয়া হয়।

ব্যাংকারদের সংগঠনটির মতে, ১১ জানুয়ারি বিশেষ সভা ডেকে গণভোটের প্রচারে ব্যাংকগুলোর সভায় গভর্নর ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা। যেখানে এজেন্ডা না থাকলেও এই গণভোট সফল করতে চাপ দেয়া হয় ব্যাংকগুলোকে। উপায় হিসেবে ব্যাংকগুলোর সিএসআর খাত থেকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণায় খরচের নির্দেশনা আসে।

তৎকালীন গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের নির্দেশনায় সুজনকে মোট ২ কোটি ৫২ লাখ টাকা গণভোটের প্রচারের জন্য দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন ব্যাংক নিবার্হীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্সের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন।

তিনি বলেন, তৎকালীন গভর্নর মহোদয় এবিবির নেতাদেরকে তার অফিসে ডাকেন। তিনি (গভর্নর) ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে বড়ো অংকের টাকা হ্যাঁ ভোটের প্রচারণার জন্য দিতে বলেন। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে লিখিত নির্দেশনা চায় এবিবি। ব্যাংক পর্ষদের অনুমোদন ছাড়া সিএসআর তহবিল থেকে অর্থ দেওয়া যাবে না বলেও জানায় এবিবি।

তখন ব্যাংকের বদলে এবিবি এর তহবিল থেকে অর্থ দেওয়ার বিষয়টি ঠিক হয় উল্লেখ করে মাসরুর আরেফিন বলেন, এখানে যা কিছু হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে এবিবির নেতাদের পরপর দুটি মিটিংয়ে এ বিষয়ক নির্দেশনা প্রাপ্তির মাধ্যমে হয়েছে। এবিবি তহবিল থেকে সুজনকে ২ কোটি ৫২ লাখ টাকা ও ডিবেট ফর ডেমোক্রেসিকে ২০ লাখ ৮৪ হাজার টাকা দেওয়া হয়। তারা খরচের প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। ডিবেট ফর ডেমোক্রেসিকে দেওয়া টাকার নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি গাইডলাইন অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর সিএসআর এর অর্থের ৩০ শতাংশ খরচ করতে হবে শিক্ষা খাতে, স্বাস্থ্য সেবায় ৩০ শতাংশ, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন খাতে ২০ শতাংশ এবং খেলাধুলা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সুবিধাবঞ্চিত জণগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বিকাশ, আর্টস, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে ২০ শতাংশ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে নির্বাচনের প্রচারণায় ব্যাংকগুলোর এই অংশগ্রহণ নিয়মবহির্ভূত, অনৈতিক ও ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত বলছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।

অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর বলেন, গণভোটের পক্ষে শুধু ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানো হয়েছে। এই অর্থ ব্যবহারে সিআরএসের নীতিমালার লঙ্ঘন হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যান্য খাত থেকে এই অর্থ ব্যবহার করতে পারতো। অডিট হবে-এই কারণে তারা সেসব খাত থেকে অর্থ নেয়নি।

তিনি বলেন, বিষয়টি সুরাহা না হলে ভবিষ্যতে এই সিএসআরের অর্থ লুটপাট হবে, রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার হতে পারে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, গণভোটের পক্ষে শুধু হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানো হয়েছে। এই ব্যয় যদি নীতিমালার বাইরে হয়ে থাকে, তবে তা সিএসআরের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই অর্থের উৎস, ব্যবহার ও নিরীক্ষা সবকিছু জনগণের কাছে স্পষ্ট করা জরুরি।

তিনি সতর্ক করে বলেন, এতে ভবিষ্যতে জবাবদিহির সংকট তৈরি হবে এবং ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থা কমতে পারে।

এই অর্থনীতিবিদ আরোও বলেন, বিষয়টি সুরাহা না হলে ভবিষ্যতে সিএসআরের অর্থ লুটপাট হবে, রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার হতে পারে। া

/এসবি/