শিরোনাম

জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণ, অর্থনীতির স্থবিরতায় রিজার্ভে স্বস্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণ, 
অর্থনীতির স্থবিরতায় রিজার্ভে স্বস্তি
এলএনজিবাহী কার্গো। ফাইল ছবি

বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায় বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশকে জ্বালানি আমদানিতে আগের অর্থবছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি অর্থ খরচ করতে হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, এক অর্থবছরের ব্যবধানে এ খাতে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। তবে জ্বালানির এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ এখনো বড় ধরনের প্রভাব ফেলেনি ডলারের বাজারে। এর অন্যতম কারণ দেশের অর্থনীতির স্থবির অবস্থা।

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে মন্দাভাব এবং শিল্পের দুর্বল অবস্থার কারণে গত অর্থবছরে ভোগ্যপণ্য, মূলধনি যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি কমেছে। ফলে একদিকে জ্বালানি আমদানির জন্য বেশি ডলার ব্যয় হলেও অন্যদিকে অন্যান্য পণ্য আমদানিতে ডলারের চাহিদা কম ছিল। এতে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে বড় ধরনের বাড়তি চাপ তৈরি হয়নি।

তবে অর্থনীতির এই স্থবিরতা কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদি স্বস্তির কারণ নয় বলে মনে করেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। তাদের মতে,অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালে শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি বাড়বে। পাশাপাশি জ্বালানি আমদানির ব্যয়ও বেশি থাকলে ডলারের চাহিদা দ্রুত বাড়তে পারে। তখন বর্তমানের স্থিতিশীলতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অপরিশোধিত জ্বালানি, পেট্রোলিয়াম, তেল ও লুব্রিকেন্ট আমদানিতে মোট ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। আগের অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় ছিল ৫ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়েছে ৫ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার।

এই বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব দেশের মোট আমদানিতেও পড়েছে। গত অর্থবছরে মোট আমদানি ব্যয় ৭১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যা ছিল ৬৪ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। এক বছরে মোট আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার।

জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি কয়েক মাসের হিসাবেও স্পষ্ট। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ৫২ কোটি ডলার। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে হয় ৭৩ কোটি ডলার। জানুয়ারিতে জ্বালানি আমদানির ব্যয় ৩০ কোটি ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ কোটি ডলারে। এপ্রিলে ৩৫ কোটি থেকে বেড়ে হয় ১৩৪ কোটি ডলার। আর জুনে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১৬০ কোটি ডলার, যেখানে আগের বছরের একই মাসে ব্যয় ছিল ২৬ কোটি ডলার।

ডলারের বাজারে স্বস্তি কতদিন

জ্বালানি আমদানিতে এত বড় অঙ্কের বাড়তি ব্যয় হলেও ডলারের বাজারে ২০২২ সালের মতো অস্থিরতা দেখা যায়নি। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ডলারের বাজারে যে স্বস্তি দেখা যাচ্ছে, সেটিকে স্থায়ী স্বস্তি হিসেবে দেখছেন না অর্থনীতিবিদেরা।

তাদের মতে, অর্থনীতির দুর্বলতা নিজেই ডলারের চাহিদা কমিয়ে দিয়েছে। অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালে শিল্পকারখানায় বিনিয়োগ বাড়বে। বাড়বে মূলধনি যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি। একই সময়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেশি থাকলে জ্বালানি আমদানির ব্যয়ও উচ্চ থাকবে। ফলে ডলারের ওপর একসঙ্গে একাধিক দিক থেকে চাপ তৈরি হতে পারে। তখন ডলারের দাম ও রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা আছে।

এবিষয়ে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ডলারে চাপ না পড়াটা আপাতত স্বস্তিদায়ক মনে হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদী হবে না, যদি না এই পরিস্থিতিকে দ্রুত সময় কাজে লাগাতে পারে সরকার। সরকারের উচিত রপ্তানি বাড়ানো। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে জ্বালানির বিকল্প ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের বিরাজমান সংকট কবে কাটবে তা অনিশ্চিত। এদিকে তেলের দাম বাড়লে আমদানির ব্যয় বাড়বে, আর দেশের আমদানি সচল হলে এই ব্যয় সামাল দেয়া কঠিন হবে। এদিকে জ্বালানি মূল্য সমন্বয় না করলে ভর্তুকি বাড়বে। সুতরাং সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে এবং স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।'

আপাতত রিজার্ভেও স্বস্তি

জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়লেও প্রবাসী আয় ও বিদেশি ঋণছাড়ের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়নি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের বিপিএম -৬ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন শেষে দেশের রিজার্ভ ছিল ২৬ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলারে।
গত ২০ আগস্ট রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার। বিপিএম (ব্যালেন্স অব পেমেন্টস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল) হিসাবের বাইরে সাধারণ হিসাবে মোট রিজার্ভের পরিমাণ কিছুটা বেশি, ৩৭ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার।

একই সময়ে প্রবাসী আয়েও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের অর্থবছরে এসেছিল ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে প্রবাসী আয় বেড়েছে ১৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ।

এদিকে বিদেশি ঋণ ছাড়ও ছিল উল্লেখযোগ্য। গত অর্থবছরে মোট ৮০৭ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ ছাড় হয়েছে। তবে একই সময় এযাবৎকালের সর্বোচ্চ ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে, যার পরিমাণ ছিলো প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আমদানি ব্যয়ের তুলনায় রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে বেশি ডলার দেশে আসায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ৬৫০ কোটি ডলার কিনে রিজার্ভ বাড়াতে পেরেছে।