শিরোনাম

এলডিসি থেকে উত্তরণ তিন বছর পেছাতে জাতিসংঘকে চিঠি দিয়েছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
এলডিসি থেকে উত্তরণ তিন বছর পেছাতে জাতিসংঘকে চিঠি দিয়েছে সরকার
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে বাংলাদেশ। দায়িত্ব নেওয়ার পরদিনই নতুন সরকার এই চিঠি পাঠায়।

নতুন সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) অধীন কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পোর কাছে চিঠিটি পাঠান।

সিডিপির কাছে পাঠানো ওই চিঠিতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে এলডিসি উত্তরণ-প্রস্তুতির সময়কাল ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়। আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ হবে চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর।

বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর সাংবাদিকদের বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ বিলম্বিত করতে যা যা করা দরকার, সবই করা হবে। আজ থেকেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে। ইআরডির সঙ্গে দ্রুত সমন্বয় করে উত্তরণ বিলম্বিত করার কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ওই দিনই ইআরডি সচিব সিডিপি চেয়ারম্যানকে চিঠি দেন।

ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, এ বিষয়ে সিডিপি আগামী ২৪ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি বৈঠকে বসবে। সেখানে বাংলাদেশের অনুরোধসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হবে।

সরকারের চিঠিতে যা আছে

বাংলাদেশে এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণ পেছানোর অনুরোধ জানিয়ে দেওয়া চিঠিতে উল্লখ করা হয়েছে, সরকার যে প্রস্তুতি সময়কাল পেয়েছিল, তা মূলত কোভিড মহামারি-পরবর্তী পাঁচ বছরের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য ব্যবহারের কথা ছিল। কিন্তু এই সময়ে একাধিক বৈশ্বিক সংকট অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়েছে, বিশ্বব্যাপী কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করা হয়েছে এবং বৈশ্বিক মন্দার প্রভাব পড়েছে।

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পাশাপাশি শিপিং খাতে সরবরাহ বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আর দেশি সংকটের মধ্যে আর্থিক খাতে অনিয়ম, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়েছে, বর্তমান বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতিতে উচ্চ মাত্রার অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। একই সঙ্গে প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের নীতিগত পরিবর্তন বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা মোকাবিলায় সময় প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২৪ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারির বৈঠকের পর প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রাথমিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রস্তুত হতে পারে। এরপর সিডিপি তাদের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ দেবে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে আগামী সেপ্টেম্বরে।

এমন প্রেক্ষাপটে সরকারের নীতিগত মনোযোগ স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও সংকট ব্যবস্থাপনার দিকে সরে যায়। যেমন সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা, জীবিকা সুরক্ষা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বৈদেশিক লেনদেনের চাপ সামাল দেওয়া ইত্যাদি। এর ফলে উত্তরণ-সংক্রান্ত সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। এসব কারণে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির সময়কাল পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।

সিডিপির চেয়ারম্যানকে দেওয়া চিঠিতে সরকার বলেছে, শুল্ক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, জ্বালানি সংস্কার, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ, শিল্পকারখানার কমপ্লায়েন্স অবকাঠামো উন্নয়নের অগ্রগতি হলেও একের পর এক সংকটের কারণে সেগুলো নির্ধারিত সময়ের চেয়ে পিছিয়ে আছে।

সরকারের পক্ষ থেকে শঙ্কা প্রকাশ করে চিঠিতে বলেছে, বর্তমান সময়সূচি অনুযায়ী, এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। যা কিনা উত্তরণের টেকসই ও অপরিবর্তনীয় চরিত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকাভুক্ত হয়। এলডিসিভুক্ত থাকার সুবাদে পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ নানা সুযোগ পেয়ে এসেছে। এলডিসি থেকে কোন দেশ বের হবে, সে বিষয়ে সুপারিশ করে সিডিপি।

তিন বছর পরপর এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর ত্রিবার্ষিক মূল্যায়ন হয়। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এই তিন সূচকের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়, কোন দেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্য। এর মধ্যে যেকোনো দুটি সূচকে উত্তীর্ণ হতে হয় অথবা মাথাপিছু আয় নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ হতে হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব মানদণ্ড অবশ্য পরিবর্তিত হয়।

বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (জিএনআই), মানবসম্পদ সূচক (এইচএআই) এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকিপূর্ণতা সূচক (ইভিআই)। ২০২১ সালেই চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করা হয়েছিল, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হবে। কিন্তু করোনার কারণে এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণ দুই বছর পিছিয়ে যায়।

/বিবি/