হাওরের কৃষকের স্বপ্ন কেড়ে নিলো পাহাড়ি ঢল

হাওরের কৃষকের স্বপ্ন কেড়ে নিলো পাহাড়ি ঢল
আয়নাল হোসেন

বছরের এই সময় হাওরজুড়ে সোনালি ধান দেখে কৃষকের মন আনন্দে ভরে যেত, কিন্তু এবার সেখানে শুধু দীর্ঘশ্বাস। প্রবল বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওরের কিছু এলাকার ধান পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক কষ্টে ডুবে থাকা জমির ধান কেটে আনলেও রোদের অভাবে তা পচে যাচ্ছে। বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না ভালো দাম। সবমিলিয়ে কৃষকেরা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অথচ এই বোরো ধান বিক্রি করে সংসার চালানোর পাশাপাশি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা। পাহাড়ি ঢলে তাদের সেই স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার সরাপাড়া গ্রামের মুঞ্জুরা বেগম ও তার সন্তানেরা হাওরের ৪০ কাঠা (প্রতি কাঠায় ১০ শতাংশ) জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন। গত বছর সাত কাঠা জমি থেকে ৮৫ মণ ধান পেয়েছেন। এবার খেত ডুবে যাওয়ায় সাত মণ ধানও সংগ্রহ করতে পারেননি।
গতকাল মঙ্গলবার মুঞ্জুরা বেগমের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয়। তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বাবারে এইবার আমরা সবশ্যাষ। ২৪০–২৫০ মণ ধান পাই প্রতিবার। এবার পানির নিচে গেছেগা। খরচ ওঠান যাই তো না। বছর ভরই কী খামু তা জানিনা।’
হাওরের ফসলডুবিতে মুঞ্জুরা বেগমের মতো হাজার হাজার কৃষকের অনেক লোকসান হয়ে গেছে। ফলন বিপর্যয়ের কারণে চালের দাম বেড়ে যাওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। এসব সংকট মোকাবিলায় নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এ ছাড়া এ অবস্থায় ভেজা ধান রক্ষা ও প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য কিছু পরামর্শ দিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
ভিজে যাওয়া ধান রক্ষায় করণীয়
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, যেসব ধান ভিজে গেছে সেগুলো দ্রুত শুকানোর জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা ছাড়াও আশপাশের জেলা থেকে অতিরিক্ত ড্রায়ার মেশিন এনে শুকানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আর যেসব ধান পানিতে তলিয়ে রয়েছে, সেগুলো দ্রুত কাটার জন্য বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিক ভাড়া করে নিয়ে আসা হয়েছে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা ভিজে যাওয়া ধান রক্ষার জন্য আরও বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলেছেন, খেত থেকে কেটে আনা ধান উঁচু ও শুকনো স্থানে রাখতে হবে। এ ছাড়া এই ধরনের সংকট মোকাবিলায় উঁচু স্থানে ধান রাখার গুদাম নির্মাণ করতে হবে। এসব গুদামে ভেজা ধান শুকানোর আধুনিক ব্যবস্থা থাকতে হবে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস সম্পর্কে খবর রাখতে হবে। বৃষ্টির পূর্বাভাস পেলে আধা পাকা ধানও খেত থেকে কেটে নিয়ে আসতে হবে।
৪৭ হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্ট
হাওরাঞ্চলের সাত জেলায় বোরো মৌসুমে উৎপাদিত ধান দেশের ১৮–২০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করে। এ বছর আকস্মিক বৃষ্টি ও হাওর রক্ষা বাঁধ ভেঙে হাওরাঞ্চলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ফসলের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জ জেলায়। বৃষ্টিতে হাওরের ৪৭ হাজার হেক্টর জমির ধানের ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবদুর রহিম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, হাওরাঞ্চলের ৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৪ হেক্টর জমিতে এবারের বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। গত ২৬ এপ্রিল থেকে হাওরের জেলাগুলোতে অতিবৃষ্টি শুরু হয়। এতে ৪৭ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এবার হাওরাঞ্চলে ১৯ লাখ ৭ হাজার চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১০ শতাংশের বেশি ক্ষতি হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সম্প্রসারণ উইং) মো. সেলিম খান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, হাওরাঞ্চলের ফসলের যাতে ক্ষতি না হয় সেজন্য গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রণালয়ে একটি সভা হয়। ওই সভায় হাওরাঞ্চলে ধান টাকার জন্য কক্সবাজার থেকে অতিরিক্ত শ্রমিক পাঠানো হয়। এ ছাড়া সরকারের পক্ষ ধান কাটা, মাড়াই এবং শুকানোর জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ কন্ হয়। অতি বৃষ্টির কারণে হাওরের বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যায়। এ কারণে ক্ষতির পরিমাণটা একটু বেশি। তবে সরকারের পক্ষ থেকে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ায় অনেক ফসলই রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ৫০ লাখ ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। এবার দুই কোটি ১৪ লাখ টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ।
হাওরাঞ্চলে ধানের ক্ষতি হওয়ায় চালের বাজারে কী প্রভাব পড়বে–এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) সাবেক পরিচালক এম আসাদুজ্জামান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, বছরে যে পরিমাণ চালের চাহিদা, তার মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ আসে হাওরাঞ্চল থেকে। যদি অল্প ক্ষতি হয় তাহলে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে বেশি ক্ষতি হলে চালের বাজারে প্রভাব পড়বে। এজন্য সরকারকে আগামী দুই মাসের মধ্যেই মজুত বাড়াতে আমদানি শুরু করতে হবে। আমদানি না বাড়ালে ব্যবসায়ীরা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে।
এ বিষয়ে দিনাজপুর জেলার প্রগতি রাইস মিলের মালিক প্রশান্ত সাহা বলেন, পানিতে হাওরের ধান নষ্ট হলে চালের বাজারে প্রভাব পড়ে। এবারের আকস্মিক বন্যায় ধানের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা সঠিকভাবে নিরূপণ করতে হবে। তবে দেশের অন্যান্য জেলায় এবার ফলন ভালো হয়েছে।

বছরের এই সময় হাওরজুড়ে সোনালি ধান দেখে কৃষকের মন আনন্দে ভরে যেত, কিন্তু এবার সেখানে শুধু দীর্ঘশ্বাস। প্রবল বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওরের কিছু এলাকার ধান পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক কষ্টে ডুবে থাকা জমির ধান কেটে আনলেও রোদের অভাবে তা পচে যাচ্ছে। বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না ভালো দাম। সবমিলিয়ে কৃষকেরা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অথচ এই বোরো ধান বিক্রি করে সংসার চালানোর পাশাপাশি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা। পাহাড়ি ঢলে তাদের সেই স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার সরাপাড়া গ্রামের মুঞ্জুরা বেগম ও তার সন্তানেরা হাওরের ৪০ কাঠা (প্রতি কাঠায় ১০ শতাংশ) জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন। গত বছর সাত কাঠা জমি থেকে ৮৫ মণ ধান পেয়েছেন। এবার খেত ডুবে যাওয়ায় সাত মণ ধানও সংগ্রহ করতে পারেননি।
গতকাল মঙ্গলবার মুঞ্জুরা বেগমের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয়। তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বাবারে এইবার আমরা সবশ্যাষ। ২৪০–২৫০ মণ ধান পাই প্রতিবার। এবার পানির নিচে গেছেগা। খরচ ওঠান যাই তো না। বছর ভরই কী খামু তা জানিনা।’
হাওরের ফসলডুবিতে মুঞ্জুরা বেগমের মতো হাজার হাজার কৃষকের অনেক লোকসান হয়ে গেছে। ফলন বিপর্যয়ের কারণে চালের দাম বেড়ে যাওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। এসব সংকট মোকাবিলায় নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এ ছাড়া এ অবস্থায় ভেজা ধান রক্ষা ও প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য কিছু পরামর্শ দিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
ভিজে যাওয়া ধান রক্ষায় করণীয়
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, যেসব ধান ভিজে গেছে সেগুলো দ্রুত শুকানোর জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা ছাড়াও আশপাশের জেলা থেকে অতিরিক্ত ড্রায়ার মেশিন এনে শুকানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আর যেসব ধান পানিতে তলিয়ে রয়েছে, সেগুলো দ্রুত কাটার জন্য বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিক ভাড়া করে নিয়ে আসা হয়েছে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা ভিজে যাওয়া ধান রক্ষার জন্য আরও বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলেছেন, খেত থেকে কেটে আনা ধান উঁচু ও শুকনো স্থানে রাখতে হবে। এ ছাড়া এই ধরনের সংকট মোকাবিলায় উঁচু স্থানে ধান রাখার গুদাম নির্মাণ করতে হবে। এসব গুদামে ভেজা ধান শুকানোর আধুনিক ব্যবস্থা থাকতে হবে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস সম্পর্কে খবর রাখতে হবে। বৃষ্টির পূর্বাভাস পেলে আধা পাকা ধানও খেত থেকে কেটে নিয়ে আসতে হবে।
৪৭ হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্ট
হাওরাঞ্চলের সাত জেলায় বোরো মৌসুমে উৎপাদিত ধান দেশের ১৮–২০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করে। এ বছর আকস্মিক বৃষ্টি ও হাওর রক্ষা বাঁধ ভেঙে হাওরাঞ্চলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ফসলের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জ জেলায়। বৃষ্টিতে হাওরের ৪৭ হাজার হেক্টর জমির ধানের ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবদুর রহিম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, হাওরাঞ্চলের ৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৪ হেক্টর জমিতে এবারের বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। গত ২৬ এপ্রিল থেকে হাওরের জেলাগুলোতে অতিবৃষ্টি শুরু হয়। এতে ৪৭ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এবার হাওরাঞ্চলে ১৯ লাখ ৭ হাজার চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১০ শতাংশের বেশি ক্ষতি হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সম্প্রসারণ উইং) মো. সেলিম খান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, হাওরাঞ্চলের ফসলের যাতে ক্ষতি না হয় সেজন্য গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রণালয়ে একটি সভা হয়। ওই সভায় হাওরাঞ্চলে ধান টাকার জন্য কক্সবাজার থেকে অতিরিক্ত শ্রমিক পাঠানো হয়। এ ছাড়া সরকারের পক্ষ ধান কাটা, মাড়াই এবং শুকানোর জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ কন্ হয়। অতি বৃষ্টির কারণে হাওরের বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যায়। এ কারণে ক্ষতির পরিমাণটা একটু বেশি। তবে সরকারের পক্ষ থেকে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ায় অনেক ফসলই রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ৫০ লাখ ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। এবার দুই কোটি ১৪ লাখ টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ।
হাওরাঞ্চলে ধানের ক্ষতি হওয়ায় চালের বাজারে কী প্রভাব পড়বে–এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) সাবেক পরিচালক এম আসাদুজ্জামান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, বছরে যে পরিমাণ চালের চাহিদা, তার মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ আসে হাওরাঞ্চল থেকে। যদি অল্প ক্ষতি হয় তাহলে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে বেশি ক্ষতি হলে চালের বাজারে প্রভাব পড়বে। এজন্য সরকারকে আগামী দুই মাসের মধ্যেই মজুত বাড়াতে আমদানি শুরু করতে হবে। আমদানি না বাড়ালে ব্যবসায়ীরা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে।
এ বিষয়ে দিনাজপুর জেলার প্রগতি রাইস মিলের মালিক প্রশান্ত সাহা বলেন, পানিতে হাওরের ধান নষ্ট হলে চালের বাজারে প্রভাব পড়ে। এবারের আকস্মিক বন্যায় ধানের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা সঠিকভাবে নিরূপণ করতে হবে। তবে দেশের অন্যান্য জেলায় এবার ফলন ভালো হয়েছে।

হাওরের কৃষকের স্বপ্ন কেড়ে নিলো পাহাড়ি ঢল
আয়নাল হোসেন

বছরের এই সময় হাওরজুড়ে সোনালি ধান দেখে কৃষকের মন আনন্দে ভরে যেত, কিন্তু এবার সেখানে শুধু দীর্ঘশ্বাস। প্রবল বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওরের কিছু এলাকার ধান পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক কষ্টে ডুবে থাকা জমির ধান কেটে আনলেও রোদের অভাবে তা পচে যাচ্ছে। বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না ভালো দাম। সবমিলিয়ে কৃষকেরা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অথচ এই বোরো ধান বিক্রি করে সংসার চালানোর পাশাপাশি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা। পাহাড়ি ঢলে তাদের সেই স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার সরাপাড়া গ্রামের মুঞ্জুরা বেগম ও তার সন্তানেরা হাওরের ৪০ কাঠা (প্রতি কাঠায় ১০ শতাংশ) জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন। গত বছর সাত কাঠা জমি থেকে ৮৫ মণ ধান পেয়েছেন। এবার খেত ডুবে যাওয়ায় সাত মণ ধানও সংগ্রহ করতে পারেননি।
গতকাল মঙ্গলবার মুঞ্জুরা বেগমের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয়। তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বাবারে এইবার আমরা সবশ্যাষ। ২৪০–২৫০ মণ ধান পাই প্রতিবার। এবার পানির নিচে গেছেগা। খরচ ওঠান যাই তো না। বছর ভরই কী খামু তা জানিনা।’
হাওরের ফসলডুবিতে মুঞ্জুরা বেগমের মতো হাজার হাজার কৃষকের অনেক লোকসান হয়ে গেছে। ফলন বিপর্যয়ের কারণে চালের দাম বেড়ে যাওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। এসব সংকট মোকাবিলায় নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এ ছাড়া এ অবস্থায় ভেজা ধান রক্ষা ও প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য কিছু পরামর্শ দিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
ভিজে যাওয়া ধান রক্ষায় করণীয়
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, যেসব ধান ভিজে গেছে সেগুলো দ্রুত শুকানোর জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা ছাড়াও আশপাশের জেলা থেকে অতিরিক্ত ড্রায়ার মেশিন এনে শুকানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আর যেসব ধান পানিতে তলিয়ে রয়েছে, সেগুলো দ্রুত কাটার জন্য বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিক ভাড়া করে নিয়ে আসা হয়েছে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা ভিজে যাওয়া ধান রক্ষার জন্য আরও বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলেছেন, খেত থেকে কেটে আনা ধান উঁচু ও শুকনো স্থানে রাখতে হবে। এ ছাড়া এই ধরনের সংকট মোকাবিলায় উঁচু স্থানে ধান রাখার গুদাম নির্মাণ করতে হবে। এসব গুদামে ভেজা ধান শুকানোর আধুনিক ব্যবস্থা থাকতে হবে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস সম্পর্কে খবর রাখতে হবে। বৃষ্টির পূর্বাভাস পেলে আধা পাকা ধানও খেত থেকে কেটে নিয়ে আসতে হবে।
৪৭ হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্ট
হাওরাঞ্চলের সাত জেলায় বোরো মৌসুমে উৎপাদিত ধান দেশের ১৮–২০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করে। এ বছর আকস্মিক বৃষ্টি ও হাওর রক্ষা বাঁধ ভেঙে হাওরাঞ্চলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ফসলের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জ জেলায়। বৃষ্টিতে হাওরের ৪৭ হাজার হেক্টর জমির ধানের ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবদুর রহিম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, হাওরাঞ্চলের ৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৪ হেক্টর জমিতে এবারের বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। গত ২৬ এপ্রিল থেকে হাওরের জেলাগুলোতে অতিবৃষ্টি শুরু হয়। এতে ৪৭ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এবার হাওরাঞ্চলে ১৯ লাখ ৭ হাজার চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১০ শতাংশের বেশি ক্ষতি হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সম্প্রসারণ উইং) মো. সেলিম খান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, হাওরাঞ্চলের ফসলের যাতে ক্ষতি না হয় সেজন্য গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রণালয়ে একটি সভা হয়। ওই সভায় হাওরাঞ্চলে ধান টাকার জন্য কক্সবাজার থেকে অতিরিক্ত শ্রমিক পাঠানো হয়। এ ছাড়া সরকারের পক্ষ ধান কাটা, মাড়াই এবং শুকানোর জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ কন্ হয়। অতি বৃষ্টির কারণে হাওরের বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যায়। এ কারণে ক্ষতির পরিমাণটা একটু বেশি। তবে সরকারের পক্ষ থেকে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ায় অনেক ফসলই রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ৫০ লাখ ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। এবার দুই কোটি ১৪ লাখ টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ।
হাওরাঞ্চলে ধানের ক্ষতি হওয়ায় চালের বাজারে কী প্রভাব পড়বে–এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) সাবেক পরিচালক এম আসাদুজ্জামান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, বছরে যে পরিমাণ চালের চাহিদা, তার মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ আসে হাওরাঞ্চল থেকে। যদি অল্প ক্ষতি হয় তাহলে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে বেশি ক্ষতি হলে চালের বাজারে প্রভাব পড়বে। এজন্য সরকারকে আগামী দুই মাসের মধ্যেই মজুত বাড়াতে আমদানি শুরু করতে হবে। আমদানি না বাড়ালে ব্যবসায়ীরা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে।
এ বিষয়ে দিনাজপুর জেলার প্রগতি রাইস মিলের মালিক প্রশান্ত সাহা বলেন, পানিতে হাওরের ধান নষ্ট হলে চালের বাজারে প্রভাব পড়ে। এবারের আকস্মিক বন্যায় ধানের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা সঠিকভাবে নিরূপণ করতে হবে। তবে দেশের অন্যান্য জেলায় এবার ফলন ভালো হয়েছে।




