শিরোনাম

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা আপনার যেসব সাধারণ তথ্যও বিপদের কারণ হতে পারে

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা আপনার যেসব সাধারণ তথ্যও বিপদের কারণ হতে পারে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার। ছবি: রয়টার্স

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পারিবারিক ছবি, জন্মদিনের শুভেচ্ছা, সন্তানের স্কুলে যাওয়ার প্রথম দিনের ছবি কিংবা কোথায় ঘুরতে গেছেন—এমন নানা মুহূর্ত নিয়মিতই ভাগ করে নেন অনেকে। কিন্তু এসব তথ্যই কখনো কখনো হয়ে উঠতে পারে প্রতারক বা সাইবার অপরাধীদের হাতিয়ার। সরাসরি অবস্থান জানানো থেকে শুরু করে ভ্রমণের পরিকল্পনা, শিশুর ছবি কিংবা পরিচয়পত্রের ছবি—অসতর্কভাবে পোস্ট করা তথ্য থেকে প্রতারণা, পরিচয় জালিয়াতি এমনকি অনুসরণের (স্টকিং) ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো কিছু প্রকাশের আগে সহজ একটি অভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন—‘পোস্ট করার আগে ভাবুন।’

কুইক হিল টেকনোলজিসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হরিশ কুমার জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়া এখন অনেকের কাছেই স্বাভাবিক অভ্যাস হয়ে গেছে। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ কোনো পোস্টের মধ্যেও একজন ব্যক্তির পরিচয়, সম্পর্ক, দৈনন্দিন অভ্যাস বা অবস্থান সম্পর্কে অনেক তথ্য প্রকাশ পেতে পারে।

তিনি বলেন, একবার কোনো তথ্য প্রকাশ্যে চলে গেলে সেটি কপি, সংরক্ষণ বা পুনরায় ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। এসব তথ্য ব্যবহার করে একজন ব্যক্তির সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা তৈরি করতে পারে প্রতারকেরা।

হরিশ কুমার আরো জানান, ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে প্রতারকেরা ভুয়া পরিচয় তৈরি, পরিচয় চুরি এবং সামাজিক প্রকৌশলভিত্তিক (সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং) প্রতারণা করতে পারে। পরিচিত মানুষের নাম, ছবি ও প্রকাশ্য তথ্য ব্যবহার করে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুদের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারে তারা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোন তথ্য পোস্ট না করাই ভালো

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্ক থাকা উচিত। যেমন—

  1. ফোন নম্বর ও ব্যক্তিগত ই-মেইল ঠিকানা
  2. বাসার ঠিকানা ও কর্মস্থলের বিস্তারিত তথ্য
  3. সরাসরি অবস্থান (লাইভ লোকেশন) ও রিয়েল-টাইম চেক-ইন
  4. ভ্রমণের পরিকল্পনা ও ছুটির সময়সূচি
  5. বোর্ডিং পাস, টিকিট ও বুকিংয়ের তথ্য
  6. আধার কার্ড, প্যান কার্ডসহ পরিচয়পত্রের ছবি
  7. ব্যাংকিং বা আর্থিক তথ্য এবং লেনদেনের স্ক্রিনশট
  8. সন্তানের স্কুল, দৈনন্দিন রুটিন বা নিয়মিত যাতায়াতের স্থান
  9. ছবির পেছনে থাকা সংবেদনশীল তথ্য
  10. পাসওয়ার্ড, নিরাপত্তা প্রশ্ন বা অ্যাকাউন্ট-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করে এমন কোনো বিষয়

একটি তথ্য আলাদাভাবে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে না হলেও অন্য প্রকাশ্য তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে সেটিই প্রতারকদের কাছে মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে।

মাল্টারবিটের ব্যবসায়িক ইউনিটের প্রধান বরুণ গ্রোভার জানিয়েছেন, ডিজিটাল পদচিহ্ন দ্রুতই ডিজিটাল ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। কোনো ছবিতে অবস্থানের তথ্য, কিংবা দৈনন্দিন চলাফেরার বিষয়ে সামান্য একটি মন্তব্যও আলাদাভাবে নিরীহ মনে হতে পারে। কিন্তু এসব তথ্য একত্র করলে ফিশিং, পরিচয় জালিয়াতি, অনুসরণসহ বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধের জন্য একটি ‘নকশা’ তৈরি হয়ে যায়।

প্রতিভি ভারতের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বৈভব কৌল বলেন, অপরাধীরা এখন প্রকাশ্যে থাকা ছোট ছোট তথ্য একত্র করে বিশ্বাসযোগ্য প্রতারণা ও সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং আক্রমণ চালাচ্ছে।

শুধু প্রাইভেসি সেটিংস যথেষ্ট নয়

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গোপনীয়তা (প্রাইভেসি) সেটিংস ঠিক করে রাখলেই নিরাপদ থাকা সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বরুণ গ্রোভারের মতে, প্রাইভেসি সেটিংস ব্যবহারকারীর জন্য একটি সহায়ক ব্যবস্থা, কিন্তু এটি সম্পূর্ণ নিরাপত্তা কৌশল নয়। তথ্য প্রকাশের আগে সচেতনতা, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং ব্যবহারকারী ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ দায়িত্বশীলতা জরুরি।

অসতর্কভাবে তথ্য প্রকাশের কারণে শুধু সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকিই নয়, পরিস্থিতি ও তথ্যের ধরন অনুযায়ী আর্থিক, আইনি বা নিয়ন্ত্রক জটিলতাও তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে হয়রানি, মানহানি, পরিচয় জালিয়াতি বা কারও ব্যক্তিগত তথ্য অনুমতি ছাড়া প্রকাশের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়তে পারে।

সন্তানের ছবি পোস্টে বাড়তি সতর্কতা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সন্তানের ছবি ও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

যেমন, স্কুলের পোশাক পরা সন্তানের একটি ছবিতে স্কুলের নাম বা অবস্থান শনাক্ত করা যেতে পারে। আবার সন্তানের প্রতিদিনের কর্মকাণ্ড নিয়ে পোস্ট করলে তার চলাফেরার সময়সূচি ও নিয়মিত যাতায়াতের স্থান সম্পর্কেও ধারণা পেতে পারে অপরাধীরা।

বৈভব কৌলের মতে, আজকের একটি নিরীহ পারিবারিক পোস্ট ভবিষ্যতে একটি শিশুর স্থায়ী ডিজিটাল পরিচয়ের অংশ হয়ে যেতে পারে—যে পরিচয় তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ শিশুটির ছিল না।

তিনি জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, প্যানের তথ্য, পেশাগত সনদ, বাসার ঠিকানা, ভ্রমণের পরিকল্পনা বা সরাসরি অবস্থান-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ না করার পরামর্শ দিয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করার আগে নিজেকে যে প্রশ্নগুলো করবেন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু পোস্ট করার আগে কয়েকটি বিষয় ভেবে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন হরিশ কুমার। যেমন—

  1. এই পোস্ট থেকে কি বোঝা যাবে আমি কোথায় আছি?
  2. আমি কার সঙ্গে আছি, তা কি জানা যাবে?
  3. কেউ কি এই তথ্য ব্যবহার করে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে?
  4. তথ্যটি কি আমার পরিচয় নকল বা আমাকে প্রভাবিত করার কাজে ব্যবহার করা সম্ভব?

এসব প্রশ্নের কোনো একটির উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে তথ্যটি প্রকাশ্যে না দিয়ে অফলাইনে রাখা কিংবা শুধু বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে ভাগ করে নেওয়া ভালো।

বৈভব কৌল আরও একটি প্রশ্ন নিজেকে করার পরামর্শ দিয়েছেন—এই তথ্য আগামী ১০ বছর অনলাইনে থাকলেও কি আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করব?

শুধু শক্তিশালী পাসওয়ার্ড নয়, প্রয়োজন সচেতনতাও

ডিজিটাল নিরাপত্তা এখন শুধু শক্তিশালী পাসওয়ার্ড, টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন বা নিরাপত্তা সফটওয়্যার ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনলাইনে কী তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে, সে বিষয়েও সচেতন থাকা জরুরি।

বৈভব কৌলের ভাষায়, ‘পোস্ট’ বাটনে চাপ দেওয়ার আগে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নেওয়াও এখন ডিজিটাল নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

হরিশ কুমার বলেন, ডিজিটাল পরিবেশে নিজেদের সুরক্ষা শুধু ডিভাইস নিরাপদ রাখার ওপর নির্ভর করে না; অনলাইনে কী তথ্য দেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়েও আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে নিরাপদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট সেটি নয়, যার প্রাইভেসি সেটিংস সবচেয়ে শক্তিশালী। বরং পোস্ট করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা—‘এই তথ্যটি কি সত্যিই অনলাইনে প্রকাশ করা প্রয়োজন?’—হতে পারে ডিজিটাল নিরাপত্তার সবচেয়ে সহজ অভ্যাস।

সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস