শিরোনাম
আলজাজিরার বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর থমকে আছে, সম্পর্কে পড়বে কী প্রভাব

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর থমকে আছে, সম্পর্কে পড়বে কী প্রভাব
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর থমকে গেছে। এর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশি দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে হওয়া গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরই মূলত দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছেন। কিন্তু ভারতে অবস্থান করা শেখ হাসিনার একটি সংবাদ সম্মেলন বাংলাদেশে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ৫ আগস্টের ওই সংবাদ সম্মেলন দুই দেশের সম্পর্কের পরিবেশকে ‘বিষাক্ত’ করে তুলেছে। এই অবস্থায় তারেক রহমানের সফরের জন্য ‘অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন’। সূত্র: আলজাজিরা।

এ মুহূর্তে তারেক রহমানের ভারত সফর অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সম্ভাব্য সমাধান বের করতে দুই দেশের কর্মকর্তারা ‘কয়েক সপ্তাহ ধরে’ আলোচনা করছেন।

দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশির মধ্যে সর্বশেষ এই কূটনৈতিক টানাপোড়েন সম্পর্কে যা জানা দরকার, তা হলো–

তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে কী হচ্ছে

আগামী মাসে নির্ধারিত ব্রিকস সম্মেলনের আগে চলতি মাসে ভারত তারেক রহমানকে সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের শীর্ষ মন্ত্রী ও কূটনীতিকদের মধ্যে বেশ কয়েক দফা যোগাযোগ হয়েছে। ভারত ঢাকায় তাদের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদীকে নিয়োগ করেছে। তিনি সাবেক মন্ত্রী এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সদস্য। গুরুত্বপূর্ণ এই পদে এমন রাজনৈতিক নিয়োগকে বিরল ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গত মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ত্রিবেদী শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ভারতীয় মিশন ঢাকা সরকারকে ‘অতীত ভুলে যেতে’ বলছে না। তিনি আরও বলেন, ‘অতীতকে সঙ্গে রেখে মতপার্থক্যগুলো সমাধান করুন। কিন্তু সামনে এগিয়ে যান। স্থবির হয়ে থাকবেন না।’

ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের আয়োজিত এক সংবর্ধনায় ত্রিবেদী বলেন, মোদি চান তারেক রহমানের ভারত সফর স্মরণীয় করে রাখতে।

কিন্তু গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বক্তব্য দেওয়ার পর সেই সফরের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। ওই দিনই শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দুই বছর পূর্ণ হয়।

ভারত পরে স্পষ্ট করে, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তাতেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল।

দুই দেশ কী বলছে

তারেক রহমানের সফর নিয়ে দুই দেশের রাজধানীই অনেকটা নীরব। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল তারেক রহমানের সফর নিয়ে বলেন, ‘এই মুহূর্তে কিছু বলার নেই।’ গত শনিবার (২২ আগস্ট) একটি অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে অবশ্যই ‘পারস্পরিক স্বার্থের পরীক্ষায়’ উত্তীর্ণ হতে হবে। জয়শঙ্কর আরও বলেন, ‘তাদের স্বার্থকে যেভাবে সম্মান করব, আমিও আশা করি তারাও আমাদের স্বার্থের ক্ষেত্রে একই কাজ করবে।’

তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বাংলাদেশের একটি সংবাদ সংস্থাকে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর আয়োজনের ক্ষেত্রে ঢাকার কোনো ‘তাড়াহুড়া নেই’। তিনি বলেন, নতুন নির্বাচিত বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ভারত কী ধরনের সম্পর্ক চায়, ঢাকা এখনো তা যাচাই করছে। এরপর তিনি যোগ করেন, ‘প্রতিবেশি দেশটিকে বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বাস্তবতা যথাযথভাবে বুঝতে হবে, এ আন্দোলনে ১ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ আত্মত্যাগ করেছে।’

এখানে তিনি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে বাংলাদেশের অনুরোধে ভারতের অবস্থানের কথাও উল্লেখ করেন। চলতি মাসের শুরুতে দিল্লি জানিয়েছিল, তারা প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ বিবেচনা করছে। দুই দেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে, তবে রাজনৈতিক মামলার ক্ষেত্রে সেখানে একটি ব্যতিক্রম আছে।

সীমান্তে পুশইনের ঘটনা ঘটাচ্ছে ভারত
সীমান্তে পুশইনের ঘটনা ঘটাচ্ছে ভারত

উত্তেজনার মূল কারণ কী

বাংলাদেশ শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণকে বড় একটি ইস্যু হিসেবে দেখছে। শেখ হাসিনার সরকারকে ভারতের সঙ্গে বিশেষভাবে ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা হতো। তার কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রতি দিল্লির সমর্থনও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছিল।

ঢাকা শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়ে আসছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিছু বিশ্লেষক মনে করেছেন, দিল্লি এই বিষয়টিকে কূটনৈতিক দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশ অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি তার রাজনৈতিক বক্তব্যকে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে। ৫ আগস্টের সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসবেন।

১৬ আগস্ট বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে বলেছে, ‘আমরা আমাদের “বাংলাদেশ ফার্স্ট” নীতি অনুসরণ করে যাব। প্রতিবেশীসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে সার্বভৌম সমতা, জাতীয় মর্যাদা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে কাজ করব।’

অন্যদিকে, কয়েক দশকের টানাপোড়েনের পর বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। এটি ভারতের জন্য বড় কূটনৈতিক ধাক্কা।

ঢাকার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাকিল আহমেদ বলেন, অনেক সময় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করে, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের মানুষ চায়, ভারতের সঙ্গে যেকোনো সম্পর্ক আত্মমর্যাদা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে হওয়া উচিত।’

শাকিল আহমেদ বলেন, তারেক রহমানের সরকার যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে নিজেদের বন্ধুত্বের পরিধি বিস্তৃত করছে। তিনি এরপর বলেন, ‘একটা সময় দিল্লি বাংলাদেশকে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির অনুসারী দেশ হিসেবে দেখত। এখন আর সেটি হচ্ছে না।’

এদিকে বাংলাদেশ সীমান্তে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়া নির্মাণের উদ্যোগও দুই দেশের সম্পর্কে চাপ তৈরি করেছে। ভারতের ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্যও ঢাকার অসন্তোষ আরও বাড়িয়েছে। এ ছাড়া সন্দেহভাজন অবৈধ অভিবাসীদের সীমান্তে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। ঢাকা অভিযোগ করেছে, কূটনৈতিক যাচাই ছাড়াই ভারত বেআইনিভাবে মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর ঘিরে দেওয়া বিবৃতি প্রত্যাহার ভারতের

সামনে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কোন দিকে

তারেক রহমান ১৭ বছরেরও বেশি সময় যুক্তরাজ্যের লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন। শেখ হাসিনার পুরো শাসনকালই তিনি দেশের বাইরে ছিলেন। তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি ফৌজদারি মামলা হয়েছিল। অর্থপাচারের অভিযোগে এবং শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগসংক্রান্ত একটি মামলায় তাকে তার অনুপস্থিতিতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।

দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক সঞ্জয় কে ভরদ্বাজ আল জাজিরাকে বলেন বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে উন্নয়নমূলক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে ভারত ইতিবাচক ছিল, এতে কোনো অনীহা ছিল না।’ তবে তার মতে, ‘তারেক রহমান রাজনীতিতে বেশি আগ্রহী এবং বাংলাদেশের উন্নয়নের বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন না।’ শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণকে তিনি একটি বিতর্কিত বিষয় বলে উল্লেখ করেছেন। তবে কার্যকর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রাখতে দুই দেশের রাজধানীকেই এই ইস্যুর বাইরে এগিয়ে যেতে হবে।

ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শ্রী রাধা দত্ত বলেন, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা প্রয়োজন। কারণ, ‘এর কোনো বিকল্প নেই। প্রতিবেশি হিসেবে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করার কোনো সুযোগ নেই।’

আলজাজিরা থেকে অনূদিত

/আরএ/