শিরোনাম

জেল থেকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৪ কয়েদির পলায়ন, দায়মুক্তি পেলো পূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী

জেল থেকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৪ কয়েদির পলায়ন, 
দায়মুক্তি পেলো পূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী
নওগাঁ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এএইচএম শাহরিয়ার। ফাইল ছবি

বগুড়া জেলা কারাগারের ‘জাফলং সেল’ -এর ছাদ ফুটো করে ২০২৪ সালের ২৫ জুন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার কয়েদি পালিয়ে যায়। ওই ঘটনায় কারাগার মেরামতের দায়িত্বে থাকা অভিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলীকে দায়মুক্তি দিলো গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়ের করা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপসচিব সিরাজুল ইসলাম। অথচ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী এএইচএম শাহরিয়ারের (বর্তমানে নওগাঁয় কর্মরত) দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি ওঠে আসে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির ওই প্রতিবেদনে কারাগারের জেল সুপারসহ চারজনের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টিও ওঠে এসেছে ।

জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২৫ জুন দিবাগত রাত ৩টা ৫ মিনেটে বগুড়া জেলা কারাগারের পুরাতন ‘জাফলং সেল’-এর ২ নম্বর কক্ষের ইট-সুরকির ছাদ ফুটো করে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত চার কয়েদি পালিয়ে যান। এ ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সুরক্ষা সেবা বিভাগ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ওই কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী এএইচএম শাহরিয়ারের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা ও পেশাগত অদক্ষতা এবং অসদাচারণের অভিযোগ আনা হয়।

ওই ঘটনায় চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী প্রকৌশলী শাহরিয়ারের বিরুদ্ধে একটি বিভাগীয় মামলা করা হয় এবং তাকে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সিরাজুল ইসলামকে এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করা হয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন যে, কয়েদিদের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি কোনো একক ব্যক্তি বা সংস্থার গাফিলতি নয়, বরং কারাগার ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত সব সংস্থা ও কর্মকর্তাদের অপেশাদারি ও যৌথ দায়িত্বহীনতার ফলেই ঘটেছে।

তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. সিরাজুল ইসলাম তার প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করেছেন, কয়েদি পলায়নের ঘটনায় এএইচএম শাহরিয়ারের বিরুদ্ধে আনা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগের কোনো প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়নি।

জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপসচিব সিরাজুল ইসলাম সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আমি তথ্য–উপাত্তের ভিত্তিতে রিপোর্ট দিয়েছি, এখন স্যারেরা যদি মনে করেন তাহলে পুনরায় তদন্ত করতে পারবেন। এটি মামলার প্রথম ধাপ। আরও দুটি ধাপ বাকি আছে। এর মধ্যে সচিব স্যার যদি মনে করেন তাহলে কমিটি করে তদন্তের ব্যবস্থা করতে পারবেন।’

শুধু গণপূর্তের উপসচিবই নয়, নির্বাহী প্রকৌশলীকে ঘটনা থেকে দায়মুক্তি দেন এই ঘটনায় গঠিত পণপূর্ত অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটির সদস্য জয়পুরহাট গণপূর্তের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আল মামুন হক, বগুড়া গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরী ও রাজশাহী গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল গোফফার।

আবু নাসের চৌধুরী এখন গণপূর্ত অধিদপ্তরের সার্কেল-২ এ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসাবে কর্মরত। বগুড়া কারাগার থেকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামির পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি বগুড়ার গণপূর্তের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ আনলেও আপনাদের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি তাকে কেন দায়মুক্তি দিয়েছে-সেই প্রশ্নের উত্তর জন্য তার মুঠোফোনে আজ সোমবার একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। এ ব্যাপারে জানতে চেয়ে তার মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

এ বিষয়ে জানতে রাজশাহী জোনের সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বর্তমানে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সদস্য (পরিকল্পনা, নকশা ও বিশেষ প্রকল্প) মো. আব্দুল গোফফারের মোবাইলফোনে পাঁচবার কল দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি। এরপর এ বিষয়ে জানতে তার মুঠোফোনের খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির সদস্য নির্বাহী প্রকৌশলী (বর্তমান বগুড়ায় কর্মরত) আল মামুন হক মুঠোফোনে সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, তাদের কাছে স্ট্রাকচারাল বিষয়টি মূল ফোকাস ছিল। সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।

বগুড়া জেলা কারাগার। ফাইল ছবি
বগুড়া জেলা কারাগার। ফাইল ছবি

বগুড়া কারাগারটি ১৮৮৩ সালে নির্মাণ করা হয়। এটি মেরামত ও এখানে নতুন সেল নির্মাণের জন্য কারা কর্তৃপক্ষ নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে একাধিকবার চিঠি দেয়। চিঠি পেয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী পরিদর্শনও করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী এএইচএম শাহরিয়ার সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা এখনও চলমান রয়েছে। আমাকে দায় মুক্ত করেছে কি না তা আমি জানি না।’

কারাগারের জাফলং সেলটি বন্দিদের জন্য নিরাপদ ছিল না বলে একাধিক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সেলের ত্রুটি উল্লেখ করে ২০২৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর জেল সুপার মো. আনোয়ার হোসেন নির্বাহী প্রকৌশলী এএইচএম শিহরিয়ারের কাছে একটি চিঠি দেন। ওই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, বগুড়া জেলা কারাগারের জাফলং সেলটি অনেক পুরোনো। ছাদের টালি প্রায়ই খুলে পড়ছে। এতে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। সেখানে থাকা বন্দিদের শরীরে পড়ে আহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা রয়েছে। পুরোনো হয়ে যাওয়ায় ছাদ দুর্বল হয়ে গেছে। এখন টালি ফেলে আরসিসি ছাদ নির্মাণ করা প্রয়োজন। জরুরি ভিত্তিতে কারাগারের নিরাপত্তার জন্য সেটি মেরামতের প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়।

কারা কর্তৃপক্ষ ২০২৩ সালের ২ এপ্রিল নির্বাহী প্রকৌশলীকেও আরও একটি চিঠি দেয়। ওই চিঠিতেও কারাগারের সেলের দুর্বলতার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। সেলের জায়গার স্বল্পতা ও বন্দিদের দুর্ভোগের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। সেলের সংখ্যা বাড়াতে ২০ কক্ষের সেল তৈরির জন্য দোতলা ভবন নির্মাণের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়। পরে একই সালের ১৮ জুন নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে একই বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়। ওই চিঠিতে জাফলং সেলে ছাদ পরিবর্তনসহ ১২টি সুপারিশ করা হয়েছিল। যাতে এসব কাজ বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনায় (এপিপি) দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী এই ঘটনার জন্য দায়ী কারাগারের চারজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এরা হলেন বগুড়ার সাবেক জেল সুপার আনোয়ার হোসেন ও মোহাম্মদ ফরিদুর রহমান, ডেপুটি জেলার হোসেনুজ্জামান ও কারা গোয়েন্দা শাখার এক সদস্য।

তবে বগুড়া জেলা কারগারের জেল সুপার মো. আসাদুর রহমান বলেন, তদন্ত শেষে তৎকালীন দুই জেল সুপার ও একজন ডেপুটি জেলারকে দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তিনজন কারারক্ষীকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। পালিয়ে যাওয়া কয়েদিদের গ্রেপ্তার করে উচ্চ নিরাপত্তা সক্ষমতার সেলে রাখা হয়েছে।

কারাগারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল সেলের জরাজীর্ণ অবস্থার কথা বারবার লিখিতভাবে জানানো সত্ত্বেও গণপূর্ত বিভাগ সেটি সংস্কারে অবহেলা করেছে। কিন্তু তদন্তে পাওয়া দালিলিক প্রমাণাদি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৩ সালের জুন মাসে তৎকালীন জেল সুপার জাফলং সেলের ছাদ পরিবর্তনের আবেদন জানালেও পরে কারা কর্তৃপক্ষই যে সংশোধিত ‘বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা’ (এপিপি) এবং কাজ সমাপ্তির প্রত্যয়নপত্র প্রদান করে, সেখানে জাফলং সেলের ছাদ সংস্কারের বিষয়টি তারা রাখেনি।

পুরাতন জাফলং সেলের নিরাপত্তার জন্য ২০২৩ সালের ২ আগস্ট গণপূর্ত বিভাগ ২০ কক্ষবিশিষ্ট একটি নতুন দ্বিতল ভবন নির্মাণের জন্য একটি খসড়া প্রাক্কলন প্রস্তুত করতে চেয়েছিল। এজন্য কারা কর্তৃপক্ষকে জায়গা নির্বাচন করে গণপূর্ত বিভাগকে জানানোর অনুরোধ করা হয়। কিন্তু বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও কারা কর্তৃপক্ষ জায়গা নির্ধারণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ায় সেই খসড়া প্রাক্কলন প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি।

জাফলং সেলটি চুন-সুরকি ও ইটের গাঁথুনিতে কাঠের কড়ি-বর্গার ওপর টালি দিয়ে নির্মিত হয়েছিল। কোনো কংক্রিটের স্ট্রাকচার ছাড়া এই অতি প্রাচীন ভবনের কড়ি-বর্গা সরিয়ে আরসিসি ছাদ ঢালাই করা কারিগরিভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অবাস্তব ছিল। এছাড়া গণপূর্ত অধিদপ্তরের গাইডলাইন অনুযায়ী, সাধারণ মেরামত বাজেট থেকে নতুন আরসিসি ছাদ বা নতুন ভবন নির্মাণের কোনো সুযোগ ছিল না।

ঘটনার পর জাফলং সেলের ছাদের নমুনা হিসেবে টালি ও চুন-সুরকির উপকরণ পরীক্ষা করার জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) পাঠানো হয়। বুয়েটের সেই উপকরণের পরীক্ষার প্রতিবেদনে বলা হয়, টালির ‘মডুলাস অব র‍্যাপচার’ বা ‘ব্রেকিং লোড’ আদর্শ মানের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল, অর্থাৎ সেখানে কোনো দৃশ্যমান কাঠামোগত ত্রুটি বা ফাটল ছিল না।

/বিবি/