জুলাইয়ের পর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথের কোনো ছক নেই: সলিমুল্লাহ খান

জুলাইয়ের পর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথের কোনো ছক নেই: সলিমুল্লাহ খান
সিজেডএন ডেস্ক

জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে, তার কোনো পূর্বনির্ধারিত পথরেখা এখনো তৈরি হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন লেখক ও অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। তার মতে, জুলাইকে বুঝতে হলে শুধু ২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে হবে না; এর সঙ্গে বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ভাষা ও সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাসকেও বিবেচনায় নিতে হবে।
রবিবার (১৬ আগস্ট) বিকালে রাজধানীর বাংলামোটরের প্ল্যানার্স টাওয়ারে এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভার (সিএএসি) রজতজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে এসব কথা বলেন তিনি।
সলিমুল্লাহ খান বলেন, চোখের সামনে যা দেখা যায়, বাস্তবতা সব সময় শুধু সেটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিজ্ঞান যেমন দৃশ্যমানতার বাইরে গিয়ে বাস্তবতার সন্ধান করে, তেমনি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকেও কেবল দৃশ্যমান ঘটনাপ্রবাহ দিয়ে বিচার করলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না।
ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পথচলা প্রসঙ্গে স্পেনের কবি আন্তোনিও মাচাদোর কবিতার উল্লেখ করে তিনি বলেন, পথ আগে থেকে তৈরি থাকে না; চলতে চলতেই পথ তৈরি হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও জুলাইয়ের আগে কিংবা পরে ভবিষ্যতের জন্য কোনো নির্দিষ্ট পথরেখা তৈরি ছিল না। এখন পর্যন্ত যে পথ তৈরি হয়েছে, তা পেছনে ফিরে দেখে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসকে নতুনভাবে বোঝার সুযোগ তৈরি করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, মতাদর্শ বা গোষ্ঠীর ব্যাখ্যার মধ্যে জুলাইকে সীমাবদ্ধ না রেখে এর পেছনের দীর্ঘ ইতিহাস, সামাজিক বৈচিত্র্য, রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনগুলোকে একসঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।
বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের প্রসঙ্গে সলিমুল্লাহ খান ১৯২০-এর দশকের ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’-এর কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সে সময়ের বুদ্ধিজীবীরা জ্ঞানকে মুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। তবে তাদের চিন্তাচর্চার মধ্যেও কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। ধর্ম, সমাজ ও বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় নিয়ে তখন যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার অনেকটাই পরবর্তী সময়েও অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় সংকটের দিকও তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষ্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ার কারণে অনেক বুদ্ধিজীবী নিজেদের অবস্থানের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নকে বিবেচনা করতে পারেন না।
বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক বিকাশ বুঝতে কাজী নজরুল ইসলামকে নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন সলিমুল্লাহ খান। তার মতে, নজরুল একই সঙ্গে হিন্দু ও মুসলমান—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
এ প্রসঙ্গে ইতালীয় চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসির ‘হেজিমনি’ ধারণার উল্লেখ করে তিনি বলেন, নেতৃত্ব বা প্রভাব কেবল আদেশ কিংবা জোর প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না; মানুষের আস্থা ও অনুসরণের মধ্য দিয়েও তা গড়ে ওঠে। নজরুলের ক্ষেত্রে এ ধরনের সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের উদাহরণ দেখা যায়।
দেশের উচ্চশিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সলিমুল্লাহ খান। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন জ্ঞানচর্চার চেয়ে ভর্তি, পরীক্ষা ও র্যাঙ্কিং নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। অথচ জ্ঞান ও চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ বিকাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও ঘটে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে গড়ে ওঠা বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজেদের সীমাবদ্ধতা নিয়েও আত্মবিশ্লেষণ প্রয়োজন।
সেমিনারে লেখক ও গবেষক সহুল আহমদ বলেন, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস ও অতীতের সংকটগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি। গত কয়েক দশকে দেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের ধরন বদলেছে। দলীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি সমন্বয়কভিত্তিক আন্দোলন, স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ এবং ইন্টারনেটনির্ভর যোগাযোগ নতুন রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করেছে।
গবেষক ও সাংবাদিক তাহমিদাল জামি বলেন, বুদ্ধিজীবীদের কাজ শুধু কোনো একটি বয়ান জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নয়। বরং গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষাগুলো ব্যাখ্যা করা এবং সেগুলোকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা তাদের দায়িত্ব। জুলাইয়ের পর এ জায়গায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভার সভাপতি জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ২৫ বছর ধরে তাদের সংগঠন এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরির চেষ্টা করছে, যেখানে কোনো ব্যক্তি বা মতাদর্শকে প্রশ্নাতীত হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। প্রচলিত জ্ঞানকাঠামোকে প্রশ্ন করার পাশাপাশি নতুন জ্ঞান সৃষ্টির আত্মবিশ্বাস তৈরি করাও তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
বর্তমান অনিশ্চিত সময়ে সমাজ ও রাষ্ট্র কোন পথে এগোবে—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বুদ্ধিজীবীদের বৃহত্তর বাস্তবতার সঙ্গে বিভিন্ন ঘটনার সম্পর্ক বোঝার একটি ‘মানচিত্র’ তৈরি করে দিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন সাংবাদিক মিনহাজুল ইসলাম।

জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে, তার কোনো পূর্বনির্ধারিত পথরেখা এখনো তৈরি হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন লেখক ও অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। তার মতে, জুলাইকে বুঝতে হলে শুধু ২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে হবে না; এর সঙ্গে বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ভাষা ও সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাসকেও বিবেচনায় নিতে হবে।
রবিবার (১৬ আগস্ট) বিকালে রাজধানীর বাংলামোটরের প্ল্যানার্স টাওয়ারে এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভার (সিএএসি) রজতজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে এসব কথা বলেন তিনি।
সলিমুল্লাহ খান বলেন, চোখের সামনে যা দেখা যায়, বাস্তবতা সব সময় শুধু সেটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিজ্ঞান যেমন দৃশ্যমানতার বাইরে গিয়ে বাস্তবতার সন্ধান করে, তেমনি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকেও কেবল দৃশ্যমান ঘটনাপ্রবাহ দিয়ে বিচার করলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না।
ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পথচলা প্রসঙ্গে স্পেনের কবি আন্তোনিও মাচাদোর কবিতার উল্লেখ করে তিনি বলেন, পথ আগে থেকে তৈরি থাকে না; চলতে চলতেই পথ তৈরি হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও জুলাইয়ের আগে কিংবা পরে ভবিষ্যতের জন্য কোনো নির্দিষ্ট পথরেখা তৈরি ছিল না। এখন পর্যন্ত যে পথ তৈরি হয়েছে, তা পেছনে ফিরে দেখে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসকে নতুনভাবে বোঝার সুযোগ তৈরি করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, মতাদর্শ বা গোষ্ঠীর ব্যাখ্যার মধ্যে জুলাইকে সীমাবদ্ধ না রেখে এর পেছনের দীর্ঘ ইতিহাস, সামাজিক বৈচিত্র্য, রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনগুলোকে একসঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।
বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের প্রসঙ্গে সলিমুল্লাহ খান ১৯২০-এর দশকের ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’-এর কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সে সময়ের বুদ্ধিজীবীরা জ্ঞানকে মুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। তবে তাদের চিন্তাচর্চার মধ্যেও কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। ধর্ম, সমাজ ও বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় নিয়ে তখন যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার অনেকটাই পরবর্তী সময়েও অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় সংকটের দিকও তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষ্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ার কারণে অনেক বুদ্ধিজীবী নিজেদের অবস্থানের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নকে বিবেচনা করতে পারেন না।
বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক বিকাশ বুঝতে কাজী নজরুল ইসলামকে নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন সলিমুল্লাহ খান। তার মতে, নজরুল একই সঙ্গে হিন্দু ও মুসলমান—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
এ প্রসঙ্গে ইতালীয় চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসির ‘হেজিমনি’ ধারণার উল্লেখ করে তিনি বলেন, নেতৃত্ব বা প্রভাব কেবল আদেশ কিংবা জোর প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না; মানুষের আস্থা ও অনুসরণের মধ্য দিয়েও তা গড়ে ওঠে। নজরুলের ক্ষেত্রে এ ধরনের সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের উদাহরণ দেখা যায়।
দেশের উচ্চশিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সলিমুল্লাহ খান। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন জ্ঞানচর্চার চেয়ে ভর্তি, পরীক্ষা ও র্যাঙ্কিং নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। অথচ জ্ঞান ও চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ বিকাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও ঘটে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে গড়ে ওঠা বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজেদের সীমাবদ্ধতা নিয়েও আত্মবিশ্লেষণ প্রয়োজন।
সেমিনারে লেখক ও গবেষক সহুল আহমদ বলেন, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস ও অতীতের সংকটগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি। গত কয়েক দশকে দেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের ধরন বদলেছে। দলীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি সমন্বয়কভিত্তিক আন্দোলন, স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ এবং ইন্টারনেটনির্ভর যোগাযোগ নতুন রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করেছে।
গবেষক ও সাংবাদিক তাহমিদাল জামি বলেন, বুদ্ধিজীবীদের কাজ শুধু কোনো একটি বয়ান জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নয়। বরং গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষাগুলো ব্যাখ্যা করা এবং সেগুলোকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা তাদের দায়িত্ব। জুলাইয়ের পর এ জায়গায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভার সভাপতি জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ২৫ বছর ধরে তাদের সংগঠন এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরির চেষ্টা করছে, যেখানে কোনো ব্যক্তি বা মতাদর্শকে প্রশ্নাতীত হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। প্রচলিত জ্ঞানকাঠামোকে প্রশ্ন করার পাশাপাশি নতুন জ্ঞান সৃষ্টির আত্মবিশ্বাস তৈরি করাও তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
বর্তমান অনিশ্চিত সময়ে সমাজ ও রাষ্ট্র কোন পথে এগোবে—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বুদ্ধিজীবীদের বৃহত্তর বাস্তবতার সঙ্গে বিভিন্ন ঘটনার সম্পর্ক বোঝার একটি ‘মানচিত্র’ তৈরি করে দিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন সাংবাদিক মিনহাজুল ইসলাম।

জুলাইয়ের পর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথের কোনো ছক নেই: সলিমুল্লাহ খান
সিজেডএন ডেস্ক

জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে, তার কোনো পূর্বনির্ধারিত পথরেখা এখনো তৈরি হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন লেখক ও অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। তার মতে, জুলাইকে বুঝতে হলে শুধু ২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে হবে না; এর সঙ্গে বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ভাষা ও সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাসকেও বিবেচনায় নিতে হবে।
রবিবার (১৬ আগস্ট) বিকালে রাজধানীর বাংলামোটরের প্ল্যানার্স টাওয়ারে এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভার (সিএএসি) রজতজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে এসব কথা বলেন তিনি।
সলিমুল্লাহ খান বলেন, চোখের সামনে যা দেখা যায়, বাস্তবতা সব সময় শুধু সেটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিজ্ঞান যেমন দৃশ্যমানতার বাইরে গিয়ে বাস্তবতার সন্ধান করে, তেমনি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকেও কেবল দৃশ্যমান ঘটনাপ্রবাহ দিয়ে বিচার করলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না।
ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পথচলা প্রসঙ্গে স্পেনের কবি আন্তোনিও মাচাদোর কবিতার উল্লেখ করে তিনি বলেন, পথ আগে থেকে তৈরি থাকে না; চলতে চলতেই পথ তৈরি হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও জুলাইয়ের আগে কিংবা পরে ভবিষ্যতের জন্য কোনো নির্দিষ্ট পথরেখা তৈরি ছিল না। এখন পর্যন্ত যে পথ তৈরি হয়েছে, তা পেছনে ফিরে দেখে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসকে নতুনভাবে বোঝার সুযোগ তৈরি করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, মতাদর্শ বা গোষ্ঠীর ব্যাখ্যার মধ্যে জুলাইকে সীমাবদ্ধ না রেখে এর পেছনের দীর্ঘ ইতিহাস, সামাজিক বৈচিত্র্য, রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনগুলোকে একসঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।
বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের প্রসঙ্গে সলিমুল্লাহ খান ১৯২০-এর দশকের ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’-এর কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সে সময়ের বুদ্ধিজীবীরা জ্ঞানকে মুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। তবে তাদের চিন্তাচর্চার মধ্যেও কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। ধর্ম, সমাজ ও বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় নিয়ে তখন যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার অনেকটাই পরবর্তী সময়েও অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় সংকটের দিকও তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষ্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ার কারণে অনেক বুদ্ধিজীবী নিজেদের অবস্থানের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নকে বিবেচনা করতে পারেন না।
বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক বিকাশ বুঝতে কাজী নজরুল ইসলামকে নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন সলিমুল্লাহ খান। তার মতে, নজরুল একই সঙ্গে হিন্দু ও মুসলমান—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
এ প্রসঙ্গে ইতালীয় চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসির ‘হেজিমনি’ ধারণার উল্লেখ করে তিনি বলেন, নেতৃত্ব বা প্রভাব কেবল আদেশ কিংবা জোর প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না; মানুষের আস্থা ও অনুসরণের মধ্য দিয়েও তা গড়ে ওঠে। নজরুলের ক্ষেত্রে এ ধরনের সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের উদাহরণ দেখা যায়।
দেশের উচ্চশিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সলিমুল্লাহ খান। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন জ্ঞানচর্চার চেয়ে ভর্তি, পরীক্ষা ও র্যাঙ্কিং নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। অথচ জ্ঞান ও চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ বিকাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও ঘটে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে গড়ে ওঠা বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজেদের সীমাবদ্ধতা নিয়েও আত্মবিশ্লেষণ প্রয়োজন।
সেমিনারে লেখক ও গবেষক সহুল আহমদ বলেন, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস ও অতীতের সংকটগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি। গত কয়েক দশকে দেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের ধরন বদলেছে। দলীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি সমন্বয়কভিত্তিক আন্দোলন, স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ এবং ইন্টারনেটনির্ভর যোগাযোগ নতুন রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করেছে।
গবেষক ও সাংবাদিক তাহমিদাল জামি বলেন, বুদ্ধিজীবীদের কাজ শুধু কোনো একটি বয়ান জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নয়। বরং গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষাগুলো ব্যাখ্যা করা এবং সেগুলোকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা তাদের দায়িত্ব। জুলাইয়ের পর এ জায়গায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভার সভাপতি জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ২৫ বছর ধরে তাদের সংগঠন এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরির চেষ্টা করছে, যেখানে কোনো ব্যক্তি বা মতাদর্শকে প্রশ্নাতীত হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। প্রচলিত জ্ঞানকাঠামোকে প্রশ্ন করার পাশাপাশি নতুন জ্ঞান সৃষ্টির আত্মবিশ্বাস তৈরি করাও তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
বর্তমান অনিশ্চিত সময়ে সমাজ ও রাষ্ট্র কোন পথে এগোবে—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বুদ্ধিজীবীদের বৃহত্তর বাস্তবতার সঙ্গে বিভিন্ন ঘটনার সম্পর্ক বোঝার একটি ‘মানচিত্র’ তৈরি করে দিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন সাংবাদিক মিনহাজুল ইসলাম।







