শিরোনাম

ধনী-গরিবের তালিকার মারপ্যাঁচে ৬৭৬ কোটির প্রকল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
ধনী-গরিবের তালিকার মারপ্যাঁচে ৬৭৬ কোটির প্রকল্প
সমাজসেবা অধিদপ্তর

সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০২২ সালে দেশের ধনী-গরিবের একটি তালিকা করেছিল। এতে ব্যয় হয়েছিল ৬৩৭ কোটি টাকা। তবে চার বছরেও তালিকাটি ব্যবহার ও তথ্যও হালনাগাদ করা হয়নি। এ অবস্থায় ধনী-গরিবের আরেকটি তালিকা তৈরি করতে যাচ্ছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সমাজসেবা অধিদপ্তর। এতে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৭৬ কোটি টাকা।

বিশ্বব্যাংকের ঋণে এ তালিকা করার লক্ষ্য বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নে সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন করা। যাতে ধনী পরিবারের কেউ এ তালিকায় ঢুকতে না পারেন এবং গরিব পরিবারগুলোর নারীপ্রধানেরা ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা পান।

দুটি ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য প্রায় এক হলেও কেন আরেকটি তালিকা করতে হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ ছাড়া দেশে যেকোনো জরিপ ও শুমারি করার আইনি সংস্থা বিবিএস। তাদের বাদ দিয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তর কেন তথ্য সংগ্রহের কাজ করবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জাতীয় খানা তথ্যভান্ডার (ন্যাশনাল হাউসহোল্ড ডেটাবেজ বা এনএইচডি) নামের ওই তালিকা করার উদ্দেশ্য ছিল, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর কর্মসূচির জন্য সুবিধাভোগী নির্বাচন সহজ করা

বিবিএসের একাধিক কর্মকর্তা জানান, এনএইচডির তথ্য হালনাগাদ করাসহ ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা জরিপের তথ্যের সমন্বয় করতে পারলে বর্তমান প্রয়োজন মিটতে পারে। একই বিষয়ে একাধিক জরিপ করা সরকারের অর্থের অপচয় ছাড়া কিছু নয়।

তবে বিবিএসের জরিপের সঙ্গে অধিদপ্তরের জরিপ মেলানো ঠিক হবে না বলে জানান সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ্ মোহাম্মদ মাহবুব। তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের জন্য তথ্য সংগ্রহ করা হবে পরিবারের নারীপ্রধানের কাছ থেকে।

এ ধরনের তথ্য সংগ্রহের অভিজ্ঞতা অধিদপ্তরের আছে কি না—এমন প্রশ্নে শাহ্ মোহাম্মদ মাহবুব বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট আকারে একটি জরিপের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই দেশব্যাপী তথ্য সংগ্রহের কাজ করতে তাঁরা আত্মবিশ্বাসী।

তবে এ প্রকল্পের অধীন ফ্যামিলি কার্ডও তৈরি করা হবে। তথ্য সংগ্রহ ও কার্ড তৈরিতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা।

দেশ স্বাধীনের এত বছরেও ধনী-গরিবের একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডার করতে না পারাকে ‘দুঃখজনক’ বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, করোনা মহামারির সময় তালিকার অভাবে অনেক ধনী পরিবার সরকারের প্রণোদনা নিয়ে গেছে। বর্তমান সরকারও প্রকৃত উপকারভোগী বাছাই না করে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু করেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ড দিতে পাঁচ বছরে ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। এ কার্ডে মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে পাবে প্রতিটি নারীপ্রধান পরিবার।

তালিকা তৈরিতে কত খরচ হবে

সমাজসেবা অধিদপ্তরের সূত্র জানায়, প্রথমে প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ফ্যামিলি কার্ড শুমারি ২০২৬’। পরে বিবিএসের আপত্তিতে করা হয় ‘ফ্যামিলি কার্ড খানা তথ্যভান্ডার’। এটি করা হচ্ছে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে। এতে ব্যয় হবে ২ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড তৈরি ও তথ্য সংগ্রহের পেছনে খরচ হবে ১ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা।

প্রকল্পের নথিতে দেখা যায়, ফ্যামিলি কার্ডের জন্য ৪ কোটি ১০ লাখ পরিবারের প্রধান নারীকে স্মার্ট কার্ড দেওয়া হবে। এ কার্ড তৈরিতে ব্যয় হবে ৫৫০ কোটি টাকা। ফ্যামিলি কার্ডের জন্য মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ, ডেটাপ্রক্রিয়া করাসহ সরকারি কর্মচারীদের সম্মানী এবং তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারদের প্রশিক্ষণ বাবদ খরচ হবে ৬৭৬ কোটি টাকা।

সঠিক তথ্য পাওয়া নিয়ে শঙ্কা

মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহে ৬৭ হাজার তথ্য সংগ্রহকারী ও প্রায় ৭ হাজার সুপারভাইজার নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। যেমন ১২ আগস্ট নাটোরের লালপুর ও বাগাতিপাড়া উপজেলায় তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তুলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীরা।
এ অবস্থায় নানা অজুহাতে পদ দুটিতে নিয়োগ পরীক্ষা পেছানো হচ্ছে। ফলে ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে এসব পদে নিয়োগ চূড়ান্ত করার কথা থাকলেও তা হয়নি। অবশ্য সমাজসেবা অধিদপ্তর জানিয়েছে, নিয়োগ সম্পন্ন করতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।

জানা গেছে, তথ্য সংগ্রহের পর তা কোথায় সংরক্ষণ করা হবে, সেটি চূড়ান্ত হয়নি। তালিকা কীভাবে চূড়ান্ত হবে, তা-ও ঠিক হয়নি। এ ছাড়া তথ্য সংগ্রহের পর কোথাও ভুল হয়েছে কি না, তা দেখতে তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে জরিপ–উত্তর বাছাই জরিপ (পিইসি) করার নিয়ম রয়েছে। সেটি কোন প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে করানো হবে, তা–ও ঠিক হয়নি। তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারদের কাজের নজরদারি কীভাবে হবে, তা–ও নির্ধারণ হয়নি। ফলে জরিপে সঠিক তথ্য উঠে আসবে কি না, তা নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতি

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সমাজসেবা অধিদপ্তর বিবিএসের প্রক্সি মিনস টেস্ট (পিএমটি) পদ্ধতি ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহের কাজ করবে। এ পদ্ধতি হচ্ছে স্কোরভিত্তিক। ১০০ নম্বরের মধ্যে যাঁর নম্বর যত বেশি, তিনি তত ধনী। এর বিপরীতে যাঁর নম্বর যত কম, তিনি তত গরিব।

তথ্যভান্ডার থাকলে এত টাকা খরচ হতো না

ধনী-গরিবের তালিকা তৈরিতে জাতীয় খানা তথ্যভান্ডার নামের প্রকল্পটি অনুমোদন পেয়েছিল ২০১৩ সালে। ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩২৮ কোটি টাকা। চার দফা ব্যয় বাড়িয়ে পরে ৭২৭ কোটি টাকা করা হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালে কাজ কিছুটা বাকি রেখেই প্রকল্প শেষ করা হয়। কিন্তু তত দিনে খরচ হয়ে যায় ৬৩৭ কোটি টাকা।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এ প্রকল্প নিয়ে একটি প্রতিবেদন দিয়েছে ২০২৩ সালে। তাতে বলা হয়, যে উদ্দেশে প্রকল্পটি নেওয়া হয়, তা অর্জিত হয়নি। প্রকল্পের আওতায় যেসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তবে তথ্য হালনাগাদ করতে পারলে তা ব্যবহার করা যেতে পারে বলে আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশের সব নাগরিকের একটি তথ্যভান্ডার করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো তা করা হয়নি। যদি তথ্যভান্ডার থাকত, এভাবে তথ্য সংগ্রহের নামে টাকা খরচ করতে হতো না।

/বিবি/