শিরোনাম

ঢাকার বর্জ্য থেকে যুক্ত হবে বিদ্যুৎ

ঢাকার বর্জ্য থেকে যুক্ত হবে বিদ্যুৎ
গ্রাফিক্স: সিটিজেন জার্নাল

রাজধানী ও আশপাশে সৃষ্ট বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। আমিনবাজারে একটি প্রকল্পের অধীনে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের কাজ শেষ হলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ৪২ দশমিক ৫ মেঘাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করা সম্ভব হবে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে যথাযথ প্রক্রিয়ায় বর্জ্য ধ্বংস করতে পারলে পরিবেশ দূষণও কমবে। এতে নগরবাসী স্বস্তি পাবে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, এটি দেশে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে বড় ও প্রথম প্রকল্প। প্রায় তিন হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। ‘ওয়েস্ট টু পাওয়ার’ শীর্ষক এই প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখা। ল্যান্ডফিলের ওপর চাপ কমানোও এই প্রকল্পের অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য । এজন্য আমিনবাজারে সর্বমোট ৮০ একর জমি অধিগ্রহন করা হয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কর্তৃপক্ষের মতে, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পাওয়ার পর মূল কাজ শুরু হবে। এরপর বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে আরও প্রায় দেড় থেকে দুই বছর লাগতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজধানীতে দৈনিক সাত থেকে ১০ হাজার টন বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। এসব বর্জ্য যথাযথভাবে পরিশোধন বা ধ্বংস করা হচ্ছে না। এতে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার না করলে তা জনস্বাস্থ্যের প্রতি বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করবে।

পরিবেশগত ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহার না করলে তা পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনো শহর ও গ্রামে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য খোলা স্থানে বা নদীতে ফেলা হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বর্জ্য সংগ্রহ করা হয় না, যা মূলত খোলা জায়গায় পোড়ানো হয়। এটি কেবল বায়ুদূষণই বাড়াচ্ছে না, বরং ২০৫০ সাল নাগাদ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে ।

জানা গেছে, বর্জ্যনির্ভর ওই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দৈনিক প্রায় তিন হাজার টন কঠিন বর্জ্য জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হবে। এসব কঠিন বর্জ্য সঠিক উপায়ে পোড়ানো না হলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদেরা।

আমিনবাজারের বিদ্যুৎ প্রকল্প সম্পর্কে জানতে চাইলে পরিবেশবিদ ও বিশিষ্ট স্থপতি ইকবাল হাবীব সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা হবে না এমন কোনো অবস্থা সামনে আসলে সেক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়পত্র দেয় না। এই প্রকল্পে যেসব বর্জ্য পোড়ানো হবে সেখানে প্লাস্টিক জাতীয় বর্জ্য থাকবে। এসব প্লাস্টিক থেকে ক্লোরিনযুক্ত মিথেন গ্যাস সৃষ্টি হবে। এই গ্যাসে পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। তবে সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারলে পরিবেশের জন্য ভালো হবে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে চলতি বছর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের শহরগুলোতে বিশেষ করে ঢাকায় প্লাস্টিক বর্জ্য এক বিশাল অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এই বর্জ্য নদ-নদী হয়ে সমুদ্রে গিয়ে পড়ছে এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থা বন্ধ করে কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি করছে ।

তবে বিশ্বব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চ্যালেঞ্জ থাকলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সম্পদে রূপান্তরের বড় সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের সামনে। টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেবল পরিবেশ রক্ষা করে না, বরং এই খাতে লাখ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। রিসাইক্লিং ও সার তৈরির মাধ্যমে বৃত্তাকার অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব, যা জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে ।

বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে ‘সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট রুলস, ২০২১’ কার্যকর করেছে। তবে বিশ্বব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, কেবল আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। এর প্রয়োগ ও তদারকি বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া বর্ধিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা (ইপিআর) এবং একক ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন।

প্রকল্পের অগ্রগতির চিত্র

২০২৩ সালের জুলাই মাসে এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে অবকাঠামো নির্মাণের প্রাথমিক কাজ (পাইলিং ও ভূমি উন্নয়ন) শুরু হয়। তবে তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না পাওয়ায় মূল নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে।

আমিনবাজার প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালক এস এম শফিকুর রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে এখনও চূড়ান্ত অনুমোদন না পাওয়ায় প্রকল্পের কাজ বন্ধ রয়েছে। একটি চীনা কোম্পানি প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে। তবে প্রকল্পের বাজেট সম্পর্কে তিনি কোনো তথ্য দিতে পারেননি।

পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক সিটিজেন জার্নালকে বলেন, প্রকল্প এলাকায় দৈনিক তিন হাজার টন বর্জ্য পোড়ানো হবে। এসব বর্জ্য থেকে নির্গত ধোঁয়া সঠিকভাবে দূষণমুক্ত করা না গেলে পরিবেশের ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ওই বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত ধোঁয়ায় পরিবেশ দূষিত হবে। তবে প্রকল্পটির আংশিকভাবে শুরু করলে অর্থাৎ সেখানে চারটি ইউনিটের পরিবর্তে বর্তমানে এক বা দুটি ইউনিট চালু করা যেতে পারে।

বড় বিনিয়োগ

ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, এই প্রকল্পটি একটি স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদক (আইপিপি) মডেলের আওতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। যেখানে সরকার সরাসরি কোনো অর্থ বিনিয়োগ করছে না, বরং এখানে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনে নেবে। চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন নিজস্ব অর্থায়নে এই কেন্দ্রটি নির্মাণ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে।

‘ওয়েস্ট টু পাওয়ার’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণে আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে তিন হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২৫ বছর মেয়াদী এই চুক্তির আওতায় সরকার প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ প্রায় ১৮–২০ সেন্ট (বাংলাদেশি টাকায় আনুমানিক ২০-২২ টাকা) দরে কিনবে।

প্রকল্পের ইতিবাচক দিক

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা শহরে বর্জ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে। এটি পচনশীল বর্জ্য থেকে উৎপন্ন ক্ষতিকারক মিথেন গ্যাস হ্রাস করবে।

তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমিনবাজারের ওই বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে বর্জ্য পোড়ানোর ফলে নির্গত ধোঁয়ার ক্ষতিকারক প্রভাব কমাতে কঠোর নজরদারির পাশাপাশি এবং উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।

আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন জন্য ‘ওয়েস্ট টু পাওয়ার’ প্রকল্পটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। কারণ এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শহর আরও পরিচ্ছন্ন হবে এবং দেশে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ হবে। এখন কেবল পরিবেশ ছাড়পত্র পেলেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

/বিবি/