শিরোনাম

যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে মধ্যপ্রাচ্যে

সিজেডএন  ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে মধ্যপ্রাচ্যে
ইরানের বন্দর খামিরের কাছে একটি সেতুতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সামরিক সংঘাত আবারও ছড়িয়ে পড়ছে মধ্যপ্রাচ্যব্যাপী। টানা ষষ্ঠ দিনের মতো যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান ও সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে তেহরান। একই সঙ্গে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২২ জুন থেকে শুরু হওয়া মার্কিন হামলায় দেশটিতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৮ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৪০০ জনেরও বেশি।

ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কেরমানপুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, নিহতদের মধ্যে তিনজন নারী ও একজন শিশু রয়েছে। আহতদের মধ্যে ২২ জন নারী এবং ১৮ বছরের কম বয়সী অন্তত নয়জন রয়েছেন। তার দাবি, অনেক হামলাই জনবসতিপূর্ণ এলাকায় হয়েছে, যার কারণে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি বেড়েছে।

সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি যুক্তরাষ্ট্রের

মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, শুক্রবার রাতেও ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার উদ্দেশ্যে একাধিক অভিযান চালানো হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানায়, কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাসের আশপাশ এবং ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ও নৌবাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনায় নির্ভুল নির্দেশিত অস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়েছে।

সেন্টকমের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার মূল লক্ষ্য ছিল উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা অবকাঠামো, সামরিক সরবরাহ নেটওয়ার্ক এবং ইরানের সামুদ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা।

তবে ইরান সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। দেশটির কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, সেতুসহ বিভিন্ন বেসামরিক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণাঞ্চলের বন্দর খামির এলাকায় একটি সেতুতে হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, চাবাহারের কাছে পাসাবান্দার এলাকায় এক বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে।

বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান ও সিরিয়ায় পাল্টা হামলার দাবি

মার্কিন হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে ইরান।

তেহরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান ও সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট একাধিক সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো, সিরিয়ার আল-তানফে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ অভিযান কমান্ড সেন্টারেও হামলা হয়েছে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, এটি সিরিয়ার ভূখণ্ডে তাদের প্রথম সরাসরি সামরিক অভিযান।

এ ছাড়া ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ওমানের ঘান্নেম এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমান নিয়ন্ত্রণ রাডার এবং সালামেহ রকস এলাকায় একটি নৌবাহিনীর রাডার ধ্বংস করা হয়েছে।

তবে রয়টার্স জানিয়েছে, এসব দাবির সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

হরমুজ প্রণালিতে ফের অচলাবস্থা

নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে আবারও জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে।

ইরান জানিয়েছে, তারা প্রণালিতে পুনরায় অবরোধ কার্যকর করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোকে ঘিরে নতুন করে অবরোধ জোরদার করেছে।

রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা একাধিক সূত্র জানিয়েছে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সহায়তায় লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালিতেও নৌ চলাচল বাধাগ্রস্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে তেহরান।

এদিকে হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলে হামলা বা বিঘ্ন সৃষ্টির ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনোভাবেই নীরব থাকবেন না। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, কূটনৈতিক সমাধানের পথও এখনো উন্মুক্ত রয়েছে।

আলোচনায় ফেরার আহ্বান বেইজিং ও ইসলামাবাদের

উত্তেজনা বাড়তে থাকায় যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক সংলাপে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে চীন ও পাকিস্তান।

সাংহাইয়ে বৈঠকের পর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধ করে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানান।

ওয়াং ই বলেন, গত জুনে যে সমঝোতা হয়েছিল, সেটি যুদ্ধ বন্ধের পথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ছিল। তার ভাষায়, শান্তির সুযোগ এখনো রয়েছে, তাই শেষ মুহূর্তে সেই সম্ভাবনা নষ্ট করা উচিত হবে না।

বাড়ছে তেলের দাম, বাড়ছে অর্থনৈতিক শঙ্কাও

মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সংঘাতের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় শূন্য দশমিক ৮৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৪ দশমিক ৯৩ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল সতর্ক করে বলেছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

যুদ্ধের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করছেন সাধারণ মানুষ। তেহরানের এক বাসিন্দা রয়টার্সকে বলেন, প্রতিদিন নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা নিয়ে বেঁচে থাকা মানসিকভাবে অত্যন্ত ক্লান্তিকর। তার ভাষায়, ‘এভাবে জীবন চলতে পারে না। আমরা চাই শেষ পর্যন্ত কূটনীতিই জয়ী হোক।’