শিরোনাম
এক্সপ্লেইনার

ইরান যুদ্ধে যেভাবে চূর্ণ হলো আমিরাতের অহংকার

সিটিজেন ডেস্ক
ইরান যুদ্ধে যেভাবে চূর্ণ হলো আমিরাতের অহংকার
ইরান যুদ্ধে আমিরাতের মধ্যম সারির আঞ্চলিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার উচ্চাকাঙ্ক্ষা এখন কঠিন বাস্তবতার মুখে। ছবি: ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে গত দুই দশক ধরে বৈশ্বিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। কিন্তু বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটে তা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসন ও হামলার মুখে আবুধাবির ‘লিটল স্পার্টা’ বা মধ্যম সারির আঞ্চলিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার উচ্চাকাঙ্ক্ষা এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।

আবুধাবি এতদিন বন্দর নির্মাণ, বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তার, ওয়াশিংটনের সাথে ঘনিষ্ঠতা এবং মস্কো ও বেইজিংয়ের সাথে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে নিজেদের অপরাজেয় হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করে আসছিল। কিন্তু ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতা প্রমাণ করেছে, বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু বা পুঁজির হাব হওয়া সত্ত্বেও সংকটের সময়ে এ বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক কোনো কার্যকর নিরাপত্তা দিতে পারছে না। ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জমকালো অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক পোর্টফোলিও ইরানের বিরুদ্ধে কোনো শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে আমিরাতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এক ধরনের চরম হতাশা দেখা দিয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্সিয়াল উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা এখন পাশে না দাঁড়িয়ে কেবল মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। একইভাবে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত আমিরাতের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ আল-ওতাইবা হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে আন্তর্জাতিক সামরিক উদ্যোগে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এসব বার্তা আবুধাবির দৃঢ়তা প্রকাশের চেষ্টা হলেও, এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক কঠিন সত্য ইরানের মতো একটি আগ্রাসী প্রতিবেশীর সামনে আমিরাতের পুঞ্জীভূত প্রভাব কৌশলগত কোনো স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে পারেনি।

ভৌগোলিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে আবুধাবি এককভাবে যে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে চেয়েছিল, তা এখন চরম সংকটে। দেশটির অর্থনীতি মূলত বিশ্বস্ততা, উন্মুক্ত বাণিজ্য এবং নির্বিঘ্ন যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা সহজেই ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান এই যুদ্ধ পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে, আবুধাবি যতই নিজেকে অন্য ছোট রাষ্ট্রগুলোর চেয়ে ব্যতিক্রম এবং সুরক্ষিত ভাবুক না কেন, কাঠামোগতভাবে তারা অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের মতোই সমান ঝুঁকিপূর্ণ।

বিশ্লেষকদের মতে, আবুধাবি এতদিন উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থাকে (জিসিসি) নিজেদের আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য মনে না করে বরং তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার পথে একটি বাধা হিসেবে বিবেচনা করেছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সহযোগিতা ছাড়া আমিরাত নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। পাকিস্তান, কাতার কিংবা ওমানের মতো দেশগুলোর মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে ক্ষোভের চোখে না দেখে, এটিকে একটি সম্মিলিত দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সৌদি আরবের কৌশলগত গভীরতা ও শক্তিকে স্বীকার করে নিয়েই আমিরাতকে তার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজাতে হবে। লিটল স্পার্টার একাকী লড়াইয়ের অবাস্তব রূপকথা নয়, বরং জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর যৌথ ও অংশীদারিত্বমূলক নিরাপত্তাবোধই হতে পারে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার একমাত্র চাবিকাঠি।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

/এমএকে/