শিরোনাম

ইরানের গ্যাসক্ষেত্রে হামলায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সম্পর্কে ফাটল

সিটিজেন ডেস্ক
ইরানের গ্যাসক্ষেত্রে হামলায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সম্পর্কে ফাটল
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পতাকা। ছবি: সংগৃহীত

ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ইরান ও কাতারের যৌথ মালিকানাধীন সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলের হামলা এবং এর জবাবে কাতারের একটি জ্বালানি স্থাপনায় ইরানের পাল্টা আঘাত—এই ঘটনাগুলো দুই মিত্র দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের স্বভাবসুলভ কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি ইরানকে হুমকি দেন। একই সঙ্গে দাবি করেন, ইসরায়েল যে এই হামলার পরিকল্পনা করছিল, সে বিষয়ে তিনি আগে থেকে কিছু জানতেন না। তার এই বক্তব্যে অনেকের মনে প্রশ্ন উঠেছে—এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আসলেই কতটা সমন্বিত?

তবে ট্রাম্পের এই দাবির বিপরীত তথ্যও সামনে এসেছে। ইসরায়েলের মধ্যপন্থী পত্রিকা ‘ইয়েদিওথ আহরোনোথ’ জানিয়েছে, হামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করেই চালানো হয়েছে এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের মধ্যে এ বিষয়ে আগেই সমঝোতা হয়েছিল। ডানপন্থী পত্রিকা ‘ইসরায়েল হায়োম’ আরও এক ধাপ এগিয়ে দাবি করেছে, পারস্য উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের নেতাদের সঙ্গেও সম্ভাব্য হামলা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন ট্রাম্প।

তবে ট্রাম্পের অন্যান্য অনেক বক্তব্যের মতো এটিও কতখানি সত্য, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

ইসরায়েলের হামলা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, সেটিও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, ইসরায়েল ‘ক্রোধের বশে’ গ্যাসক্ষেত্রে ‘হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছে’। সাধারণত এ ধরনের শব্দ তিনি প্রতিপক্ষের হামলা বর্ণনায় ব্যবহার করেন, ঘনিষ্ঠ মিত্রের পরিকল্পিত সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে নয়। ফলে এতে তার অসন্তোষের ইঙ্গিত দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

একই পোস্টে ট্রাম্প বড় হাতের অক্ষরে লিখেছেন, ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েল আর কোনো হামলা করবে না, যদি না ইরান কাতারের মতো নিরপরাধ দেশের ওপর আঘাত হানে।’ সবসময় পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাওয়া ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে কেউ কেউ আগাম সতর্কবার্তা, আবার কেউ সম্ভাব্য প্রতিশ্রুতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।

এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, গ্যাসক্ষেত্রে হামলাটি ইসরায়েল একাই চালিয়েছে। তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের কথাও জোর দিয়ে তুলে ধরেন। তার ভাষায়, ট্রাম্পই নেতৃত্ব দিচ্ছেন, আর তিনি তার মিত্র হিসেবে কাজ করছেন।

ইসরায়েলি কর্মকর্তারাও দাবি করছেন, ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক সক্ষমতা মোকাবিলার ক্ষেত্রে দুই দেশের লক্ষ্য অভিন্ন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, কৌশলগত দিক থেকে কিছু পার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও নৌক্ষমতা দুর্বল করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, সেখানে ইসরায়েল আরও এগিয়ে গিয়ে নেতৃত্ব কাঠামো ভেঙে দেওয়ার কৌশল নিচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক বিশেষ দূত ডেভিড স্যাটারফিল্ডের মতে, যুদ্ধের সময়সীমা নির্ধারণ ছাড়া দুই দেশের লক্ষ্য প্রায় একই। তবে তিনি মনে করেন, ট্রাম্প এমন একটি ফল চান যা রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য, আর নেতানিয়াহুর কাছে ইরানের শাসনব্যবস্থার পতনই বড় লক্ষ্য।

নিজের পোস্টে ট্রাম্প আরও দাবি করেন, কাতার এই সংঘাতে জড়িত ছিল না এবং আগাম কোনো তথ্যও তাদের কাছে ছিল না। তার মতে, ইরান ভুল বোঝাবুঝির কারণে প্রতিশোধ নিয়েছে। যদিও তিনি ইরানকে ছাড় দেননি, তবুও এই বক্তব্যে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা দেখা যায়।

পোস্টের এক পর্যায়ে ট্রাম্প কঠোর হুমকিও দেন। তিনি বলেন, ইরান যদি আবার কাতারের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সহযোগিতা থাকুক বা না থাকুক—সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্র এমনভাবে ধ্বংস করবে, যা আগে কখনও দেখা যায়নি।

এই বক্তব্যে ‘ইসরায়েলের সম্মতি থাকুক বা না থাকুক’ অংশটি অনেকের দৃষ্টি কেড়েছে। কেউ এটিকে নেতানিয়াহুর প্রতি পরোক্ষ বার্তা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন—ভবিষ্যৎ পদক্ষেপে আরও সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত এটি।

এদিকে ইসরায়েল-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও। তেল ও গ্যাসের দাম বাড়তে শুরু করেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করাও চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখনও ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাদের মধ্যে সূক্ষ্ম মতপার্থক্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই এই পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে—যা ভবিষ্যতে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

/এমআর/