ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা থেকে যুদ্ধের শঙ্কা, সংকটে মধ্যপ্রাচ্য

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা থেকে যুদ্ধের শঙ্কা, সংকটে মধ্যপ্রাচ্য
মোসাদ্দেকুর রহমান

ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যে একটি ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে। কোনো চুক্তি ছাড়াই জেনেভায় দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শেষ হয়েছে। এটিকে দুই দেশের কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা। আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় দুই পক্ষই এখন হুমকি ও পাল্টা হুমকির পথ বেছে নিয়েছে।
চুক্তি না করলে ১০ দিনের মধ্যে ইরানে হামলা চালানো হতে পারে বলে গত বৃহস্পতিবার সতর্ক করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এদিকে হামলা হলে কোনো ছাড় দিবে না ইরান। তারা প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়ে বলেছে, হামলা করলে মার্কিন ঘাঁটি ও সম্পদ তাদের ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা ইরানে হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় আছে।
ফলে এই উত্তেজনা এখন শুধুই কূটনৈতিক সংকট নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হয়েছে, যা গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ইরানকে পরমাণু চুক্তিতে বাধ্য করতে আলোচনার টেবিলে ডেকেছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক শক্তি ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিমানবাহী রণতরী, আধুনিক যুদ্ধবিমান ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র। যা এই অঞ্চলে যুদ্ধের আশঙ্কা আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশল ইরানকে কূটনৈতিক আলোচনায় বাধ্য করার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা। তবে এই চেষ্টা ব্যর্থ হলে জমে থাকা ক্ষোভের বিষ্ফোরণ ঘটতে পারে, যার পরিণতি হবে যুদ্ধ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ইরান যদি নিজেদের পরমাণু কর্মসূচি ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চুক্তি করতে অস্বীকার করে, তাহলে হামলা ছাড়া বিকল্প কিছু থাকবে না।
ইরানের প্রতিক্রিয়া: কঠিন অবস্থান ও সামরিক প্রস্তুতি
জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাইদ ইরাভানি জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে লেখা চিঠিতে ট্রাম্পের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের যুদ্ধকে উসকে দেওয়ার মতো এই ধরনের বক্তব্য, ইরানে সামরিক আগ্রাসনের ইঙ্গিত দেয়। যার পরিণতি মধ্যপ্রাচ্যের জন্য ভালো হবে না। এমনকি বিষয়টি বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করবে।
ইরান স্পষ্ট করে বলেছে, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি শুধুমাত্র তাদের সামরিক সক্ষমতার প্রতীক নয়, এটি দেশটির জাতীয় নিরাপত্তার জন্য জরুরি। তাই তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে চুক্তি করতে চাইলেও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে আলোচনা করতে রাজি নয়। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার সীমিত করার চেষ্টাকে তারা ‘রেড লাইন’ হিসেবে দেখছে। তারা কোনোভাবেই ভয়ভীতি বা চাপের মুখে এই সক্ষমতা ত্যাগ করবে না।
ইরান ইতোমধ্যেই সামরিক ঘাঁটিতে কংক্রিট শিল্ড বা নতুন সুরক্ষা কাঠামো তৈরি করছে, যা সম্ভাব্য বিমান হামলা থেকে বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা রক্ষা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মূহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালানোর আশঙ্কা ৭৬ শতাংশ। যদি কূটনৈতিক আলোচনায় সফলতা না আসে, সেই আশঙ্কা দ্রুতই ১০০ শতাংশে পৌঁছাবে।
অন্যদিকে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা শুধু মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বিশ্ববাজার ও অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করছে। হরমুজ প্রণালীতে সামরিক মহড়া ও উত্তেজনার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।
যুদ্ধ ঠেকাতে ইতোমধ্যে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোও এই উত্তেজনা মোকাবিলায় প্রস্তুত হচ্ছে।
যুদ্ধ কি মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে যাবে?
চলমান উত্তেজনার মধ্যেই পারস্য উপসাগরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর বহরের উপস্থিতি বেড়েছে। আর অন্যদিকে ইরানও সামরিক মহড়া জোরদার করছে। কূটনৈতিক আলোচনা চললেও দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। ফলে সংঘাতের আশঙ্কা বেড়েই চলেছে।
যদি সরাসরি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে এর কারণ হিসাবে প্রথম যে দেশটির নাম সামনে আসে সেটি ইসরায়েল। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি বলে মনে করে আসছে। তেলআবিব প্রয়োজনে একতরফা হামলার ইঙ্গিত দিয়েছে।
যুদ্ধ শুরু হলে লেবানন ও সিরিয়া সীমান্তবর্তী ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। ফলে সংঘাত খুব দ্রুতই ইসরায়েল-কেন্দ্রিক আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর ঝুঁকি
পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোও এই সম্ভাব্য যুদ্ধের সরাসরি প্রভাবের বাইরে থাকবে না। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ইরান যদি পাল্টা হামলা চালায়, তাহলে এসব মার্কিন ঘাঁটি সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
অন্যদিকে উপসাগরীয় জ্বালানি তেলের স্থাপনাগুলোতে হামলা হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল রপ্তানি হয়। এই রুটে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলে।
ইরাক ও সিরিয়া: প্রক্সি যুদ্ধের বিস্তার
ইরাক ও সিরিয়া দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রক্সি যুদ্ধ বা ছায়া যুত্থের ক্ষেত্র। ইরাকে মার্কিন সেনা উপস্থিতি রয়েছে, পাশাপাশি ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন আঞ্চলিক গোষ্ঠীও সক্রিয়। অতীতে তাদের মধ্যে একাধিকবার ক্ষেপনাস্ত্র হামলা ও পাল্টা বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে।
যদি সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে ‘ছায়া যুদ্ধের ক্ষেত্র’ এই দুই দেশও আক্রান্ত হতে পারে। এতে এই দেশগুলোর সরকারব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং জনগণ নতুন করে মানবিক সংকটে পড়বে। শরণার্থী সংকটও বাড়তে পারে।
ইয়েমেন ও লেবানন: বহুমাত্রিক চাপ
ইয়েমেনে চলমান সংঘাতে ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর ভূমিকা রয়েছে বলে পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ। যুদ্ধ শুরু হলে তারা লোহিত সাগর অঞ্চলে নৌ চলাচলে বাধা দিতে পারে। একইভাবে লেবাননে শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা ইসরায়েল সীমান্তে উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
ফলে সংঘাত কেবল একটি ফ্রন্টে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং মধ্যপ্রাচ্যে উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব—তিন দিক থেকেই চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজার
মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত হবে। যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলে উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইউরোপ ইতোমধ্যে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে। এশীয় দেশগুলোও আমদানি নির্ভর।
এছাড়া সমুদ্রপথে বাণিজ্য ব্যাহত হলে বিশ্ববাজার আবারও অস্থির হয়ে উঠতে পারে। মুদ্রাস্ফীতি ও শেয়ারবাজারে ধ্বসের ঝুঁকি তৈরি হবে।
কূটনৈতিক বিকল্প কি আছে?
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এখনো অনিবার্য নয়। উভয় পক্ষই জানে, বড় আকারের সংঘাত তাদের জন্য ব্যয়বহুল হবে। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে জানে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়। অন্যদিকে ইরানও জানে, ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষতি তাদের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিতে ফেলবে।
এই বাস্তবতা দুই পক্ষকে সীমিত সংঘাত বা কূটনৈতিক সমঝোতার পথে ঠেলে দিতে পারে। ওমান বা কাতারের মতো মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্রগুলো গোপন সংলাপের উদ্যোগ নিতে পারে।
ইসরায়েল এই সম্ভাব্য সংঘাতের সবচেয়ে সক্রিয় অংশীদার। তেলআবিব দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়, তাহলে ইসরায়েল কেবল সমর্থনই নয়, সক্রিয় অংশগ্রহণও করতে পারে।
ইসরায়েলের বিমানবাহিনী দূরপাল্লার হামলা চালানোর সক্ষমতা রাখে। একই সঙ্গে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ ও ‘ডেভিডস স্লিং’ সম্ভাব্য পাল্টা হামলা ঠেকাতে প্রস্তুত রয়েছে। তবে যুদ্ধ শুরু হলে ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলের উত্তর সীমান্তে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা সংঘাতকে দ্রুত আঞ্চলিক রূপ দেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল চাইবে যুদ্ধ সীমিত ও লক্ষ্যভিত্তিক থাকুক। কিন্তু ইরানের পাল্টা হামলা যদি ইসরায়েলি ভূখণ্ডে আঘাত হানে, তাহলে তারা পূর্ণমাত্রার প্রতিরোধে যেতে পারে। যা সংঘাতকে মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তৃত করবে।
রাশিয়া: কৌশলগত সমর্থন, সরাসরি যুদ্ধে নয়
রাশিয়া ঐতিহাসিকভাবে ইরানের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার। সিরিয়ায় দুই দেশের যৌথ সামরিক বোঝাপড়া রয়েছে। তবে মস্কো সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চাইবে না। রাশিয়া চাইবে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরও জড়িয়ে পড়ুক। যাতে ইউরোপীয় ফ্রন্টে তাদের কৌশলগত সুবিধা বজায় থাকে।
চীন: অর্থনৈতিক স্বার্থ ও ভারসাম্য রক্ষা
চীন ইরানের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদারদের একটি, বিশেষ করে জ্বালানি খাতে। একই সঙ্গে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাত এড়াতে চায়। তাই চীনের ভূমিকা হবে সূক্ষ্ম ও কৌশলগত। চীন ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখবে, তবে প্রকাশ্যে সামরিক সমর্থন দেবে না।
চীন মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা চায়, কারণ অঞ্চলটি তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম বাড়বে, যা চীনের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে। তাই তারা যুদ্ধ এড়াতে কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলো ঐতিহ্যগতভাবে পারমাণবিক চুক্তি রক্ষার পক্ষে। তারা চায় না মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বড় যুদ্ধ শুরু হোক। তবে ইউরোপ একক অবস্থানে থাকবে না। ইউরোপের কিছু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক বজায় রাখবে, অন্যরা কূটনৈতিক সমাধানে জোর দেবে। যুদ্ধ শুরু হলে ইউরোপ সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণে যাবে, এমন সম্ভাবনা কম। তবে ন্যাটো কাঠামোগত কারণে মিত্রদের লজিস্টিক বা গোয়েন্দা সহায়তা দিতে পারে।
একই সঙ্গে ইউরোপ যুদ্ধ থামাতে মধ্যস্থতার ভূমিকা নিতে পারে। বিশেষ করে ফ্রান্স ও জার্মানি সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে পারে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য যুদ্ধ কেবল দুই দেশের সংঘর্ষ হবে না, এটি হবে একটি বহুমাত্রিক ভূরাজনৈতিক সংকট। যেকোনো আকস্মিক হামলা দ্রুত পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের এই সম্ভাব্য যুদ্ধ তাই কেবল আঞ্চলিক নয়, এটি বৈশ্বিক শক্তির সমীকরণ নতুন করে নির্ধারণ করতে পারে।

ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যে একটি ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে। কোনো চুক্তি ছাড়াই জেনেভায় দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শেষ হয়েছে। এটিকে দুই দেশের কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা। আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় দুই পক্ষই এখন হুমকি ও পাল্টা হুমকির পথ বেছে নিয়েছে।
চুক্তি না করলে ১০ দিনের মধ্যে ইরানে হামলা চালানো হতে পারে বলে গত বৃহস্পতিবার সতর্ক করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এদিকে হামলা হলে কোনো ছাড় দিবে না ইরান। তারা প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়ে বলেছে, হামলা করলে মার্কিন ঘাঁটি ও সম্পদ তাদের ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা ইরানে হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় আছে।
ফলে এই উত্তেজনা এখন শুধুই কূটনৈতিক সংকট নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হয়েছে, যা গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ইরানকে পরমাণু চুক্তিতে বাধ্য করতে আলোচনার টেবিলে ডেকেছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক শক্তি ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিমানবাহী রণতরী, আধুনিক যুদ্ধবিমান ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র। যা এই অঞ্চলে যুদ্ধের আশঙ্কা আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশল ইরানকে কূটনৈতিক আলোচনায় বাধ্য করার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা। তবে এই চেষ্টা ব্যর্থ হলে জমে থাকা ক্ষোভের বিষ্ফোরণ ঘটতে পারে, যার পরিণতি হবে যুদ্ধ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ইরান যদি নিজেদের পরমাণু কর্মসূচি ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চুক্তি করতে অস্বীকার করে, তাহলে হামলা ছাড়া বিকল্প কিছু থাকবে না।
ইরানের প্রতিক্রিয়া: কঠিন অবস্থান ও সামরিক প্রস্তুতি
জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাইদ ইরাভানি জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে লেখা চিঠিতে ট্রাম্পের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের যুদ্ধকে উসকে দেওয়ার মতো এই ধরনের বক্তব্য, ইরানে সামরিক আগ্রাসনের ইঙ্গিত দেয়। যার পরিণতি মধ্যপ্রাচ্যের জন্য ভালো হবে না। এমনকি বিষয়টি বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করবে।
ইরান স্পষ্ট করে বলেছে, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি শুধুমাত্র তাদের সামরিক সক্ষমতার প্রতীক নয়, এটি দেশটির জাতীয় নিরাপত্তার জন্য জরুরি। তাই তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে চুক্তি করতে চাইলেও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে আলোচনা করতে রাজি নয়। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার সীমিত করার চেষ্টাকে তারা ‘রেড লাইন’ হিসেবে দেখছে। তারা কোনোভাবেই ভয়ভীতি বা চাপের মুখে এই সক্ষমতা ত্যাগ করবে না।
ইরান ইতোমধ্যেই সামরিক ঘাঁটিতে কংক্রিট শিল্ড বা নতুন সুরক্ষা কাঠামো তৈরি করছে, যা সম্ভাব্য বিমান হামলা থেকে বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা রক্ষা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মূহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালানোর আশঙ্কা ৭৬ শতাংশ। যদি কূটনৈতিক আলোচনায় সফলতা না আসে, সেই আশঙ্কা দ্রুতই ১০০ শতাংশে পৌঁছাবে।
অন্যদিকে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা শুধু মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বিশ্ববাজার ও অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করছে। হরমুজ প্রণালীতে সামরিক মহড়া ও উত্তেজনার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।
যুদ্ধ ঠেকাতে ইতোমধ্যে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোও এই উত্তেজনা মোকাবিলায় প্রস্তুত হচ্ছে।
যুদ্ধ কি মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে যাবে?
চলমান উত্তেজনার মধ্যেই পারস্য উপসাগরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর বহরের উপস্থিতি বেড়েছে। আর অন্যদিকে ইরানও সামরিক মহড়া জোরদার করছে। কূটনৈতিক আলোচনা চললেও দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। ফলে সংঘাতের আশঙ্কা বেড়েই চলেছে।
যদি সরাসরি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে এর কারণ হিসাবে প্রথম যে দেশটির নাম সামনে আসে সেটি ইসরায়েল। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি বলে মনে করে আসছে। তেলআবিব প্রয়োজনে একতরফা হামলার ইঙ্গিত দিয়েছে।
যুদ্ধ শুরু হলে লেবানন ও সিরিয়া সীমান্তবর্তী ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। ফলে সংঘাত খুব দ্রুতই ইসরায়েল-কেন্দ্রিক আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর ঝুঁকি
পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোও এই সম্ভাব্য যুদ্ধের সরাসরি প্রভাবের বাইরে থাকবে না। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ইরান যদি পাল্টা হামলা চালায়, তাহলে এসব মার্কিন ঘাঁটি সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
অন্যদিকে উপসাগরীয় জ্বালানি তেলের স্থাপনাগুলোতে হামলা হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল রপ্তানি হয়। এই রুটে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলে।
ইরাক ও সিরিয়া: প্রক্সি যুদ্ধের বিস্তার
ইরাক ও সিরিয়া দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রক্সি যুদ্ধ বা ছায়া যুত্থের ক্ষেত্র। ইরাকে মার্কিন সেনা উপস্থিতি রয়েছে, পাশাপাশি ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন আঞ্চলিক গোষ্ঠীও সক্রিয়। অতীতে তাদের মধ্যে একাধিকবার ক্ষেপনাস্ত্র হামলা ও পাল্টা বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে।
যদি সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে ‘ছায়া যুদ্ধের ক্ষেত্র’ এই দুই দেশও আক্রান্ত হতে পারে। এতে এই দেশগুলোর সরকারব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং জনগণ নতুন করে মানবিক সংকটে পড়বে। শরণার্থী সংকটও বাড়তে পারে।
ইয়েমেন ও লেবানন: বহুমাত্রিক চাপ
ইয়েমেনে চলমান সংঘাতে ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর ভূমিকা রয়েছে বলে পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ। যুদ্ধ শুরু হলে তারা লোহিত সাগর অঞ্চলে নৌ চলাচলে বাধা দিতে পারে। একইভাবে লেবাননে শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা ইসরায়েল সীমান্তে উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
ফলে সংঘাত কেবল একটি ফ্রন্টে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং মধ্যপ্রাচ্যে উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব—তিন দিক থেকেই চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজার
মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত হবে। যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলে উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইউরোপ ইতোমধ্যে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে। এশীয় দেশগুলোও আমদানি নির্ভর।
এছাড়া সমুদ্রপথে বাণিজ্য ব্যাহত হলে বিশ্ববাজার আবারও অস্থির হয়ে উঠতে পারে। মুদ্রাস্ফীতি ও শেয়ারবাজারে ধ্বসের ঝুঁকি তৈরি হবে।
কূটনৈতিক বিকল্প কি আছে?
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এখনো অনিবার্য নয়। উভয় পক্ষই জানে, বড় আকারের সংঘাত তাদের জন্য ব্যয়বহুল হবে। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে জানে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়। অন্যদিকে ইরানও জানে, ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষতি তাদের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিতে ফেলবে।
এই বাস্তবতা দুই পক্ষকে সীমিত সংঘাত বা কূটনৈতিক সমঝোতার পথে ঠেলে দিতে পারে। ওমান বা কাতারের মতো মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্রগুলো গোপন সংলাপের উদ্যোগ নিতে পারে।
ইসরায়েল এই সম্ভাব্য সংঘাতের সবচেয়ে সক্রিয় অংশীদার। তেলআবিব দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়, তাহলে ইসরায়েল কেবল সমর্থনই নয়, সক্রিয় অংশগ্রহণও করতে পারে।
ইসরায়েলের বিমানবাহিনী দূরপাল্লার হামলা চালানোর সক্ষমতা রাখে। একই সঙ্গে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ ও ‘ডেভিডস স্লিং’ সম্ভাব্য পাল্টা হামলা ঠেকাতে প্রস্তুত রয়েছে। তবে যুদ্ধ শুরু হলে ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলের উত্তর সীমান্তে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা সংঘাতকে দ্রুত আঞ্চলিক রূপ দেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল চাইবে যুদ্ধ সীমিত ও লক্ষ্যভিত্তিক থাকুক। কিন্তু ইরানের পাল্টা হামলা যদি ইসরায়েলি ভূখণ্ডে আঘাত হানে, তাহলে তারা পূর্ণমাত্রার প্রতিরোধে যেতে পারে। যা সংঘাতকে মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তৃত করবে।
রাশিয়া: কৌশলগত সমর্থন, সরাসরি যুদ্ধে নয়
রাশিয়া ঐতিহাসিকভাবে ইরানের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার। সিরিয়ায় দুই দেশের যৌথ সামরিক বোঝাপড়া রয়েছে। তবে মস্কো সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চাইবে না। রাশিয়া চাইবে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরও জড়িয়ে পড়ুক। যাতে ইউরোপীয় ফ্রন্টে তাদের কৌশলগত সুবিধা বজায় থাকে।
চীন: অর্থনৈতিক স্বার্থ ও ভারসাম্য রক্ষা
চীন ইরানের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদারদের একটি, বিশেষ করে জ্বালানি খাতে। একই সঙ্গে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাত এড়াতে চায়। তাই চীনের ভূমিকা হবে সূক্ষ্ম ও কৌশলগত। চীন ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখবে, তবে প্রকাশ্যে সামরিক সমর্থন দেবে না।
চীন মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা চায়, কারণ অঞ্চলটি তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম বাড়বে, যা চীনের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে। তাই তারা যুদ্ধ এড়াতে কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলো ঐতিহ্যগতভাবে পারমাণবিক চুক্তি রক্ষার পক্ষে। তারা চায় না মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বড় যুদ্ধ শুরু হোক। তবে ইউরোপ একক অবস্থানে থাকবে না। ইউরোপের কিছু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক বজায় রাখবে, অন্যরা কূটনৈতিক সমাধানে জোর দেবে। যুদ্ধ শুরু হলে ইউরোপ সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণে যাবে, এমন সম্ভাবনা কম। তবে ন্যাটো কাঠামোগত কারণে মিত্রদের লজিস্টিক বা গোয়েন্দা সহায়তা দিতে পারে।
একই সঙ্গে ইউরোপ যুদ্ধ থামাতে মধ্যস্থতার ভূমিকা নিতে পারে। বিশেষ করে ফ্রান্স ও জার্মানি সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে পারে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য যুদ্ধ কেবল দুই দেশের সংঘর্ষ হবে না, এটি হবে একটি বহুমাত্রিক ভূরাজনৈতিক সংকট। যেকোনো আকস্মিক হামলা দ্রুত পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের এই সম্ভাব্য যুদ্ধ তাই কেবল আঞ্চলিক নয়, এটি বৈশ্বিক শক্তির সমীকরণ নতুন করে নির্ধারণ করতে পারে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা থেকে যুদ্ধের শঙ্কা, সংকটে মধ্যপ্রাচ্য
মোসাদ্দেকুর রহমান

ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যে একটি ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে। কোনো চুক্তি ছাড়াই জেনেভায় দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শেষ হয়েছে। এটিকে দুই দেশের কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা। আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় দুই পক্ষই এখন হুমকি ও পাল্টা হুমকির পথ বেছে নিয়েছে।
চুক্তি না করলে ১০ দিনের মধ্যে ইরানে হামলা চালানো হতে পারে বলে গত বৃহস্পতিবার সতর্ক করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এদিকে হামলা হলে কোনো ছাড় দিবে না ইরান। তারা প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়ে বলেছে, হামলা করলে মার্কিন ঘাঁটি ও সম্পদ তাদের ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা ইরানে হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় আছে।
ফলে এই উত্তেজনা এখন শুধুই কূটনৈতিক সংকট নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হয়েছে, যা গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ইরানকে পরমাণু চুক্তিতে বাধ্য করতে আলোচনার টেবিলে ডেকেছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক শক্তি ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিমানবাহী রণতরী, আধুনিক যুদ্ধবিমান ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র। যা এই অঞ্চলে যুদ্ধের আশঙ্কা আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশল ইরানকে কূটনৈতিক আলোচনায় বাধ্য করার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা। তবে এই চেষ্টা ব্যর্থ হলে জমে থাকা ক্ষোভের বিষ্ফোরণ ঘটতে পারে, যার পরিণতি হবে যুদ্ধ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ইরান যদি নিজেদের পরমাণু কর্মসূচি ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চুক্তি করতে অস্বীকার করে, তাহলে হামলা ছাড়া বিকল্প কিছু থাকবে না।
ইরানের প্রতিক্রিয়া: কঠিন অবস্থান ও সামরিক প্রস্তুতি
জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাইদ ইরাভানি জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে লেখা চিঠিতে ট্রাম্পের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের যুদ্ধকে উসকে দেওয়ার মতো এই ধরনের বক্তব্য, ইরানে সামরিক আগ্রাসনের ইঙ্গিত দেয়। যার পরিণতি মধ্যপ্রাচ্যের জন্য ভালো হবে না। এমনকি বিষয়টি বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করবে।
ইরান স্পষ্ট করে বলেছে, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি শুধুমাত্র তাদের সামরিক সক্ষমতার প্রতীক নয়, এটি দেশটির জাতীয় নিরাপত্তার জন্য জরুরি। তাই তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে চুক্তি করতে চাইলেও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে আলোচনা করতে রাজি নয়। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার সীমিত করার চেষ্টাকে তারা ‘রেড লাইন’ হিসেবে দেখছে। তারা কোনোভাবেই ভয়ভীতি বা চাপের মুখে এই সক্ষমতা ত্যাগ করবে না।
ইরান ইতোমধ্যেই সামরিক ঘাঁটিতে কংক্রিট শিল্ড বা নতুন সুরক্ষা কাঠামো তৈরি করছে, যা সম্ভাব্য বিমান হামলা থেকে বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা রক্ষা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মূহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালানোর আশঙ্কা ৭৬ শতাংশ। যদি কূটনৈতিক আলোচনায় সফলতা না আসে, সেই আশঙ্কা দ্রুতই ১০০ শতাংশে পৌঁছাবে।
অন্যদিকে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা শুধু মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বিশ্ববাজার ও অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করছে। হরমুজ প্রণালীতে সামরিক মহড়া ও উত্তেজনার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।
যুদ্ধ ঠেকাতে ইতোমধ্যে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোও এই উত্তেজনা মোকাবিলায় প্রস্তুত হচ্ছে।
যুদ্ধ কি মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে যাবে?
চলমান উত্তেজনার মধ্যেই পারস্য উপসাগরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর বহরের উপস্থিতি বেড়েছে। আর অন্যদিকে ইরানও সামরিক মহড়া জোরদার করছে। কূটনৈতিক আলোচনা চললেও দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। ফলে সংঘাতের আশঙ্কা বেড়েই চলেছে।
যদি সরাসরি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে এর কারণ হিসাবে প্রথম যে দেশটির নাম সামনে আসে সেটি ইসরায়েল। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি বলে মনে করে আসছে। তেলআবিব প্রয়োজনে একতরফা হামলার ইঙ্গিত দিয়েছে।
যুদ্ধ শুরু হলে লেবানন ও সিরিয়া সীমান্তবর্তী ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। ফলে সংঘাত খুব দ্রুতই ইসরায়েল-কেন্দ্রিক আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর ঝুঁকি
পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোও এই সম্ভাব্য যুদ্ধের সরাসরি প্রভাবের বাইরে থাকবে না। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ইরান যদি পাল্টা হামলা চালায়, তাহলে এসব মার্কিন ঘাঁটি সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
অন্যদিকে উপসাগরীয় জ্বালানি তেলের স্থাপনাগুলোতে হামলা হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল রপ্তানি হয়। এই রুটে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলে।
ইরাক ও সিরিয়া: প্রক্সি যুদ্ধের বিস্তার
ইরাক ও সিরিয়া দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রক্সি যুদ্ধ বা ছায়া যুত্থের ক্ষেত্র। ইরাকে মার্কিন সেনা উপস্থিতি রয়েছে, পাশাপাশি ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন আঞ্চলিক গোষ্ঠীও সক্রিয়। অতীতে তাদের মধ্যে একাধিকবার ক্ষেপনাস্ত্র হামলা ও পাল্টা বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে।
যদি সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে ‘ছায়া যুদ্ধের ক্ষেত্র’ এই দুই দেশও আক্রান্ত হতে পারে। এতে এই দেশগুলোর সরকারব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং জনগণ নতুন করে মানবিক সংকটে পড়বে। শরণার্থী সংকটও বাড়তে পারে।
ইয়েমেন ও লেবানন: বহুমাত্রিক চাপ
ইয়েমেনে চলমান সংঘাতে ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর ভূমিকা রয়েছে বলে পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ। যুদ্ধ শুরু হলে তারা লোহিত সাগর অঞ্চলে নৌ চলাচলে বাধা দিতে পারে। একইভাবে লেবাননে শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা ইসরায়েল সীমান্তে উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
ফলে সংঘাত কেবল একটি ফ্রন্টে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং মধ্যপ্রাচ্যে উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব—তিন দিক থেকেই চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজার
মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত হবে। যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলে উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইউরোপ ইতোমধ্যে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে। এশীয় দেশগুলোও আমদানি নির্ভর।
এছাড়া সমুদ্রপথে বাণিজ্য ব্যাহত হলে বিশ্ববাজার আবারও অস্থির হয়ে উঠতে পারে। মুদ্রাস্ফীতি ও শেয়ারবাজারে ধ্বসের ঝুঁকি তৈরি হবে।
কূটনৈতিক বিকল্প কি আছে?
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এখনো অনিবার্য নয়। উভয় পক্ষই জানে, বড় আকারের সংঘাত তাদের জন্য ব্যয়বহুল হবে। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে জানে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়। অন্যদিকে ইরানও জানে, ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষতি তাদের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিতে ফেলবে।
এই বাস্তবতা দুই পক্ষকে সীমিত সংঘাত বা কূটনৈতিক সমঝোতার পথে ঠেলে দিতে পারে। ওমান বা কাতারের মতো মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্রগুলো গোপন সংলাপের উদ্যোগ নিতে পারে।
ইসরায়েল এই সম্ভাব্য সংঘাতের সবচেয়ে সক্রিয় অংশীদার। তেলআবিব দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়, তাহলে ইসরায়েল কেবল সমর্থনই নয়, সক্রিয় অংশগ্রহণও করতে পারে।
ইসরায়েলের বিমানবাহিনী দূরপাল্লার হামলা চালানোর সক্ষমতা রাখে। একই সঙ্গে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ ও ‘ডেভিডস স্লিং’ সম্ভাব্য পাল্টা হামলা ঠেকাতে প্রস্তুত রয়েছে। তবে যুদ্ধ শুরু হলে ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলের উত্তর সীমান্তে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা সংঘাতকে দ্রুত আঞ্চলিক রূপ দেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল চাইবে যুদ্ধ সীমিত ও লক্ষ্যভিত্তিক থাকুক। কিন্তু ইরানের পাল্টা হামলা যদি ইসরায়েলি ভূখণ্ডে আঘাত হানে, তাহলে তারা পূর্ণমাত্রার প্রতিরোধে যেতে পারে। যা সংঘাতকে মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তৃত করবে।
রাশিয়া: কৌশলগত সমর্থন, সরাসরি যুদ্ধে নয়
রাশিয়া ঐতিহাসিকভাবে ইরানের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার। সিরিয়ায় দুই দেশের যৌথ সামরিক বোঝাপড়া রয়েছে। তবে মস্কো সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চাইবে না। রাশিয়া চাইবে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরও জড়িয়ে পড়ুক। যাতে ইউরোপীয় ফ্রন্টে তাদের কৌশলগত সুবিধা বজায় থাকে।
চীন: অর্থনৈতিক স্বার্থ ও ভারসাম্য রক্ষা
চীন ইরানের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদারদের একটি, বিশেষ করে জ্বালানি খাতে। একই সঙ্গে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাত এড়াতে চায়। তাই চীনের ভূমিকা হবে সূক্ষ্ম ও কৌশলগত। চীন ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখবে, তবে প্রকাশ্যে সামরিক সমর্থন দেবে না।
চীন মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা চায়, কারণ অঞ্চলটি তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম বাড়বে, যা চীনের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে। তাই তারা যুদ্ধ এড়াতে কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলো ঐতিহ্যগতভাবে পারমাণবিক চুক্তি রক্ষার পক্ষে। তারা চায় না মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বড় যুদ্ধ শুরু হোক। তবে ইউরোপ একক অবস্থানে থাকবে না। ইউরোপের কিছু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক বজায় রাখবে, অন্যরা কূটনৈতিক সমাধানে জোর দেবে। যুদ্ধ শুরু হলে ইউরোপ সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণে যাবে, এমন সম্ভাবনা কম। তবে ন্যাটো কাঠামোগত কারণে মিত্রদের লজিস্টিক বা গোয়েন্দা সহায়তা দিতে পারে।
একই সঙ্গে ইউরোপ যুদ্ধ থামাতে মধ্যস্থতার ভূমিকা নিতে পারে। বিশেষ করে ফ্রান্স ও জার্মানি সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে পারে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য যুদ্ধ কেবল দুই দেশের সংঘর্ষ হবে না, এটি হবে একটি বহুমাত্রিক ভূরাজনৈতিক সংকট। যেকোনো আকস্মিক হামলা দ্রুত পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের এই সম্ভাব্য যুদ্ধ তাই কেবল আঞ্চলিক নয়, এটি বৈশ্বিক শক্তির সমীকরণ নতুন করে নির্ধারণ করতে পারে।




