ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ কৌশল বদলে দিচ্ছে ড্রোন
সিটিজেন ডেস্ক

ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ কৌশল বদলে দিচ্ছে ড্রোন
সিটিজেন ডেস্ক
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৬, ১২: ৩৬

এক বছর আগে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সৃষ্ট সামরিক সংঘাত যুদ্ধকৌশলের একটি নতুন দিক খুলে দেয়। বলা যেতে পারে, সেটিই ছিল উপমহাদেশের দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী দেশের মধ্যে প্রথম ড্রোন যুদ্ধ।
২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ভারতশাসিত কাশ্মীরের পহেলগামে বন্দুকধারীদের গুলিতে ২৬ জন পর্যটক ও স্থানীয় একজন ব্যক্তি নিহত হন। ভারতের অভিযোগ, ‘পাকিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো’ই এ হামলার জন্য দায়ী। তবে পাকিস্তান এর দায় অস্বীকার করে। এরপরেই পাকিস্তানের কিছু স্থাপনায় সামরিক অভিযান চালায় ভারত। এর সাংকেতিক নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন সিন্দুর’। এসময় ‘ইহা’, ‘হারোপ’ এবং ‘সংগার’– দুই দেশই এই ধরনের ড্রোন ব্যবহার করে।
ড্রোন প্রযুক্তি উচ্চ গতি, কম খরচ ও সহজলভ্যতার কারণে আধুনিক যুদ্ধের ধারাকে আমূল বদলে দিয়েছে। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পর্যন্ত– ড্রোনকেন্দ্রিক যুদ্ধই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস)-এর একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে ইরান তার প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরে ৪ হাজারেরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এর খুব কম সংখ্যকই তাদের লক্ষ্যে আঘাত হেনেছে, তবে এই হামলাগুলো বিশ্বের জ্বালানি ও আর্থিক বাজারে উল্লেখযোগ্য অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।
গত কয়েক বছর ধরে সংঘাতের কারণে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত রক্ষা এবং আকাশসীমা সুরক্ষিত করায় জোর দিয়েছে ভারত। তেমনি ২০২৪ সাল থেকে পাকিস্তানও ভারত, আফগানিস্তান ও ইরানের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে।
এজন্যই ভারত ও পাকিস্তান নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এর মধ্যে অস্ত্রসহ ড্রোন যেমন আছে, তেমনই রয়েছে বিনা-অস্ত্রের ড্রোনও।
ভারতের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, সামরিক বাহিনী অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে গোটা দেশের জন্য ড্রোন-প্রতিরোধী নীতি প্রণয়নের কাজ করছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের ৩৩২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে ১৮১৬টি ড্রোন দেখা গেছে। ভারতের সীমান্তরক্ষা বাহিনী বিএসএফের মতে, পাকিস্তান থেকে ভারতে মাদক, অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহের জন্য ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছিল। পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও তা স্বীকার করা হয়েছে।
ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আগে আমরা শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার বা ক্ষেপণাস্ত্রের দিকে নজর রাখতাম। পাশাপাশি এখন আমাদের সব আকার ও আকৃতির এবং বিভিন্ন উচ্চতায় থাকা ড্রোনও শনাক্ত করতে হচ্ছে।
যদিও তাদের মতে খরচ একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, শত্রুর ছোঁড়া সস্তা ড্রোন ধ্বংস করার জন্য দামী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা যায় না। তাই খরচের কথা মাথায় রাখতে হয়।

ভারতের ড্রোন যাত্রা যেভাবে শুরু
ভারতের সশস্ত্র বাহিনীতে ইসরায়েল-নির্মিত একাধিক সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। সার্চার হলো ভারতের প্রথম ড্রোন, যা ১৯৯৯ সালে কেনা হয়েছিল।
প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল বেদ প্রকাশ মালিক ১৯৯৮ সালের মার্চ মাসে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের কাছে সার্চার ১-এর একটি প্রদর্শনী দেখেন। তিনি বলেন, সেটি ছিল এই ধরনের প্রথম প্রদর্শনী।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীতে প্রধানত নজরদারির জন্য হেরন এবং সার্চার এমকে-ওয়ান/টু ড্রোন ব্যবহার করা হয়। মিশনের উপর নির্ভর করে হেরন ৩৫ হাজার ফুট উচ্চতায় ৪৫ ঘণ্টা পর্যন্ত আকাশে থাকতে পারে।
তবে ভারত এখন শুধু দীর্ঘ সময় উড়তে পারবে এমন ড্রোনের পাশাপাশি আঘাত করার ক্ষমতা আরও বেশি হবে– এমন ড্রোনও চাইছে। ভারতের রয়েছে নিজস্ব ড্রোন ‘নাগাস্ত্র’। তবে হামলা চালানোর ‘লোইটারিং মিউনিশন’ বা কামিকাজি ড্রোনের জন্য ভারত এখনো মূলত আমদানির ওপরেই নির্ভরশীল। এগুলোতে বিস্ফোরক থাকে এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার পরে ফেটে যায়।
জানা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারত ৩৫০ কোটি ডলারের একটি চুক্তি করেছে, যার অধীনে ৩১টি এমকিউ-৯বি ‘হাই অল্টিটিউড লং এনডিউরেন্স’ বা ‘হেল’, অর্থাৎ অতি উচ্চতায় দীর্ঘ সময় ধরে উড়তে পারবে, এমন ড্রোন কিনবে। ২০২৯ সাল থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এগুলো সরবরাহ করা হবে।
ভারত ছোট আকারের কৌশলগত ড্রোন– যেমন নজরদারি চালানো ও সোয়ার্ম অপারেশনে ব্যবহৃত কোয়াডকপ্টার নির্মাণের ব্যপারে আত্মনির্ভর হওয়ার দিকে জোর দিচ্ছে।
সোয়ার্ম অপারেশন বলতে এমন সমন্বিত অভিযানকে বোঝায় যেখানে একগুচ্ছ ড্রোন বা রোবট বা যানবাহন, অথবা এর সবগুলোই একটি দল হিসেবে কাজ করে এবং একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে ব্যবহৃত হয়।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একটি ‘হিউম্যান-ইন-দ্য-লুপ’ সিস্টেম নিয়ে কাজ চলছে, যার সাহায্যে একজন অপারেটর একইসঙ্গে অনেকগুলো ড্রোন পরিচালনা করতে পারবে।

দ্রুত এগিয়েছে পাকিস্তান
পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে’ প্রচলিত বিমান হামলার পরিবর্তে ড্রোন-ভিত্তিক অভিযান ক্রমশ প্রাধান্য পাচ্ছে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে ভারত বিশ্বের পঞ্চম অবস্থানে ছিল, ওই বছর তারা প্রায় ৯২১০ কোটি ডলার ব্যয় করে এ খাতে। আর পাকিস্তান এ সময় ব্যয় করেছে প্রায় ১১৯০ কোটি ডলার।
সামরিক বাজেট কম হওয়া সত্ত্বেও, সশস্ত্র ড্রোন ক্রয়ের ক্ষেত্রে পাকিস্তান ভারতের চেয়ে দ্রুত এগিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এসআইপিআরআই-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পাকিস্তান ৩৫টি সশস্ত্র ড্রোন পেয়েছে যার মধ্যে তুরস্ক থেকে ৩টি আকিনজি সিস্টেম, চীন থেকে ২৩টি উইং লুং-২ সিস্টেম এবং তুরস্ক থেকেই ৯টি বায়রাক্তার টিবি-২ ড্রোন পেয়েছে তারা।
পাকিস্তান দেশীয়ভাবেও বেশ কিছু সিস্টেম তৈরি করার চেষ্টা করছে। শাহপার সিরিজ, বিশেষ করে শাহপার-থ্রি তাদের সবচেয়ে উন্নত দেশীয় ড্রোন, যেটি প্রায় ৩০ ঘণ্টা পর্যন্ত উড়তে পারে। পাকিস্তানের প্রথম ড্রোন ‘বর্রাক’ ২০১৫ সালে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযানে ব্যবহার করা হয়েছিল।
‘উকাব’ ড্রোন ব্যবহার করা হয় কৌশলগত কাজের জন্য, যেমন নজরদারি এবং অস্ত্র থেকে ছোঁড়া গোলা যেন সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছায়, এজন্য ব্যবহার করা হয়। এই ড্রোনগুলোর বেশিরভাগই পাকিস্তানে তৈরি করা হয়, তবে ইঞ্জিনের মতো কিছু যন্ত্রাংশ আমদানি করা হয়।
পাকিস্তান তুরস্ক ও চীন থেকেও উন্নত ড্রোন আমদানি করেছে, যেগুলো নজরদারি চালাতে, লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে এবং দীর্ঘ দূরত্বে উড়তে পারে। আইআইএসএস-এর তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান তুরস্কের তৈরি ‘ইহা’ কামিকাজি ড্রোন এবং ইতালির ‘মিডিয়াম ফ্যালকো’ ড্রোনও ব্যবহার করে।
সৈন্যের হাতে ঈগল
ভারত আর পাকিস্তান উভয় দেশের সেনাবাহিনীই ২০২৫ সালের সংঘাতকে একটি শিক্ষাক্ষেত্র হিসেবে দেখছে এবং উভয়েই নিজেদের প্রস্তুত করছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রতিটি সৈন্যের হাতে ‘ঈগল তুলে দেওয়ার’ লক্ষ্যে কাজ করছে, যাকে কর্মকর্তারা ‘প্রতিটি সৈন্যের হাতে ঈগল তুলে দেওয়া’ বলে বর্ণনা করছেন– অর্থাৎ সম্মুখসারির সৈন্যদের ড্রোন ওড়ানো, পরিচালনা করা এবং এর বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার শিক্ষা দেওয়া।
এ ছাড়াও প্রতিটি ব্যাটালিয়নে ড্রোন যুদ্ধ বিশেষজ্ঞকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইসলামাবাদ-ভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক সৈয়দ মুহাম্মদ আলী মতে, পাকিস্তান ড্রোন যুদ্ধকে ‘তাদের অভিযানিক পরিকল্পনা এবং প্রশিক্ষণের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ’ হিসেবে মনে করছে, যার মধ্যে উৎপাদন ও সংগ্রহ থেকে শুরু করে রক্ষণাবেক্ষণ, মোতায়েন এবং ড্রোন-বিরোধী ব্যবস্থা পর্যন্ত সবকিছু অন্তর্ভুক্ত।
কম ধ্বংসাত্মক উপায় নাকি বিপজ্জনক সূচনা
বিশ্লেষকরা সাবধান করছেন যে, ড্রোনকে কৌশলগত ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোই বদলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে এরকম একটি সরঞ্জাম হিসেবে দেখা উচিত হবে না।
এসআইপিআরআই-এর ‘আমর্স ট্র্যান্সফার প্রোগ্রাম’-এর পরিচালক ও জ্যেষ্ঠ গবেষক ম্যাথিউ জর্জ বলেন, নজরদারির জন্য ব্যবহার করা ড্রোন মানুষের কাজকে আরও সহজ করে। তবে, আমি মনে করি না ড্রোন ব্যবহার করা শান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে কোনো বাধা হয়ে উঠবে, যদি দুই পক্ষের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই প্রচেষ্টা চালান।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর ইন্টেলিজেন্স, ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড টেকনোলজি প্রোগ্রামের পরিচালক এমিলি হার্ডিং প্রশ্ন তুলেছেন, ভারত-পাকিস্তান দুটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ। ড্রোন কি উভয় পক্ষের জন্য একটি কম ধ্বংসাত্মক উপায়, নাকি এটি লড়াইকে আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সূচনা।
সূত্র: বিবিসি বাংলা

এক বছর আগে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সৃষ্ট সামরিক সংঘাত যুদ্ধকৌশলের একটি নতুন দিক খুলে দেয়। বলা যেতে পারে, সেটিই ছিল উপমহাদেশের দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী দেশের মধ্যে প্রথম ড্রোন যুদ্ধ।
২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ভারতশাসিত কাশ্মীরের পহেলগামে বন্দুকধারীদের গুলিতে ২৬ জন পর্যটক ও স্থানীয় একজন ব্যক্তি নিহত হন। ভারতের অভিযোগ, ‘পাকিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো’ই এ হামলার জন্য দায়ী। তবে পাকিস্তান এর দায় অস্বীকার করে। এরপরেই পাকিস্তানের কিছু স্থাপনায় সামরিক অভিযান চালায় ভারত। এর সাংকেতিক নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন সিন্দুর’। এসময় ‘ইহা’, ‘হারোপ’ এবং ‘সংগার’– দুই দেশই এই ধরনের ড্রোন ব্যবহার করে।
ড্রোন প্রযুক্তি উচ্চ গতি, কম খরচ ও সহজলভ্যতার কারণে আধুনিক যুদ্ধের ধারাকে আমূল বদলে দিয়েছে। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পর্যন্ত– ড্রোনকেন্দ্রিক যুদ্ধই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস)-এর একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে ইরান তার প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরে ৪ হাজারেরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এর খুব কম সংখ্যকই তাদের লক্ষ্যে আঘাত হেনেছে, তবে এই হামলাগুলো বিশ্বের জ্বালানি ও আর্থিক বাজারে উল্লেখযোগ্য অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।
গত কয়েক বছর ধরে সংঘাতের কারণে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত রক্ষা এবং আকাশসীমা সুরক্ষিত করায় জোর দিয়েছে ভারত। তেমনি ২০২৪ সাল থেকে পাকিস্তানও ভারত, আফগানিস্তান ও ইরানের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে।
এজন্যই ভারত ও পাকিস্তান নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এর মধ্যে অস্ত্রসহ ড্রোন যেমন আছে, তেমনই রয়েছে বিনা-অস্ত্রের ড্রোনও।
ভারতের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, সামরিক বাহিনী অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে গোটা দেশের জন্য ড্রোন-প্রতিরোধী নীতি প্রণয়নের কাজ করছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের ৩৩২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে ১৮১৬টি ড্রোন দেখা গেছে। ভারতের সীমান্তরক্ষা বাহিনী বিএসএফের মতে, পাকিস্তান থেকে ভারতে মাদক, অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহের জন্য ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছিল। পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও তা স্বীকার করা হয়েছে।
ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আগে আমরা শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার বা ক্ষেপণাস্ত্রের দিকে নজর রাখতাম। পাশাপাশি এখন আমাদের সব আকার ও আকৃতির এবং বিভিন্ন উচ্চতায় থাকা ড্রোনও শনাক্ত করতে হচ্ছে।
যদিও তাদের মতে খরচ একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, শত্রুর ছোঁড়া সস্তা ড্রোন ধ্বংস করার জন্য দামী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা যায় না। তাই খরচের কথা মাথায় রাখতে হয়।

ভারতের ড্রোন যাত্রা যেভাবে শুরু
ভারতের সশস্ত্র বাহিনীতে ইসরায়েল-নির্মিত একাধিক সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। সার্চার হলো ভারতের প্রথম ড্রোন, যা ১৯৯৯ সালে কেনা হয়েছিল।
প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল বেদ প্রকাশ মালিক ১৯৯৮ সালের মার্চ মাসে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের কাছে সার্চার ১-এর একটি প্রদর্শনী দেখেন। তিনি বলেন, সেটি ছিল এই ধরনের প্রথম প্রদর্শনী।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীতে প্রধানত নজরদারির জন্য হেরন এবং সার্চার এমকে-ওয়ান/টু ড্রোন ব্যবহার করা হয়। মিশনের উপর নির্ভর করে হেরন ৩৫ হাজার ফুট উচ্চতায় ৪৫ ঘণ্টা পর্যন্ত আকাশে থাকতে পারে।
তবে ভারত এখন শুধু দীর্ঘ সময় উড়তে পারবে এমন ড্রোনের পাশাপাশি আঘাত করার ক্ষমতা আরও বেশি হবে– এমন ড্রোনও চাইছে। ভারতের রয়েছে নিজস্ব ড্রোন ‘নাগাস্ত্র’। তবে হামলা চালানোর ‘লোইটারিং মিউনিশন’ বা কামিকাজি ড্রোনের জন্য ভারত এখনো মূলত আমদানির ওপরেই নির্ভরশীল। এগুলোতে বিস্ফোরক থাকে এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার পরে ফেটে যায়।
জানা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারত ৩৫০ কোটি ডলারের একটি চুক্তি করেছে, যার অধীনে ৩১টি এমকিউ-৯বি ‘হাই অল্টিটিউড লং এনডিউরেন্স’ বা ‘হেল’, অর্থাৎ অতি উচ্চতায় দীর্ঘ সময় ধরে উড়তে পারবে, এমন ড্রোন কিনবে। ২০২৯ সাল থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এগুলো সরবরাহ করা হবে।
ভারত ছোট আকারের কৌশলগত ড্রোন– যেমন নজরদারি চালানো ও সোয়ার্ম অপারেশনে ব্যবহৃত কোয়াডকপ্টার নির্মাণের ব্যপারে আত্মনির্ভর হওয়ার দিকে জোর দিচ্ছে।
সোয়ার্ম অপারেশন বলতে এমন সমন্বিত অভিযানকে বোঝায় যেখানে একগুচ্ছ ড্রোন বা রোবট বা যানবাহন, অথবা এর সবগুলোই একটি দল হিসেবে কাজ করে এবং একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে ব্যবহৃত হয়।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একটি ‘হিউম্যান-ইন-দ্য-লুপ’ সিস্টেম নিয়ে কাজ চলছে, যার সাহায্যে একজন অপারেটর একইসঙ্গে অনেকগুলো ড্রোন পরিচালনা করতে পারবে।

দ্রুত এগিয়েছে পাকিস্তান
পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে’ প্রচলিত বিমান হামলার পরিবর্তে ড্রোন-ভিত্তিক অভিযান ক্রমশ প্রাধান্য পাচ্ছে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে ভারত বিশ্বের পঞ্চম অবস্থানে ছিল, ওই বছর তারা প্রায় ৯২১০ কোটি ডলার ব্যয় করে এ খাতে। আর পাকিস্তান এ সময় ব্যয় করেছে প্রায় ১১৯০ কোটি ডলার।
সামরিক বাজেট কম হওয়া সত্ত্বেও, সশস্ত্র ড্রোন ক্রয়ের ক্ষেত্রে পাকিস্তান ভারতের চেয়ে দ্রুত এগিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এসআইপিআরআই-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পাকিস্তান ৩৫টি সশস্ত্র ড্রোন পেয়েছে যার মধ্যে তুরস্ক থেকে ৩টি আকিনজি সিস্টেম, চীন থেকে ২৩টি উইং লুং-২ সিস্টেম এবং তুরস্ক থেকেই ৯টি বায়রাক্তার টিবি-২ ড্রোন পেয়েছে তারা।
পাকিস্তান দেশীয়ভাবেও বেশ কিছু সিস্টেম তৈরি করার চেষ্টা করছে। শাহপার সিরিজ, বিশেষ করে শাহপার-থ্রি তাদের সবচেয়ে উন্নত দেশীয় ড্রোন, যেটি প্রায় ৩০ ঘণ্টা পর্যন্ত উড়তে পারে। পাকিস্তানের প্রথম ড্রোন ‘বর্রাক’ ২০১৫ সালে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযানে ব্যবহার করা হয়েছিল।
‘উকাব’ ড্রোন ব্যবহার করা হয় কৌশলগত কাজের জন্য, যেমন নজরদারি এবং অস্ত্র থেকে ছোঁড়া গোলা যেন সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছায়, এজন্য ব্যবহার করা হয়। এই ড্রোনগুলোর বেশিরভাগই পাকিস্তানে তৈরি করা হয়, তবে ইঞ্জিনের মতো কিছু যন্ত্রাংশ আমদানি করা হয়।
পাকিস্তান তুরস্ক ও চীন থেকেও উন্নত ড্রোন আমদানি করেছে, যেগুলো নজরদারি চালাতে, লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে এবং দীর্ঘ দূরত্বে উড়তে পারে। আইআইএসএস-এর তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান তুরস্কের তৈরি ‘ইহা’ কামিকাজি ড্রোন এবং ইতালির ‘মিডিয়াম ফ্যালকো’ ড্রোনও ব্যবহার করে।
সৈন্যের হাতে ঈগল
ভারত আর পাকিস্তান উভয় দেশের সেনাবাহিনীই ২০২৫ সালের সংঘাতকে একটি শিক্ষাক্ষেত্র হিসেবে দেখছে এবং উভয়েই নিজেদের প্রস্তুত করছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রতিটি সৈন্যের হাতে ‘ঈগল তুলে দেওয়ার’ লক্ষ্যে কাজ করছে, যাকে কর্মকর্তারা ‘প্রতিটি সৈন্যের হাতে ঈগল তুলে দেওয়া’ বলে বর্ণনা করছেন– অর্থাৎ সম্মুখসারির সৈন্যদের ড্রোন ওড়ানো, পরিচালনা করা এবং এর বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার শিক্ষা দেওয়া।
এ ছাড়াও প্রতিটি ব্যাটালিয়নে ড্রোন যুদ্ধ বিশেষজ্ঞকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইসলামাবাদ-ভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক সৈয়দ মুহাম্মদ আলী মতে, পাকিস্তান ড্রোন যুদ্ধকে ‘তাদের অভিযানিক পরিকল্পনা এবং প্রশিক্ষণের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ’ হিসেবে মনে করছে, যার মধ্যে উৎপাদন ও সংগ্রহ থেকে শুরু করে রক্ষণাবেক্ষণ, মোতায়েন এবং ড্রোন-বিরোধী ব্যবস্থা পর্যন্ত সবকিছু অন্তর্ভুক্ত।
কম ধ্বংসাত্মক উপায় নাকি বিপজ্জনক সূচনা
বিশ্লেষকরা সাবধান করছেন যে, ড্রোনকে কৌশলগত ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোই বদলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে এরকম একটি সরঞ্জাম হিসেবে দেখা উচিত হবে না।
এসআইপিআরআই-এর ‘আমর্স ট্র্যান্সফার প্রোগ্রাম’-এর পরিচালক ও জ্যেষ্ঠ গবেষক ম্যাথিউ জর্জ বলেন, নজরদারির জন্য ব্যবহার করা ড্রোন মানুষের কাজকে আরও সহজ করে। তবে, আমি মনে করি না ড্রোন ব্যবহার করা শান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে কোনো বাধা হয়ে উঠবে, যদি দুই পক্ষের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই প্রচেষ্টা চালান।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর ইন্টেলিজেন্স, ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড টেকনোলজি প্রোগ্রামের পরিচালক এমিলি হার্ডিং প্রশ্ন তুলেছেন, ভারত-পাকিস্তান দুটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ। ড্রোন কি উভয় পক্ষের জন্য একটি কম ধ্বংসাত্মক উপায়, নাকি এটি লড়াইকে আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সূচনা।
সূত্র: বিবিসি বাংলা

ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ কৌশল বদলে দিচ্ছে ড্রোন
সিটিজেন ডেস্ক
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৬, ১২: ৩৬

এক বছর আগে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সৃষ্ট সামরিক সংঘাত যুদ্ধকৌশলের একটি নতুন দিক খুলে দেয়। বলা যেতে পারে, সেটিই ছিল উপমহাদেশের দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী দেশের মধ্যে প্রথম ড্রোন যুদ্ধ।
২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ভারতশাসিত কাশ্মীরের পহেলগামে বন্দুকধারীদের গুলিতে ২৬ জন পর্যটক ও স্থানীয় একজন ব্যক্তি নিহত হন। ভারতের অভিযোগ, ‘পাকিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো’ই এ হামলার জন্য দায়ী। তবে পাকিস্তান এর দায় অস্বীকার করে। এরপরেই পাকিস্তানের কিছু স্থাপনায় সামরিক অভিযান চালায় ভারত। এর সাংকেতিক নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন সিন্দুর’। এসময় ‘ইহা’, ‘হারোপ’ এবং ‘সংগার’– দুই দেশই এই ধরনের ড্রোন ব্যবহার করে।
ড্রোন প্রযুক্তি উচ্চ গতি, কম খরচ ও সহজলভ্যতার কারণে আধুনিক যুদ্ধের ধারাকে আমূল বদলে দিয়েছে। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পর্যন্ত– ড্রোনকেন্দ্রিক যুদ্ধই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস)-এর একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে ইরান তার প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরে ৪ হাজারেরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এর খুব কম সংখ্যকই তাদের লক্ষ্যে আঘাত হেনেছে, তবে এই হামলাগুলো বিশ্বের জ্বালানি ও আর্থিক বাজারে উল্লেখযোগ্য অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।
গত কয়েক বছর ধরে সংঘাতের কারণে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত রক্ষা এবং আকাশসীমা সুরক্ষিত করায় জোর দিয়েছে ভারত। তেমনি ২০২৪ সাল থেকে পাকিস্তানও ভারত, আফগানিস্তান ও ইরানের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে।
এজন্যই ভারত ও পাকিস্তান নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এর মধ্যে অস্ত্রসহ ড্রোন যেমন আছে, তেমনই রয়েছে বিনা-অস্ত্রের ড্রোনও।
ভারতের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, সামরিক বাহিনী অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে গোটা দেশের জন্য ড্রোন-প্রতিরোধী নীতি প্রণয়নের কাজ করছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের ৩৩২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে ১৮১৬টি ড্রোন দেখা গেছে। ভারতের সীমান্তরক্ষা বাহিনী বিএসএফের মতে, পাকিস্তান থেকে ভারতে মাদক, অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহের জন্য ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছিল। পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও তা স্বীকার করা হয়েছে।
ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আগে আমরা শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার বা ক্ষেপণাস্ত্রের দিকে নজর রাখতাম। পাশাপাশি এখন আমাদের সব আকার ও আকৃতির এবং বিভিন্ন উচ্চতায় থাকা ড্রোনও শনাক্ত করতে হচ্ছে।
যদিও তাদের মতে খরচ একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, শত্রুর ছোঁড়া সস্তা ড্রোন ধ্বংস করার জন্য দামী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা যায় না। তাই খরচের কথা মাথায় রাখতে হয়।

ভারতের ড্রোন যাত্রা যেভাবে শুরু
ভারতের সশস্ত্র বাহিনীতে ইসরায়েল-নির্মিত একাধিক সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। সার্চার হলো ভারতের প্রথম ড্রোন, যা ১৯৯৯ সালে কেনা হয়েছিল।
প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল বেদ প্রকাশ মালিক ১৯৯৮ সালের মার্চ মাসে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের কাছে সার্চার ১-এর একটি প্রদর্শনী দেখেন। তিনি বলেন, সেটি ছিল এই ধরনের প্রথম প্রদর্শনী।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীতে প্রধানত নজরদারির জন্য হেরন এবং সার্চার এমকে-ওয়ান/টু ড্রোন ব্যবহার করা হয়। মিশনের উপর নির্ভর করে হেরন ৩৫ হাজার ফুট উচ্চতায় ৪৫ ঘণ্টা পর্যন্ত আকাশে থাকতে পারে।
তবে ভারত এখন শুধু দীর্ঘ সময় উড়তে পারবে এমন ড্রোনের পাশাপাশি আঘাত করার ক্ষমতা আরও বেশি হবে– এমন ড্রোনও চাইছে। ভারতের রয়েছে নিজস্ব ড্রোন ‘নাগাস্ত্র’। তবে হামলা চালানোর ‘লোইটারিং মিউনিশন’ বা কামিকাজি ড্রোনের জন্য ভারত এখনো মূলত আমদানির ওপরেই নির্ভরশীল। এগুলোতে বিস্ফোরক থাকে এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার পরে ফেটে যায়।
জানা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারত ৩৫০ কোটি ডলারের একটি চুক্তি করেছে, যার অধীনে ৩১টি এমকিউ-৯বি ‘হাই অল্টিটিউড লং এনডিউরেন্স’ বা ‘হেল’, অর্থাৎ অতি উচ্চতায় দীর্ঘ সময় ধরে উড়তে পারবে, এমন ড্রোন কিনবে। ২০২৯ সাল থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এগুলো সরবরাহ করা হবে।
ভারত ছোট আকারের কৌশলগত ড্রোন– যেমন নজরদারি চালানো ও সোয়ার্ম অপারেশনে ব্যবহৃত কোয়াডকপ্টার নির্মাণের ব্যপারে আত্মনির্ভর হওয়ার দিকে জোর দিচ্ছে।
সোয়ার্ম অপারেশন বলতে এমন সমন্বিত অভিযানকে বোঝায় যেখানে একগুচ্ছ ড্রোন বা রোবট বা যানবাহন, অথবা এর সবগুলোই একটি দল হিসেবে কাজ করে এবং একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে ব্যবহৃত হয়।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একটি ‘হিউম্যান-ইন-দ্য-লুপ’ সিস্টেম নিয়ে কাজ চলছে, যার সাহায্যে একজন অপারেটর একইসঙ্গে অনেকগুলো ড্রোন পরিচালনা করতে পারবে।

দ্রুত এগিয়েছে পাকিস্তান
পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে’ প্রচলিত বিমান হামলার পরিবর্তে ড্রোন-ভিত্তিক অভিযান ক্রমশ প্রাধান্য পাচ্ছে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে ভারত বিশ্বের পঞ্চম অবস্থানে ছিল, ওই বছর তারা প্রায় ৯২১০ কোটি ডলার ব্যয় করে এ খাতে। আর পাকিস্তান এ সময় ব্যয় করেছে প্রায় ১১৯০ কোটি ডলার।
সামরিক বাজেট কম হওয়া সত্ত্বেও, সশস্ত্র ড্রোন ক্রয়ের ক্ষেত্রে পাকিস্তান ভারতের চেয়ে দ্রুত এগিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এসআইপিআরআই-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পাকিস্তান ৩৫টি সশস্ত্র ড্রোন পেয়েছে যার মধ্যে তুরস্ক থেকে ৩টি আকিনজি সিস্টেম, চীন থেকে ২৩টি উইং লুং-২ সিস্টেম এবং তুরস্ক থেকেই ৯টি বায়রাক্তার টিবি-২ ড্রোন পেয়েছে তারা।
পাকিস্তান দেশীয়ভাবেও বেশ কিছু সিস্টেম তৈরি করার চেষ্টা করছে। শাহপার সিরিজ, বিশেষ করে শাহপার-থ্রি তাদের সবচেয়ে উন্নত দেশীয় ড্রোন, যেটি প্রায় ৩০ ঘণ্টা পর্যন্ত উড়তে পারে। পাকিস্তানের প্রথম ড্রোন ‘বর্রাক’ ২০১৫ সালে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযানে ব্যবহার করা হয়েছিল।
‘উকাব’ ড্রোন ব্যবহার করা হয় কৌশলগত কাজের জন্য, যেমন নজরদারি এবং অস্ত্র থেকে ছোঁড়া গোলা যেন সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছায়, এজন্য ব্যবহার করা হয়। এই ড্রোনগুলোর বেশিরভাগই পাকিস্তানে তৈরি করা হয়, তবে ইঞ্জিনের মতো কিছু যন্ত্রাংশ আমদানি করা হয়।
পাকিস্তান তুরস্ক ও চীন থেকেও উন্নত ড্রোন আমদানি করেছে, যেগুলো নজরদারি চালাতে, লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে এবং দীর্ঘ দূরত্বে উড়তে পারে। আইআইএসএস-এর তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান তুরস্কের তৈরি ‘ইহা’ কামিকাজি ড্রোন এবং ইতালির ‘মিডিয়াম ফ্যালকো’ ড্রোনও ব্যবহার করে।
সৈন্যের হাতে ঈগল
ভারত আর পাকিস্তান উভয় দেশের সেনাবাহিনীই ২০২৫ সালের সংঘাতকে একটি শিক্ষাক্ষেত্র হিসেবে দেখছে এবং উভয়েই নিজেদের প্রস্তুত করছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রতিটি সৈন্যের হাতে ‘ঈগল তুলে দেওয়ার’ লক্ষ্যে কাজ করছে, যাকে কর্মকর্তারা ‘প্রতিটি সৈন্যের হাতে ঈগল তুলে দেওয়া’ বলে বর্ণনা করছেন– অর্থাৎ সম্মুখসারির সৈন্যদের ড্রোন ওড়ানো, পরিচালনা করা এবং এর বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার শিক্ষা দেওয়া।
এ ছাড়াও প্রতিটি ব্যাটালিয়নে ড্রোন যুদ্ধ বিশেষজ্ঞকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইসলামাবাদ-ভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক সৈয়দ মুহাম্মদ আলী মতে, পাকিস্তান ড্রোন যুদ্ধকে ‘তাদের অভিযানিক পরিকল্পনা এবং প্রশিক্ষণের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ’ হিসেবে মনে করছে, যার মধ্যে উৎপাদন ও সংগ্রহ থেকে শুরু করে রক্ষণাবেক্ষণ, মোতায়েন এবং ড্রোন-বিরোধী ব্যবস্থা পর্যন্ত সবকিছু অন্তর্ভুক্ত।
কম ধ্বংসাত্মক উপায় নাকি বিপজ্জনক সূচনা
বিশ্লেষকরা সাবধান করছেন যে, ড্রোনকে কৌশলগত ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোই বদলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে এরকম একটি সরঞ্জাম হিসেবে দেখা উচিত হবে না।
এসআইপিআরআই-এর ‘আমর্স ট্র্যান্সফার প্রোগ্রাম’-এর পরিচালক ও জ্যেষ্ঠ গবেষক ম্যাথিউ জর্জ বলেন, নজরদারির জন্য ব্যবহার করা ড্রোন মানুষের কাজকে আরও সহজ করে। তবে, আমি মনে করি না ড্রোন ব্যবহার করা শান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে কোনো বাধা হয়ে উঠবে, যদি দুই পক্ষের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই প্রচেষ্টা চালান।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর ইন্টেলিজেন্স, ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড টেকনোলজি প্রোগ্রামের পরিচালক এমিলি হার্ডিং প্রশ্ন তুলেছেন, ভারত-পাকিস্তান দুটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ। ড্রোন কি উভয় পক্ষের জন্য একটি কম ধ্বংসাত্মক উপায়, নাকি এটি লড়াইকে আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সূচনা।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
/এফসি/




