শিরোনাম

মানবদেহে শূকরের কিডনির সফল প্রতিস্থাপন, কাজ করলো রেকর্ড ২৭১ দিন

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
মানবদেহে শূকরের কিডনির সফল প্রতিস্থাপন, কাজ করলো রেকর্ড ২৭১ দিন
টিম অ্যান্ড্রুস অস্ত্রোপচারের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ছবি: বিবিসি

দীর্ঘদিন ডায়ালাইসিসের যন্ত্রণায় কাটানো একজন মানুষের কাছে বেঁচে থাকাটাই এক সংগ্রাম। সেই কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ৬৬ বছর বয়সী টিম অ্যান্ড্রুজ খুঁজে পেয়েছিলেন এক নতুন আশা। জেনেটিকভাবে রূপান্তরিত শূকরের কিডনি বসানোর পর তা তার শরীরে টানা ২৭১ দিন বা প্রায় ৯ মাস সচল ছিল। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা। যদিও শেষ পর্যন্ত কিডনিটি অকেজো হয়ে পড়ায় সরিয়ে নিতে হয়েছে, তবে এই সাফল্য বিশ্বের কোটি কোটি রোগীর সামনে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

টাইপ-২ ডায়াবেটিসের প্রভাবে ধীরে ধীরে অ্যান্ড্রুজের দুটি কিডনিই অকেজো হয়ে পড়ে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, কিডনি প্রতিস্থাপনের জাতীয় তালিকায় তার নাম যে পর্যায়ে আছে, সেখান থেকে মানবদাতার কিডনি পেতে অপেক্ষা করতে হতে পারে প্রায় ৭ বছর। ডায়ালাইসিসে থাকা রোগীদের গড় আয়ু সাধারণত পাঁচ বছর, সেখানে এই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করাটা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকি ও হতাশাজনক।

২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাস জেনারেল ব্রিগহাম হাসপাতালে সফলভাবে তার শরীরে বসানো হয় একটি বিশেষ জাতের শূকরের কিডনি। ভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর অঙ্গ মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপনের এ প্রযুক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘জেনোট্রান্সপ্লান্টেশন’ নামে পরিচিত। সাধারণ শূকরের কিডনি মানুষের শরীরে বসালে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা তাকে ক্ষতিকারক বস্তু ভেবে মুহূর্তেই নষ্ট করে ফেলে। এ বাধা কাটাতে বিজ্ঞানীরা ইউকাটান মিনিয়েচার জাতের শূকরের ডিএনএ-তে মোট ৬৯টি পরিবর্তন আনেন। শূকরের ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্যগুলো বাদ দিয়ে সেখানে যুক্ত করা হয় কিছু মানব জিন, যাতে মানুষের শরীরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সেটিকে সহজেই গ্রহণ করে নেয়।

মানবদেহে দানের উপযোগী করার জন্য কিডনিটি জিনগতভাবে পরিবর্তিত একটি শূকর থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। ছবি: বিবিসি
মানবদেহে দানের উপযোগী করার জন্য কিডনিটি জিনগতভাবে পরিবর্তিত একটি শূকর থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। ছবি: বিবিসি

প্রতিস্থাপনের পর মুহূর্ত থেকেই কিডনিটি অ্যান্ড্রুজের শরীরে স্বাভবিকভাবে কাজ শুরু করে। ফলে ২৭১ দিন তাকে হাসপাতালে গিয়ে দীর্ঘ সময় ডায়ালাইসিসের টেবিলে বন্দি থাকতে হয়নি। সে সময়ের কথা মনে করে অ্যান্ড্রুজ বলেন, ‘আমার হাতে সময় কিছুটা কম ছিল। বিষয়টি খুবই হতাশাজনক হয়ে উঠেছিল।’ এ বিকল্প চিকিৎসা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আশাই সবচেয়ে বড় বিষয়। ডায়ালাইসিসের যন্ত্র থেকে মুক্ত হয়ে নিজের জীবন নিজের মতো করে কাটানোর সুযোগ পাওয়াটাই সবচেয়ে বড় কথা।’

অবশ্য এই দীর্ঘ পথচলা একেবারে নিখুঁত ছিল না। অস্ত্রোপচারের কিছু দিন পরই অ্যান্ড্রুজের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা নতুন কিডনিটিকে প্রত্যাখ্যানের চেষ্টা করে, তবে চিকিৎসকেরা ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখেন। কিন্তু প্রায় ছয় মাস পর কিডনিটির রক্তনালীতে ক্ষত তৈরি হয় এবং প্রদাহের কারণে কার্যক্ষমতা কমতে থাকে। ফলে ওই বছরের অক্টোবরে সেটি শরীর থেকে বের করে নেওয়া হয়। তবে এই শূকরের কিডনিই তাকে মূল সংকট থেকে রক্ষা করেছিল। কিডনি অপসারণের পর অ্যান্ড্রুজকে মাত্র ৮২ দিন ডায়ালাইসিস করতে হয় এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি একজন মানবদাতার কিডনি পান।

চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে অঙ্গ সংকটের এক বাস্তব সমাধান তুলে ধরেছে। বর্তমানে কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই প্রায় ১ লাখ মানুষ কিডনি প্রতিস্থাপনের অপেক্ষায় আছেন, অথচ বছরে প্রতিস্থাপন হয় মাত্র ২৫ হাজারের মতো। যুক্তরাজ্যের চিত্রও একই রকম, সেখানে অপেক্ষায় আছেন ৭ হাজারের বেশি রোগী।

ম্যাস জেনারেল ব্রিগহামের ট্রান্সপ্লান্টেশন সায়েন্সেসের চিকিৎসক লিওনার্দো রিয়েলা বলেন, ‘আমরা একটি সংকটের মধ্যে রয়েছি। আমরা মানুষের মধ্যে আশার আলো দেখানোর জন্য কঠোর পরিশ্রম করছি। আমরা সত্যিই মনে করি, যেসব রোগীর জীবিত কোনো অঙ্গদাতা নেই, তাদের জন্য জেনোট্রান্সপ্লান্টেশন একটি বিকল্প হতে পারে। এর মাধ্যমে ডায়ালাইসিস এড়িয়ে সরাসরি প্রতিস্থাপনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।’

সূত্র: বিবিসি

/এমএকে/