শিরোনাম

৩ মাসেও নিয়ন্ত্রণে আসেনি হাম, বাড়ছে মৃত্যু

সিজেডএন  ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
৩ মাসেও নিয়ন্ত্রণে আসেনি হাম, বাড়ছে মৃত্যু
হাসপাতালের শয্যায় হামের চিকিৎসা নিচ্ছে একটি শিশু

দেশে শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার তিন মাস পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি সরকার। এ সময়ে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সরকারি হিসাবে, হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা ৮৫ হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৬৫২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

এত প্রাণহানির জন্য সরকারের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে সরকার।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে এত মৃত্যু হতো না। তার মতে, হাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পরও এটিকে মহামারি ঘোষণা করে স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা জারি না করা সরকারের বড় ভুল ছিল।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, প্রতি ৪ বছর পরপর এমআর টিকার বিশেষ কর্মসূচি চালানোর কথা থাকলেও ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর তা করা হয়নি। এর প্রভাব আমাদের ওপরে এসে পড়েছে।

তবে অব্যবস্থাপনার কারণে হামে মৃত্যু বেড়েছে– এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত। সেইসঙ্গে দাবি করেছেন, সরকার যথাসময়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে হামে তুলনামূলক কম শিশু মারা গেছে।

তিনি বলেন, আমরা রাষ্ট্র ক্ষমতার দায়িত্ব নেওয়ার ১৫ দিন পরেই হামের বিষয়টা শুরু হলো। আমরা যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নিতাম, তাহলে হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু হতো।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে– হামের রোগীতে ওয়ার্ডগুলো প্রায় পূর্ণ। চিকিৎসকেরা বলছেন, অনেক শিশু দেরিতে হাসপাতালে আসায় তাদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডা. মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ঢাকার বাইরে থেকে অনেক অভিভাবক আতঙ্ক নিয়ে শিশুদের এখানে নিয়ে আসছেন। অনেকের হামের পর নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হয়েছে। কিছু কিছু রোগী এর মধ্য থেকে খারাপ হয়ে যাচ্ছে। পরবর্তীতে তাদের অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় মারা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ থেকে প্রায় নির্মূল হয়ে যাওয়া হাম পুনরায় কীভাবে ফিরে এলো এবং এর জন্য দায়ী কারা, সেটি নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন মহলে নানান আলোচনা ও বিতর্ক হতে দেখা যাচ্ছে।

বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, চলমান হাম পরিস্থিতির জন্য বিগত আওয়ামী লীগ এবং অর্ন্তবর্তী সরকার দায়ী।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, প্রতি ৪ বছর পরপর এমআর টিকার বিশেষ কর্মসূচি চালানোর কথা থাকলেও ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর তা করা হয়নি। এর প্রভাব আমাদের ওপরে এসে পড়েছে।

হামের প্রাদুর্ভাবের জন্য আগের সরকারগুলোর ভূমিকা তদন্ত করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি পরিস্থিতি কীভাবে এ পর্যায়ে এলো, তা খতিয়ে দেখতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) একটি স্বাধীন তদন্তের অনুরোধও জানিয়েছে সরকার।

তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম ছড়িয়ে পড়ার পর তিন মাসেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারার দায় বর্তমান সরকার এড়াতে পারে না। বিশেষ করে জরুরি অবস্থা ঘোষণা না করা এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে।

৩ মাসেও নিয়ন্ত্রণে আসেনি হাম

ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, শুরুতেই মহামারি ঘোষণা করে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া হলে সংক্রমণ ও মৃত্যু– দুটিই কমানো যেত। তিনি মনে করেন, আইসিইউ সুবিধা বাড়ানো, চিকিৎসক-নার্সদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে পরিস্থিতি এতটা খারাপ হতো না।

তিনি আরও বলেন, হাম ঘিরে জরুরি অবস্থা ঘোষণা না করার সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনীতি থাকতে পারে। সেই অবস্থানটা এরকম যে, আমাদের সময় একটা হেলথ ইমার্জেন্সি বা একটা মহামারি ঘোষণা করা হয়েছে, এটা আমাদের ব্যর্থতা, আমাদের দুর্বলতা। কিন্তু আসলে এটা একটা ভুল ধারণা। কেননা এখন পর্যন্ত কেউই বলছে না যে, এই মহামারিটা হওয়ার দায় এই সরকারের। বলছে, এটা আগের সরকারের।

এদিকে সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, দেশজুড়ে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি করার চেষ্টা চলছে। দুই মাস আগে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির মাধ্যমে এখনো সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।

এর মধ্যে দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও বাড়তে শুরু করেছে। ফলে আগামী মাসগুলোতে হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

/এফসি/