পূর্তে ‘বীরদর্পে’ ফিরেছে প্যারাডাইম

পূর্তে ‘বীরদর্পে’ ফিরেছে প্যারাডাইম
সেলিনা আক্তার

একটা সময় সরকারি যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সাজসজ্জা কিংবা ভিআইপি অনুষ্ঠানের কাজে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো ‘প্যারাডাইম আর্কিটেক্টস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স’কে। গত দেড় যুগ ধরে এমন অঘোষিত সংস্কৃতি ছিলো সরকারের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদপ্তরে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিগত সময়ের সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত প্যারাডাইম সাময়িকভাবে হোঁচট খায়। কিন্তু এ সংকট কাটিয়ে ‘বীরদর্পে’ ফিরতে খুব বেশি সময় লাগেনি প্রতিষ্ঠানটির।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় অনেকটা হাঁকডাক দিয়ে প্যারাডাইমের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হলেও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সংক্রান্ত নথিপত্র বস্তাবন্দি অবস্থায় পূর্ত ভবনের প্রশাসন বিভাগে পড়ে আছে বলে জানা যায়। আর নিষ্ক্রিয়তা কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটিও গত দুই বছরে সচিবালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সেতু ভবন, মন্ত্রিপাড়া, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, এনবিআর ভবন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শত শত কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ বাগিয়ে নিয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন অনিয়ম ও অভিযোগ অডিট প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। একের পর এক সরকার পরিবর্তন হলেও কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অভ্যন্তরীণ আঁতাতের মাধ্যমে কাজ পেয়ে যাচ্ছে। এসব অভিযোগ যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
গণপূর্তের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ইতোপূর্তে সাবেক এক গণপূর্ত সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার ও স্থাপত্য অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসিরের আশীর্বাদ বন্ধ হলেও সেখানে নতুন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে দাড়িঁয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) ড. আবু নাসের চৌধুরী। ঢাকা সার্কেল-২ এর দায়িত্বে থাকা এ প্রকৌশলী বর্তমানে সার্কেল-১ এর অতিরিক্ত দায়িত্বও বাগিয়ে নিয়েছেন। ফলে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ দুটি সার্কেলের অধীনে থাকা সব কাজ প্রচলিত বাজার দর থেকে উচ্চমূল্যে প্যারাডাইমের ঝুড়িতে জমা পড়ছে।
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সাবেক গণপূর্ত সচিব মো. নজরুল ইসলাম প্যারাডাইমের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেন। তার চাহিদামত সব ডিভিশন থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। এরপর নথিপত্র সংগ্রহ করলেও তা পূর্ত ভবনের সংস্থাপন শাখায় বস্তাবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আবু নাসেরের এখতিয়ারধীন রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সার্কেল-২ এর আওতায় রয়েছে- গণপূর্ত ভবন, হাইকোর্ট, ইডেন গণপূর্ত বিভাগ (সচিবালয়), তেজগাঁও, বিটিভি, ওয়ারী, কেরানীগঞ্জ কারাগার এবং ঢাকার বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ। সরকারি ভবন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের বড় অংশই এই সার্কেলের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। সেখানে প্যারাডাইমের কাজই বেশি।
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৭১ পুরানা পল্টন ভবনে সিটিজেন সার্ভিস সেন্টার স্থাপনের জন্য ৩৮ লাখ টাকার সংস্কারকাজ পায় প্যারাডাইম। এরপর সচিবালয়ের ১ নম্বর ভবনের বিভিন্ন কক্ষ সংস্কারের ৬১ লাখ টাকার কাজ, একই ভবনের ১৪/ক নম্বর কক্ষ আধুনিকায়নের জন্য ১ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং ভিভিআইপি কনফারেন্স রুমসংলগ্ন নতুন টয়লেট নির্মাণ ও অন্যান্য সংস্কারকাজে ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার কার্যাদেশও যায় প্রতিষ্ঠানটির হাতে।
এছাড়া সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে ৫৫ লাখ টাকা, ৪ নম্বর ভবনে ৭৪ লাখ টাকা এবং ডে-কেয়ার সেন্টার সংস্কারে ৪৪ লাখ টাকার কাজও পেয়েছে তারা। একই সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আন্তর্জাতিক কনফারেন্স রুম নির্মাণ ও সংশ্লিষ্ট উন্নয়নকাজে ৫৬ লাখ টাকার কার্যাদেশ, বিসিএস প্রশাসন একাডেমির দেয়াল সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ৫৭ লাখ টাকার কাজ এবং সচিবালয়ের ১ নম্বর ভবনে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আইসিটি রুম, টয়লেট ও শেড নির্মাণসহ নানাবিধ উন্নয়ন ও সংস্কারকাজের ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার কার্যাদেশও পেয়েছে প্যারাডাইম।
শুধু সচিবালয়ই নয়, গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য সরকারি স্থাপনাতেও বিস্তৃত হয়েছে প্যারাডাইমের কার্যক্রম। শেরেবাংলা নগরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৪২ লাখ টাকার সংস্কারকাজ, আগারগাঁওয়ের এসএমআরসি ভবনের প্রায় ১৫ কোটি টাকার ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়া ও বিভিন্ন হলের নির্মাণ, পরিবর্তন ও সম্প্রসারণসংক্রান্ত দুটি প্রকল্পে মোট ৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
একই সময়ে বনানীতে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সেতু ভবন সংস্কার, রেট্রোফিটিং ও পুনর্নির্মাণসংক্রান্ত তিনটি পৃথক প্যাকেজে প্রায় ১১ কোটি টাকার কার্যাদেশও পায় প্যারাডাইম। পাশাপাশি এনবিআর ভবনের ৪৯ লাখ টাকার কাজও বাগিয়ে নেয় তারা।
স্বাস্থ্যখাতেও সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। পূর্ত অধিদপ্তরের ডেলিগেটেড কাজ হিসেবে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড হাসপাতালের ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকার গ্লাস কার্টেইন ওয়াল স্থাপন, ঢাকা মেডিকেল কলেজের শহীদ ডা. মিলন অডিটোরিয়ামের ১ কোটি ৯৮ লাখ টাকার সংস্কার এবং অডিটোরিয়াম চত্বরের রাস্তা মেরামতের ৩৭ লাখ টাকার কাজও পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে প্যারাডাইমের কার্যাদেশ বাড়ার সময়ই প্রশাসনিকভাবে আরও শক্তিশালী অবস্থানে চলে আসেন আবু নাসের চৌধুরী। গত ১৩ আগস্ট নারীঘটিত বিষয়সহ বিভিন্ন অভিযোগে সার্কেল-১ এর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলমকে সরিয়ে দেওয়া হলে সেই দায়িত্বও পান তিনি।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলগুলোর একটি ‘সার্কেল-১’। এর আওতায় রয়েছে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২, নগর গণপূর্ত বিভাগ এবং আরবরিকালচার বিভাগ। এই সার্কেলের অধীনেই রয়েছে বঙ্গভবন, মন্ত্রীপাড়া, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, জুলাই জাদুঘর (সাবেক গণভবন), ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন, রমনা পার্ক এলেনবাড়ি, জাজেস কমপ্লেক্স, মতিঝিল এবং কাকরাইল থানাসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা। ফলে বর্তমানে রাজধানীর সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিপুল অঙ্কের পরিচালন বাজেট তদারকির দায়িত্ব রয়েছে আবু নাসেরের হাতে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের পরিচালন ব্যয়ের বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, সার্কেল-২ এর আওতাধীন ইডেন ভবন গণপূর্ত বিভাগের জন্য ২৫ কোটি টাকা, মেডিকেল গণপূর্ত বিভাগ ঢাকার জন্য ১৫ কোটি টাকা, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ এর জন্য ১৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪ এর জন্য ২৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে সার্কেল-১ এর আওতাধীন নগর গণপূর্ত বিভাগের জন্য ৩০ কোটি টাকা, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১ এর জন্য ১১ কোটি ৭৫ লাখ, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২ এর জন্য ২৩ কোটি এবং আরবরিকালচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, এলেনবাড়ীতে বঙ্গবন্ধু কর্ণার করে আলোচনায় থাকা আবু নাসের সরকার পরিবর্তনের পর প্রভাব যেন আরও বেড়েছে। এ প্রকৌশলীর ছোঁয়ায় বড় পরিসরে কাজ পেতে শুরু করেছে প্যারাডাইম। একপর্যায়ে গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুরের সচিবালয়ের কার্যালয়ের সাজসজ্জার দায়িত্বও দেওয়া হয় প্যারাডাইমকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরী বলেন, ‘এসব বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করবো না।’
অন্যদিকে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্যারাডাইম আর্কিটেক্টস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফয়সাল মোহাম্মদ সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘সাবেক সচিব শহীদ উল্লা খন্দকারের সঙ্গে আমাদের ফার্মের কোনো সম্পর্ক নেই। আর সাবেক প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসির অবসরে যাওয়ার পর আমাদের ফার্মে শুধু পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন।’
প্যারাডাইমের বিষয়ে গঠিত তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কমিটি গঠন হয়েছে কি না তা আমরা জানি না। আমাদের কোনো চিঠি দেওয়া হয়নি।’
প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে সচিবালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাজ পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সচিবালয়ে কোনো কাজ করিনি। প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরীর সার্কেলের অধীনেও কোনো প্রকল্পে কাজ করিনি।’

একটা সময় সরকারি যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সাজসজ্জা কিংবা ভিআইপি অনুষ্ঠানের কাজে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো ‘প্যারাডাইম আর্কিটেক্টস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স’কে। গত দেড় যুগ ধরে এমন অঘোষিত সংস্কৃতি ছিলো সরকারের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদপ্তরে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিগত সময়ের সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত প্যারাডাইম সাময়িকভাবে হোঁচট খায়। কিন্তু এ সংকট কাটিয়ে ‘বীরদর্পে’ ফিরতে খুব বেশি সময় লাগেনি প্রতিষ্ঠানটির।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় অনেকটা হাঁকডাক দিয়ে প্যারাডাইমের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হলেও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সংক্রান্ত নথিপত্র বস্তাবন্দি অবস্থায় পূর্ত ভবনের প্রশাসন বিভাগে পড়ে আছে বলে জানা যায়। আর নিষ্ক্রিয়তা কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটিও গত দুই বছরে সচিবালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সেতু ভবন, মন্ত্রিপাড়া, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, এনবিআর ভবন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শত শত কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ বাগিয়ে নিয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন অনিয়ম ও অভিযোগ অডিট প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। একের পর এক সরকার পরিবর্তন হলেও কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অভ্যন্তরীণ আঁতাতের মাধ্যমে কাজ পেয়ে যাচ্ছে। এসব অভিযোগ যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
গণপূর্তের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ইতোপূর্তে সাবেক এক গণপূর্ত সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার ও স্থাপত্য অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসিরের আশীর্বাদ বন্ধ হলেও সেখানে নতুন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে দাড়িঁয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) ড. আবু নাসের চৌধুরী। ঢাকা সার্কেল-২ এর দায়িত্বে থাকা এ প্রকৌশলী বর্তমানে সার্কেল-১ এর অতিরিক্ত দায়িত্বও বাগিয়ে নিয়েছেন। ফলে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ দুটি সার্কেলের অধীনে থাকা সব কাজ প্রচলিত বাজার দর থেকে উচ্চমূল্যে প্যারাডাইমের ঝুড়িতে জমা পড়ছে।
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সাবেক গণপূর্ত সচিব মো. নজরুল ইসলাম প্যারাডাইমের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেন। তার চাহিদামত সব ডিভিশন থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। এরপর নথিপত্র সংগ্রহ করলেও তা পূর্ত ভবনের সংস্থাপন শাখায় বস্তাবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আবু নাসেরের এখতিয়ারধীন রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সার্কেল-২ এর আওতায় রয়েছে- গণপূর্ত ভবন, হাইকোর্ট, ইডেন গণপূর্ত বিভাগ (সচিবালয়), তেজগাঁও, বিটিভি, ওয়ারী, কেরানীগঞ্জ কারাগার এবং ঢাকার বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ। সরকারি ভবন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের বড় অংশই এই সার্কেলের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। সেখানে প্যারাডাইমের কাজই বেশি।
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৭১ পুরানা পল্টন ভবনে সিটিজেন সার্ভিস সেন্টার স্থাপনের জন্য ৩৮ লাখ টাকার সংস্কারকাজ পায় প্যারাডাইম। এরপর সচিবালয়ের ১ নম্বর ভবনের বিভিন্ন কক্ষ সংস্কারের ৬১ লাখ টাকার কাজ, একই ভবনের ১৪/ক নম্বর কক্ষ আধুনিকায়নের জন্য ১ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং ভিভিআইপি কনফারেন্স রুমসংলগ্ন নতুন টয়লেট নির্মাণ ও অন্যান্য সংস্কারকাজে ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার কার্যাদেশও যায় প্রতিষ্ঠানটির হাতে।
এছাড়া সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে ৫৫ লাখ টাকা, ৪ নম্বর ভবনে ৭৪ লাখ টাকা এবং ডে-কেয়ার সেন্টার সংস্কারে ৪৪ লাখ টাকার কাজও পেয়েছে তারা। একই সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আন্তর্জাতিক কনফারেন্স রুম নির্মাণ ও সংশ্লিষ্ট উন্নয়নকাজে ৫৬ লাখ টাকার কার্যাদেশ, বিসিএস প্রশাসন একাডেমির দেয়াল সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ৫৭ লাখ টাকার কাজ এবং সচিবালয়ের ১ নম্বর ভবনে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আইসিটি রুম, টয়লেট ও শেড নির্মাণসহ নানাবিধ উন্নয়ন ও সংস্কারকাজের ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার কার্যাদেশও পেয়েছে প্যারাডাইম।
শুধু সচিবালয়ই নয়, গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য সরকারি স্থাপনাতেও বিস্তৃত হয়েছে প্যারাডাইমের কার্যক্রম। শেরেবাংলা নগরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৪২ লাখ টাকার সংস্কারকাজ, আগারগাঁওয়ের এসএমআরসি ভবনের প্রায় ১৫ কোটি টাকার ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়া ও বিভিন্ন হলের নির্মাণ, পরিবর্তন ও সম্প্রসারণসংক্রান্ত দুটি প্রকল্পে মোট ৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
একই সময়ে বনানীতে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সেতু ভবন সংস্কার, রেট্রোফিটিং ও পুনর্নির্মাণসংক্রান্ত তিনটি পৃথক প্যাকেজে প্রায় ১১ কোটি টাকার কার্যাদেশও পায় প্যারাডাইম। পাশাপাশি এনবিআর ভবনের ৪৯ লাখ টাকার কাজও বাগিয়ে নেয় তারা।
স্বাস্থ্যখাতেও সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। পূর্ত অধিদপ্তরের ডেলিগেটেড কাজ হিসেবে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড হাসপাতালের ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকার গ্লাস কার্টেইন ওয়াল স্থাপন, ঢাকা মেডিকেল কলেজের শহীদ ডা. মিলন অডিটোরিয়ামের ১ কোটি ৯৮ লাখ টাকার সংস্কার এবং অডিটোরিয়াম চত্বরের রাস্তা মেরামতের ৩৭ লাখ টাকার কাজও পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে প্যারাডাইমের কার্যাদেশ বাড়ার সময়ই প্রশাসনিকভাবে আরও শক্তিশালী অবস্থানে চলে আসেন আবু নাসের চৌধুরী। গত ১৩ আগস্ট নারীঘটিত বিষয়সহ বিভিন্ন অভিযোগে সার্কেল-১ এর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলমকে সরিয়ে দেওয়া হলে সেই দায়িত্বও পান তিনি।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলগুলোর একটি ‘সার্কেল-১’। এর আওতায় রয়েছে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২, নগর গণপূর্ত বিভাগ এবং আরবরিকালচার বিভাগ। এই সার্কেলের অধীনেই রয়েছে বঙ্গভবন, মন্ত্রীপাড়া, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, জুলাই জাদুঘর (সাবেক গণভবন), ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন, রমনা পার্ক এলেনবাড়ি, জাজেস কমপ্লেক্স, মতিঝিল এবং কাকরাইল থানাসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা। ফলে বর্তমানে রাজধানীর সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিপুল অঙ্কের পরিচালন বাজেট তদারকির দায়িত্ব রয়েছে আবু নাসেরের হাতে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের পরিচালন ব্যয়ের বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, সার্কেল-২ এর আওতাধীন ইডেন ভবন গণপূর্ত বিভাগের জন্য ২৫ কোটি টাকা, মেডিকেল গণপূর্ত বিভাগ ঢাকার জন্য ১৫ কোটি টাকা, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ এর জন্য ১৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪ এর জন্য ২৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে সার্কেল-১ এর আওতাধীন নগর গণপূর্ত বিভাগের জন্য ৩০ কোটি টাকা, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১ এর জন্য ১১ কোটি ৭৫ লাখ, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২ এর জন্য ২৩ কোটি এবং আরবরিকালচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, এলেনবাড়ীতে বঙ্গবন্ধু কর্ণার করে আলোচনায় থাকা আবু নাসের সরকার পরিবর্তনের পর প্রভাব যেন আরও বেড়েছে। এ প্রকৌশলীর ছোঁয়ায় বড় পরিসরে কাজ পেতে শুরু করেছে প্যারাডাইম। একপর্যায়ে গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুরের সচিবালয়ের কার্যালয়ের সাজসজ্জার দায়িত্বও দেওয়া হয় প্যারাডাইমকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরী বলেন, ‘এসব বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করবো না।’
অন্যদিকে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্যারাডাইম আর্কিটেক্টস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফয়সাল মোহাম্মদ সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘সাবেক সচিব শহীদ উল্লা খন্দকারের সঙ্গে আমাদের ফার্মের কোনো সম্পর্ক নেই। আর সাবেক প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসির অবসরে যাওয়ার পর আমাদের ফার্মে শুধু পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন।’
প্যারাডাইমের বিষয়ে গঠিত তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কমিটি গঠন হয়েছে কি না তা আমরা জানি না। আমাদের কোনো চিঠি দেওয়া হয়নি।’
প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে সচিবালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাজ পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সচিবালয়ে কোনো কাজ করিনি। প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরীর সার্কেলের অধীনেও কোনো প্রকল্পে কাজ করিনি।’

পূর্তে ‘বীরদর্পে’ ফিরেছে প্যারাডাইম
সেলিনা আক্তার

একটা সময় সরকারি যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সাজসজ্জা কিংবা ভিআইপি অনুষ্ঠানের কাজে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো ‘প্যারাডাইম আর্কিটেক্টস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স’কে। গত দেড় যুগ ধরে এমন অঘোষিত সংস্কৃতি ছিলো সরকারের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদপ্তরে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিগত সময়ের সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত প্যারাডাইম সাময়িকভাবে হোঁচট খায়। কিন্তু এ সংকট কাটিয়ে ‘বীরদর্পে’ ফিরতে খুব বেশি সময় লাগেনি প্রতিষ্ঠানটির।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় অনেকটা হাঁকডাক দিয়ে প্যারাডাইমের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হলেও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সংক্রান্ত নথিপত্র বস্তাবন্দি অবস্থায় পূর্ত ভবনের প্রশাসন বিভাগে পড়ে আছে বলে জানা যায়। আর নিষ্ক্রিয়তা কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটিও গত দুই বছরে সচিবালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সেতু ভবন, মন্ত্রিপাড়া, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, এনবিআর ভবন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শত শত কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ বাগিয়ে নিয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন অনিয়ম ও অভিযোগ অডিট প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। একের পর এক সরকার পরিবর্তন হলেও কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অভ্যন্তরীণ আঁতাতের মাধ্যমে কাজ পেয়ে যাচ্ছে। এসব অভিযোগ যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
গণপূর্তের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ইতোপূর্তে সাবেক এক গণপূর্ত সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার ও স্থাপত্য অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসিরের আশীর্বাদ বন্ধ হলেও সেখানে নতুন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে দাড়িঁয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) ড. আবু নাসের চৌধুরী। ঢাকা সার্কেল-২ এর দায়িত্বে থাকা এ প্রকৌশলী বর্তমানে সার্কেল-১ এর অতিরিক্ত দায়িত্বও বাগিয়ে নিয়েছেন। ফলে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ দুটি সার্কেলের অধীনে থাকা সব কাজ প্রচলিত বাজার দর থেকে উচ্চমূল্যে প্যারাডাইমের ঝুড়িতে জমা পড়ছে।
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সাবেক গণপূর্ত সচিব মো. নজরুল ইসলাম প্যারাডাইমের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেন। তার চাহিদামত সব ডিভিশন থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। এরপর নথিপত্র সংগ্রহ করলেও তা পূর্ত ভবনের সংস্থাপন শাখায় বস্তাবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আবু নাসেরের এখতিয়ারধীন রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সার্কেল-২ এর আওতায় রয়েছে- গণপূর্ত ভবন, হাইকোর্ট, ইডেন গণপূর্ত বিভাগ (সচিবালয়), তেজগাঁও, বিটিভি, ওয়ারী, কেরানীগঞ্জ কারাগার এবং ঢাকার বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ। সরকারি ভবন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের বড় অংশই এই সার্কেলের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। সেখানে প্যারাডাইমের কাজই বেশি।
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৭১ পুরানা পল্টন ভবনে সিটিজেন সার্ভিস সেন্টার স্থাপনের জন্য ৩৮ লাখ টাকার সংস্কারকাজ পায় প্যারাডাইম। এরপর সচিবালয়ের ১ নম্বর ভবনের বিভিন্ন কক্ষ সংস্কারের ৬১ লাখ টাকার কাজ, একই ভবনের ১৪/ক নম্বর কক্ষ আধুনিকায়নের জন্য ১ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং ভিভিআইপি কনফারেন্স রুমসংলগ্ন নতুন টয়লেট নির্মাণ ও অন্যান্য সংস্কারকাজে ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার কার্যাদেশও যায় প্রতিষ্ঠানটির হাতে।
এছাড়া সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে ৫৫ লাখ টাকা, ৪ নম্বর ভবনে ৭৪ লাখ টাকা এবং ডে-কেয়ার সেন্টার সংস্কারে ৪৪ লাখ টাকার কাজও পেয়েছে তারা। একই সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আন্তর্জাতিক কনফারেন্স রুম নির্মাণ ও সংশ্লিষ্ট উন্নয়নকাজে ৫৬ লাখ টাকার কার্যাদেশ, বিসিএস প্রশাসন একাডেমির দেয়াল সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ৫৭ লাখ টাকার কাজ এবং সচিবালয়ের ১ নম্বর ভবনে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আইসিটি রুম, টয়লেট ও শেড নির্মাণসহ নানাবিধ উন্নয়ন ও সংস্কারকাজের ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার কার্যাদেশও পেয়েছে প্যারাডাইম।
শুধু সচিবালয়ই নয়, গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য সরকারি স্থাপনাতেও বিস্তৃত হয়েছে প্যারাডাইমের কার্যক্রম। শেরেবাংলা নগরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৪২ লাখ টাকার সংস্কারকাজ, আগারগাঁওয়ের এসএমআরসি ভবনের প্রায় ১৫ কোটি টাকার ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়া ও বিভিন্ন হলের নির্মাণ, পরিবর্তন ও সম্প্রসারণসংক্রান্ত দুটি প্রকল্পে মোট ৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
একই সময়ে বনানীতে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সেতু ভবন সংস্কার, রেট্রোফিটিং ও পুনর্নির্মাণসংক্রান্ত তিনটি পৃথক প্যাকেজে প্রায় ১১ কোটি টাকার কার্যাদেশও পায় প্যারাডাইম। পাশাপাশি এনবিআর ভবনের ৪৯ লাখ টাকার কাজও বাগিয়ে নেয় তারা।
স্বাস্থ্যখাতেও সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। পূর্ত অধিদপ্তরের ডেলিগেটেড কাজ হিসেবে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড হাসপাতালের ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকার গ্লাস কার্টেইন ওয়াল স্থাপন, ঢাকা মেডিকেল কলেজের শহীদ ডা. মিলন অডিটোরিয়ামের ১ কোটি ৯৮ লাখ টাকার সংস্কার এবং অডিটোরিয়াম চত্বরের রাস্তা মেরামতের ৩৭ লাখ টাকার কাজও পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে প্যারাডাইমের কার্যাদেশ বাড়ার সময়ই প্রশাসনিকভাবে আরও শক্তিশালী অবস্থানে চলে আসেন আবু নাসের চৌধুরী। গত ১৩ আগস্ট নারীঘটিত বিষয়সহ বিভিন্ন অভিযোগে সার্কেল-১ এর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলমকে সরিয়ে দেওয়া হলে সেই দায়িত্বও পান তিনি।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলগুলোর একটি ‘সার্কেল-১’। এর আওতায় রয়েছে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২, নগর গণপূর্ত বিভাগ এবং আরবরিকালচার বিভাগ। এই সার্কেলের অধীনেই রয়েছে বঙ্গভবন, মন্ত্রীপাড়া, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, জুলাই জাদুঘর (সাবেক গণভবন), ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন, রমনা পার্ক এলেনবাড়ি, জাজেস কমপ্লেক্স, মতিঝিল এবং কাকরাইল থানাসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা। ফলে বর্তমানে রাজধানীর সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিপুল অঙ্কের পরিচালন বাজেট তদারকির দায়িত্ব রয়েছে আবু নাসেরের হাতে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের পরিচালন ব্যয়ের বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, সার্কেল-২ এর আওতাধীন ইডেন ভবন গণপূর্ত বিভাগের জন্য ২৫ কোটি টাকা, মেডিকেল গণপূর্ত বিভাগ ঢাকার জন্য ১৫ কোটি টাকা, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ এর জন্য ১৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪ এর জন্য ২৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে সার্কেল-১ এর আওতাধীন নগর গণপূর্ত বিভাগের জন্য ৩০ কোটি টাকা, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১ এর জন্য ১১ কোটি ৭৫ লাখ, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২ এর জন্য ২৩ কোটি এবং আরবরিকালচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, এলেনবাড়ীতে বঙ্গবন্ধু কর্ণার করে আলোচনায় থাকা আবু নাসের সরকার পরিবর্তনের পর প্রভাব যেন আরও বেড়েছে। এ প্রকৌশলীর ছোঁয়ায় বড় পরিসরে কাজ পেতে শুরু করেছে প্যারাডাইম। একপর্যায়ে গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুরের সচিবালয়ের কার্যালয়ের সাজসজ্জার দায়িত্বও দেওয়া হয় প্যারাডাইমকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরী বলেন, ‘এসব বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করবো না।’
অন্যদিকে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্যারাডাইম আর্কিটেক্টস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফয়সাল মোহাম্মদ সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘সাবেক সচিব শহীদ উল্লা খন্দকারের সঙ্গে আমাদের ফার্মের কোনো সম্পর্ক নেই। আর সাবেক প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসির অবসরে যাওয়ার পর আমাদের ফার্মে শুধু পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন।’
প্যারাডাইমের বিষয়ে গঠিত তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কমিটি গঠন হয়েছে কি না তা আমরা জানি না। আমাদের কোনো চিঠি দেওয়া হয়নি।’
প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে সচিবালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাজ পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সচিবালয়ে কোনো কাজ করিনি। প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরীর সার্কেলের অধীনেও কোনো প্রকল্পে কাজ করিনি।’

শেখ হাসিনার প্লটে সরকারি অর্থ ব্যয় করা প্রকৌশলীরা ফেঁসে যাচ্ছেন
মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী সচিবের ‘পিএস-এপিএসের’ গাড়ি বিলাস
নিজস্ব কারখানা অচল, ঠিকাদার-নির্ভর আসবাব কেনে গণপূর্ত
জুন আসে জুন যায় ‘মাসুদরা’ ঢাকায় থেকে যায়
কার স্বার্থে পূর্ত মন্ত্রণালয়ে নিষ্কণ্টক জমির তালিকা
ঝুঁকিপূর্ণ দেয়ালে জোড়াতালি দিয়ে ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকার বিল! 







