ভূমধ্যসাগরে অসহনীয় যন্ত্রণা আর মৃত্যুতেই শেষ ইউরোপযাত্রার স্বপ্ন

ভূমধ্যসাগরে অসহনীয় যন্ত্রণা আর মৃত্যুতেই শেষ ইউরোপযাত্রার স্বপ্ন
আয়নাল হোসেন

মুন্সিগঞ্জের সদর উপজেলার মধ্যমহাকালী গ্রামের সিদ্দিক হালদারের ছেলে তাজুল হোসেন সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সুন্দর জীবনের সেই স্বপ্ন পূরণে দুবাই হয়ে লিবিয়া যান তিনি। সেখানে আড়াই বছর থাকার পর ২০২৫ সালের ২ মার্চ দালালের মাধ্যমে সাগর পথে গ্রিসে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কপাল খারাপ তার। তিনি কোস্টগার্ডের হাতে আটক হন। পরে তাকে লিবিয়ার কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে তাকে নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন করা হয়।
ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে যাওয়ার সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে গিয়ে সম্প্রতি তাজুল হোসেন সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, লিবিয়া যাওয়ার পর কোম্পানির পক্ষ থেকে ঠিকমতো বেতন ও খাবার দেওয়া হতো না। পরে গ্রিসে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। গ্রিসে যাওয়ার পর আটক হয়ে ২২ দিন কারাগারে থাকেন। খবর পেয়ে জমি বিক্রি করে লিবিয়ায় থাকা আরেক প্রবাসী বাংলাদেশি শরীয়তপুরের আনোয়ার হোসেনের কাছে পাঁচ লাখ টাকা পাঠিয়ে তাকে কারাগার থেকে মুক্ত করা হয়। পরে তাকে লিবিয়া থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। এখন তিনি অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। ঘরে তার অসুস্থ মা, প্রতিবন্ধী বাবা ও বোন।
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার ফরিদপুর গ্রামের এনাম খানের ছেলে রফিকুল খানের কাহিনীও একই রকমের। ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে ২০২২ সালে চার লাখ ৫০ হাজার টাকায় দুবাই পাড়ি জমান। কিছুদিন পর দালাল শওকত আলীর সহায়তায় আট লাখ ৫০ হাজার টাকায় লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেন। লিবিয়া পৌছানোর পর এক দালাল তাকে স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেয়। সেখানে প্রায় এক বছর তাকে একটি কক্ষে আটক রাখা হয়। সেখান থেকে ছাড়াতে আরও ১১ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এ নিয়ে প্রায় ২৪ লাখ টাকা চলে যায়। এসব টাকা জোগাড় করতে গ্রামের জমিজমা বিক্রি, আত্মীয় ও ব্যাংক থেকে ঋণ করেন তিনি। বর্তমানে বাড়ি ফিরে বেকার হয়ে ঘরে বসে আছেন রফিকুল।
সম্প্রতি রফিকুলের মা হালিমা বেগম তার ছেলের ইউরোপ যেতে দালালদের প্রলোভনে পড়ে নিঃস্ব ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার এই ঘটনার কথা বলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশি-বিদেশি দালাল চক্র ভাগ্যবদলের স্বপ্নে বিভোর এমন তরুণদের প্রথম টার্গেট করছে। পরে তারা ইউরোপে পাঠোনোর নানা প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ সাগর পথে ছোট ছোট নৌকা অখবা নৌযানে তুলে দিচ্ছে। কিন্তু অনেকের আর ইউরোপের দেশ ইতালি কিংবা গ্রিসে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয় না। এদের মধ্যে অনেকের স্বপ্নই ভূমধ্যসাগরে ডুবে শেষ হয়ে যায়। আবার অনেকে কোস্টগার্ড অখবা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে কারাগারে আটক থাকেন। কেউ কেউ লিবিয়ায় দালালাদের হাতে বন্দি হয়ে অসহনীয় নির্যাতনের শিকার হন। আবার অনেককে লিবিয়ার দুষ্কৃতকারীরা অপহরণ করে বাংলাদেশি দালালদের মাধ্যমে ২৫-৩০ লাখ টাকা আদায় করে ছেড়ে দেয়। ফলে ভূমধ্যসাগরে তাদের সলিলসমাধি ঘটে অখবা জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরতে হয়।
ওই প্রতিবেদনে দালাল ও তাদের সহযোগীদের তালিকায় যারা আছেন তারা হলেন বারিধারার জাহান হাউজের মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান, সাভারের আশুলিয়ার ভাটিয়াকান্দি শিমুলিয়ার মো. খোকন, আশুলিয়ার বাইপাইলের মতিউর রহমান, বনানী চেয়ারম্যান বাড়ির নাসরিন বেগম, উত্তরা আশকোনার তৌহিদুল ইসলাম, কেরানীগঞ্জের খাড়াকান্দি গ্রামের শাহীন, বেলনা খাসকান্দির সেলিমা বেগম, শরীয়তপুরের জাজিরার আইয়ুব আলীর ছেলে কবির, মুন্সিগঞ্জ সদরের মধ্য মহাকালী গ্রামের সেরাজুল কাজীর ছেলে আল–আমিন, কিশোরগঞ্জের ভৈরবের কমলাপুর গ্রামের হৃদয়, জগন্নাথপুর গ্রামের কুদ্দুস মিয়ার ছেলে রাসেল, কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার পঞ্চবটি গ্রামের মাখন লাল এবং কুলিয়ারচরের ফরিদপুর গ্রামের রহমত আলী।
সম্প্রতি অপর একটি ঘটনায় আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইতালির উদ্ধারকারী সংস্থা ইমার্জেন্সি লাইফ সাপোর্টের জাহাজে প্রায় ৫০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে তোলা হয়। এদের মধ্যে সাগর পাড়ি দেওয়ার সময় খাবার ও পানির অভাবে সাতজনের মৃত্যু হয়।
মানবপাচার মামলার পরিস্থিতি
চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে মানবপাচার মামলার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি মাসেই মানবপাচার মামলার সংখ্যা বাড়ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক-৩ শাখা থেকে প্রকাশিত ২০২৬ সালের জানুয়ারি–মে মাস পর্যন্ত মানবপাচার বিষয়ক একটি প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে মানবপাচারের মামলার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই প্রতিবেদনে উল্লিখিত সময়ের প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মামলার তদন্ত, বিচারিক অবস্থা এবং আসামিদের পরিস্থিতির একটি সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারি মাসে থানায় মোট তদন্তাধীন মামলার সংখ্যা ছিল এক হাজার ৭৬৮, যা মে মাসে বেড়ে হয়েছে দুই হাজার ২২। অর্থাৎ পাঁচ মাসের ব্যবধানে তন্তনাধীন মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একই সঙ্গে বিচারাধীন মামলার সংখ্যাও জানুয়ারি মাসে তিন হাজার ৩১১টি থেকে বেড়ে মে মাসে তিন হাজার ২৯৩টি হয়েছে। মে মাসের তথ্য অনুযায়ী, মোট ঝুলে থাকা মামলার সংখ্যা চার হাজার ২১৮, যা আগের বছরের শুরুর তুলনায় বেশি।
জানুয়ারি মাসে সর্বোচ্চ ৬১টি মামলা নিষ্পত্তি হয়। তবে পরবর্তী মাসগুলোতে নিষ্পত্তির এই হার কমেছে। মে মাসে মাত্র ১৭টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। মামলা দায়েরের সংখ্যা বাড়লেও নিষ্পত্তির ধীরগতির কারণে ঝুলে থাকা মামলার সংখ্যা বাড়ছে। মানবপাচার মামলার সঙ্গে জড়িত আসামির সংখ্যাও বাড়ছে। জানুয়ারি মাসে মোট আসামির সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৪৭৯, মে মাসে তা বেড়ে হয় ৪৬ হাজার ৬৮১ জন। বছরের এই পাঁচ মাসে আসামির সংখ্যা বৃদ্ধির হার উদ্বেগজনক।
মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের বর্ণনায় উঠে এসেছে লোমহর্ষক নানা কাহিনী। অনেককে লিবিয়ার বেনগাজি বা অন্যান্য শহরের গোপন কক্ষে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন ও জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে লিবিয়ার পুলিশের হাতে আটক হয়ে ভুক্তভোগীদের দীর্ঘদিন কারাগারে কাটাতে হয়েছে। পরে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইএমও) এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
মানবপাচার প্রতিরোধের কাজে যুক্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, আইনজীবী ও কর্মীরা মনে করেন, মানবপাচার শুধু ব্যক্তিগত জীবনকেই ঝুঁকিতে ফেলছে তা নয়, বরং রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনীতিকেও হুমকিতে ফেলছে।
মানবপাচার ও অবৈধ পথে ইউরোপযাত্রা বন্ধে দেশে নাগরিক সমাজ দালালদের বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। এ ছাড়া জেলা পর্যায়ে ‘ভিজিলেন্স টাস্কফোর্স’ গঠনের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো, পাচারের শিকার ভুক্তভোগীরা যাতে সহজেই টাস্কফোর্সের সহায়তা পেতে পারে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
মানবপাচার প্রতিরোধ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ যীশু বড়ুয়া সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, মিয়ানমারের লোকজন এক সময়ে সাগর পথে বিভিন্ন দেশ পাড়ি জমিয়েছে। কিন্তু এখন বাংলাদেশের তরুণেরাও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে যাচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, শিল্প কারখানা কম হওয়া এবং অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ায় দেশের তরুণেরা বিপথে পরিচালিত হচ্ছে। আর এই সুযোগে দালালেরা তরুণদের টার্গেট করে অবৈধ পথে বিদেশ পাঠানোর নামে আটক রেখে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করছে। দেশে উন্নয়নের নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। তরুণেরা কাউকে অনুসরণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে এমন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না। ফলে ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে অনেকেই মরণ পথ বেছে নিচ্ছে।
মানবপাচার প্রতিরোধ ও দালালদের আইনের আওতায় আনার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক অনুবিভাগ) জিয়াউদ্দিন আহমেদ সিজেডএন টোয়ন্টিফোরকে বলেন, মানবপাচারের সঙ্গে জড়িতদের প্রায়ই আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। কিছুদিন আগেও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত ২৪ জনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তবে এই অপরাধ প্রতিরোধে লিবিয়া সরকারের তেমন কোনো সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। এখন যেসব দালালের তালিকা পাওয়া গেছে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

মুন্সিগঞ্জের সদর উপজেলার মধ্যমহাকালী গ্রামের সিদ্দিক হালদারের ছেলে তাজুল হোসেন সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সুন্দর জীবনের সেই স্বপ্ন পূরণে দুবাই হয়ে লিবিয়া যান তিনি। সেখানে আড়াই বছর থাকার পর ২০২৫ সালের ২ মার্চ দালালের মাধ্যমে সাগর পথে গ্রিসে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কপাল খারাপ তার। তিনি কোস্টগার্ডের হাতে আটক হন। পরে তাকে লিবিয়ার কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে তাকে নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন করা হয়।
ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে যাওয়ার সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে গিয়ে সম্প্রতি তাজুল হোসেন সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, লিবিয়া যাওয়ার পর কোম্পানির পক্ষ থেকে ঠিকমতো বেতন ও খাবার দেওয়া হতো না। পরে গ্রিসে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। গ্রিসে যাওয়ার পর আটক হয়ে ২২ দিন কারাগারে থাকেন। খবর পেয়ে জমি বিক্রি করে লিবিয়ায় থাকা আরেক প্রবাসী বাংলাদেশি শরীয়তপুরের আনোয়ার হোসেনের কাছে পাঁচ লাখ টাকা পাঠিয়ে তাকে কারাগার থেকে মুক্ত করা হয়। পরে তাকে লিবিয়া থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। এখন তিনি অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। ঘরে তার অসুস্থ মা, প্রতিবন্ধী বাবা ও বোন।
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার ফরিদপুর গ্রামের এনাম খানের ছেলে রফিকুল খানের কাহিনীও একই রকমের। ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে ২০২২ সালে চার লাখ ৫০ হাজার টাকায় দুবাই পাড়ি জমান। কিছুদিন পর দালাল শওকত আলীর সহায়তায় আট লাখ ৫০ হাজার টাকায় লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেন। লিবিয়া পৌছানোর পর এক দালাল তাকে স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেয়। সেখানে প্রায় এক বছর তাকে একটি কক্ষে আটক রাখা হয়। সেখান থেকে ছাড়াতে আরও ১১ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এ নিয়ে প্রায় ২৪ লাখ টাকা চলে যায়। এসব টাকা জোগাড় করতে গ্রামের জমিজমা বিক্রি, আত্মীয় ও ব্যাংক থেকে ঋণ করেন তিনি। বর্তমানে বাড়ি ফিরে বেকার হয়ে ঘরে বসে আছেন রফিকুল।
সম্প্রতি রফিকুলের মা হালিমা বেগম তার ছেলের ইউরোপ যেতে দালালদের প্রলোভনে পড়ে নিঃস্ব ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার এই ঘটনার কথা বলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশি-বিদেশি দালাল চক্র ভাগ্যবদলের স্বপ্নে বিভোর এমন তরুণদের প্রথম টার্গেট করছে। পরে তারা ইউরোপে পাঠোনোর নানা প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ সাগর পথে ছোট ছোট নৌকা অখবা নৌযানে তুলে দিচ্ছে। কিন্তু অনেকের আর ইউরোপের দেশ ইতালি কিংবা গ্রিসে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয় না। এদের মধ্যে অনেকের স্বপ্নই ভূমধ্যসাগরে ডুবে শেষ হয়ে যায়। আবার অনেকে কোস্টগার্ড অখবা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে কারাগারে আটক থাকেন। কেউ কেউ লিবিয়ায় দালালাদের হাতে বন্দি হয়ে অসহনীয় নির্যাতনের শিকার হন। আবার অনেককে লিবিয়ার দুষ্কৃতকারীরা অপহরণ করে বাংলাদেশি দালালদের মাধ্যমে ২৫-৩০ লাখ টাকা আদায় করে ছেড়ে দেয়। ফলে ভূমধ্যসাগরে তাদের সলিলসমাধি ঘটে অখবা জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরতে হয়।
ওই প্রতিবেদনে দালাল ও তাদের সহযোগীদের তালিকায় যারা আছেন তারা হলেন বারিধারার জাহান হাউজের মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান, সাভারের আশুলিয়ার ভাটিয়াকান্দি শিমুলিয়ার মো. খোকন, আশুলিয়ার বাইপাইলের মতিউর রহমান, বনানী চেয়ারম্যান বাড়ির নাসরিন বেগম, উত্তরা আশকোনার তৌহিদুল ইসলাম, কেরানীগঞ্জের খাড়াকান্দি গ্রামের শাহীন, বেলনা খাসকান্দির সেলিমা বেগম, শরীয়তপুরের জাজিরার আইয়ুব আলীর ছেলে কবির, মুন্সিগঞ্জ সদরের মধ্য মহাকালী গ্রামের সেরাজুল কাজীর ছেলে আল–আমিন, কিশোরগঞ্জের ভৈরবের কমলাপুর গ্রামের হৃদয়, জগন্নাথপুর গ্রামের কুদ্দুস মিয়ার ছেলে রাসেল, কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার পঞ্চবটি গ্রামের মাখন লাল এবং কুলিয়ারচরের ফরিদপুর গ্রামের রহমত আলী।
সম্প্রতি অপর একটি ঘটনায় আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইতালির উদ্ধারকারী সংস্থা ইমার্জেন্সি লাইফ সাপোর্টের জাহাজে প্রায় ৫০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে তোলা হয়। এদের মধ্যে সাগর পাড়ি দেওয়ার সময় খাবার ও পানির অভাবে সাতজনের মৃত্যু হয়।
মানবপাচার মামলার পরিস্থিতি
চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে মানবপাচার মামলার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি মাসেই মানবপাচার মামলার সংখ্যা বাড়ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক-৩ শাখা থেকে প্রকাশিত ২০২৬ সালের জানুয়ারি–মে মাস পর্যন্ত মানবপাচার বিষয়ক একটি প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে মানবপাচারের মামলার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই প্রতিবেদনে উল্লিখিত সময়ের প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মামলার তদন্ত, বিচারিক অবস্থা এবং আসামিদের পরিস্থিতির একটি সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারি মাসে থানায় মোট তদন্তাধীন মামলার সংখ্যা ছিল এক হাজার ৭৬৮, যা মে মাসে বেড়ে হয়েছে দুই হাজার ২২। অর্থাৎ পাঁচ মাসের ব্যবধানে তন্তনাধীন মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একই সঙ্গে বিচারাধীন মামলার সংখ্যাও জানুয়ারি মাসে তিন হাজার ৩১১টি থেকে বেড়ে মে মাসে তিন হাজার ২৯৩টি হয়েছে। মে মাসের তথ্য অনুযায়ী, মোট ঝুলে থাকা মামলার সংখ্যা চার হাজার ২১৮, যা আগের বছরের শুরুর তুলনায় বেশি।
জানুয়ারি মাসে সর্বোচ্চ ৬১টি মামলা নিষ্পত্তি হয়। তবে পরবর্তী মাসগুলোতে নিষ্পত্তির এই হার কমেছে। মে মাসে মাত্র ১৭টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। মামলা দায়েরের সংখ্যা বাড়লেও নিষ্পত্তির ধীরগতির কারণে ঝুলে থাকা মামলার সংখ্যা বাড়ছে। মানবপাচার মামলার সঙ্গে জড়িত আসামির সংখ্যাও বাড়ছে। জানুয়ারি মাসে মোট আসামির সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৪৭৯, মে মাসে তা বেড়ে হয় ৪৬ হাজার ৬৮১ জন। বছরের এই পাঁচ মাসে আসামির সংখ্যা বৃদ্ধির হার উদ্বেগজনক।
মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের বর্ণনায় উঠে এসেছে লোমহর্ষক নানা কাহিনী। অনেককে লিবিয়ার বেনগাজি বা অন্যান্য শহরের গোপন কক্ষে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন ও জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে লিবিয়ার পুলিশের হাতে আটক হয়ে ভুক্তভোগীদের দীর্ঘদিন কারাগারে কাটাতে হয়েছে। পরে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইএমও) এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
মানবপাচার প্রতিরোধের কাজে যুক্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, আইনজীবী ও কর্মীরা মনে করেন, মানবপাচার শুধু ব্যক্তিগত জীবনকেই ঝুঁকিতে ফেলছে তা নয়, বরং রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনীতিকেও হুমকিতে ফেলছে।
মানবপাচার ও অবৈধ পথে ইউরোপযাত্রা বন্ধে দেশে নাগরিক সমাজ দালালদের বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। এ ছাড়া জেলা পর্যায়ে ‘ভিজিলেন্স টাস্কফোর্স’ গঠনের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো, পাচারের শিকার ভুক্তভোগীরা যাতে সহজেই টাস্কফোর্সের সহায়তা পেতে পারে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
মানবপাচার প্রতিরোধ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ যীশু বড়ুয়া সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, মিয়ানমারের লোকজন এক সময়ে সাগর পথে বিভিন্ন দেশ পাড়ি জমিয়েছে। কিন্তু এখন বাংলাদেশের তরুণেরাও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে যাচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, শিল্প কারখানা কম হওয়া এবং অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ায় দেশের তরুণেরা বিপথে পরিচালিত হচ্ছে। আর এই সুযোগে দালালেরা তরুণদের টার্গেট করে অবৈধ পথে বিদেশ পাঠানোর নামে আটক রেখে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করছে। দেশে উন্নয়নের নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। তরুণেরা কাউকে অনুসরণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে এমন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না। ফলে ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে অনেকেই মরণ পথ বেছে নিচ্ছে।
মানবপাচার প্রতিরোধ ও দালালদের আইনের আওতায় আনার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক অনুবিভাগ) জিয়াউদ্দিন আহমেদ সিজেডএন টোয়ন্টিফোরকে বলেন, মানবপাচারের সঙ্গে জড়িতদের প্রায়ই আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। কিছুদিন আগেও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত ২৪ জনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তবে এই অপরাধ প্রতিরোধে লিবিয়া সরকারের তেমন কোনো সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। এখন যেসব দালালের তালিকা পাওয়া গেছে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

ভূমধ্যসাগরে অসহনীয় যন্ত্রণা আর মৃত্যুতেই শেষ ইউরোপযাত্রার স্বপ্ন
আয়নাল হোসেন

মুন্সিগঞ্জের সদর উপজেলার মধ্যমহাকালী গ্রামের সিদ্দিক হালদারের ছেলে তাজুল হোসেন সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সুন্দর জীবনের সেই স্বপ্ন পূরণে দুবাই হয়ে লিবিয়া যান তিনি। সেখানে আড়াই বছর থাকার পর ২০২৫ সালের ২ মার্চ দালালের মাধ্যমে সাগর পথে গ্রিসে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কপাল খারাপ তার। তিনি কোস্টগার্ডের হাতে আটক হন। পরে তাকে লিবিয়ার কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে তাকে নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন করা হয়।
ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে যাওয়ার সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে গিয়ে সম্প্রতি তাজুল হোসেন সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, লিবিয়া যাওয়ার পর কোম্পানির পক্ষ থেকে ঠিকমতো বেতন ও খাবার দেওয়া হতো না। পরে গ্রিসে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। গ্রিসে যাওয়ার পর আটক হয়ে ২২ দিন কারাগারে থাকেন। খবর পেয়ে জমি বিক্রি করে লিবিয়ায় থাকা আরেক প্রবাসী বাংলাদেশি শরীয়তপুরের আনোয়ার হোসেনের কাছে পাঁচ লাখ টাকা পাঠিয়ে তাকে কারাগার থেকে মুক্ত করা হয়। পরে তাকে লিবিয়া থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। এখন তিনি অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। ঘরে তার অসুস্থ মা, প্রতিবন্ধী বাবা ও বোন।
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার ফরিদপুর গ্রামের এনাম খানের ছেলে রফিকুল খানের কাহিনীও একই রকমের। ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে ২০২২ সালে চার লাখ ৫০ হাজার টাকায় দুবাই পাড়ি জমান। কিছুদিন পর দালাল শওকত আলীর সহায়তায় আট লাখ ৫০ হাজার টাকায় লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেন। লিবিয়া পৌছানোর পর এক দালাল তাকে স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেয়। সেখানে প্রায় এক বছর তাকে একটি কক্ষে আটক রাখা হয়। সেখান থেকে ছাড়াতে আরও ১১ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এ নিয়ে প্রায় ২৪ লাখ টাকা চলে যায়। এসব টাকা জোগাড় করতে গ্রামের জমিজমা বিক্রি, আত্মীয় ও ব্যাংক থেকে ঋণ করেন তিনি। বর্তমানে বাড়ি ফিরে বেকার হয়ে ঘরে বসে আছেন রফিকুল।
সম্প্রতি রফিকুলের মা হালিমা বেগম তার ছেলের ইউরোপ যেতে দালালদের প্রলোভনে পড়ে নিঃস্ব ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার এই ঘটনার কথা বলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশি-বিদেশি দালাল চক্র ভাগ্যবদলের স্বপ্নে বিভোর এমন তরুণদের প্রথম টার্গেট করছে। পরে তারা ইউরোপে পাঠোনোর নানা প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ সাগর পথে ছোট ছোট নৌকা অখবা নৌযানে তুলে দিচ্ছে। কিন্তু অনেকের আর ইউরোপের দেশ ইতালি কিংবা গ্রিসে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয় না। এদের মধ্যে অনেকের স্বপ্নই ভূমধ্যসাগরে ডুবে শেষ হয়ে যায়। আবার অনেকে কোস্টগার্ড অখবা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে কারাগারে আটক থাকেন। কেউ কেউ লিবিয়ায় দালালাদের হাতে বন্দি হয়ে অসহনীয় নির্যাতনের শিকার হন। আবার অনেককে লিবিয়ার দুষ্কৃতকারীরা অপহরণ করে বাংলাদেশি দালালদের মাধ্যমে ২৫-৩০ লাখ টাকা আদায় করে ছেড়ে দেয়। ফলে ভূমধ্যসাগরে তাদের সলিলসমাধি ঘটে অখবা জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরতে হয়।
ওই প্রতিবেদনে দালাল ও তাদের সহযোগীদের তালিকায় যারা আছেন তারা হলেন বারিধারার জাহান হাউজের মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান, সাভারের আশুলিয়ার ভাটিয়াকান্দি শিমুলিয়ার মো. খোকন, আশুলিয়ার বাইপাইলের মতিউর রহমান, বনানী চেয়ারম্যান বাড়ির নাসরিন বেগম, উত্তরা আশকোনার তৌহিদুল ইসলাম, কেরানীগঞ্জের খাড়াকান্দি গ্রামের শাহীন, বেলনা খাসকান্দির সেলিমা বেগম, শরীয়তপুরের জাজিরার আইয়ুব আলীর ছেলে কবির, মুন্সিগঞ্জ সদরের মধ্য মহাকালী গ্রামের সেরাজুল কাজীর ছেলে আল–আমিন, কিশোরগঞ্জের ভৈরবের কমলাপুর গ্রামের হৃদয়, জগন্নাথপুর গ্রামের কুদ্দুস মিয়ার ছেলে রাসেল, কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার পঞ্চবটি গ্রামের মাখন লাল এবং কুলিয়ারচরের ফরিদপুর গ্রামের রহমত আলী।
সম্প্রতি অপর একটি ঘটনায় আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইতালির উদ্ধারকারী সংস্থা ইমার্জেন্সি লাইফ সাপোর্টের জাহাজে প্রায় ৫০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে তোলা হয়। এদের মধ্যে সাগর পাড়ি দেওয়ার সময় খাবার ও পানির অভাবে সাতজনের মৃত্যু হয়।
মানবপাচার মামলার পরিস্থিতি
চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে মানবপাচার মামলার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি মাসেই মানবপাচার মামলার সংখ্যা বাড়ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক-৩ শাখা থেকে প্রকাশিত ২০২৬ সালের জানুয়ারি–মে মাস পর্যন্ত মানবপাচার বিষয়ক একটি প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে মানবপাচারের মামলার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই প্রতিবেদনে উল্লিখিত সময়ের প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মামলার তদন্ত, বিচারিক অবস্থা এবং আসামিদের পরিস্থিতির একটি সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারি মাসে থানায় মোট তদন্তাধীন মামলার সংখ্যা ছিল এক হাজার ৭৬৮, যা মে মাসে বেড়ে হয়েছে দুই হাজার ২২। অর্থাৎ পাঁচ মাসের ব্যবধানে তন্তনাধীন মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একই সঙ্গে বিচারাধীন মামলার সংখ্যাও জানুয়ারি মাসে তিন হাজার ৩১১টি থেকে বেড়ে মে মাসে তিন হাজার ২৯৩টি হয়েছে। মে মাসের তথ্য অনুযায়ী, মোট ঝুলে থাকা মামলার সংখ্যা চার হাজার ২১৮, যা আগের বছরের শুরুর তুলনায় বেশি।
জানুয়ারি মাসে সর্বোচ্চ ৬১টি মামলা নিষ্পত্তি হয়। তবে পরবর্তী মাসগুলোতে নিষ্পত্তির এই হার কমেছে। মে মাসে মাত্র ১৭টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। মামলা দায়েরের সংখ্যা বাড়লেও নিষ্পত্তির ধীরগতির কারণে ঝুলে থাকা মামলার সংখ্যা বাড়ছে। মানবপাচার মামলার সঙ্গে জড়িত আসামির সংখ্যাও বাড়ছে। জানুয়ারি মাসে মোট আসামির সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৪৭৯, মে মাসে তা বেড়ে হয় ৪৬ হাজার ৬৮১ জন। বছরের এই পাঁচ মাসে আসামির সংখ্যা বৃদ্ধির হার উদ্বেগজনক।
মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের বর্ণনায় উঠে এসেছে লোমহর্ষক নানা কাহিনী। অনেককে লিবিয়ার বেনগাজি বা অন্যান্য শহরের গোপন কক্ষে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন ও জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে লিবিয়ার পুলিশের হাতে আটক হয়ে ভুক্তভোগীদের দীর্ঘদিন কারাগারে কাটাতে হয়েছে। পরে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইএমও) এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
মানবপাচার প্রতিরোধের কাজে যুক্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, আইনজীবী ও কর্মীরা মনে করেন, মানবপাচার শুধু ব্যক্তিগত জীবনকেই ঝুঁকিতে ফেলছে তা নয়, বরং রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনীতিকেও হুমকিতে ফেলছে।
মানবপাচার ও অবৈধ পথে ইউরোপযাত্রা বন্ধে দেশে নাগরিক সমাজ দালালদের বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। এ ছাড়া জেলা পর্যায়ে ‘ভিজিলেন্স টাস্কফোর্স’ গঠনের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো, পাচারের শিকার ভুক্তভোগীরা যাতে সহজেই টাস্কফোর্সের সহায়তা পেতে পারে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
মানবপাচার প্রতিরোধ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ যীশু বড়ুয়া সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, মিয়ানমারের লোকজন এক সময়ে সাগর পথে বিভিন্ন দেশ পাড়ি জমিয়েছে। কিন্তু এখন বাংলাদেশের তরুণেরাও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে যাচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, শিল্প কারখানা কম হওয়া এবং অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ায় দেশের তরুণেরা বিপথে পরিচালিত হচ্ছে। আর এই সুযোগে দালালেরা তরুণদের টার্গেট করে অবৈধ পথে বিদেশ পাঠানোর নামে আটক রেখে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করছে। দেশে উন্নয়নের নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। তরুণেরা কাউকে অনুসরণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে এমন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না। ফলে ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে অনেকেই মরণ পথ বেছে নিচ্ছে।
মানবপাচার প্রতিরোধ ও দালালদের আইনের আওতায় আনার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক অনুবিভাগ) জিয়াউদ্দিন আহমেদ সিজেডএন টোয়ন্টিফোরকে বলেন, মানবপাচারের সঙ্গে জড়িতদের প্রায়ই আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। কিছুদিন আগেও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত ২৪ জনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তবে এই অপরাধ প্রতিরোধে লিবিয়া সরকারের তেমন কোনো সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। এখন যেসব দালালের তালিকা পাওয়া গেছে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।








