শিরোনাম

যে লোডশেডিং অন্ধকারের সঙ্গে ফেলছে খাদ্য ঝুঁকিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
যে লোডশেডিং অন্ধকারের সঙ্গে ফেলছে খাদ্য ঝুঁকিতে
গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

দেশে চলছে ভয়াবহ লোডশেডিং। এই সমস্যাকে এখন পর্যন্ত মূলত নাগরিক দুর্ভোগ, শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়া কিংবা বিদ্যুতের সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু এর আরেকটি উদ্বেগের বিষয় রয়েছে। আর সেই বিষয়টি কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কারণ আধুনিক কৃষি এখন আর শুধু জমি, পানি ও কৃষকের শ্রমের ওপর নির্ভরশীল নয়। সেচপাম্প, পোলট্রি ফার্মের ভেন্টিলেশন, হ্যাচারি, মাছ উৎপাদনের এয়ারেটর, দুধ ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা, হিমাগার, ফিড মিল, ধান-চাল প্রক্রিয়াজাতকরণসহ খাদ্য উৎপাদনের প্রায় প্রতিটি স্তরই কোনো না কোনোভাবে নির্ভর করছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর।

এই কারণেই দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংকে শুধু ‘বিদ্যুৎ না থাকার সমস্যা’ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত অর্থনৈতিক এবং খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ধরা পড়বে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এর প্রভাব কৃষি খাতের ঠিক কোন কোন পর্যায়ে গিয়ে পড়বে।

খাদ্য নিরাপত্তার নানাক্ষেত্রে ঝুঁকি

আসলে লোডশেডিং জনদুর্ভোগ, শিল্পকারখানায় উৎপাদন হ্রাসসহ খাদ্য নিরপত্তার বেশকিছু ক্ষেত্রে তীব্র ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

সেচের ৩২ শতাংশ নলকূপ বিদ্যুৎনির্ভর

বর্তমানে ফসল উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানিনির্ভর পদ্ধতিগুলোর একটি সেচ। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সেচ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ওই অর্থবছরে প্রায় ৫৭.৬৯ লাখ হেক্টর জমি সেচের আওতায় ছিল। এর মধ্যে প্রায় ৭২.০৭ শতাংশ জমিতে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা হয়েছে। রবি মৌসুমে সেচ দেওয়া হয়েছে প্রায় ৯৫ শতাংশ জমিতে। ভূগর্ভস্থ পানি তুলতে যে পাম্পগুলো ব্যবহৃত হয়, সেগুলোর অধিকাংশই বিদ্যুৎ বা ডিজেলচালিত।
অর্থাৎ জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশে সব সেচ পাম্প বিদ্যুৎচালিত নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কৃষি পরিসংখ্যান-ভিত্তিক সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের ১৪ লাখের বেশি অগভীর নলকূপের মধ্যে প্রায় ৯ লাখ ৫১ হাজারটি ডিজেলচালিত, আর ৪ লাখ ৪৯ হাজারটি বিদ্যুৎচালিত। অর্থাৎ অগভীর নলকূপের ৩২ শতাংশের বেশি বিদ্যুৎনির্ভর।

তাই লোডশেডিং হলেই পুরো সেচব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাবে, এমনটা বলা ঠিক নয়। বরং সমস্যাটি হবে তিনভাবে। প্রথমত, বিদ্যুৎ না থাকায় নির্ধারিত সময়ে সেচ দেওয়া সম্ভব না হলে কৃষককে বিদ্যুৎ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এতে সেচের সময় পিছিয়ে যেতে পারে। দীর্ঘসময় এভাবে চললে ফসল চাষের প্রয়োজনীয় সময়ে পানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুতের পরিবর্তে ডিজেলে যেতে হলে সেচের খরচ বাড়বে।তৃতীয়ত, পানি তোলার সময়ের অনিশ্চয়তা তৈরি হলে, বিশেষ করে সেচনির্ভর এলাকায় ফসল বড় হওয়ার সময়ে পানি সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে।

উৎপাদন ও ব্যয়ে নেতিবাচক প্রভাব

উপমহাদেশে বিদ্যুৎবিভ্রাটের কারণে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার এই পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কিছু গবেষণাও হয়েছে। যেমন, ভারতের গুজরাটে লোডশেডিংয়ের কারণে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়া নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, কম ভোল্টেজ ও অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ নলকূপে পানির প্রবাহ কমায় এবং সেচ ব্যাহত করে। আর পাকিস্তানের ৯৫০টি খামারের ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং ফলন, কৃষকের আয় এবং খাদ্য নিরাপত্তা-এই তিনক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। গবেষণায় লোডশেডিংয়ের কারণে গম, ভুট্টা, চাল, আখ ও তুলাসহ সব ফসলের ওপর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়।

প্রভাব পড়তে পারে বোরোতে

আগামী বোরো মৌসুমকে সামনে রেখে বর্তমান লোডশেডিংয়ের প্রভাব বিশ্লেষণের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখন আগস্ট মাস, মূলত আমনের মৌসুম। আমন ধানের আবাদ অনেকাংশই বৃষ্টিনির্ভর। ফলে এই সময়ের লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সরাসরি বোরো ধানের ওপর পড়ছে না। কিন্তু বিদ্যুৎ সংকট যদি শরৎ, শীত এবং আগামী রবি মৌসুম পর্যন্ত চলে যায়, তখন পরিস্থিতি অনেক বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বাংলাদেশ বিষয়ক খাদ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বোরো ধান দেশের বার্ষিক ধান উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ জোগান দেয়। ২০২৫ সালের বোরো উৎপাদন আনুমানিক ৩১.৭ মিলিয়ন টন ছিল। অন্য গবেষণাতেও বোরোকে বাংলাদেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৫৫–৬০ শতাংশের উৎস হিসেবে দেখানো হয়েছে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলেই দেশের মোট ধানের প্রায় ৩৪ শতাংশ উৎপাদিত হয়। পাশাপাশি সেখানে গম, ভুট্টা, আলু ও ডালেরও বড় উৎপাদন রয়েছে। অর্থাৎ লোডশেডিং বর্তমান সময়ের সংকট হলেও এর সবচেয়ে বড় কৃষি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে কয়েক মাস পর যদি সেটি বোরো সেচের মৌসুমে গিয়েও অব্যাহত থাকে।

পোলট্রিশিল্পে উৎপাদন বিপর্যয়ের শঙ্কা

পোলট্রিশিল্পের উৎপাদন বহুলাংশেই বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে গরমের সময়ে মুরগির বড় খামারের শেডে ভেন্টিলেশন পাখা, কুলিং সিস্টেম, পানি সরবরাহ ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ সচল রাখতে বিদ্যুৎ প্রয়োজন।

বাংলাদেশে বার্ষিক ডিমের উৎপাদন প্রায় ২৪৪ কোটি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে বিদ্যুৎ না থাকলে কি ডিম কমে যাবে। এখানে বিষয়টি একটু সূক্ষ্ম। অনেক বাণিজ্যিক খামারে সাধারণত ১৬ ঘণ্টা আলো এবং ৮ ঘণ্টা অন্ধকারের সার্কেল ব্যবহৃত হয়, সেটাও সরাসরি বিঘ্নিত হবে। আর গরমের সময়ে আরও বড় সমস্যা হলো ভেন্টিলেশন। শুধু খামারে নয়, ঝুঁকি ডিম-মাংসের পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায়। পোলট্রি খাতের ঝুঁকি শুধু খামারের ভেন্টিলেশন শাখায় গিয়ে শেষ হয় না। কারণ এখানের মুরগি বা ডিমের দাম কম বেশি হয় সরাসরি পোলট্রি খাদ্যের দামের ওপর। তাই পোলট্রি ফিড উৎপাদনের কারখানায়ও নিরবিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রয়োজন।

মৎস্য খাতে সমস্যার আভাস

মৎস্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাতেও বিদ্যুতের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক মাছ চাষে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক রাখতে বৈদ্যুতিক এয়ারেটর যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে মাছ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, এমনকি মারাও যেতে পারে। তবে বিদ্যুৎ-সংকটের প্রভাব শুধু মাছের খামারেই সীমাবদ্ধ নয়।
মাছ ধরা, বাজারজাত করা এবং সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। বিশেষ করে মাছ সংরক্ষণের জন্য বরফ উৎপাদন এবং হিমাগার বা ঠান্ডা সংরক্ষণ ব্যবস্থা সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন।

খাদ্য সংরক্ষণেও নেতিবাচক প্রভাব

বিদ্যুৎ-সংকটের প্রভাব শুধু খাদ্য উৎপাদনের পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়। উৎপাদনের পর খাদ্য সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। দুধ, মাছ, মাংস ও ডিমের মতো পচনশীল খাদ্য নিরাপদে সংরক্ষণ করতে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখা জরুরি। বাংলাদেশের পচনশীল খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে ২০২৬ সালের গবেষণায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট, শীতল সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং পরিবহন ব্যবস্থার বিঘ্নকে পরস্পর সম্পর্কিত ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ফলে বিদ্যুৎ-সংকট দীর্ঘ হলে খাদ্য উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলেও পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় ক্ষতি হতে পারে। উৎপাদিত দুধ, মাছ, মাংস বা ডিমের একটি অংশ সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের আগেই নষ্ট হয়ে গেলে কার্যত বাজারে সরবরাহ কমে যাবে। ফলে একদিকে খাদ্য অপচয় বাড়বে, অন্যদিকে বাজারেও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

বাড়বে উৎপাদন খরচ

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা সরাসরি খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়া নয়। দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ে প্রথমে বাড়বে উৎপাদন ও সরবরাহের খরচ। গত জুলাই মাসে মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইতোমধ্যে কৃষি, পোলট্রি ও মৎস্য খাতে এমন প্রভাবের কথা উঠে এসেছে। সমস্যা হলো, এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত শুধু কৃষক বা খামারি পর্যায়ে আটকে থাকবে না, বাজারদরেও এর প্রভাব পড়বে। আর খরচ সামাল দিতে না পারা ছোট খামারি বা কৃষক উৎপাদন কমিয়ে দিলে ধীরে ধীরে সরবরাহেও ঘাটতি তৈরি হতে পারে। আর এসব কারণেই খাদ্য নিরাপত্তায় ভয়াবহ ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে।

/বিবি/