শিরোনাম

নকশা অনুমোদন পেতে গুণতে হয় বিসি কমিটির ‘অঘোষিত ফি’

নকশা অনুমোদন পেতে গুণতে হয় বিসি কমিটির ‘অঘোষিত ফি’
ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাভুক্ত জায়গায় যেকোনো স্থাপনা নির্মাণের জন্য সংস্থাটির অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এর জন্য রয়েছে নির্ধারিত বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন (বিসি) কমিটি। প্রচলিত ধারায় আবেদনকারী নির্ধারিত সরকারি ফি পরিশোধ করবেন, প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেবেন, এরপর যাচাই-বাছাই শেষে অনুমোদন পাবেন। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রক্রিয়া অনেকের কাছেই গল্পের মতো। এটি মূলত এক ধরনের ব্যয়বহুল ও বিড়ম্বনার যাত্রা। সরকারি ফির বাইরে বিসি কমিটির ‘অঘোষিত ফি’ নামে মোটা অঙ্কের অর্থ খরচ না করলে সহজে মেলে না নকশার অনুমোদন।

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমের অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজউকে নকশা অনুমোদনকে ঘিরে বছরের পর বছর ধরে অঘোষিত অর্থ লেনদেনের একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এই অর্থের কোনো সরকারি হিসাব নেই, কোনো রসিদও দেওয়া হয় না। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের দাবি, টাকা ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে ফাইল এগোয় না। নকশা অনুমোদনের কাজটি সেবা প্রার্থীর সঙ্গে সমন্বয় করে সংশ্লিষ্ট জোন পরিচালকের দপ্তরের সহকারী, অথরাইজড অফিসারের অফিস সহকারী এবং ইমারত পরিদর্শক। মূলত তারাই এই ঘুষের টাকা গ্রহণ করেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, একটি নকশার ফাইল কখন বিসি কমিটিতে উপস্থাপন করা হবে, সেই সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে সংশ্লিষ্ট অথরাইজড অফিসারের। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় ‘যোগাযোগ’ না থাকলে অনেক আবেদন দীর্ঘদিন অপেক্ষমাণ থাকে। অন্যদিকে প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী বা দালালের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলে একই ধরনের ফাইল দ্রুত কমিটিতে ওঠে এবং অনুমোদন প্রক্রিয়াও এগিয়ে যায়।

অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বেশ কয়েকজন বেসরকারি আবাসন ব্যবসায়ীদের কথা বলেছে সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকম। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, ১০ তলা ভবনের নকশা অনুমোদনের জন্য অনানুষ্ঠানিকভাবে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়। এর চেয়ে উঁচু ভবনের ক্ষেত্রে সেই অঙ্ক বেড়ে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকায় পৌঁছে যায়। আবার ৫ থেকে ৭ তলা ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রেও ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বড় প্রকল্প বা বিধিমালাগত জটিলতা থাকলে ব্যয় আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি জানান, শুধু বিসি কমিটির নামে অর্থ দিলেই কাজ শেষ হয় না। ফাইল বিভিন্ন টেবিল ও দপ্তর ঘুরে অনুমোদনের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। প্রতিটি ধাপেই অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। ফলে সরকারি ফি ও অঘোষিত অর্থ মিলিয়ে কোনো কোনো ভবনের নকশা অনুমোদনে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা ব্যয় হওয়া এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। কিছু ক্ষেত্রে এই অঙ্ক ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকাও ছাড়িয়ে যায়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, একটি নকশার ফাইল কখন বিসি কমিটিতে উপস্থাপন করা হবে, সেই সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে সংশ্লিষ্ট অথরাইজড অফিসারের। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় ‘যোগাযোগ’ না থাকলে অনেক আবেদন দীর্ঘদিন অপেক্ষমাণ থাকে। অন্যদিকে প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী বা দালালের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলে একই ধরনের ফাইল দ্রুত কমিটিতে ওঠে এবং অনুমোদন প্রক্রিয়াও এগিয়ে যায়।

বিসি কমিটির সব সদস্য এই অনিয়মের সাথে জড়িত, সেটা মানা যায় না। এখন টাকা দেওয়ার কোনো প্রয়োজনই নেই। সবকিছু এখন অনলাইনে হয়। কোনো অথরাইজড অফিসার যদি একদিনের বেশি কোনো ফাইল আটকিয়ে রাখে তাহলে তাকে শোকজ করা হয় ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম চেয়ারম্যান, রাজউক

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ৭ তলা পর্যন্ত ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে কমিটির বিভিন্ন স্তরে নির্দিষ্ট অঙ্কের অঘোষিত অর্থ লেনদেন চলে। অভিযোগ অনুযায়ী, কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী জোন পরিচালক ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা, সদস্য সচিব অথরাইজড অফিসার প্রায় ১৫ হাজার টাকা, প্রধান ইমারত পরিদর্শক ও ইমারত পরিদর্শক ১০ হাজার টাকা এবং সহকারী অথরাইজড অফিসার ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পান। প্লটসংক্রান্ত কোনো জটিলতা থাকলে অতিরিক্ত ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়।

তবে ৮ তলার বেশি ভবনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এ ধরনের ভবনের নকশা অনুমোদনে কমিটির সভাপতির জন্য ২ লাখ টাকা এবং সদস্যদের জন্য প্রায় ১ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়। সেটব্যাক, রাস্তার প্রস্থ কিংবা অন্যান্য বিধিমালাগত জটিলতা থাকলে সেই অঙ্ক ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকায় পৌঁছে যায়। গুলশান, বনানীর মতো অভিজাত এলাকায় বড় প্রকল্প হলে অঘোষিত অর্থের পরিমাণ কোটি টাকাও ছাড়িয়ে যায়।

অনুসন্ধানে কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও নীতিমালা উপেক্ষা করে নকশা অনুমোদনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, জোন-৭-এর অথরাইজড অফিসার মো. ইলিয়াস এবং জোন-৪-এর (গুলশান, বসুন্ধরা) অথরাইজড অফিসার মো. কায়সার পারভেজ একাধিক ক্ষেত্রে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করেই নকশা অনুমোদন দিয়েছেন। সাবেক অথরাইজড অফিসার ইমরুল ইসলামের নামও এই তালিকায় রয়েছে। দীর্ঘ সময় তিনি রাজউকের গুরুত্বপূর্ণ জোন-৩ ও জোন-৪-এর দায়িত্বে ছিলেন। তার দায়িত্বাধীন এলাকায় গুলশান, বনানী, বারিধারা, খিলক্ষেত, পূর্বাচল, বসুন্ধরা, মিরপুর, নিকুঞ্জ, ভাষানটেক ও পল্লবীর মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ছিল। অভিযোগ রয়েছে, এসব জোনে দায়িত্ব পালনকালে নকশা অনুমোদনসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অনিয়মের মাধ্যমে তিনি কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের নভেম্বরে তিনি হঠাৎ অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশে যাওয়ার আগে তিনি কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমতি নেননি। সরকারি পাসপোর্টের পাশাপাশি তার কাছে আরেকটি পাসপোর্ট ছিল, যেটি ব্যবহার করেই তিনি সহজে ইমিগ্রেশন পার হন। পরে তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. ছিদ্দিকুর রহমানকে টেলিফোনে জানান তিনি আর চাকরিতে ফিরবেন না। এ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে জ্বালানি খাতে প্রায় ১২ লাখ টাকার অডিট আপত্তিসহ বিভাগীয় মামলা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

জানা যায়, নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে সরাসরি অবৈধ অর্থ লেনদেনে রাজউক চেয়ারম্যান জড়িত না থাকলেও কমিটির চাবিকাঠি বা গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পদায়ন ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।

রাজউকের বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী ভবনের উচ্চতার ভিত্তিতে দুটি ধরনের বিসি কমিটি কাজ করে। ১ থেকে ৭ তলা পর্যন্ত ভবনের নকশা অনুমোদনের জন্য ৮টি জোনে মোট ২৪টি কমিটি রয়েছে। এসব কমিটির সভাপতি সংশ্লিষ্ট জোন পরিচালক। সদস্য হিসেবে থাকেন নির্বাহী প্রকৌশলী (বাস্তবায়ন), চেয়ারম্যান মনোনীত একজন উপস্থপতি এবং একজন উপপরিচালক। সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন সংশ্লিষ্ট অথরাইজড অফিসার।

অন্যদিকে ৮ তলার বেশি ভবনের জন্য আলাদা কমিটি রয়েছে। রাজউককে তিনটি অঞ্চলে ভাগ করে এসব কমিটি পরিচালনা করা হয়। কমিটিগুলোর নেতৃত্বে রয়েছেন রাজউকের বোর্ড সদস্যরা। সদস্য হিসেবে আছেন পরিচালক, তত্ত্বাবধায়ক, প্রকৌশলী, নগর পরিকল্পনাবিদ, উপস্থপতি এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধি। এখানেও সংশ্লিষ্ট অথরাইজড অফিসার সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের অথরাইজড অফিসার মো. ইলিয়াস বলেন, ‘এই অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভুয়া। লিখিত অভিযোগ থাকলে রাজউকে আসেন। আর কোনো কিছু জানতে চাইলে তথ্য কর্মকর্তা আছেন, তাকে জিজ্ঞাসা করুন।’

একই বিষয়ে জোন-৪ এর অথরাইজড অফিসার মো. কায়সার পারভেজ বলেন, ‘এখন ফাইল আটকিয়ে রাখার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, পুরো বিষয়টি এখন অনলাইনে হয়। একটা ফাইল যদি আমি আটকিয়ে রাখি, তাহলে আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সেটার মেসেজ চলে যায়। এর জন্য আমাকে জবাবদিহি করতে হয়।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘বিসি কমিটির সব সদস্য এই অনিয়মের সাথে জড়িত, সেটা মানা যায় না। এখন টাকা দেওয়ার কোনো প্রয়োজনই নেই। সবকিছু এখন অনলাইনে হয়। কোনো অথরাইজড অফিসার যদি একদিনের বেশি কোনো ফাইল আটকিয়ে রাখে তাহলে শোকজ করা হয়।’