শিরোনাম

দখল ও অব্যবস্থাপনায় ঝুঁকিতে তেজগাঁও সিএসডি

দখল ও অব্যবস্থাপনায় ঝুঁকিতে তেজগাঁও সিএসডি
তেজগাঁও কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষাণাগার (সিএসডি) প্রবেশ পথের পাশে ফুটপাত দখল করে রেস্তোরাঁ বসানো হয়েছে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় জমির দাম অনেক। এই এলাকারই ১৭ একর ৪৬ শতাংশ জমিতে দেশের অন্যতম কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষাণাগার/গুদাম (সিএসডি)। সে অনুযায়ী এই গুদাম এলাকায় সবসময় নিরাপত্তা জোরদার থাকার কথা। পাশাপাশি পরিবেশ সুন্দর ও সুশৃঙ্খল হওয়ার কথা। কিন্তু এখানে শৃঙ্খলা বলতে কিছুই নেই। উল্টো এই গুদামের অনেকগুলো কক্ষ দখলে নিয়ে ব্যবসা করছে স্থানীয় লোকজন। আবার এখানে বেশকিছু কক্ষ সংস্কারের অভাবে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এতে গুদামের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

গত ৩০ আগস্ট সরেজমিনে দেখা গেছে, তেজগাঁও সিএসডির চারপাশে অবৈধভাবে গড়ে ওঠেছে ট্রাক ও কার্ভাডভ্যানস্ট্যান্ড। এছাড়া গুদামের সীমানাপ্রাচীর ঘিরে অর্ধশত দোকান ও খুপড়ি ঘর তৈরি করা হয়েছে। এসব ঘরে চলছে হোটেল-রেস্তোরাঁ, গাড়ির যন্ত্রাংশের দোকান। কিছু ঘরে শ্রমিকেরা বসবাস করছেন। সিএসডির প্রবেশ পথের এক পাশে বসানো হয়েছে একটি রেস্তোরাঁ।

তেজগাঁও কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষাণাগারের (সিএসডি) একটি পরিত্যক্ত গুদাম। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
তেজগাঁও কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষাণাগারের (সিএসডি) একটি পরিত্যক্ত গুদাম। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

সিএসডির ভেতরে বটতলার পূর্বপাশে এক একরের চেয়েও বেশি জমি খালি পড়ে আছে। এ বিষয়ে কয়েকজন শ্রমিক জানান, এই খালি জমিতে দুটি গুদাম ছিল। সেগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে। এই জমি একটি বেসরকারি কোম্পানিকে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সিএসডি সূত্রে জানা গেছে, এখানের প্রতিটি গুদাম একতলা। কাগজে-কলমে মোট ৫১টি গুদাম থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে ১, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১, ১৮ ও ১৯ নম্বর—এই ৮টি গুদামের কোনো অস্তিত্বই নেই। বর্তমানে থাকা ৪৩টি গুদামের মধ্যে ২০, ৩৭ ও ৪০ নম্বর গুদাম সম্পূর্ণ ব্যবহারের অনুপযোগী। এর বাইরে ৩৮, ৪১, ৪৩, ৪৭, ৩২, ৩৩ ও ৩৪ নম্বরসহ ১১টি গুদাম অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সেগুলোতে খাদ্যশস্য রাখা হয়েছে।

জানা গেছে, সিএসডির ভেতরের এক একর জমি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়কে ‘ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার’ নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ১১২ কোটি ৬৮ লাখ ৯০ হাজার ৭৯১ টাকার এই জমি ২০২২ সালের ২২ মে ওই মন্ত্রণালয়কে প্রতীকী এক হাজার এক টাকা মূল্যে বরাদ্দ দেয় খাদ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু দীর্ঘদিনেও ব্যবহার না করায় ওই জমি খালি পড়ে আছে। এই অব্যবহৃত জমি খাদ্য অধিদপ্তর ফেরত চেয়েছে। বিষয়টি নিয়ে দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চিঠি চালাচালি চলছে। খাদ্য অধিদপ্তর ওই জমিতে এক হাজার টন ধারণ ক্ষমতার তিনটি গুদাম নির্মাণ করতে চায়। তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জমি ফেরত না দেওয়ায় সিএসডির অভ্যন্তরীণ সম্প্রসারণ ও নতুন গুদাম নির্মাণ ব্যাহত হচ্ছে।

সিএসডি সূত্রে জানা গেছে, ১৯৫৯ সালে তেজগাঁওয়ে এই কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষাণাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়। সিএসডির ধারণক্ষমতা ৩৫ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন। এখানে চাল, আটা ও গম মজুত করে রাখা হয়। নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম থেকে এখানে গম আসে। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে আসে চাল। এছাড়া চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও শেরপুরের বিভিন্ন মিল থেকে এখানে আটা সরবরাহ করা হয়।

সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ওএমএস (ওএমএস) কর্মসূচি, টিসিবি এবং বিভিন্ন দপ্তরের চাহিদা অনুযায়ী সিএসডি থেকে চাল, গম ও আটা সরবরাহ করা হয়। তবে সম্প্রতি তেজগাঁও সিএসডির থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ঐতিহাসিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটি প্রশাসনিক জটিলতা এবং নানা সমস্যায় জর্জরিত।

সম্প্রতি সিএসডির একটি প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির নানা সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, অব্যবস্থাপনা, অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জমির মালিকানা নিয়ে জটিলতা, জরাজীর্ণ গুদাম এবং জনবল ও অবকাঠামোগত সংকটে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় এড়াতে কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে অব্যবহৃত জমি পুনরুদ্ধার, ঝুঁকিপূর্ণ গুদাম মেরামত বা পুনর্নির্মাণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জনবল সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

তেজগাঁও কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষাণাগারের (সিএসডি) পূর্ব পাশের গেটে নিষিদ্ধ লিখে রাখার পরও একটি কাভার্ডভ্যান পার্কিং করা হয়েছে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
তেজগাঁও কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষাণাগারের (সিএসডি) পূর্ব পাশের গেটে নিষিদ্ধ লিখে রাখার পরও একটি কাভার্ডভ্যান পার্কিং করা হয়েছে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগে ১২টি নিষ্কাশন পথ দিয়ে সিএসডি এলাকার পানি বের হলেও বর্তমানে প্রায় সব পথ বন্ধ রয়েছে। কেবল বিজি প্রেস কোয়ার্টার এবং হলিডে ইন হোটেলের ড্রেনের ওপর পুরো সিএসডির পানি নিষ্কাশন নির্ভর করে। সামান্য বৃষ্টিতেই ড্রেনের মুখ ময়লায় বন্ধ হয়ে সিএসডির ভেতরে কোমর পানি জমে যায়। এতে গুদামে সংরক্ষিত খাদ্যশস্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। একইসঙ্গে জমে থাকা পানিতে ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়ার মতো মারাত্মক রোগ সৃষ্টিকারী এডিস মশার লার্ভা জন্ম নিচ্ছে। এতে সিএসডির কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকেরাও ঝুঁকিতে রয়েছে।

জনবল সংকটে কার্যক্রম ব্যাহত

সিএসডি পরিচালনায় অনুমোদিত পদ ১৩৬টি। এর মধ্যে ২৫টি পদ শূন্য রয়েছে। ব্যবস্থাপকের একটি পদ শূন্য থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে নিরাপত্তা প্রহরীর ৪৮টি পদ থাকলেও কর্মরত আছে ৩১ জন। বাকি ১১ জন অন্য দপ্তরে প্রেষণে আছেন। এছাড়া এখানে পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও ঝাড়ুদারের তীব্র সংকট রয়েছে।

বিগত বছরগুলোতে ১৯ জন খন্ডকালীন ঝাড়ুদার থাকলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে তা কমিয়ে মাত্র চারজনে নামিয়ে আনা হয়েছে।

জানা গেছে, সিএসডিতে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৫০০ মানুষের সমাগম হয়। এখানে দিনে হাজার হাজার টন খাদ্যশস্য ওঠানো ও নামানো হয়। কিন্তু এই বিশাল চত্বর মাত্র চারজন খন্ডকালীন ঝাড়ুদার দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা অসম্ভব। পাশাপাশি নিরাপত্তা প্রহরীদের বড় একটি অংশ অন্য দপ্তরে সংযুক্ত আছে। এতে এই গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য গুদামের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

ভেতরের রাস্তাগুলো বেহাল

সিএসডির ১ নম্বর ব্রিজস্কেল থেকে ৩৬ নম্বর গুদাম পর্যন্ত এবং ৩, ৪, ৫ ও ৬ নম্বর গুদামের সামনের রাস্তাগুলো দীর্ঘদিন ধরে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে। রাস্তাগুলোতে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে খাদ্যশস্যবাহী ট্রাক প্রায়ই বিকল হয়ে যায় এবং ঝাঁকুনিতে বস্তা ফেটে চাল বা গম নষ্ট হয়ে যায়।

তেজগাঁও কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষাণাগারের (সিএসডি) ভেতরে খাদ্যশস্য আনা ও নেওয়ার জন্য নির্মিত রেললাইন। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
তেজগাঁও কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষাণাগারের (সিএসডি) ভেতরে খাদ্যশস্য আনা ও নেওয়ার জন্য নির্মিত রেললাইন। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

খাদ্যশস্য আনা ও নেওয়ার জন্য সিএসডির ভেতরে রেললাইন রয়েছে। কিন্তু রেলওয়ে সাইডিং ডুয়েলগেজে (প্রধান লাইনের পাশাপাশি ট্রেন পার্কিং, মালামাল ওঠানো এবং নামানো বা ক্রসিংয়ের জন্য একটি অতিরিক্ত লাইন) রূপান্তরের পর গত ১০ মে ওয়াগন প্রবেশের সময় ৩ নম্বর লোহার গেটের পিলারের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। এতে গেটটি ভেঙে যায়। ফলে সিএসডি চত্বর বর্তমানে সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।

শ্রমিকদের মানবেতর জীবন

সিএসডিতে ৩৫০ জন শ্রমিক আছে। কিন্তু উচ্চমূল্যের বাজারে অনেক কম বেতন পাওয়ায় তারা পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। প্রতিটন খাদ্যশস্য লোড করতে শ্রমিকেরা পাচ্ছেন মাত্র ৬০ টাকা ৮০ পয়সা। এই অবস্থায় খাদ্য অধিদপ্তর শ্রমিকদের মজুরি বাড়িয়ে দ্বিগুণ করার প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাব এখনও কার্যকর হয়নি।

মজুরি না বাড়ানোর কারণে শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। শ্রমিকেরা দায়িত্ব শেষে কারওয়ানবাজার গিয়ে সবজি ও অন্যান্য মালামাল ওঠানামার কাজ করে কোনোমতে সংসার টিকিয়ে রাখছেন।

দবিরুল নামে একজন শ্রমিক বলেন, ৩৮ বছর ধরে তিনি সিএসডিতে পণ্য ওঠানো ও নামানোর কাজ করছেন। বর্তমানে যে টাকা আয় করেন তা দিয়ে সংসার চালানো দূরে থাক, নিজের চলতেও কষ্ট হচ্ছে। তাদের চাকরি স্থায়ীকরণ করা হলে অনেক সুবিধা হতো।

খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সিএসডির ১২টি গুদাম ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণ করা হবে। আটটি মেরামত করা হবে। গুদামের ভেতরে রাস্তা মেরামত করা হবে। গুদামের ভেতরে ড্রেনগুলোও সংস্কার করা হবে। সীমানাপ্রাচীরও নির্মাণ করা হবে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জসিম উদ্দিন খান সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে মুঠোফোনে বলেন, যেসব গুদাম অকেজা হয়ে পড়েছে সেগুলো মেরামত করা হবে। তবে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা আপাতত নেই। এছাড়া ২০২২ সালে যে এক একর জমি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়কে প্রতীকী মূল্যে দেওয়া হয়েছিল, সেটি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। সিএসডির অন্যান্য সমস্যাও দ্রুত সমাধান করা হবে।

/বিবি/