শিরোনাম
১০ বছরেও নিয়োগ হয়নি ১৩তম শিক্ষক নিবন্ধনের ৬৫ প্রার্থীর

‘আমরা আদালতের বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত ও নিঃস্ব’

‘আমরা আদালতের বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত ও নিঃস্ব’
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের ভবন।

২০১৬ সালে শিক্ষক নিবন্ধনের সনদ হাতে পেয়েছিলেন তারা। সামনে ছিল শিক্ষকতা পেশায় ঢুকে জাতি গঠনের স্বপ্ন। একটি সুন্দর জীবনের প্রত্যাশা। কিন্তু প্রায় ১০ বছরে তাদের সেই স্বপ্ন ও প্রত্যাশা- কোনোটিই পূরণ হয়নি। অন্যরা নিয়োগ পেলেও হয়রানি ও বঞ্চনার শিকার হয়েছেন এনটিআরসিএ’র ২০২১ সালের নোটিশে নাম থাকা ৬৫ প্রার্থী।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) আদালতের রায় বাস্তবায়নের বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখায় দীর্ঘদিনেও তারা নিয়োগ পাননি। তাদের মধ্যে অনেকই এখন আদালতের বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত ও নিঃস্ব হয়ে গেছেন।

ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে ও এনটিআরসিএ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত ১৩তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় ১৭ হাজার ২৫২ জন প্রার্থী উত্তীর্ণ হন। এদের মধ্যে নানা কারণে ২ হাজার ২০৭ জন নিয়োগ দেওয়া হয়নি। পরে তারা বিষয়টি নিয়ে আদালতের মামলা করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর বিষয়টি হাইকোর্ট থেকে আপিল বিভাগ পর্যন্ত গড়ায়। পরে উচ্চ আদালতের আদেশে রিট আবেদনকারীদের পক্ষে সিদ্ধান্ত আসে।

মামলা সূত্র ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় পর্যালোচনা করে জানা গেছে, একপর্যায়ে এ বিষয়ে এনটিআরসিএ রিভিউ আবেদন করলে আপিল বিভাগ রিভিউ মামলার চূড়ান্ত আদেশে রিট আবেদনকারীদের পূর্বে অর্জিত সুবিধা ও অধিকার অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টি স্পষ্ট করে। সাধারণ প্রার্থীদের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে গণবিজ্ঞপ্তির নিয়ম বহাল থাকলেও মূল ২ হাজার ২০৭ জন রিট আবেদনকারীর ক্ষেত্রে আদালতের মাধ্যমে অর্জিত সুবিধা ক্ষুণ্ন না করার বিষয়টি বলা হয়। আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের দায়িত্বও এনটিআরসিএ’র ওপর রয়েছে।

সিভিল আপিল নম্বর ৩৪৩/২০১৯-সহ সংশ্লিষ্ট মামলার ধারাবাহিকতায় ১৩তম নিবন্ধনের রিটকারী প্রার্থীদের নিয়োগের বিষয়টি আদালতের বিবেচনায় আসে। আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ২০২১ সালের তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তিতে ২ হাজার ২০৭টি পদ সংরক্ষণ করা হয়। এর আগে ২০২১ সালের ৩০ জুন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের স্মারক নম্বর ৩৭.০০.০০০০.০৭৩.০৪.০১২.১৭-৩০৬ মাধ্যমে ওই পদে নিয়োগের জন্য এনটিআরসিএকে সুপারিশ প্রদানের নির্দেশনা দেয়। ভুক্তভোগী প্রার্থীদের দাবি, আদালতের নির্দেশে সংরক্ষিত ২ হাজার ২০৭টি পদের নিয়োগ প্রক্রিয়ার আওতায় নিয়োগবঞ্চিত ওই ৬৫ জনও ছিলেন। অন্য প্রার্থীদের মতো তারাও অনলাইনে আবেদন করে পছন্দক্রম দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়নি। তখন শূন্য পদ না থাকার বিষয়টি এনটিআরসিএর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল বলে দাবি করেন ভুক্তভোগীরা।

২০২১ সালের ১৬ আগস্ট এনটিআরসিএর পরিচালক (উপসচিব) কাজী কামরুল আহছানের স্বাক্ষরে জারি করা এক নোটিশে ৬৫ প্রার্থীর রোল নম্বর উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়, পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট শূন্য পদগুলোর চাহিদা পাওয়া গেলে ওই প্রার্থীদের নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হবে। কিন্তু ওই নোটিশ জারির প্রায় পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও তালিকাভুক্ত ৬৫ জন নিয়োগ পাননি।

এ সময়ে শিক্ষক নিয়োগে আরও একাধিক গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে এনটিআরসিএ। তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তির পর চতুর্থ ও পঞ্চম গণবিজ্ঞপ্তিতেও বিপুলসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই ৬৫ জনকে আরও নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

মামলা ও আদালতের রায় পর্যালোচনা করে ভুক্তভোগীরা বলছেন, আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রিভিউ রায়ে মূল ২ হাজার ২০৭ জন রিট আবেদনকারীর পূর্বে অর্জিত সুবিধা ও অধিকার অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। ফলে তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে আর বিলম্বের কারণ থাকা উচিত নয় বলে মনে করেন তারা।

দীর্ঘ সময় ধরে বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে নিয়োগবঞ্চিত ওই ৬৫ প্রার্থী। কারণ ২০১৬ সালে নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সময় যারা শিক্ষকতায় প্রবেশের বয়সসীমার মধ্যে ছিলেন, তাদের অনেকেরই এখন সেই বয়স পেরিয়ে গেছে। ফলে নতুন করে গণবিজ্ঞপ্তিতে আবেদন করে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগও হারিয়েছেন অনেকে।

এই বিষয়ে মো. রবিউল ইসলাম নামে এক ভুক্তভোগী সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, একদিকে এনটিআরসিএ’র মামলার কারণে তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়েছে। অন্যদিকে আদালতের রায় তাদের পক্ষে আসার পরও বিভিন্ন জটিলতার কারণে নিয়োগ আটকে আছে। পরে এনটিআরসিএ তাদের নিবন্ধন সনদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার বিষয়টিও সামনে আনে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

রবিউল ইসলাম আরও বলেন, ‘আমরা আদালতের বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত ও নিঃস্ব। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে জয়ী হয়ে এবং তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তিতে পছন্দক্রম দিয়ে আবেদন করার পরও এনটিআরসিএ আমাদের নিয়োগের বিষয়ে সুপারিশ করেনি। তারা নিজেরাই নোটিশ দিয়ে সংশ্লিষ্ট শূন্য পদ পাওয়া গেলে আমাদের নিয়োগের জন্য সুপারিশ করার কথা জানিয়েছিল। এরপর চতুর্থ ও পঞ্চম গণবিজ্ঞপ্তিতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও আমাদের বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়নি।’

রবিউল ইসলামের অভিযোগ, প্রায় ১০ বছর ধরে আইনি লড়াই করতে গিয়ে তাদের সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সও শেষ হয়ে গেছে। এতে তারা চরম সংকটে পড়েছেন। এই অবস্থায় রবিউলসহ ৬৫ জন প্রার্থী আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী দ্রুত তাদের নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

আরেক রিটকারী জসীমউদ্দিন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমরা অপেক্ষা করছি। এর মধ্যে একের পর এক গণবিজ্ঞপ্তি হয়েছে, অন্যরা নিয়োগ পেয়েছেন। কিন্তু আমাদের বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়নি। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে বয়সসীমা পেরিয়ে যাওয়ায়। শিক্ষক হিসেবে জাতি গড়ার স্বপ্ন ক্রমশ ম্লান হয়ে যাচ্ছে। এখন আমরা আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী দ্রুত নিয়োগের সমাধান চাই।’

এদিকে আদালতের রায় বাস্তবায়ন না করার অভিযোগে এনটিআরসিএ’র বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলাও চলছে। ফলে ৬৫ প্রার্থীর নিয়োগের বিষয়টি এখন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বিচারিক প্রক্রিয়ারও অংশ হয়ে উঠেছে।

এবিষয়ে এনটিআরসিএর সচিব (উপসচিব) (অতিরিক্ত দায়িত্ব) তাসনিম জেবিন বিনতে শেখ সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘এনটিআরসিএ অদ্যাবধি কখনো মামলায় হারেনি। কারণ তারা আইনের বাইরে গিয়ে কিছুই করে না। এই বিষয়টি যেহেতু আদালতে চলমান আছে, তাই এখানে আমরা কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারি না। তবে আপনি যেহেতু এই বিষয়টি আবার মনে করিয়েছেন, আমি পরবর্তী মিটিংয়ে এই বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের অবগত করবো।’

এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বলেন, তাদের (৬৫ প্রার্থী) সঙ্গে অন্যায় করা হয়ে থাকলে কিংবা আদালতের রায় তাদের পক্ষে থাকলে অবশ্যই তাদের চাকরি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। তবে এর আগে জটিলতা কোথায়, তা ভালোভাবে যাচাই করতে হবে।

/বিবি/