শিরোনাম

মনিপুর স্কুলে ৬৬২ শিক্ষক অবৈধ

নিজস্ব  প্রতিবেদক
মনিপুর স্কুলে ৬৬২ শিক্ষক অবৈধ

তাহমিনা আহমেদ, রাজধানীর মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের মূল বালক শাখার (প্রভাতী) সহকারী শিক্ষক। তার নিয়োগ সংক্রান্ত নথিতে দেখা যায় ২০০৫ সালে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু তিনি শিক্ষক নিবন্ধন সনদ পেয়েছেন ২০০৮ সালে। বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী নিয়োগটি বৈধ নয়।

মোহাম্মদ জাকির হোসেন, তিনি মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের একই শাখার সহকারী শিক্ষক। ২০২৫ সালের অক্টোবরে স্কুলটিতে যোগ দেওয়া এই শিক্ষকের শিক্ষক নিবন্ধন নেই। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, নিয়োগ আবেদন, ডিজির প্রতিনিধির মনোনয়নপত্র, নিয়োগ পরীক্ষার টেবুলেশন শিটসহ তার নিয়োগ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় আরও অনেক নথিই স্কুলে নেই। ফলে জাকির হোসেনের নিয়োগও অবৈধ বলে বিবেচিত।

ড. মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন, তিনিও বিদ্যালয়টির মূল বালক (প্রভাতী) শাখার সহকারী শিক্ষক। তিনি কবে বিদ্যালয়টিতে যোগ দিয়েছেন, সেটাসহ কোনো কাগজপত্রই বিদ্যালয়টির অফিসে সংরক্ষিত নেই। তার নিয়োগটিও বৈধ হওয়ার কোনো কারণ নেই।

আশ্চর্যের ব্যাপার, এমন এক, দুই বা তিনজন নন। ২০১০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ১৪টি শিফটের মোট ৬৬২ জন শিক্ষকের নিয়োগই অবৈধ বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা শেষে গতকাল রবিবার (১৭ মে) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বিশদ প্রতিবেদন জমা দিয়েছে ৭ সদস্যের পরিদর্শক দল। অডিটে মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের আর্থিক অনিয়মের বিষয়ও বেরিয়ে এসেছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ৬টি ক্যাম্পাস রয়েছে। এসব ক্যাম্পাসের প্রভাতী এবং দিবা মিলিয়ে মোট ১৪টি শিফট। এর মধ্যে ৪টি শিফটের অনুমোদন থাকলেও বাকি ১০টি শিফট অনুমোদন ছাড়াই চালানো হচ্ছে।

২০১০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি যত শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে, এর একটির জন্যও পত্রিকায় কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেনি। এই নিয়োগগুলোর সময় নিয়ম অনুযায়ী ছিল না ডিজির কোনো প্রতিনিধিও। নিয়োগের জন্য কোনো লিখিত পরীক্ষাও নেওয়া হয়নি। গভর্নিং বডির ২১তম সভায় এসব শিক্ষকদের নিয়োগ অনুমোদন করা হয়েছে।

ডিআইএ জানিয়েছে, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০৫ (২০ মার্চ ২০০৫ তারিখ থেকে বলবৎ)-এর ধারা ১০ এর উপধারা ২ অনুযায়ী, ‘এর অধীন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত শিক্ষকদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত, নিবন্ধিত ও প্রত্যয়নকৃত না হইলে কোন ব্যক্তি কোন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগের জন্য যোগ্য বিবেচিত হইবেন না।’

বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন আইন ২০০৫ অনুযায়ী ২০০৫ সালের ২০ মার্চের পর বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক পদে আবেদন করার জন্য শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন সনদ থাকা বাধ্যতামূলক। এই সনদ কাম্য শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হবে। কিন্তু মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে ২০০৫ সালের ২০ মার্চের পর অনেক শিক্ষক প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত বেতনে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সাত সদস্যের পরিদর্শন দল ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর থেকে ১৬ অক্টোবর এবং ৫ নভেম্বর থেকে ৯ নভেম্বর দুই দফায় যখন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ পরিদর্শন করে, তখন ওইসব শিক্ষকদের শিক্ষক নিবন্ধন সনদ সরবরাহ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। পরিদর্শক দল তাই ধরে নিয়েছে, ওইসব শিক্ষকদের শিক্ষক নিবন্ধন সনদ নেই।

তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের মূল বালক (প্রভাতী) শাখায় ৬৭ শিক্ষকের নিয়োগ বিধি সম্মত হয়নি। এই ক্যাম্পাসের দিবা শাখায় ৬৫, মূল বালিকা (প্রভাতী) শাখায় ৭৫, দিবা শাখার ৬১, ব্রাঞ্চ-১ (প্রভাতী শাখা) ৬৩, ব্রাঞ্চ-১ (দিবা শাখা) ৬১, ব্রাঞ্চ-২ (প্রভাতী শাখা) ৩২, ব্রাঞ্চ-২ (দিবা শাখা) ৩০, ব্রাঞ্চ-৩ (প্রভাতী) শাখা ৫৬, ব্রাঞ্চ-৩ (দিবা শাখা) ৫৩, কলেজ (প্রভাতী শাখা) ২৪, কলেজ (দিবা শাখা) ২৬, কলেজ শাখা ইংলিশ ভার্সন (প্রভাতী শাখা) ২৫ ও কলেজ শাখা ইংলিশ ভার্সনের (দিবা শাখা) ২৪ জন শিক্ষকের নিয়োগ বিধি সম্মত হয়নি।

উল্লেখ্য ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার মনিপুর স্কুলের নানা বিষয় খতিয়ে দেখতে শুরু করে। বর্তমান নির্বাচিত সরকারও সেটার ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে।

/আরএ/জেএইচ/