মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে বাংলাদেশের জন্য অনুপ্রেরণা

মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে বাংলাদেশের জন্য অনুপ্রেরণা
ড. মোহাম্মদ রাশেদ হাসান পলাশ

শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বুকে অবস্থিত মালয়েশিয়া এই সত্যটি উপলব্ধি করেছিল বহু আগেই। স্বাধীনতার পর থেকে ধাপে ধাপে শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ ও সংস্কারের মধ্য দিয়ে দেশটি আজ এশিয়ার শীর্ষ উচ্চশিক্ষার গন্তব্যগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃত। বিশ্বের ১৬০টিরও বেশি দেশ থেকে লক্ষাধিক শিক্ষার্থী প্রতিবছর মালয়েশিয়ায় পড়তে আসেন। একজন বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ হিসেবে এই দেশে কাজ করতে করতে যখন মালয়েশিয়ার শিক্ষাব্যবস্থার গভীরে প্রবেশ করি, তখন বারবার মনে হয়— এই অভিজ্ঞতা কেবল আমার একার নয়, এটি বাংলাদেশের প্রতিটি শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক ও তরুণ শিক্ষার্থীর জানা উচিত।
মালয়েশিয়া কীভাবে এতদূর এল— এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৯৯১ সালে। সেই বছর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহামাদ ঘোষণা করেন ঐতিহাসিক ‘ভিশন ২০২০’ পরিকল্পনা— যার লক্ষ্য ছিল ২০২০ সালের মধ্যে মালয়েশিয়াকে একটি পূর্ণ উন্নত জাতিতে পরিণত করা। এই দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্পের কেন্দ্রে ছিল শিক্ষা। সরকার বুঝেছিল, প্রাকৃতিক সম্পদের মজুত একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু মানবসম্পদ কখনো ফুরায় না— বরং সঠিক শিক্ষা পেলে তা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। এরপর থেকে পরপর কয়েকটি সরকারি নীতি— ন্যাশনাল এডুকেশন পলিসি, ন্যাশনাল হায়ার এডুকেশন স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান এবং মালয়েশিয়া এডুকেশন ব্লুপ্রিন্ট (২০১৫-২০২৫) — দেশের শিক্ষাকে একটি সুসংগঠিত কাঠামোয় নিয়ে আসে। শিক্ষাখাতে জিডিপির ৫ থেকে ৬ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়, যা দেশের যে-কোনো খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ।
মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষার কাঠামো শুরু হয় ডিপ্লোমা পর্যায় থেকে। সাধারণত মাধ্যমিক পরীক্ষার (এসপিএম বা সমমান) পরেই শিক্ষার্থীরা ডিপ্লোমা প্রোগ্রামে ভর্তি হতে পারেন, যা দুই থেকে আড়াই বছরের। এই ডিপ্লোমা কোর্সগুলো কেবল তাত্ত্বিক নয়, অত্যন্ত কার্যকরী ও শিল্পমুখী। পলিটেকনিক ও কমিউনিটি কলেজগুলো থেকে শুরু করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোতেও মানসম্পন্ন ডিপ্লোমা কোর্স পরিচালিত হয়। বিশেষ উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ডিপ্লোমা শেষে শিক্ষার্থীরা সরাসরি স্নাতক ডিগ্রির দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তির সুযোগ পান— ফলে সময় ও অর্থ দুটোরই সাশ্রয় হয়। এই ক্রেডিট ট্রান্সফার ব্যবস্থা মালয়েশিয়ার শিক্ষাব্যবস্থাকে অত্যন্ত নমনীয় ও শিক্ষার্থীবান্ধব করে তুলেছে।
স্নাতক বা ব্যাচেলর ডিগ্রি পর্যায়ে মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রদান করে। সাধারণত তিন থেকে চার বছর মেয়াদি এই কোর্সগুলোতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাথে ইন্টার্নশিপ, প্রজেক্ট-ভিত্তিক শিক্ষা এবং শিল্প বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে পরিচালিত ক্লাস বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকে। এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি (এপিইউ), সানওয়ে ইউনিভার্সিটি, টেইলর’স ইউনিভার্সিটি এবং ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটির মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যাচেলর পর্যায়ে বিশেষভাবে শিল্পমুখী শিক্ষায় অগ্রগামী। সানওয়ে ইউনিভার্সিটি সানওয়ে গ্রুপের সাথে তার গভীর শিল্প সংযোগের জন্য বিখ্যাত, যেখানে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব ব্যবসায়িক পরিবেশে কাজ করার সুযোগ পান। টেইলর’স ইউনিভার্সিটি হসপিটালিটি, ব্যবসা ও স্বাস্থ্যসেবা শিক্ষায় অত্যন্ত সুনামধন্য এবং এটি কিউএস র্যাংকিংয়ে ধারাবাহিকভাবে এশিয়ার শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় স্থান পায়। অন্যদিকে ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি স্বাস্থ্য বিজ্ঞান ও ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষায় তার আন্তর্জাতিক মান ও বৈচিত্র্যপূর্ণ শিক্ষার্থী সম্প্রদায়ের জন্য পরিচিত।
মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে গর্বের অধ্যায়গুলোর একটি হলো এদেশে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শাখা ক্যাম্পাসের উপস্থিতি। অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটির শাখা কুয়ালালামপুরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৯৮ সালে, যা বিশ্বের প্রথম সত্যিকারের বিদেশি শাখা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃত। শিক্ষার্থীরা মূল অস্ট্রেলিয়ান ডিগ্রি পাচ্ছেন, কিন্তু অনেক কম খরচে এবং নিজ অঞ্চলে থেকেই। সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির শাখা সারাওয়াকে অবস্থিত, যেখানে অস্ট্রেলিয়ার মূল ক্যাম্পাসের সমান মানের ডিগ্রি প্রদান করা হয়। কার্টিন ইউনিভার্সিটিরও একটি পূর্ণাঙ্গ শাখা ক্যাম্পাস সারাওয়াকে রয়েছে, যেখানে ইঞ্জিনিয়ারিং, ব্যবসা ও বিজ্ঞান বিভাগে বিশ্বমানের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত ইউনিভার্সিটি অব নটিংহামের মালয়েশিয়া ক্যাম্পাস সেমেনিহ-এ অবস্থিত, যেখানে ব্রিটিশ ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ রয়েছে ব্রিটেনের তুলনায় অনেক কম টিউশন ফিতে। এ ছাড়াও হার্টফোর্ডশায়ার ইউনিভার্সিটি, ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটি, লিভারপুল ইউনিভার্সিটি, রেডিং ইউনিভার্সিটি এবং স্ট্র্যাথক্লাইড ইউনিভার্সিটির মতো ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও মালয়েশিয়ায় শিক্ষা অংশীদারিত্ব বা শাখা রয়েছে। এই বিদেশি শাখা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপস্থিতি মালয়েশিয়াকে একটি আন্তর্জাতিক শিক্ষা হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
স্নাতকোত্তর বা মাস্টার্স পর্যায়ে মালয়েশিয়া অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও মানসম্পন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে। কোর্সওয়ার্ক মাস্টার্স, মিক্সড মোড মাস্টার্স এবং রিসার্চ মাস্টার্স— এই তিন ধরনের প্রোগ্রামের সমন্বয়ে শিক্ষার্থীরা তাদের ক্যারিয়ার লক্ষ্য অনুযায়ী পথ বেছে নিতে পারেন। ইউনিভার্সিটি মালায়া (ইউএম), ইউনিভার্সিটি পুত্রা মালয়েশিয়া (ইউপিএম), ইউনিভার্সিটি কেবাংসান মালয়েশিয়া (ইউকেএম) এবং ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি মালয়েশিয়া (ইউটিএম)-এর মতো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বমানের স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম পরিচালনা করে। মাল্টিমিডিয়া ইউনিভার্সিটি (এমএমইউ) প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিশেষভাবে শক্তিশালী। সানওয়ে ইউনিভার্সিটির মাস্টার্স প্রোগ্রামগুলো ব্যবসা ও ফাইন্যান্সে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। মোনাশ, নটিংহাম ও কার্টিনের মালয়েশিয়া ক্যাম্পাস গুলোতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়া মানে মূল দেশের ডিগ্রিই পাওয়া— যা আন্তর্জাতিক কর্মবাজারে অত্যন্ত মূল্যবান।
পিএইচডি পর্যায়ে মালয়েশিয়া গত দুই দশকে অসাধারণ অগ্রগতি করেছে। সরকারের ‘মাই ব্রেইন’ বৃত্তি কার্যক্রমের আওতায় হাজার হাজার মালয়েশিয়ান নাগরিককে দেশে ও বিদেশে পিএইচডি করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যারা পরে দেশে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা ও শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছেন। এর পাশাপাশি মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক পিএইচডি শিক্ষার্থী আকর্ষণে নানা বৃত্তি ও অর্থায়ন সুবিধা প্রদান করে। ইউনিভার্সিটি মালায়া বর্তমানে কিউএস ওয়ার্ল্ড র্যাংকিংয়ে শীর্ষ ১৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্থান পাচ্ছে এবং এর গবেষণা প্রকাশনা বছর বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইউটিএম-এর গবেষণা কেন্দ্রগুলো প্রকৌশল, প্রযুক্তি ও নগর উন্নয়নে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ইউপিএম কৃষি, জৈবপ্রযুক্তি ও পরিবেশ গবেষণায় এশিয়ার পথিকৃৎ। এপিইউতে তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার নিরাপত্তায় পিএইচডি গবেষণা দ্রুতগতিতে প্রসারিত হচ্ছে। পিএইচডি শিক্ষার্থীরা শুধু তাত্ত্বিক গবেষণায় সীমাবদ্ধ থাকেন না, তাদের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ গবেষণা, আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে অংশগ্রহণ এবং মেধাস্বত্ব অর্জনের জন্য সক্রিয়ভাবে উৎসাহিত করা হয়।
মালয়েশিয়ার মালিকানাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে মালয়েশিয়ান কোয়ালিফিকেশন এজেন্সি, যা প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি প্রোগ্রামের মান নিশ্চিত করে। কোনো প্রোগ্রাম মালয়েশিয়ান কোয়ালিফিকেশন এজেন্সির অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত হতে পারে না। এই কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা মালয়েশিয়ার ডিগ্রির বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশেও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন রয়েছে, তবে মান নিশ্চিতকরণের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও প্রয়োগ আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে— বাংলাদেশের সাথে তুলনায় কোথায় পার্থক্য? বাংলাদেশে মেধার অভাব নেই। আমাদের শিক্ষার্থীরা বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হচ্ছেন, আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে পুরস্কার পাচ্ছেন, বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোতে উঁচু পদে কাজ করছেন। সমস্যা হলো কাঠামোগত— পাঠ্যক্রম ও শিল্পের মধ্যে দূরত্ব, গবেষণায় অপ্রতুল বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিকীকরণে পিছিয়ে থাকা এবং মান নিশ্চিতকরণে দুর্বলতা। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু মান সেই অনুপাতে বাড়েনি। অন্যদিকে মালয়েশিয়া সংখ্যার চেয়ে মানকে প্রাধান্য দিয়েছে সবসময়।
তবে হতাশার কিছু নেই। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার চাপ বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। মালয়েশিয়ার পথ দেখিয়ে দিচ্ছে— বিদেশি শাখা বিশ্ববিদ্যালয় আনা যায়, শিল্পের সাথে গভীর সম্পর্ক তৈরি করা যায়, ডিপ্লোমা থেকে পিএইচডি পর্যন্ত একটি নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন শিক্ষা পথ তৈরি করা যায়। দরকার শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে রাখার অঙ্গীকার।
মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষার এই অভাবনীয় যাত্রা আমাদের শেখায়— স্বপ্ন দেখলে এবং সেই স্বপ্নের পেছনে একনিষ্ঠভাবে কাজ করলে, একটি উন্নয়নশীল দেশও বিশ্বের শিক্ষা অঙ্গনে নিজের স্থান করে নিতে পারে। বাংলাদেশের সেই সামর্থ্য আছে, সেই মেধা আছে— এখন প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা। মালয়েশিয়ার আলোকবর্তিকা ধরে এগিয়ে যাওয়ার এটাই সময়।
লেখক: ড. মোহাম্মদ রাশেদ হাসান পলাশ,
সহকারী অধ্যাপক, স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআরআই),
এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি অব্ টেকনোলজি অ্যান্ড ইনোভেশন (এপিইউ),
কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়া।

শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বুকে অবস্থিত মালয়েশিয়া এই সত্যটি উপলব্ধি করেছিল বহু আগেই। স্বাধীনতার পর থেকে ধাপে ধাপে শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ ও সংস্কারের মধ্য দিয়ে দেশটি আজ এশিয়ার শীর্ষ উচ্চশিক্ষার গন্তব্যগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃত। বিশ্বের ১৬০টিরও বেশি দেশ থেকে লক্ষাধিক শিক্ষার্থী প্রতিবছর মালয়েশিয়ায় পড়তে আসেন। একজন বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ হিসেবে এই দেশে কাজ করতে করতে যখন মালয়েশিয়ার শিক্ষাব্যবস্থার গভীরে প্রবেশ করি, তখন বারবার মনে হয়— এই অভিজ্ঞতা কেবল আমার একার নয়, এটি বাংলাদেশের প্রতিটি শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক ও তরুণ শিক্ষার্থীর জানা উচিত।
মালয়েশিয়া কীভাবে এতদূর এল— এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৯৯১ সালে। সেই বছর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহামাদ ঘোষণা করেন ঐতিহাসিক ‘ভিশন ২০২০’ পরিকল্পনা— যার লক্ষ্য ছিল ২০২০ সালের মধ্যে মালয়েশিয়াকে একটি পূর্ণ উন্নত জাতিতে পরিণত করা। এই দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্পের কেন্দ্রে ছিল শিক্ষা। সরকার বুঝেছিল, প্রাকৃতিক সম্পদের মজুত একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু মানবসম্পদ কখনো ফুরায় না— বরং সঠিক শিক্ষা পেলে তা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। এরপর থেকে পরপর কয়েকটি সরকারি নীতি— ন্যাশনাল এডুকেশন পলিসি, ন্যাশনাল হায়ার এডুকেশন স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান এবং মালয়েশিয়া এডুকেশন ব্লুপ্রিন্ট (২০১৫-২০২৫) — দেশের শিক্ষাকে একটি সুসংগঠিত কাঠামোয় নিয়ে আসে। শিক্ষাখাতে জিডিপির ৫ থেকে ৬ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়, যা দেশের যে-কোনো খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ।
মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষার কাঠামো শুরু হয় ডিপ্লোমা পর্যায় থেকে। সাধারণত মাধ্যমিক পরীক্ষার (এসপিএম বা সমমান) পরেই শিক্ষার্থীরা ডিপ্লোমা প্রোগ্রামে ভর্তি হতে পারেন, যা দুই থেকে আড়াই বছরের। এই ডিপ্লোমা কোর্সগুলো কেবল তাত্ত্বিক নয়, অত্যন্ত কার্যকরী ও শিল্পমুখী। পলিটেকনিক ও কমিউনিটি কলেজগুলো থেকে শুরু করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোতেও মানসম্পন্ন ডিপ্লোমা কোর্স পরিচালিত হয়। বিশেষ উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ডিপ্লোমা শেষে শিক্ষার্থীরা সরাসরি স্নাতক ডিগ্রির দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তির সুযোগ পান— ফলে সময় ও অর্থ দুটোরই সাশ্রয় হয়। এই ক্রেডিট ট্রান্সফার ব্যবস্থা মালয়েশিয়ার শিক্ষাব্যবস্থাকে অত্যন্ত নমনীয় ও শিক্ষার্থীবান্ধব করে তুলেছে।
স্নাতক বা ব্যাচেলর ডিগ্রি পর্যায়ে মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রদান করে। সাধারণত তিন থেকে চার বছর মেয়াদি এই কোর্সগুলোতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাথে ইন্টার্নশিপ, প্রজেক্ট-ভিত্তিক শিক্ষা এবং শিল্প বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে পরিচালিত ক্লাস বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকে। এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি (এপিইউ), সানওয়ে ইউনিভার্সিটি, টেইলর’স ইউনিভার্সিটি এবং ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটির মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যাচেলর পর্যায়ে বিশেষভাবে শিল্পমুখী শিক্ষায় অগ্রগামী। সানওয়ে ইউনিভার্সিটি সানওয়ে গ্রুপের সাথে তার গভীর শিল্প সংযোগের জন্য বিখ্যাত, যেখানে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব ব্যবসায়িক পরিবেশে কাজ করার সুযোগ পান। টেইলর’স ইউনিভার্সিটি হসপিটালিটি, ব্যবসা ও স্বাস্থ্যসেবা শিক্ষায় অত্যন্ত সুনামধন্য এবং এটি কিউএস র্যাংকিংয়ে ধারাবাহিকভাবে এশিয়ার শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় স্থান পায়। অন্যদিকে ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি স্বাস্থ্য বিজ্ঞান ও ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষায় তার আন্তর্জাতিক মান ও বৈচিত্র্যপূর্ণ শিক্ষার্থী সম্প্রদায়ের জন্য পরিচিত।
মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে গর্বের অধ্যায়গুলোর একটি হলো এদেশে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শাখা ক্যাম্পাসের উপস্থিতি। অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটির শাখা কুয়ালালামপুরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৯৮ সালে, যা বিশ্বের প্রথম সত্যিকারের বিদেশি শাখা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃত। শিক্ষার্থীরা মূল অস্ট্রেলিয়ান ডিগ্রি পাচ্ছেন, কিন্তু অনেক কম খরচে এবং নিজ অঞ্চলে থেকেই। সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির শাখা সারাওয়াকে অবস্থিত, যেখানে অস্ট্রেলিয়ার মূল ক্যাম্পাসের সমান মানের ডিগ্রি প্রদান করা হয়। কার্টিন ইউনিভার্সিটিরও একটি পূর্ণাঙ্গ শাখা ক্যাম্পাস সারাওয়াকে রয়েছে, যেখানে ইঞ্জিনিয়ারিং, ব্যবসা ও বিজ্ঞান বিভাগে বিশ্বমানের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত ইউনিভার্সিটি অব নটিংহামের মালয়েশিয়া ক্যাম্পাস সেমেনিহ-এ অবস্থিত, যেখানে ব্রিটিশ ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ রয়েছে ব্রিটেনের তুলনায় অনেক কম টিউশন ফিতে। এ ছাড়াও হার্টফোর্ডশায়ার ইউনিভার্সিটি, ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটি, লিভারপুল ইউনিভার্সিটি, রেডিং ইউনিভার্সিটি এবং স্ট্র্যাথক্লাইড ইউনিভার্সিটির মতো ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও মালয়েশিয়ায় শিক্ষা অংশীদারিত্ব বা শাখা রয়েছে। এই বিদেশি শাখা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপস্থিতি মালয়েশিয়াকে একটি আন্তর্জাতিক শিক্ষা হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
স্নাতকোত্তর বা মাস্টার্স পর্যায়ে মালয়েশিয়া অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও মানসম্পন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে। কোর্সওয়ার্ক মাস্টার্স, মিক্সড মোড মাস্টার্স এবং রিসার্চ মাস্টার্স— এই তিন ধরনের প্রোগ্রামের সমন্বয়ে শিক্ষার্থীরা তাদের ক্যারিয়ার লক্ষ্য অনুযায়ী পথ বেছে নিতে পারেন। ইউনিভার্সিটি মালায়া (ইউএম), ইউনিভার্সিটি পুত্রা মালয়েশিয়া (ইউপিএম), ইউনিভার্সিটি কেবাংসান মালয়েশিয়া (ইউকেএম) এবং ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি মালয়েশিয়া (ইউটিএম)-এর মতো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বমানের স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম পরিচালনা করে। মাল্টিমিডিয়া ইউনিভার্সিটি (এমএমইউ) প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিশেষভাবে শক্তিশালী। সানওয়ে ইউনিভার্সিটির মাস্টার্স প্রোগ্রামগুলো ব্যবসা ও ফাইন্যান্সে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। মোনাশ, নটিংহাম ও কার্টিনের মালয়েশিয়া ক্যাম্পাস গুলোতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়া মানে মূল দেশের ডিগ্রিই পাওয়া— যা আন্তর্জাতিক কর্মবাজারে অত্যন্ত মূল্যবান।
পিএইচডি পর্যায়ে মালয়েশিয়া গত দুই দশকে অসাধারণ অগ্রগতি করেছে। সরকারের ‘মাই ব্রেইন’ বৃত্তি কার্যক্রমের আওতায় হাজার হাজার মালয়েশিয়ান নাগরিককে দেশে ও বিদেশে পিএইচডি করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যারা পরে দেশে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা ও শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছেন। এর পাশাপাশি মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক পিএইচডি শিক্ষার্থী আকর্ষণে নানা বৃত্তি ও অর্থায়ন সুবিধা প্রদান করে। ইউনিভার্সিটি মালায়া বর্তমানে কিউএস ওয়ার্ল্ড র্যাংকিংয়ে শীর্ষ ১৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্থান পাচ্ছে এবং এর গবেষণা প্রকাশনা বছর বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইউটিএম-এর গবেষণা কেন্দ্রগুলো প্রকৌশল, প্রযুক্তি ও নগর উন্নয়নে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ইউপিএম কৃষি, জৈবপ্রযুক্তি ও পরিবেশ গবেষণায় এশিয়ার পথিকৃৎ। এপিইউতে তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার নিরাপত্তায় পিএইচডি গবেষণা দ্রুতগতিতে প্রসারিত হচ্ছে। পিএইচডি শিক্ষার্থীরা শুধু তাত্ত্বিক গবেষণায় সীমাবদ্ধ থাকেন না, তাদের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ গবেষণা, আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে অংশগ্রহণ এবং মেধাস্বত্ব অর্জনের জন্য সক্রিয়ভাবে উৎসাহিত করা হয়।
মালয়েশিয়ার মালিকানাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে মালয়েশিয়ান কোয়ালিফিকেশন এজেন্সি, যা প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি প্রোগ্রামের মান নিশ্চিত করে। কোনো প্রোগ্রাম মালয়েশিয়ান কোয়ালিফিকেশন এজেন্সির অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত হতে পারে না। এই কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা মালয়েশিয়ার ডিগ্রির বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশেও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন রয়েছে, তবে মান নিশ্চিতকরণের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও প্রয়োগ আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে— বাংলাদেশের সাথে তুলনায় কোথায় পার্থক্য? বাংলাদেশে মেধার অভাব নেই। আমাদের শিক্ষার্থীরা বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হচ্ছেন, আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে পুরস্কার পাচ্ছেন, বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোতে উঁচু পদে কাজ করছেন। সমস্যা হলো কাঠামোগত— পাঠ্যক্রম ও শিল্পের মধ্যে দূরত্ব, গবেষণায় অপ্রতুল বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিকীকরণে পিছিয়ে থাকা এবং মান নিশ্চিতকরণে দুর্বলতা। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু মান সেই অনুপাতে বাড়েনি। অন্যদিকে মালয়েশিয়া সংখ্যার চেয়ে মানকে প্রাধান্য দিয়েছে সবসময়।
তবে হতাশার কিছু নেই। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার চাপ বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। মালয়েশিয়ার পথ দেখিয়ে দিচ্ছে— বিদেশি শাখা বিশ্ববিদ্যালয় আনা যায়, শিল্পের সাথে গভীর সম্পর্ক তৈরি করা যায়, ডিপ্লোমা থেকে পিএইচডি পর্যন্ত একটি নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন শিক্ষা পথ তৈরি করা যায়। দরকার শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে রাখার অঙ্গীকার।
মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষার এই অভাবনীয় যাত্রা আমাদের শেখায়— স্বপ্ন দেখলে এবং সেই স্বপ্নের পেছনে একনিষ্ঠভাবে কাজ করলে, একটি উন্নয়নশীল দেশও বিশ্বের শিক্ষা অঙ্গনে নিজের স্থান করে নিতে পারে। বাংলাদেশের সেই সামর্থ্য আছে, সেই মেধা আছে— এখন প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা। মালয়েশিয়ার আলোকবর্তিকা ধরে এগিয়ে যাওয়ার এটাই সময়।
লেখক: ড. মোহাম্মদ রাশেদ হাসান পলাশ,
সহকারী অধ্যাপক, স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআরআই),
এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি অব্ টেকনোলজি অ্যান্ড ইনোভেশন (এপিইউ),
কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়া।

মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে বাংলাদেশের জন্য অনুপ্রেরণা
ড. মোহাম্মদ রাশেদ হাসান পলাশ

শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বুকে অবস্থিত মালয়েশিয়া এই সত্যটি উপলব্ধি করেছিল বহু আগেই। স্বাধীনতার পর থেকে ধাপে ধাপে শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ ও সংস্কারের মধ্য দিয়ে দেশটি আজ এশিয়ার শীর্ষ উচ্চশিক্ষার গন্তব্যগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃত। বিশ্বের ১৬০টিরও বেশি দেশ থেকে লক্ষাধিক শিক্ষার্থী প্রতিবছর মালয়েশিয়ায় পড়তে আসেন। একজন বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ হিসেবে এই দেশে কাজ করতে করতে যখন মালয়েশিয়ার শিক্ষাব্যবস্থার গভীরে প্রবেশ করি, তখন বারবার মনে হয়— এই অভিজ্ঞতা কেবল আমার একার নয়, এটি বাংলাদেশের প্রতিটি শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক ও তরুণ শিক্ষার্থীর জানা উচিত।
মালয়েশিয়া কীভাবে এতদূর এল— এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৯৯১ সালে। সেই বছর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহামাদ ঘোষণা করেন ঐতিহাসিক ‘ভিশন ২০২০’ পরিকল্পনা— যার লক্ষ্য ছিল ২০২০ সালের মধ্যে মালয়েশিয়াকে একটি পূর্ণ উন্নত জাতিতে পরিণত করা। এই দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্পের কেন্দ্রে ছিল শিক্ষা। সরকার বুঝেছিল, প্রাকৃতিক সম্পদের মজুত একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু মানবসম্পদ কখনো ফুরায় না— বরং সঠিক শিক্ষা পেলে তা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। এরপর থেকে পরপর কয়েকটি সরকারি নীতি— ন্যাশনাল এডুকেশন পলিসি, ন্যাশনাল হায়ার এডুকেশন স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান এবং মালয়েশিয়া এডুকেশন ব্লুপ্রিন্ট (২০১৫-২০২৫) — দেশের শিক্ষাকে একটি সুসংগঠিত কাঠামোয় নিয়ে আসে। শিক্ষাখাতে জিডিপির ৫ থেকে ৬ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়, যা দেশের যে-কোনো খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ।
মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষার কাঠামো শুরু হয় ডিপ্লোমা পর্যায় থেকে। সাধারণত মাধ্যমিক পরীক্ষার (এসপিএম বা সমমান) পরেই শিক্ষার্থীরা ডিপ্লোমা প্রোগ্রামে ভর্তি হতে পারেন, যা দুই থেকে আড়াই বছরের। এই ডিপ্লোমা কোর্সগুলো কেবল তাত্ত্বিক নয়, অত্যন্ত কার্যকরী ও শিল্পমুখী। পলিটেকনিক ও কমিউনিটি কলেজগুলো থেকে শুরু করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোতেও মানসম্পন্ন ডিপ্লোমা কোর্স পরিচালিত হয়। বিশেষ উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ডিপ্লোমা শেষে শিক্ষার্থীরা সরাসরি স্নাতক ডিগ্রির দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তির সুযোগ পান— ফলে সময় ও অর্থ দুটোরই সাশ্রয় হয়। এই ক্রেডিট ট্রান্সফার ব্যবস্থা মালয়েশিয়ার শিক্ষাব্যবস্থাকে অত্যন্ত নমনীয় ও শিক্ষার্থীবান্ধব করে তুলেছে।
স্নাতক বা ব্যাচেলর ডিগ্রি পর্যায়ে মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রদান করে। সাধারণত তিন থেকে চার বছর মেয়াদি এই কোর্সগুলোতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাথে ইন্টার্নশিপ, প্রজেক্ট-ভিত্তিক শিক্ষা এবং শিল্প বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে পরিচালিত ক্লাস বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকে। এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি (এপিইউ), সানওয়ে ইউনিভার্সিটি, টেইলর’স ইউনিভার্সিটি এবং ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটির মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যাচেলর পর্যায়ে বিশেষভাবে শিল্পমুখী শিক্ষায় অগ্রগামী। সানওয়ে ইউনিভার্সিটি সানওয়ে গ্রুপের সাথে তার গভীর শিল্প সংযোগের জন্য বিখ্যাত, যেখানে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব ব্যবসায়িক পরিবেশে কাজ করার সুযোগ পান। টেইলর’স ইউনিভার্সিটি হসপিটালিটি, ব্যবসা ও স্বাস্থ্যসেবা শিক্ষায় অত্যন্ত সুনামধন্য এবং এটি কিউএস র্যাংকিংয়ে ধারাবাহিকভাবে এশিয়ার শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় স্থান পায়। অন্যদিকে ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি স্বাস্থ্য বিজ্ঞান ও ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষায় তার আন্তর্জাতিক মান ও বৈচিত্র্যপূর্ণ শিক্ষার্থী সম্প্রদায়ের জন্য পরিচিত।
মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে গর্বের অধ্যায়গুলোর একটি হলো এদেশে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শাখা ক্যাম্পাসের উপস্থিতি। অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটির শাখা কুয়ালালামপুরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৯৮ সালে, যা বিশ্বের প্রথম সত্যিকারের বিদেশি শাখা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃত। শিক্ষার্থীরা মূল অস্ট্রেলিয়ান ডিগ্রি পাচ্ছেন, কিন্তু অনেক কম খরচে এবং নিজ অঞ্চলে থেকেই। সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির শাখা সারাওয়াকে অবস্থিত, যেখানে অস্ট্রেলিয়ার মূল ক্যাম্পাসের সমান মানের ডিগ্রি প্রদান করা হয়। কার্টিন ইউনিভার্সিটিরও একটি পূর্ণাঙ্গ শাখা ক্যাম্পাস সারাওয়াকে রয়েছে, যেখানে ইঞ্জিনিয়ারিং, ব্যবসা ও বিজ্ঞান বিভাগে বিশ্বমানের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত ইউনিভার্সিটি অব নটিংহামের মালয়েশিয়া ক্যাম্পাস সেমেনিহ-এ অবস্থিত, যেখানে ব্রিটিশ ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ রয়েছে ব্রিটেনের তুলনায় অনেক কম টিউশন ফিতে। এ ছাড়াও হার্টফোর্ডশায়ার ইউনিভার্সিটি, ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটি, লিভারপুল ইউনিভার্সিটি, রেডিং ইউনিভার্সিটি এবং স্ট্র্যাথক্লাইড ইউনিভার্সিটির মতো ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও মালয়েশিয়ায় শিক্ষা অংশীদারিত্ব বা শাখা রয়েছে। এই বিদেশি শাখা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপস্থিতি মালয়েশিয়াকে একটি আন্তর্জাতিক শিক্ষা হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
স্নাতকোত্তর বা মাস্টার্স পর্যায়ে মালয়েশিয়া অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও মানসম্পন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে। কোর্সওয়ার্ক মাস্টার্স, মিক্সড মোড মাস্টার্স এবং রিসার্চ মাস্টার্স— এই তিন ধরনের প্রোগ্রামের সমন্বয়ে শিক্ষার্থীরা তাদের ক্যারিয়ার লক্ষ্য অনুযায়ী পথ বেছে নিতে পারেন। ইউনিভার্সিটি মালায়া (ইউএম), ইউনিভার্সিটি পুত্রা মালয়েশিয়া (ইউপিএম), ইউনিভার্সিটি কেবাংসান মালয়েশিয়া (ইউকেএম) এবং ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি মালয়েশিয়া (ইউটিএম)-এর মতো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বমানের স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম পরিচালনা করে। মাল্টিমিডিয়া ইউনিভার্সিটি (এমএমইউ) প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিশেষভাবে শক্তিশালী। সানওয়ে ইউনিভার্সিটির মাস্টার্স প্রোগ্রামগুলো ব্যবসা ও ফাইন্যান্সে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। মোনাশ, নটিংহাম ও কার্টিনের মালয়েশিয়া ক্যাম্পাস গুলোতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়া মানে মূল দেশের ডিগ্রিই পাওয়া— যা আন্তর্জাতিক কর্মবাজারে অত্যন্ত মূল্যবান।
পিএইচডি পর্যায়ে মালয়েশিয়া গত দুই দশকে অসাধারণ অগ্রগতি করেছে। সরকারের ‘মাই ব্রেইন’ বৃত্তি কার্যক্রমের আওতায় হাজার হাজার মালয়েশিয়ান নাগরিককে দেশে ও বিদেশে পিএইচডি করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যারা পরে দেশে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা ও শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছেন। এর পাশাপাশি মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক পিএইচডি শিক্ষার্থী আকর্ষণে নানা বৃত্তি ও অর্থায়ন সুবিধা প্রদান করে। ইউনিভার্সিটি মালায়া বর্তমানে কিউএস ওয়ার্ল্ড র্যাংকিংয়ে শীর্ষ ১৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্থান পাচ্ছে এবং এর গবেষণা প্রকাশনা বছর বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইউটিএম-এর গবেষণা কেন্দ্রগুলো প্রকৌশল, প্রযুক্তি ও নগর উন্নয়নে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ইউপিএম কৃষি, জৈবপ্রযুক্তি ও পরিবেশ গবেষণায় এশিয়ার পথিকৃৎ। এপিইউতে তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার নিরাপত্তায় পিএইচডি গবেষণা দ্রুতগতিতে প্রসারিত হচ্ছে। পিএইচডি শিক্ষার্থীরা শুধু তাত্ত্বিক গবেষণায় সীমাবদ্ধ থাকেন না, তাদের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ গবেষণা, আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে অংশগ্রহণ এবং মেধাস্বত্ব অর্জনের জন্য সক্রিয়ভাবে উৎসাহিত করা হয়।
মালয়েশিয়ার মালিকানাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে মালয়েশিয়ান কোয়ালিফিকেশন এজেন্সি, যা প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি প্রোগ্রামের মান নিশ্চিত করে। কোনো প্রোগ্রাম মালয়েশিয়ান কোয়ালিফিকেশন এজেন্সির অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত হতে পারে না। এই কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা মালয়েশিয়ার ডিগ্রির বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশেও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন রয়েছে, তবে মান নিশ্চিতকরণের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও প্রয়োগ আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে— বাংলাদেশের সাথে তুলনায় কোথায় পার্থক্য? বাংলাদেশে মেধার অভাব নেই। আমাদের শিক্ষার্থীরা বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হচ্ছেন, আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে পুরস্কার পাচ্ছেন, বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোতে উঁচু পদে কাজ করছেন। সমস্যা হলো কাঠামোগত— পাঠ্যক্রম ও শিল্পের মধ্যে দূরত্ব, গবেষণায় অপ্রতুল বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিকীকরণে পিছিয়ে থাকা এবং মান নিশ্চিতকরণে দুর্বলতা। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু মান সেই অনুপাতে বাড়েনি। অন্যদিকে মালয়েশিয়া সংখ্যার চেয়ে মানকে প্রাধান্য দিয়েছে সবসময়।
তবে হতাশার কিছু নেই। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার চাপ বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। মালয়েশিয়ার পথ দেখিয়ে দিচ্ছে— বিদেশি শাখা বিশ্ববিদ্যালয় আনা যায়, শিল্পের সাথে গভীর সম্পর্ক তৈরি করা যায়, ডিপ্লোমা থেকে পিএইচডি পর্যন্ত একটি নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন শিক্ষা পথ তৈরি করা যায়। দরকার শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে রাখার অঙ্গীকার।
মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষার এই অভাবনীয় যাত্রা আমাদের শেখায়— স্বপ্ন দেখলে এবং সেই স্বপ্নের পেছনে একনিষ্ঠভাবে কাজ করলে, একটি উন্নয়নশীল দেশও বিশ্বের শিক্ষা অঙ্গনে নিজের স্থান করে নিতে পারে। বাংলাদেশের সেই সামর্থ্য আছে, সেই মেধা আছে— এখন প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা। মালয়েশিয়ার আলোকবর্তিকা ধরে এগিয়ে যাওয়ার এটাই সময়।
লেখক: ড. মোহাম্মদ রাশেদ হাসান পলাশ,
সহকারী অধ্যাপক, স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআরআই),
এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি অব্ টেকনোলজি অ্যান্ড ইনোভেশন (এপিইউ),
কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়া।




