তৈরি পোশাক খাত
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ বন্ধে রপ্তানি কমছে, খরচ বেড়েছে দ্বিগুণ

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ বন্ধে রপ্তানি কমছে, খরচ বেড়েছে দ্বিগুণ
মরিয়ম সেঁজুতি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের আকাশপথ বন্ধ হয়ে গেছে। এমিরেটস ও কাতার এয়ারওয়েজের মতো বিমান সংস্থাগুলো অনেক ফ্লাইট বাতিল করেছে। এর জেরে বিশ্বের বড় বড় পোশাক ব্র্যান্ডের বিপুল পরিমাণ পণ্য বিমানবন্দরে আটকে আছে। এতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন পোশাক কারখানার মালিকেরা।
দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের অন্যতম পোশাক উৎপাদন কেন্দ্র। বিশ্বখ্যাত ফাস্ট ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের কারখানা থেকে টি-শার্ট, জিন্সের শার্ট-প্যান্টসহ নানা ধরনের পোশাকের জোগান দেয়। তবে ভ্যন্তরীণ অস্থিরতায় দেশের পোশাক খাতে নানা ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এমনকি বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীণ সরকারের সময়ে পাশের দেশের সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের প্রভাবসহ নানা সমস্যায় পোশাক রপ্তানিতে টানা সাত মাস মন্দাভাব চলছে। পোশাক রপ্তানি কমায় বাংলাদেশের সার্বিক রপ্তানিতেও ধস নেমেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়কালে সামগ্রিক রপ্তানি আয় ৩ দশমিক ১৩ শতাংশ কমে ৩১ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা এক বছর আগে একই সময়ে ছিল ৩২ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাতের আয় ফেব্রুয়ারিতে ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ কমে ২ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয় ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমে ২৫ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা আগের বছর ছিল ২৬ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার।
আমরা রুট পরিবর্তন করে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন রুটে পণ্য রপ্তানি করছি। ইরান যুদ্ধের কারণে রপ্তানি থেমে নেই। তবে কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পোশাক রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে পথ পরিবর্তন করার কারণে খরচ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুন
মোহাম্মদ হাতেম, সভাপতি বিকেএমইএ
জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, আমরা রুট পরিবর্তন করে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন রুটে পণ্য রপ্তানি করছি। ইরান যুদ্ধের কারণে রপ্তানি থেমে নেই। তবে কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পোশাক রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে পথ পরিবর্তন করার কারণে খরচ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুন।
তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘ইউরোপ-আমেরিকা দুই জায়গাতেই পোশাক রপ্তানি কমছে। মোট রপ্তানিতে এটার প্রভাব পড়ছে। অপ্রচলিত বাজারেও আমরা ভালো করতে পারিনি। এ ছাড়া ফেব্রুয়ারি আমাদের নির্বাচনের মাস ছিল, কাজের সময় কম পাওয়া গেছে, বন্দর বন্ধ ছিল এজন্য বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। টোটাল রপ্তানি কমছে। গণতান্ত্রিক নতুন সরকার এসেছে। আমরা ভালো কিছু আশা করছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এখন আবার ইরান যুদ্ধ শুরু হয়েছে। বিশ্বব্যাপী এর প্রভাব পড়বে। সামনে কী প্রভাব পড়বে তা দেখার বিষয়।’
আকাশ পথ বন্ধের বিষয়ে মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলেও আমাদের পণ্য রপ্তানি চলমান রয়েছে। এখনো যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে পড়েনি। তবে এ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একইসঙ্গে এর প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়বে। তিনি বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে আমরা বিকল্প পথে পণ্য রপ্তানি করছি। তবে এতে খরচ প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।’
এ বিষয়ে পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান স্প্যারো গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ঢাকার বিমানবন্দরে আমাদের পোশাকের চালান আটকে ছিল। এগুলো দুবাই হয়ে যুক্তরাজ্যে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু দুবাই বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত থাকায় আমরা খুব বিপদে পড়েছিলাম। পরে বিকল্প পথে পণ্য পাঠিয়েছি। এতে খরচ অনেক বেড়েছে।
শোভন ইসলাম আর বলেন, বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণ কার্গো যায়, তার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ক্যাপাসিটি হ্রাস পেয়েছে। ইউরোপগামী পণ্যের বেশিরভাগ পণ্য গালফ রুটে যেত। কিন্তু গত ৫ দিন ধরে এ কার্গোগুলো বন্ধ রয়েছে। অর্থাৎ গত ৫ দিন ধরে পণ্য শিপমেন্ট করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের বেশিরভাগ সাশ্রয়ী কার্গো পরিচালনা করতো কুয়েত, গালফএয়ার ও এমিরেটস। তিনটি এয়ারলাইন্সই এখন বন্ধ রয়েছে।
শোভন বলেন, বায়াররা (বাইরের ক্রেতারা) যখন এয়ারশিপমেন্টে কার্গো নেয়, কিংবা আমাদের যখন এয়ার শিপমেন্টে কার্গো পাঠাতে হয়- তখন বায়ার এবং আমাদের যৌথ খরচে পণ্য পাঠাতে হয়। যেহেতু গালফ রুট বন্ধ, তাই প্যাসিফিক রুট অর্থাৎ হংকং, চীন, সিঙ্গাপুর দিয়ে পণ্য পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
গত শনিবার মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ওই অঞ্চলের বেশির ভাগ আকাশপথই বন্ধ। এতে বিশ্বের ব্যস্ততম বিমানবন্দর দুবাইও কয়েক দিনের জন্য কার্যক্রম স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়। কাতার এয়ারওয়েজ, এমিরেটস ও ইত্তিহাদের মতো বড় বিমান সংস্থাগুলো ফ্লাইট বাতিল করে দিয়েছে।
কমেছে রপ্তানি, বেড়েছে খরচ
বিকল্প রুটে পণ্য পাঠাতে হলে খরচ কাঠামো দ্রুত বদলে যায়, জ্বালানি ব্যয় বাড়ে, বিমার প্রিমিয়াম বাড়ে, ফ্রেইট চার্জ ঊর্ধ্বমুখী হয়। একই সময়ে তেলের বাজার অস্থির থাকায় ব্যারেলপ্রতি দাম ১০০ ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কা থাকলে পরিবহন খরচ আরও বেড়ে যেতে পারে। তখন রপ্তানিকারকদের প্রফিট মার্জিন বা লাভ কমে যায় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। রপ্তানিকারকদের মতে, আকাশপথে মধ্যপ্রাচ্যে পণ্য পাঠানো কার্যত বন্ধ থাকায় পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সিটিজেন জার্নালকে বলেছেন, সমুদ্রপথে এখনো বড় ধরনের সমস্যা হয়নি। তবে আকাশপথে রপ্তানি কার্যত স্থবির। যুদ্ধ পরিস্থিতির ঠিক কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা পরে নিরূপণ করা হবে।
সংকট দীর্ঘ হলে প্রভাব শুধু আকাশপথে সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিপিং বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে দীর্ঘ সময় জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে সিঙ্গাপুর বা কলম্বোর মতো ট্রানশিপমেন্ট হাবে কনটেইনার জট তৈরি হতে পারে। এতে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ধীর হবে এবং পরিবহন ব্যয় বাড়বে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯২ ভাগই হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। এ বন্দর দিয়ে পাঠানো হয় রপ্তানি পণ্যের ৯৮ ভাগ। সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা কিংবা মালয়েশিয়ার বন্দর হয়ে পণ্যবাহী জাহাজগুলো যায় ইউরোপ-আমেরিকায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের জের ধরে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় এই রুটে পণ্য পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ‘কেপ অব গুড হোপ’ হয়ে বিকল্প রুটে যেতে হবে জাহাজগুলোকে। এতে বেড়ে যাবে বীমা খরচ ও জাহাজের পরিবহন ব্যয়। পণ্য পৌঁছাতে সময় লাগবে দ্বিগুণ।
নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিকল্প পথে হাঁটতে হবে আমাদের। খরচ বাড়লেও নিরাপত্তার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে ।
পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাজার ইউরোপ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পরিসংখ্যানবিষয়ক সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ পাঁচ বছরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ইইউর দেশগুলোতে ১৯ বিলিয়ন ইউরোর বেশি মূল্যের পোশাক রপ্তানি করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানির ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ হয়েছে বাংলাদেশ থেকে।
বিকেএমইএ-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় পণ্যবাহী ফ্লাইট স্থগিত আছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে। তিনি বলেন, ইরান, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হলো হরমুজ প্রণালি। সেটা বন্ধ থাকলে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে যায়। সব মিলিয়ে আমরা শঙ্কিত।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের আকাশপথ বন্ধ হয়ে গেছে। এমিরেটস ও কাতার এয়ারওয়েজের মতো বিমান সংস্থাগুলো অনেক ফ্লাইট বাতিল করেছে। এর জেরে বিশ্বের বড় বড় পোশাক ব্র্যান্ডের বিপুল পরিমাণ পণ্য বিমানবন্দরে আটকে আছে। এতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন পোশাক কারখানার মালিকেরা।
দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের অন্যতম পোশাক উৎপাদন কেন্দ্র। বিশ্বখ্যাত ফাস্ট ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের কারখানা থেকে টি-শার্ট, জিন্সের শার্ট-প্যান্টসহ নানা ধরনের পোশাকের জোগান দেয়। তবে ভ্যন্তরীণ অস্থিরতায় দেশের পোশাক খাতে নানা ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এমনকি বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীণ সরকারের সময়ে পাশের দেশের সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের প্রভাবসহ নানা সমস্যায় পোশাক রপ্তানিতে টানা সাত মাস মন্দাভাব চলছে। পোশাক রপ্তানি কমায় বাংলাদেশের সার্বিক রপ্তানিতেও ধস নেমেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়কালে সামগ্রিক রপ্তানি আয় ৩ দশমিক ১৩ শতাংশ কমে ৩১ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা এক বছর আগে একই সময়ে ছিল ৩২ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাতের আয় ফেব্রুয়ারিতে ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ কমে ২ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয় ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমে ২৫ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা আগের বছর ছিল ২৬ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার।
আমরা রুট পরিবর্তন করে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন রুটে পণ্য রপ্তানি করছি। ইরান যুদ্ধের কারণে রপ্তানি থেমে নেই। তবে কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পোশাক রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে পথ পরিবর্তন করার কারণে খরচ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুন
মোহাম্মদ হাতেম, সভাপতি বিকেএমইএ
জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, আমরা রুট পরিবর্তন করে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন রুটে পণ্য রপ্তানি করছি। ইরান যুদ্ধের কারণে রপ্তানি থেমে নেই। তবে কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পোশাক রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে পথ পরিবর্তন করার কারণে খরচ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুন।
তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘ইউরোপ-আমেরিকা দুই জায়গাতেই পোশাক রপ্তানি কমছে। মোট রপ্তানিতে এটার প্রভাব পড়ছে। অপ্রচলিত বাজারেও আমরা ভালো করতে পারিনি। এ ছাড়া ফেব্রুয়ারি আমাদের নির্বাচনের মাস ছিল, কাজের সময় কম পাওয়া গেছে, বন্দর বন্ধ ছিল এজন্য বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। টোটাল রপ্তানি কমছে। গণতান্ত্রিক নতুন সরকার এসেছে। আমরা ভালো কিছু আশা করছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এখন আবার ইরান যুদ্ধ শুরু হয়েছে। বিশ্বব্যাপী এর প্রভাব পড়বে। সামনে কী প্রভাব পড়বে তা দেখার বিষয়।’
আকাশ পথ বন্ধের বিষয়ে মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলেও আমাদের পণ্য রপ্তানি চলমান রয়েছে। এখনো যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে পড়েনি। তবে এ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একইসঙ্গে এর প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়বে। তিনি বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে আমরা বিকল্প পথে পণ্য রপ্তানি করছি। তবে এতে খরচ প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।’
এ বিষয়ে পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান স্প্যারো গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ঢাকার বিমানবন্দরে আমাদের পোশাকের চালান আটকে ছিল। এগুলো দুবাই হয়ে যুক্তরাজ্যে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু দুবাই বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত থাকায় আমরা খুব বিপদে পড়েছিলাম। পরে বিকল্প পথে পণ্য পাঠিয়েছি। এতে খরচ অনেক বেড়েছে।
শোভন ইসলাম আর বলেন, বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণ কার্গো যায়, তার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ক্যাপাসিটি হ্রাস পেয়েছে। ইউরোপগামী পণ্যের বেশিরভাগ পণ্য গালফ রুটে যেত। কিন্তু গত ৫ দিন ধরে এ কার্গোগুলো বন্ধ রয়েছে। অর্থাৎ গত ৫ দিন ধরে পণ্য শিপমেন্ট করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের বেশিরভাগ সাশ্রয়ী কার্গো পরিচালনা করতো কুয়েত, গালফএয়ার ও এমিরেটস। তিনটি এয়ারলাইন্সই এখন বন্ধ রয়েছে।
শোভন বলেন, বায়াররা (বাইরের ক্রেতারা) যখন এয়ারশিপমেন্টে কার্গো নেয়, কিংবা আমাদের যখন এয়ার শিপমেন্টে কার্গো পাঠাতে হয়- তখন বায়ার এবং আমাদের যৌথ খরচে পণ্য পাঠাতে হয়। যেহেতু গালফ রুট বন্ধ, তাই প্যাসিফিক রুট অর্থাৎ হংকং, চীন, সিঙ্গাপুর দিয়ে পণ্য পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
গত শনিবার মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ওই অঞ্চলের বেশির ভাগ আকাশপথই বন্ধ। এতে বিশ্বের ব্যস্ততম বিমানবন্দর দুবাইও কয়েক দিনের জন্য কার্যক্রম স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়। কাতার এয়ারওয়েজ, এমিরেটস ও ইত্তিহাদের মতো বড় বিমান সংস্থাগুলো ফ্লাইট বাতিল করে দিয়েছে।
কমেছে রপ্তানি, বেড়েছে খরচ
বিকল্প রুটে পণ্য পাঠাতে হলে খরচ কাঠামো দ্রুত বদলে যায়, জ্বালানি ব্যয় বাড়ে, বিমার প্রিমিয়াম বাড়ে, ফ্রেইট চার্জ ঊর্ধ্বমুখী হয়। একই সময়ে তেলের বাজার অস্থির থাকায় ব্যারেলপ্রতি দাম ১০০ ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কা থাকলে পরিবহন খরচ আরও বেড়ে যেতে পারে। তখন রপ্তানিকারকদের প্রফিট মার্জিন বা লাভ কমে যায় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। রপ্তানিকারকদের মতে, আকাশপথে মধ্যপ্রাচ্যে পণ্য পাঠানো কার্যত বন্ধ থাকায় পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সিটিজেন জার্নালকে বলেছেন, সমুদ্রপথে এখনো বড় ধরনের সমস্যা হয়নি। তবে আকাশপথে রপ্তানি কার্যত স্থবির। যুদ্ধ পরিস্থিতির ঠিক কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা পরে নিরূপণ করা হবে।
সংকট দীর্ঘ হলে প্রভাব শুধু আকাশপথে সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিপিং বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে দীর্ঘ সময় জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে সিঙ্গাপুর বা কলম্বোর মতো ট্রানশিপমেন্ট হাবে কনটেইনার জট তৈরি হতে পারে। এতে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ধীর হবে এবং পরিবহন ব্যয় বাড়বে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯২ ভাগই হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। এ বন্দর দিয়ে পাঠানো হয় রপ্তানি পণ্যের ৯৮ ভাগ। সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা কিংবা মালয়েশিয়ার বন্দর হয়ে পণ্যবাহী জাহাজগুলো যায় ইউরোপ-আমেরিকায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের জের ধরে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় এই রুটে পণ্য পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ‘কেপ অব গুড হোপ’ হয়ে বিকল্প রুটে যেতে হবে জাহাজগুলোকে। এতে বেড়ে যাবে বীমা খরচ ও জাহাজের পরিবহন ব্যয়। পণ্য পৌঁছাতে সময় লাগবে দ্বিগুণ।
নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিকল্প পথে হাঁটতে হবে আমাদের। খরচ বাড়লেও নিরাপত্তার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে ।
পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাজার ইউরোপ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পরিসংখ্যানবিষয়ক সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ পাঁচ বছরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ইইউর দেশগুলোতে ১৯ বিলিয়ন ইউরোর বেশি মূল্যের পোশাক রপ্তানি করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানির ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ হয়েছে বাংলাদেশ থেকে।
বিকেএমইএ-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় পণ্যবাহী ফ্লাইট স্থগিত আছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে। তিনি বলেন, ইরান, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হলো হরমুজ প্রণালি। সেটা বন্ধ থাকলে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে যায়। সব মিলিয়ে আমরা শঙ্কিত।

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ বন্ধে রপ্তানি কমছে, খরচ বেড়েছে দ্বিগুণ
মরিয়ম সেঁজুতি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের আকাশপথ বন্ধ হয়ে গেছে। এমিরেটস ও কাতার এয়ারওয়েজের মতো বিমান সংস্থাগুলো অনেক ফ্লাইট বাতিল করেছে। এর জেরে বিশ্বের বড় বড় পোশাক ব্র্যান্ডের বিপুল পরিমাণ পণ্য বিমানবন্দরে আটকে আছে। এতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন পোশাক কারখানার মালিকেরা।
দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের অন্যতম পোশাক উৎপাদন কেন্দ্র। বিশ্বখ্যাত ফাস্ট ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের কারখানা থেকে টি-শার্ট, জিন্সের শার্ট-প্যান্টসহ নানা ধরনের পোশাকের জোগান দেয়। তবে ভ্যন্তরীণ অস্থিরতায় দেশের পোশাক খাতে নানা ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এমনকি বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীণ সরকারের সময়ে পাশের দেশের সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের প্রভাবসহ নানা সমস্যায় পোশাক রপ্তানিতে টানা সাত মাস মন্দাভাব চলছে। পোশাক রপ্তানি কমায় বাংলাদেশের সার্বিক রপ্তানিতেও ধস নেমেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়কালে সামগ্রিক রপ্তানি আয় ৩ দশমিক ১৩ শতাংশ কমে ৩১ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা এক বছর আগে একই সময়ে ছিল ৩২ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাতের আয় ফেব্রুয়ারিতে ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ কমে ২ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয় ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমে ২৫ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা আগের বছর ছিল ২৬ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার।
আমরা রুট পরিবর্তন করে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন রুটে পণ্য রপ্তানি করছি। ইরান যুদ্ধের কারণে রপ্তানি থেমে নেই। তবে কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পোশাক রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে পথ পরিবর্তন করার কারণে খরচ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুন
মোহাম্মদ হাতেম, সভাপতি বিকেএমইএ
জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, আমরা রুট পরিবর্তন করে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন রুটে পণ্য রপ্তানি করছি। ইরান যুদ্ধের কারণে রপ্তানি থেমে নেই। তবে কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পোশাক রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে পথ পরিবর্তন করার কারণে খরচ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুন।
তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘ইউরোপ-আমেরিকা দুই জায়গাতেই পোশাক রপ্তানি কমছে। মোট রপ্তানিতে এটার প্রভাব পড়ছে। অপ্রচলিত বাজারেও আমরা ভালো করতে পারিনি। এ ছাড়া ফেব্রুয়ারি আমাদের নির্বাচনের মাস ছিল, কাজের সময় কম পাওয়া গেছে, বন্দর বন্ধ ছিল এজন্য বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। টোটাল রপ্তানি কমছে। গণতান্ত্রিক নতুন সরকার এসেছে। আমরা ভালো কিছু আশা করছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এখন আবার ইরান যুদ্ধ শুরু হয়েছে। বিশ্বব্যাপী এর প্রভাব পড়বে। সামনে কী প্রভাব পড়বে তা দেখার বিষয়।’
আকাশ পথ বন্ধের বিষয়ে মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলেও আমাদের পণ্য রপ্তানি চলমান রয়েছে। এখনো যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে পড়েনি। তবে এ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একইসঙ্গে এর প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়বে। তিনি বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে আমরা বিকল্প পথে পণ্য রপ্তানি করছি। তবে এতে খরচ প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।’
এ বিষয়ে পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান স্প্যারো গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ঢাকার বিমানবন্দরে আমাদের পোশাকের চালান আটকে ছিল। এগুলো দুবাই হয়ে যুক্তরাজ্যে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু দুবাই বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত থাকায় আমরা খুব বিপদে পড়েছিলাম। পরে বিকল্প পথে পণ্য পাঠিয়েছি। এতে খরচ অনেক বেড়েছে।
শোভন ইসলাম আর বলেন, বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণ কার্গো যায়, তার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ক্যাপাসিটি হ্রাস পেয়েছে। ইউরোপগামী পণ্যের বেশিরভাগ পণ্য গালফ রুটে যেত। কিন্তু গত ৫ দিন ধরে এ কার্গোগুলো বন্ধ রয়েছে। অর্থাৎ গত ৫ দিন ধরে পণ্য শিপমেন্ট করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের বেশিরভাগ সাশ্রয়ী কার্গো পরিচালনা করতো কুয়েত, গালফএয়ার ও এমিরেটস। তিনটি এয়ারলাইন্সই এখন বন্ধ রয়েছে।
শোভন বলেন, বায়াররা (বাইরের ক্রেতারা) যখন এয়ারশিপমেন্টে কার্গো নেয়, কিংবা আমাদের যখন এয়ার শিপমেন্টে কার্গো পাঠাতে হয়- তখন বায়ার এবং আমাদের যৌথ খরচে পণ্য পাঠাতে হয়। যেহেতু গালফ রুট বন্ধ, তাই প্যাসিফিক রুট অর্থাৎ হংকং, চীন, সিঙ্গাপুর দিয়ে পণ্য পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
গত শনিবার মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ওই অঞ্চলের বেশির ভাগ আকাশপথই বন্ধ। এতে বিশ্বের ব্যস্ততম বিমানবন্দর দুবাইও কয়েক দিনের জন্য কার্যক্রম স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়। কাতার এয়ারওয়েজ, এমিরেটস ও ইত্তিহাদের মতো বড় বিমান সংস্থাগুলো ফ্লাইট বাতিল করে দিয়েছে।
কমেছে রপ্তানি, বেড়েছে খরচ
বিকল্প রুটে পণ্য পাঠাতে হলে খরচ কাঠামো দ্রুত বদলে যায়, জ্বালানি ব্যয় বাড়ে, বিমার প্রিমিয়াম বাড়ে, ফ্রেইট চার্জ ঊর্ধ্বমুখী হয়। একই সময়ে তেলের বাজার অস্থির থাকায় ব্যারেলপ্রতি দাম ১০০ ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কা থাকলে পরিবহন খরচ আরও বেড়ে যেতে পারে। তখন রপ্তানিকারকদের প্রফিট মার্জিন বা লাভ কমে যায় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। রপ্তানিকারকদের মতে, আকাশপথে মধ্যপ্রাচ্যে পণ্য পাঠানো কার্যত বন্ধ থাকায় পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সিটিজেন জার্নালকে বলেছেন, সমুদ্রপথে এখনো বড় ধরনের সমস্যা হয়নি। তবে আকাশপথে রপ্তানি কার্যত স্থবির। যুদ্ধ পরিস্থিতির ঠিক কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা পরে নিরূপণ করা হবে।
সংকট দীর্ঘ হলে প্রভাব শুধু আকাশপথে সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিপিং বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে দীর্ঘ সময় জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে সিঙ্গাপুর বা কলম্বোর মতো ট্রানশিপমেন্ট হাবে কনটেইনার জট তৈরি হতে পারে। এতে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ধীর হবে এবং পরিবহন ব্যয় বাড়বে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯২ ভাগই হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। এ বন্দর দিয়ে পাঠানো হয় রপ্তানি পণ্যের ৯৮ ভাগ। সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা কিংবা মালয়েশিয়ার বন্দর হয়ে পণ্যবাহী জাহাজগুলো যায় ইউরোপ-আমেরিকায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের জের ধরে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় এই রুটে পণ্য পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ‘কেপ অব গুড হোপ’ হয়ে বিকল্প রুটে যেতে হবে জাহাজগুলোকে। এতে বেড়ে যাবে বীমা খরচ ও জাহাজের পরিবহন ব্যয়। পণ্য পৌঁছাতে সময় লাগবে দ্বিগুণ।
নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিকল্প পথে হাঁটতে হবে আমাদের। খরচ বাড়লেও নিরাপত্তার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে ।
পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাজার ইউরোপ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পরিসংখ্যানবিষয়ক সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ পাঁচ বছরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ইইউর দেশগুলোতে ১৯ বিলিয়ন ইউরোর বেশি মূল্যের পোশাক রপ্তানি করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানির ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ হয়েছে বাংলাদেশ থেকে।
বিকেএমইএ-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় পণ্যবাহী ফ্লাইট স্থগিত আছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে। তিনি বলেন, ইরান, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হলো হরমুজ প্রণালি। সেটা বন্ধ থাকলে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে যায়। সব মিলিয়ে আমরা শঙ্কিত।




