শিরোনাম

রেকর্ড ছুঁয়ে হঠাৎ কেন কমলো স্বর্ণের দাম

রেকর্ড ছুঁয়ে হঠাৎ কেন কমলো স্বর্ণের দাম
ছবি: সংগৃহীত

টানা ঊর্ধ্বগতির পর বিশ্ববাজারে স্বর্ণ ও রুপার দামে হঠাৎ বড় ধরনের পতন হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) বিশ্ববাজারে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম প্রায় ২ লাখ ৮২ হাজার টাকায় পৌঁছে রেকর্ড গড়ে। একই দিনে রুপার দাম ওঠে প্রায় ৬ হাজার ২০০ টাকায়। কিন্তু পরদিন হঠাৎ করেই এই ঊর্ধ্বগতি থেমে যায়। একদিনেই স্বর্ণের দাম কমে যায় প্রায় ১০ শতাংশ এবং রুপার দাম প্রায় ২৮ শতাংশ।

পতনের ধারা থামেনি সোমবারও। দিন শেষে স্বর্ণের দাম আরও প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং রুপার দাম প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নেমে আসে। তবে মঙ্গলবার বাজারে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। গ্রিনিচ মান সময় সকাল ৬টা পর্যন্ত স্বর্ণের দাম প্রায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং রুপার দাম প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে।

দাম এত বেড়েছিল কেন

বিশ্লেষকদের মতে, গত এক বছরে স্বর্ণ ও রুপার দামের এই তীব্র ঊর্ধ্বগতি মূলত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রতিফলন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তনের পর তার শুল্কনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা নিয়ে চাপ, এমনকী গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকির মতো বক্তব্য বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করে। এসব কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের মান দুর্বল হয়।

এর ফলে বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকেন। ঐতিহাসিকভাবে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় স্বর্ণ ও রুপাকে মূল্য ধরে রাখার নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়।

গত বছর ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের পর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত সময়ে স্বর্ণের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়। একই সময়ে রুপার দাম প্রায় চার গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়।

ঋণঝুঁকি ও স্বর্ণের আকর্ষণ

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঊর্ধ্বগতি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতিও তুলে ধরে। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দ্রুত বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করেছে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। এমন পরিস্থিতিতে স্বর্ণের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

প্লেনিসফার ইনভেস্টমেন্টসের পোর্টফোলিও কৌশল বিভাগের প্রধান দিয়েগো ফ্রানজিন বলেন, বর্তমান বিশ্বে প্রায় সব আর্থিক লেনদেনেই কোনো না কোনো ঋণঝুঁকি থাকে। কিন্তু স্বর্ণের ক্ষেত্রে এমন কোনো পাল্টা পক্ষ নেই।

তার ভাষায়, স্বর্ণ কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় না, কোনো সুদ দেয় না এবং এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল নয়। অস্তিত্বের কারণেই এটি নিরাপত্তা দেয়।

স্বর্ণের দাম বাড়ার আরেকটি বড় কারণ হলো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ব্যাপক স্বর্ণ কেনা। চীন, তুরস্কসহ কয়েকটি দেশ ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে তাদের স্বর্ণের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।

হঠাৎ পতনের কারণ কী

এই আকস্মিক দরপতনের পেছনে একাধিক কারণ দেখছেন বিশ্লেষকেরা। শুক্রবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তিনি কেভিন ওয়ার্শকে ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনয়ন দেবেন। বিনিয়োগকারীরা এই সিদ্ধান্তকে তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল ও নীতিগত ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখেন।

এ ছাড়া একই দিনে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সমঝোতার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এর ফলে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কমতে পারে– এমন ধারণা তৈরি হয় এবং বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিভীতি কিছুটা কমে।

এর পাশাপাশি অনেক বিশ্লেষকের মতে, দাম এত দ্রুত ও এত বেশি বেড়ে যাওয়ায় বাজারে একটি স্বাভাবিক সংশোধন ছিল প্রায় অনিবার্য। বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলে নিতে শুরু করলে বিক্রির চাপ বাড়ে এবং পতন তীব্র হয়।

সামনে কী হতে পারে

বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে স্বর্ণ ও রুপার বাজারে আরও অস্থিরতা থাকতে পারে। তবে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের ভবিষ্যৎ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার প্রবণতা এই বাজারকে আবারও সহায়তা করতে পারে।

এই কারণেই সাম্প্রতিক পতনের পরও অনেক বিনিয়োগকারী স্বর্ণ ও রুপাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের নিরাপদ মাধ্যম হিসেবেই দেখছেন।

/এসএ/