শিরোনাম

সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধিতে ব্যবসায়ীদের কারসাজি, বিপাকে ক্রেতা

নিজস্ব প্রতিবেদক
সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধিতে ব্যবসায়ীদের কারসাজি, বিপাকে ক্রেতা
ছবি: সিটিজেন জার্নাল

সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বাজারে হঠাৎ করেই বৃদ্ধি পেয়েছে সয়াবিন তেলের দাম। আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী কোম্পানি এবং ব্যবসায়ীদের একক সিদ্ধান্তে লিটার প্রতি ১২ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। পাশাপাশি বাজারে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম সংকট। এতে অতিরিক্ত দাম দিয়েও অনেক জায়গায় চাহিদা অনুযায়ী তেল মিলছে না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় বিপাকে পড়েছে সাধারণ ক্রেতারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরকার নির্ধারিত মূল্য ১৯৫ টাকা ও ৫ লিটার ৯৫৫ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা। তবে সম্প্রতি সয়াবিন তেলের নতুন দাম বেধে দিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। মিল-মালিকদের এই সংগঠনটি চিঠিতে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ২০৭ টাকা, ৫ লিটার ১ হাজার ২০ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলে ১৮৫ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, সরকার এই মূল্য অনুমতি দেওয়ার আগেই বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) থেকে নিজেরাই নতুন দাম কার্যকর করে নিয়েছে ব্যবসায়ীরা।

ক্রেতাদের দাবি, ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের দাম কারসাজির এই খেলা আগেই জেনে যায় খুচরা ব্যবসায়ীরা। চারদিকে সয়াবিন তেলের মজুতে হিড়িক পড়ে। এতে বাজারে অনেক দোকানেই মিলছে না বোতলজাত সয়াবিন তেল। বাধ্য হয়ে খোলা তেল কিনতে হচ্ছে বেশি দামে।

সরকারি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে সাধারণ সময়ে প্রতি মাসে সয়াবিন তেলের গড় চাহিদা প্রায় ৮০ হাজার থেকে ৯০ হাজার মেট্রিক টন। আর বার্ষিক গড় চাহিদা প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ মেট্রিক টন। বিশাল চাহিদায় মাত্র ১০ শতাংশ পূরণ হয় দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে। বাকি ৯০ শতাংশ চাহিদা পূরণে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ৪-৫টি দেশে থেকে সয়াবিন তেল ও সয়াবিন বীজ আমদানি করা হয়। ফলে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে, দেশেও তার প্রভাব পড়ে।

এনবিআরের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে ৯ লাখ ৯৯ হাজার ৩৭ টন। গত অর্থবছরের একই সময়ে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছিল ১৩ লাখ ১৮ হাজার ৩৪৭ টন। একই সময়ে গত বছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৩০২ টন ভোজ্যতেল কম আমদানি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি কমিয়ে সরকারকে চাপে ফেলে ব্যবসায়ীদের তেলের দাম বৃদ্ধির পাঁয়তারা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। সর্বশেষ গত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৬ টাকা বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। এরই মধ্যে ফের তেলের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়াকে অধিক মুনাফা লাভের পাঁয়তারা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রতিবাদে ‘অসাধু’ ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন করেছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। বুধবার (৮ এপ্রিল) জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, সরকার নির্ধারিত মূল্য উপেক্ষা করে প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ৩০ থেকে ৩৪ টাকা বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। কোথাও আবার বোতলজাত তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। এতে সাধারণ ভোক্তারা প্রতারিত হচ্ছেন এবং অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ছেন।

ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া বলেন, ‘অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভোক্তা অধিকার সংস্থাকে আরও সক্রিয় হতে হবে।’

ভোজ্যতলের দাম বৃদ্ধির বিপক্ষে সরকার

এদিকে, তেলের দাম সমন্বয় করতে মিল-মালিকদের সাম্প্রতিক চিঠির প্রেক্ষিতে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দামের বিশ্লেষণ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তথ্য বিশ্লেষণে বর্তমান দামই আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছে মন্ত্রণালয়। ফলে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর দরকার নেই বলে জানা গেছে।

তবে সরকারের এমন বিশ্লেষণ সত্ত্বেও সয়াবিন তেলের আমদানি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী কোম্পানিরা।

টিকে গ্রুপের পরিচালক শফিকুল আথহার সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়লে আমাদের কিছু করার নেই। আর বর্তমানে ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে যে দামে তেল বিক্রি হচ্ছে, সে তুলনায় বাংলাদেশের দাম এখনো কম রয়েছে। সবাই একই সোর্স থেকে ভোজ্য তেল আমদানি করছে। কেউ লোকসান দিয়ে ব্যবসা করবে না।’

শফিকুল আথহার আরও বলেন, ‘২০ বছর আগে দেশে ২৮টি ভোজ্য তেলের কারখানা ছিল। আর দশ বছর আগেও ছিল দশটির উপরে। বর্তমানে হাতে গোনা দুই-তিনটি প্রতিষ্ঠান ভোজ্যতেল আমদানি ও পরিশোধন করছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে এবং আমদানি সঙ্গে বিক্রির মিল না থাকলে ব্যবসায়ীরা ভোজ্যতেল আমদানি বন্ধ করে দেবে।’

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আগামী রবিবার (১২ এপ্রিল) ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

অন্যদিকে, তেলের কৃত্রিম সংকট ও মজুত রোধে দেশের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) র‌্যাব সদর দপ্তর থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বুধবার সারা দেশে মজুত করে রাখা মোট ১ লাখ ৪২ হাজার ১৭৩ লিটার ভোজ্যতেল জব্দ করা হয়। এতে জড়িতদের মোট ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে এমন অভিযান চলমান থাকবে বলে জানানো হয়।

বিশ্লেষকরা মতে, শুধু জরিমানা বা অভিযানে এই সমস্যা সমাধান হবে না। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর একক আধিপত্য কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এবং নিয়মিত মনিটরিং ছাড়া বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

/এফআর/