শিরোনাম

বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার মহাপরিকল্পনা

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার মহাপরিকল্পনা
বাংলাদেশ ব্যাংক আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মতবিনিময় সভায় গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে দেশের শিল্প ও উৎপাদন খাতে নতুন প্রাণ ফেরাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ পুনরর্থায়ন ও সহায়তা তহবিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত প্যাকেজের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা পুনরর্থায়ন স্কিমের আওতায় বিতরণ করা হবে। যা আসবে সরকার থেকে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে দেওয়া হবে। যা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অর্থায়ন করা হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এই বিশাল তহবিল বাস্তবায়িত হলে বন্ধ হয়ে যাওয়া হাজারো শিল্পকারখানা আবার চালু হবে এবং সৃষ্টি হবে ২৫ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান। শনিবার (২৩ মে) বাংলাদেশ ব্যাংক আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এমন ঘোষণা করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।

গভর্নর বলেন, গত কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধীরগতি দেখা দিয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের মতে ২০২৩ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৮ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৩.৭ শতাংশে। এর সঙ্গে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে এবং ব্যাংকিং খাতে বেড়েছে খেলাপি ঋণ ও অনিয়ম। একইসঙ্গে উচ্চ সুদের চাপের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এ অবস্থায় অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতেই এই বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়েছে।

তিনি জানান, গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, স্টিল, সিরামিক, তথ্যপ্রযুক্তি ও উৎপাদন খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। বহু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লাখো মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। নতুন এ উদ্যোগের মাধ্যমে সেসব কারখানা পুনরায় চালুর সুযোগ তৈরি হবে।

পুনরর্থায়ন তহবিলের আওতায় বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতে ৫ হাজার কোটি, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ১০ হাজার কোটি, রপ্তানি বহুমুখীকরণে ৩ হাজার কোটি এবং উত্তরবঙ্গকে কৃষি হাব হিসাবে গড়ে তুলতে আরও ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব সহায়তা কর্মসূচির আওতায় প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যান্সে ৫ হাজার কোটি টাকা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ হাজার কোটি, চামড়া ও চামড়াজাত শিল্পে ২ হাজার কোটি এবং বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এছাড়া গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ১ হাজার কোটি, হিমায়িত মাছ ও মাছ রপ্তানিতে ২ হাজার কোটি, পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন বিনিয়োগে ১ হাজার কোটি, বিদেশে কর্মসংস্থানে ১ হাজার কোটি, স্টার্টআপে ৫০০ কোটি এবং সৃজনশীল অর্থনীতিতে আরও ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। গভর্নর আরও জানান, সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে অনুদান হিসাবে দেওয়া হবে। এটি ঋণ নয়।

সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য শুধু ঋণ বিতরণ নয়, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানো। এর মাধ্যমে কৃষি খাতে ৯ লাখ, বন্ধ কারখানায় ২ লাখসহ ২৫ লাখের বেশি কর্মসংস্থান হবে বলে জানান তিনি। বন্ধ শিল্পকারখানাগুলোকে পুনরায় সচল করে অর্থনীতিতে নতুন গতি ফিরিয়ে আনাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।’ তিনি আরও বলেন, এই তহবিল পুরোপুরি কার্যকর হলে শিল্প উৎপাদন বাড়বে, রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী হবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হবে।

গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানান, পুনরর্থায়ন স্কিমের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে ৪ শতাংশ সুদে অর্থ দেবে। ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ স্প্রেড রাখতে পারবে। ফলে বড় ঋণগ্রহীতারা সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন। তবে ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থাপনা ব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় ছোট উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে সুদের হার কিছুটা বাড়তে পারে বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যাশা, এই বিশেষ উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের শিল্প, কৃষি, রপ্তানি ও গ্রামীণ অর্থনীতি আবারও ঘুরে দাঁড়াবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বাড়বে কর্মসংস্থান, সমাধান হবে বেকার সমস্যার, সচল হবে দেশের অর্থনীতি।

/এমআর/