শিরোনাম

রামিসা ধর্ষণ-হত্যা: সাক্ষ্য দিলেন বাবা-মাসহ ১৬ জন

আদালত প্রতিবেদক
রামিসা ধর্ষণ-হত্যা: সাক্ষ্য দিলেন বাবা-মাসহ ১৬ জন
আদালত প্রাঙ্গণে সোহেল রানা (বাঁয়ে) ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার

রাজধানীর পল্লবীতে ধর্ষণের পর ৮ বছরের শিশু রামিসাকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন শিশুটির বাবা-মাসহ ১৬ জন। মঙ্গলবার (২ জুন) ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে তারা সাক্ষ্য দেন।

মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার। গতকাল সোমবার (১ জুন) তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। এর মধ্য দিয়ে এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। সাক্ষ্য গ্রহণ শুরুর জন্য গতকালই আদালত আজকের দিন ধার্য করেন।

মামলায় প্রথম সাক্ষী দেন রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। এ সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। অসুস্থ বোধ করায় আদালতের অনুমতি নিয়ে চেয়ার বসে সাক্ষ্য দেন হান্নান। তিনি বলেন, ঘটনার দিন ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে অফিসের উদ্দেশে বের হই৷ ক্যান্টনমেন্ট হয়ে বনানীর কাকলী অফিসে যাওয়ার পর তার স্ত্রী পারভীন আক্তার ফোন দিয়ে জানান, রামিসাকে পাওয়া যাচ্ছে না। তারপর বাসায় ফিরে আসি। বাসার সামনে তখন অনেক লোক জড়ো হয়ে ছিল।

হান্নান বলেন, ফ্ল্যাটের সামনে পৌঁছার স্ত্রী বলতে থাকেন, পাশের ফ্ল্যাটে (সোহেল রানা ও স্বপ্নার ফ্ল্যাট) রামিসা আটকে আছে৷ সেখানে রাজু নামে একজন দরজার তালা ভাঙার চেষ্টা করছিল। অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করলেও কেউ দরজা খোলেনি। তখন নিচে গিয়ে একটা হাতুড়ি নিয়ে এসে তিনি দরজার তালা ভাঙার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি অন্য লোকজনও ভাঙার চেষ্টা করে।

রামিসার বাবার ভাষ্য, এক পর্যায়ে দরজার তালা ভেঙে যায়। তালা ভাঙার ছিদ্র দিয়ে একজনকে দেখতে পান। ভেতরে ঢুকে কমন রুম ও বাথরুমের দরজা বন্ধ দেখতে পান। টয়লেটের ভেতরে রক্ত। তখন স্বপ্না নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিলেন। আসামিরা যেই রুমে বসবাস করেন, সেই রুমও বন্ধ ছিল। উপস্থিত একজন স্টিলের খাট উঁচু করে দেখেন বালতির ভেতর রামিসার মাথা। তখন তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

এ সময় আইনজীবী খণ্ডিত মাথার ছবি দেখালে কাঠগড়ায় বসে কেঁদে ফেলেন বাবা। পরে তাকে জেরা করেন আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমূল্যাহ।

বেলা ১১টার দিকে সাক্ষ্য দেওয়া শুরু করেন রামিসার মা পারভীন আক্তার। তিনি বলেন, আমি রান্না করছিলাম৷ রান্নার শেষ পর্যায়ে বড় মেয়েকে তার চাচা গোলাম মোস্তফার বাসায় যেতে বলি। তখন ছোট মেয়ে রামিসা বলে, আম্মু আমিও যাব। রান্না ঘর থেকে বুঝতে পারি, দুইজন রেডি হচ্ছে। তবে বড় মেয়ে তাকে রেখে বের হয়ে যায়। আমি বুঝতে পারিনি, ওকে নিয়ে যায়নি।

পারভীন আক্তার বলেন, রান্নাঘর থেকে চিৎকার শুনতে পাই। পাশের ফ্ল্যাটের বাচ্চা চিৎকার করছে, এটা ভেবেছি। কিছুক্ষণ পর দেখি দরজা খোলা। কিছুক্ষণ পর বড় মেয়ে একা বাসায় ফিরে আসে। তাকে জিজ্ঞাসা করি, রামিসা কোথায়? নিচে গিয়ে দেখি রামিসা সেখানে নেই। লোকজনকে জিজ্ঞাসা করি, রামিসাকে দেখছে কি না। দোতলায় ব্যাচেলারদের রুম চেক করেও পাইনি। তিন তলায় এসে রুমের দরজার ধাক্কা দিলে খোলে না। তখন দরজার সামনে নিচে দেখি আমার মেয়ের একটা জুতা পড়ে আছে৷ তখন আমি চিৎকার করি।

তিনি বলেন, এসময় বিভিন্ন ফ্ল্যাট থেকে লোকজন আসেন। তারা এসে দরজা ধাক্কা দিলেও খোলেনি। পরে নিচে থেকে ১০/১২ জন লোক আসেন। এসময় আমার স্বামী ফোন পেয়ে অফিস থেকে আসেন।

এদিন আরও সাক্ষ্য দেয় রামিসার বড় বোন। রুদ্ধদ্বার বিচারকক্ষে (ক্যামেরা ট্রায়াল) এই সাক্ষ্য নেওয়া হয়। এরপর রামিসার ফুপু, চাচাও সাক্ষ্য দেন। দুপুর ১২টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত এই মামলায় মোট ১০ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এরপর আদালত বিরতিতে যান। বিরতির পর আরও ৬ জন সাক্ষ্য দেন।

এর আগে সকাল ৯টার দিকে আসামি দুইজনকে কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে করে এনে আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সকাল সোয়া ১০টার দিকে সোহেলকে, এরপর স্বপ্নাকে আদালতের কাঠগড়ায় তোলা হয়। কাঠগড়ায় স্বপ্না কাঁদতে শুরু করেন। এ সময় তার সঙ্গে কথা বলতে চান সোহেল। তাকে থামিয়ে দেয় পুলিশ।

সকাল সাড়ে ১০টার পর বিচারক এজলাসে আসেন। এরপর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান শুনানি শুরু করেন। তিনি আসামি সোহেলের গণমাধ্যমে এলোমেলো কথা বলার বিষয় তুলে ধরেন। আদালতের কাছে তিনি আবেদন জানান, আসামিরা যেন যাতায়াতের সময় গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ না পান।

আগামীকাল বুধবার (৩ জুন) আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের দিন ধার্য্য করেছেন আদালত।

গত ১৯ মে দুপুরে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওইদিন সকালে পাশের ফ্লাটের বাসিন্দা ৩২ বছরের সোহেল শিশুটিকে গলা কেটে হত্যার পর মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। এরপর গ্রিল কেটে পালিয়ে যান। তবে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ঘরেই ছিলেন।

পুলিশ বাসা থেকে স্বপ্নাকে আটক করে। পরে সন্ধ্যায় সোহেলকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা দুইজনকে আসামি করে সেদিনই পল্লবী থানায় মামলা করেন।

সোহেল রানা আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ এবং স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে ধর্ষণের পর হত্যায় সহায়তা করার অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া এই মামলায় ১৮ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।

/এফসি/