শিরোনাম

আবু সাঈদ হত্যা: ধরাছোঁয়ার বাইরে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতারা

বেরোবি সংবাদদাতা
বেরোবি সংবাদদাতা
আবু সাঈদ হত্যা: ধরাছোঁয়ার বাইরে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতারা
কোটা সংস্কারের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে জীবন দিয়েছেন আবু সাঈদ

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, সহিংসতা এবং শহীদ আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ১৯ বিভাগের ৭১ শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দিয়েছিলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। শাস্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে ২৩ জনকে এক সেমিস্টার এবং ৩৩ জনকে দুই সেমিস্টারের জন্য বহিষ্কার করা হয়। এছাড়া ১৫ জন সাবেক শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন। তবে এক ও দুই সেমিস্টারের বহিষ্কারাদেশ শেষ হওয়ায় ইতোমধ্যে অনেকেই ক্লাসে ফিরেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৭ মে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলা, ভাঙচুর এবং শহীদ আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী, দুইজন শিক্ষক, ৩৬ জন ছাত্রলীগ নেতাকর্মী, ৮ জন পুলিশ সদস্য এবং ১২ জন স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা করা হয়। এ মামলায় ৮০ থেকে ১০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। তবে এ মামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে মাস্টার রোলে নিয়োজিত কর্মচারী পারভেজ আপেল, তৎকালীন প্রক্টর অফিসের সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান, নিষিদ্ধ ঘোষিত সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী আকাশকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত আর কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এদিকে শাস্তি শেষে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের অনেকেই ক্লাসে ফিরেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, তথ্য অনুসন্ধান কমিটি ৭২ জন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে একটি তালিকা জমা দেয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা বোর্ড ২৩ জনকে এক সেমিস্টার এবং ৩৩ জনকে দুই সেমিস্টারের জন্য বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়। এছাড়া ১৫ জন সাবেক শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রায়হান মিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগকারীরা অভিযোগ প্রত্যাহার করায় তাকে শাস্তির আওতার বাইরে রাখা হয়। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৯তম সিন্ডিকেট সভায় অভিযুক্ত ৭১ জনের বিরুদ্ধে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়।

বহিস্কৃত শিক্ষার্থীরা ইংরেজি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, লোকপ্রশাসন, বাংলা, জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব, মার্কেটিং, রসায়ন, ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান, ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ, গণিত, ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস, সমাজবিজ্ঞান এবং অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের।

১৫ জন সাবেক শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তারা হলেন- পোমেল বড়ুয়া, শামীম মাহফুজ, ধনঞ্জয় কুমার টগর, গ্লোরিয়াস (ফজলে রাব্বি), বাবুল, বিধান, তানভীর, আব্দুল্লাহ আল নোমান খান, রিফাত, ফারহাদ হোসেন এলিট, মোমিনুল, আরিফুজ্জামান ইমন, গাজীউর, শাহিদ হাসান ও মামুন।

১৪ জুলাই ২০২৪ তারিখে কোটা সংস্কারের দাবিতে রংপুর শহরের টাউন হলের সামনে পতাকা হাতে নিয়ে দাঁড়ায় আবু সাঈদ
১৪ জুলাই ২০২৪ তারিখে কোটা সংস্কারের দাবিতে রংপুর শহরের টাউন হলের সামনে পতাকা হাতে নিয়ে দাঁড়ায় আবু সাঈদ

দুই সেমিস্টারের জন্য বহিষ্কার ৩৩ জন। তারা হলেন– সেজান আহমেদ (ওরফে আরিফ), মো. আরাফাত রহমান আবির, আবু সালেহ নাহিদ, ইমরান চৌধুরী আকাশ, কফি আনান মান্নান, মাসুদুল হাসান, উজ্জ্বল মিয়া, হাবিবুর রহমান, সাখাওয়াত হোসেন, শোয়াইবুল (সাল্লু), আব্দুল্লাহ আল রায়হান, বায়েজিদ মোস্তাফী, রাসেল, সিয়াম আল নাহিদ, অমিত, আখতার হোসেন, তানজিল, মুন্না হাসান লিওন, জিহান আলী, মো. সাব্বির হোসেন (রিয়ান), গালিব হাসান, মাহমুদুর রহমান হৃদয়, মো. মোশারফ হোসেন, পিয়াস আলী, মোজাম্মেল হক, মৃত্যুঞ্জয় রায়, মো. সাজ্জাদ হোসেন, মানিক চন্দ্র সেন, রবীন্দ্র রায়, সিয়াম আরাফাত, মো. সাব্বির আহমেদ, মো. মুসান্না-বিন-আহমেদ ও শাহীন ইসলাম।

এক সেমিস্টারের জন্য বহিষ্কার ২৩ জন। তারা হলেন– মো. হাসানুজ্জামান সৌমিক, সুদীপ্ত সরকার বাঁধন, জুবায়ের মাহমুদ, কোমল দেবনাথ, মো. রিজন মণ্ডল, মো. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, ফিলিপ রায়, জিহাদ উল্লাহ, এস এম লাবু ইসলাম, জয়ন্ত চন্দ্র রায়, সবুজ কুমার, সবুজ মহন্ত, মো. মেহেদী হাসান মিরাজ, জামাল মিয়া, তৌফিক কিবরিয়া, মেজবাহুল সরকার জয়, দেবাশীষ কুমার রায়, আতেফ আসহাব দিল মণ্ডল, নাফিউল ইসলাম, তপন চৌধুরী, সাজেদুর রহমান, আমিরুল ইসলাম শুভ ও শফিউল আযম (সম্রাট)।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি রাফায়েল ইমতিয়াজ ইয়ামিন বলেন, শহীদ আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে। আমরা দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটি অনেককে বাচিঁয়ে দিয়েছে। আমরা চাই, বিষয়টির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক।

তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এক সেমিস্টার, দুই সেমিস্টার শাস্তি দিয়েছে, তা ইতিহাসে বিরল। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা এবং আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনায় এ ধরনের শাস্তি মেনে নেওয়ার মতো নয়।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সাবেক সমন্বয়ক এস এম আশিকুর রহমান বলেন, জুলাইয়ের স্ফুলিঙ্গ ছিলো শহীদ আবু সাঈদ। শহীদ হওয়ার দুই বছর হতে চলেছে অথচ এখনো তার বিচারের রায় কার্যকর হয়নি। আসামিরা গ্রেপ্তার হয় নি। আমরা জুলাই যোদ্ধারা শঙ্কিত আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমান বলেন, মামলার অনেক আসামিই গ্রেপ্তার হয়েছেন, আবার অনেকেই পলাতক রয়েছেন। তাদের গ্রেপ্তার করার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, এটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। পুলিশ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। বিশ্ববিদ্যালয় যাদের একাডেমিক শাস্তি দিয়েছিলো, শাস্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় তারা ক্লাসে ফিরেছে।

/এসআর/