শিরোনাম

কবির মোল্লার সব কেড়ে নিলো সর্বনাশা পদ্মা!

মোহাম্মদ মাহিদুল খান, মানিকগঞ্জ
মোহাম্মদ মাহিদুল খান, মানিকগঞ্জ
কবির মোল্লার সব কেড়ে নিলো সর্বনাশা পদ্মা!
পদ্মার তীব্র ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে নদী পাড়ের বসতবাড়ি। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

‘পদ্মার ঢেউ রে– ও মোর শূন্য হৃদয়-পদ্ম নিয়ে যারে....।’ কাজী নজরুল ইসলামের লেখা সেই গানের মতো আক্ষেপ ঝরে পড়লো মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার চরাঞ্চল হরিহরদিয়া এলাকার কবির মোল্লার কণ্ঠে। বসতভিটা, ফসলি জমি হারানোর পর এবার পূর্বপুরুষের কবরও হারিয়ে যেন তার বুকের ভেতরটাও শূন্য করে দিয়েছে সর্বনাশা পদ্মা।

সম্প্রতি পদ্মার তীব্র ভাঙনে কবির মোল্লার দাদা মাঈন উদ্দীন মোল্লার কবরটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। প্রায় দেড় যুগ ধরে পরিবারের কাছে স্মৃতি ও আবেগের জায়গা হয়ে নিয়েছিল কবরটি। তবে নদীভাঙনের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেছে পূর্বপুরুষের শেষ স্মৃতিচিহ্নটুকুও।

আক্ষেপ করে কবির মোল্লা বলেন, ‘বাড়িঘর, জমিজমা তো আগেই গেছে। এবার আমাদের পূর্বপুরুষের কবরটিও পদ্মা নদীতে বিলীন হয়ে গেলো।’

শুধু কবির মোল্লার পরিবারের বসতবাড়িই নয়, চলতি বছর হরিহরদিয়া, সেলিমপুর, জয়পুর ও হালুয়াঘাটসহ আশপাশের এলাকায় ভাঙনে প্রায় দেড় শতাধিক বাড়িঘর বিলীন হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। তারা জানান, গত তিন-চার বছরে চরাঞ্চলের লেছড়াগঞ্জ, সুতালড়ি ও আজিমনগর ইউনিয়নে দুই হাজারের ও বেশি বাড়িঘর ও হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। আজিমনগর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের ৪ তলা ভবন, হাতিঘাটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কয়েকটি স্কুল ও বাজার পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে।

পদ্মার আগ্রাসী রূপে বাড়িঘর ভেঙে অন্য জায়গায় নিয়ে গেছে অনেকে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
পদ্মার আগ্রাসী রূপে বাড়িঘর ভেঙে অন্য জায়গায় নিয়ে গেছে অনেকে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

হরিহরদিয়া এলাকার মোহাম্মদ রাজিব বলেন, ‘এবার বর্ষায় প্রায় ১৫০টির মতো বাড়ি নদীতে চলে গেছে। মানুষ ঘরবাড়ি সরিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। যারা আগে জমিজমার মালিক ছিলেন, এখন তাদের অনেকেরই থাকার জায়গা নেই।’

স্থানীয় বাসিন্দা জীবন বলেন, ‘আমাদের ঘরবাড়ি ও জমি নদীতে গেছে। এখন আমাদের দাদা মাঈন উদ্দীন মোল্লার কবরটিও পদ্মায় বিলীন হয়ে গেল। পূর্বপুরুষের কবরটাও যে এভাবে হারিয়ে যাবে, তা কখনো ভাবিনি।’

লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড সদস্য মোতালেব হোসেন বলেন, ‘খাদ্য মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা মহোদয় বিমান মন্ত্রী থাকাকালে লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের সেলিমপুর- হরিহরদিয়া ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রনালয়ে ডিও লেটার দিয়েছিলেন। কিন্তু এখনো এ বিষয়ে কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি বলে শুনলাম।’

লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘চর প্রায় শেষ হয়ে গেছে। এখন আর তেমন কিছুই নেই। ভাঙন ঠেকাতে কার্যকর কোনো কাজ হচ্ছে না। ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, নটাখোলা পুলিশ ফাঁড়ি ও নটাখোলা আফরোজা উচ্চ বিদ্যালয়ও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে গুরুত্বপূর্ণ এসব স্থাপনাও নদীগর্ভে চলে যেতে পারে।’

কবির মোল্লার দাদার সেই কবর। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
কবির মোল্লার দাদার সেই কবর। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

আন্ধারমানিক ঘাট থেকে লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নে চলাচলকারী ট্রলারের চালক মোহাম্মদ হাশেম বলেন, ‘সেলিমপুর শেষ, জয়পুরও শেষের পথে। হালুয়াঘাটেও ভাঙছে। হরিনা ঘাট, আজিমনগর ইউনিয়নেও ভাঙতেছে। এভাবে ভাঙতে থাকলে চর আর থাকবে না।’

স্থানীয়দের দাবি, ভাঙন অব্যাহত থাকলেও নদীতীর রক্ষায় স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছরই নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। এতে বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন চরাঞ্চলের মানুষ। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ইউনিয়ন পরিষদসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোও পড়েছে হুমকির মুখে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার বলেন, ‘আমি সম্প্রতি এখানে যোগদান করেছি। লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নদীভাঙনের বিষয়টি আমাকে জানিয়েছেন। আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শনে যাবো।’

মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান বলেন, ‘সোমবার চরাঞ্চলের লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নে ভাঙন কবলিত এলাকা ফিজিবিলিটি স্টাডি করতে যাবো। মানিকগঞ্জ-২ আসনের এমপি ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান মহোদয়সহ উপজেলা প্রশাসনও পরিদর্শনে যাবেন। পরিদর্শন শেষে বিস্তারিত জানাতে পারবো’।

/এফআর/