শিরোনাম

সাভারে ওরস বন্ধের নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াত-হেফাজতের নেতারা

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
সাভারে ওরস বন্ধের নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াত-হেফাজতের নেতারা
ওরস বন্ধের দাবিতে উপজেলা প্রশাসন ও থানায় বিক্ষোভ করেছে 'তৌহিদী জনতা'

সাভারে সুরেশ্বর পীরের অনুসারী কাজী জাবের আল জাহাঙ্গীরের বাড়িতে আগামী ২৬ ও ২৭ আগস্ট অনুষ্ঠেয় ওরস বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন ‘তৌহিদি জনতার’ ব্যানারে স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মভিত্তিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

রোববার (২৩ আগস্ট) সাভার উপজেলা প্রশাসন ও সাভার মডেল থানায় এ বিষয়ে লিখিত স্মারকলিপিও দেওয়া হয়। স্মারকলিপিতে ওরস বন্ধের পাশাপাশি কথিত ধর্মীয় বিতর্কিত বক্তব্যের অভিযোগ তদন্ত এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।

‘তৌহিদি জনতার’ পক্ষে দেওয়া স্মারকলিপিতে ১০ জন ব্যক্তি স্বাক্ষর করেছেন। তাদের মধ্যে হেফাজতে ইসলামের তিন নেতা, বিএনপির দুই নেতা, যুবদলের একজন নেতা, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের একজন নেতা, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের একজন নেতা, জামায়াতে ইসলামীর একজন কর্মী এবং স্থানীয় একজন পীর রয়েছেন।

স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন চাকুলিয়ার পীর মাওলানা তৈয়বুর রহমান খান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউসুফ সাদিক হাক্কানী, হেফাজতে ইসলাম ঢাকা জেলা উত্তর শাখার আমির মাওলানা আলী আকবর কাসেমী, মহাসচিব মাওলানা আলী আজম ও সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আমিনুল ইসলাম কাসেমী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সাভার থানা শাখার সভাপতি মাওলানা আলী আশরাফ তৈয়ব, সাভার থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল্লাহ মোহা. আবুল খায়ের বেপারী, সিনিয়র সহসভাপতি সাইদুল ইবনে হাসিব সোহেল, জামায়াতের কর্মী আমিনুল ইসলাম আমিন এবং সাভার থানা যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ মঞ্জু মোল্লা।

যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে

স্মারকলিপিতে কাজী জাবের আল জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিষয়ে বিতর্কিত বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। বিশেষ করে আল্লাহ, রাসুল ও পীরের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই—এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি নামাজ, রোজা, জান্নাত-জাহান্নাম ও কেয়ামত নিয়ে তিনি আপত্তিকর ও বিভ্রান্তিকর কথা বলেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

এসব বক্তব্যের মাধ্যমে মুসলিম সমাজকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্মারকলিপিদাতারা।

তাদের দাবি, আগামী ২৫ থেকে ২৭ আগস্ট জাবের আল জাহাঙ্গীরের বাড়িতে অনুষ্ঠেয় ওরস বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে ‘তৌহিদি জনতার’ বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবিও জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি যাতে কোনোভাবেই সংঘাতের দিকে না যায়, সে জন্য প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপও চাওয়া হয়েছে।

অভিযোগ অস্বীকার জাবের আল জাহাঙ্গীরের

তবে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কাজী জাবের আল জাহাঙ্গীর। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তার বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছিল। ওই হামলায় পরিবারের সদস্যসহ অনেকে আহত হন এবং বাড়িঘর ও যানবাহন ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়।

জাবের আল জাহাঙ্গীর বলেন, ওই ঘটনার পর স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। পরে তারাও পাল্টা মামলা করেন।

ধর্মীয় বিষয়ে তাকে নিয়ে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, সেটিকে মিথ্যা দাবি করে তিনি বলেন, কারও সঙ্গে ধর্মীয় বিতর্কে জড়ানোর ইচ্ছা তার নেই। তবে কারও আপত্তি থাকলে কোরআন-হাদিসের দলিল নিয়ে প্রশাসনের উপস্থিতিতে আলোচনায় বসতে তিনি প্রস্তুত।

তিনি জানান, তার বাবার ওফাত উপলক্ষে প্রায় ১৯ বছর ধরে তাদের বাড়িতে ঘরোয়াভাবে ওরস হয়ে আসছে। এবারও বাড়ির সীমানার মধ্যেই অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বাইরে কোনো প্যান্ডেল করা হবে না এবং মাইকও ব্যবহার করা হবে না।

তবে ওরসকে কেন্দ্র করে নিজের বাড়িতে ফের হামলার আশঙ্কা করছেন বলে জানান জাবের আল জাহাঙ্গীর। এ বিষয়ে তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন এবং প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়েও বিষয়টি জানিয়েছেন।

যা বলছেন দাবিদাতারা

বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউসুফ সাদিক হাক্কানী বলেন, জাবের আল জাহাঙ্গীরের সঙ্গে তাদের কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নেই। তবে তার বক্তব্যে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে বলে তারা মনে করেন।

তার ভাষ্য, কোরআন-হাদিসের ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে তিনি মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন এবং তার বক্তব্যের সঙ্গে ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সাংঘর্ষিকতা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করে আইনগতভাবেই ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান তিনি।

হেফাজতে ইসলাম ঢাকা জেলা উত্তর শাখার মহাসচিব মাওলানা আলী আজম বলেন, ওই এলাকার মুসল্লি ও আলেম-ওলামারা বিষয়টি নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তাদের অভিযোগ, অতীতের ওরসের সময় ইসলাম ও আকিদাবিরোধী বিভিন্ন বক্তব্য দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বিষয়টি যদি ইসলামের আকিদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে এ বিষয়ে কথা বলা ও দাবি জানানো সবার দায়িত্ব বলে তারা মনে করেন।

স্মারকলিপিতে স্বাক্ষরকারী জামায়াতের কর্মী আমিনুল ইসলাম আমিন বলেন, এলাকার আলেম-ওলামা ও সাধারণ মানুষ বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন। তাদের অভিযোগ, জাবের আল জাহাঙ্গীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসলামবিরোধী ও আপত্তিকর বক্তব্য দিয়ে আসছেন।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সাভার থানা কমিটির সভাপতি মাওলানা আলী আশরাফ তৈয়ব বলেন, তাদের মূল লক্ষ্য ওরস বন্ধ করা নয়; জাবের আল জাহাঙ্গীরের কথিত অনৈসলামিক কার্যকলাপ বন্ধ করাই তাদের উদ্দেশ্য।

সাভার থানা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি সাইদুল ইবনে হাসিব সোহেল বলেন, এলাকার শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। এক পক্ষ ওরস আয়োজন করতে চাইছে, অন্য পক্ষ তা বন্ধের দাবি জানাচ্ছে। এ নিয়ে এলাকায় যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়েছে।

যুবদলের নেতা মোহাম্মদ মঞ্জু মোল্লাও বলেন, তারা ওরস বন্ধের দাবি করছেন না; বরং সেখানে কথিত ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য দেওয়া হলে তা বন্ধের দাবি জানাচ্ছেন। এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে তারা প্রশাসনকে বিষয়টি জানিয়েছেন।

সতর্ক প্রশাসন

সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ নিয়ে যারা এসেছেন, তাদের শান্ত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাইফুল আলম জানান, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও জানানো হয়েছে। কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, সে বিষয়ে পুলিশ সতর্ক রয়েছে।

আগেও হামলা হয়েছিল

এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সাভারের চাকুলিয়া এলাকায় শাহ সুফি সৈয়দ মাওলানা কাজী আফসার উদ্দিন আল জাহাঙ্গীর আল সুরেশ্বরীর মাজার এবং তার ছেলে কাজী জাবের আল জাহাঙ্গীরের বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে।

ওই ঘটনার পর ৪ অক্টোবর কাজী জাবেরের ভাই কাজী গোলাম রসুল সাভার মডেল থানায় মামলা করেন।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২৯ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে ‘তৌহিদি জনতার’ ব্যানারে প্রায় ৫০০ ব্যক্তি লাঠিসোঁটা, রামদা, কুঠার, লোহার পাইপসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বাড়িটিতে হামলা চালান বলে অভিযোগ করা হয়। হামলাকারীরা বাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন এবং আসবাবপত্র ও জানালার কাচসহ বিভিন্ন জিনিসপত্রের ক্ষতি করেন।

এজাহারে আরও বলা হয়, হামলার সময় দুটি মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয় এবং প্রায় ২০ লাখ টাকার মালামাল লুট করা হয়। একপর্যায়ে বাড়িতে থাকা মাওলানা আফসার উদ্দিনের মাজারেও ভাঙচুরের চেষ্টা করা হয়।

খবর পেয়ে রাত ১২টার দিকে সেনাবাহিনী ও সাভার মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ওই ঘটনায় ২০ থেকে ২৫ জন আহত হওয়ার কথাও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

সেই ঘটনার প্রায় দুই বছর পর আবারও একই বাড়িতে ওরস আয়োজনকে কেন্দ্র করে বিরোধ দেখা দিয়েছে। প্রশাসন বলছে, পরিস্থিতি যাতে কোনোভাবেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির দিকে না যায়, সে বিষয়ে তারা সতর্ক রয়েছে।

/এমআর/