শিরোনাম

ঢাকার খাল শুধু পানিপ্রবাহের নালা ভাবলে জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকার খাল শুধু পানিপ্রবাহের নালা ভাবলে জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে
রাজধানীর শ্যামপুর খাল। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

রাজধানীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায় একসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা প্রশস্ত খালগুলো এখন দখল ও দূষণে অনেকটাই ভরাট হয়ে গেছে। প্রায় দেড় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে দুই সিটি করপোরেশনের নিয়মিত খাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম।

এদিকে খাল পুনরুদ্ধারের কাজেও নেই দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি। উল্টো চারটি খাল পুনরুদ্ধার প্রকল্পের কাজ সংকুচিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ মহল বলছে, খালকে শুধু পানিপ্রবাহের নালা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। এতে জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে, দীর্ঘমেয়াদে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতাধীন মোহাম্মদপুরের রামচন্দ্রপুর খাল, মিরপুরের বাইশটেকী খালসহ দিয়াবাড়ি, ইব্রাহিমপুর, কল্যাণপুর, বাউনিয়া ও দ্বিগুন এলাকার খালগুলো দখল-দূষণে বিপর্যস্ত। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) খালগুলোর অবস্থাও একই। কুতুবখালী, শ্যামপুর, রায়েরবাজার ও কামরাঙ্গীরচরের বিভিন্ন খালে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নেই; পানির বদলে প্রবাহিত হচ্ছে কালো ও দূষিত বর্জ্য।

২০২১ সালে খালগুলোর দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসা থেকে দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে তাতে পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও খাল পুনরুদ্ধার ও দখলমুক্ত করার কাজে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি।

দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেড় বছর ধরে খাল ঘিরে তাদের নিয়মিত কার্যক্রম অনেকটাই বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার পালাবদলে নগরসেবার বিভিন্ন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে খাল ব্যবস্থাপনাতেও। ফলে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং দখল উচ্ছেদ কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, সরকার খাল খননের কথা বলে দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে। এ প্রেক্ষাপটে সারা দেশেই খাল খনন কর্মসূচি চলছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো ঢাকার খাল পুনরুদ্ধারে সরকারের কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। দখলদারদের চিহ্নিত করতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

জানা গেছে, বর্তমানে দুই সিটি করপোরেশন খাল নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা না করলেও ডিএসসিসির একটি বিশেষ প্রকল্পের আওতায় মান্ডা, জিরানি, শ্যামপুর ও কালুনগর খাল পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। প্রকল্পটি সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের সময়ে অনুমোদন পায়। তবে অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের পরিধি কাটছাঁট করে খাল পুনরুদ্ধারের কাজও সংকুচিত করা হয়েছে।

কাজের পরিধি কমিয়ে আনার বিষয়ে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, খালের মূল কাজ পানিপ্রবাহ সচল রাখা। খাল কিছুটা সরু করা হলেও পানি চলাচলে সমস্যা হবে না। একইসঙ্গে পানি আইন পুরোপুরি অনুসরণ করতে গেলে উচ্ছেদসংক্রান্ত জটিলতা বাড়তে পারে। এ কারণেই সেই পথে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, চারটি খালের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও খালপাড়ের সৌন্দর্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রকল্পটি ২০২৪ সালে অনুমোদন পায়। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রকল্পটি দ্বিতীয়বার সংশোধন করা হয়। আগের পরিকল্পনায় ৫৮ পর্বে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও সংশোধিত প্রকল্পে তা প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে ৩০টি করা হয়।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক পরিকল্পনায় সিএস ম্যাপ অনুসারে চারটি খালের সীমানা নির্ধারণ এবং পানি আইন অনুযায়ী দুই পাড়ের ১০ মিটার পর্যন্ত জায়গা খালের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা ছিল। একইসঙ্গে খালগুলো নান্দনিক করতে বিভিন্ন অংশে পার্ক, গণপরিসর ও হাঁটার জায়গা রাখার পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু সংশোধিত পরিকল্পনায় এসব বাদ দেওয়া হয়েছে এবং খালের নির্ধারিত পরিধিও আরো সংকুচিত করা হচ্ছে।

কাজের পরিধি কমিয়ে আনার বিষয়ে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, খালের মূল কাজ পানিপ্রবাহ সচল রাখা। খাল কিছুটা সরু করা হলেও পানি চলাচলে সমস্যা হবে না। একইসঙ্গে পানি আইন পুরোপুরি অনুসরণ করতে গেলে উচ্ছেদসংক্রান্ত জটিলতা বাড়তে পারে। এ কারণেই সেই পথে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞ মহল বলছে, খালকে শুধু পানিপ্রবাহের নালা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। এতে জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে, দীর্ঘমেয়াদে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, পান্থপথ, শাহবাগ ও মতিঝিলের খালগুলোকে সরকার শুধু পানিপ্রবাহের লাইন হিসেবে দেখেছে। তাই এসব খালের ওপর বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে খালগুলোর জীববৈচিত্র্য পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, খাল শুধু পানিপ্রবাহের নালা নয়; এটি জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং নগরের তাপ শোষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এদিকে দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বড় পরিসরে খাল পুনরুদ্ধার কার্যক্রম না চললেও বর্তমানে তারা খালগুলোর সীমানা নির্ধারণে কাজ করছেন। এরপর পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হবে।

/এফসি/