শিরোনাম

মাঝপথে বদলে গেল ৯০০ কোটির দরপত্রের ধরন

মাঝপথে বদলে গেল ৯০০ কোটির দরপত্রের ধরন
গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকার খাল পুনরুদ্ধার, খনন ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেডকে দিয়েছে সরকার। যদিও এভাবে কাজ দেওয়ার বিষয়টি সরকারি ক্রয় বিধিমালার (পিপিআর) সরাসরি লঙ্ঘন। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাল পুনরুদ্ধার, খনন ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ মূলত ডকইয়ার্ডের নয়।

উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি (ওটিএম)-এর জন্য নির্ধারিত কাজ ডিপিএমে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। পিপিআর-২০০৮ (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস) অনুযায়ী, এই দুই ক্রয় পদ্ধতির ধরন ও শর্ত সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো কাজের ক্রয় পদ্ধতি ওটিএম অনুমোদিত হলে তা আবশ্যিকভাবে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই সম্পন্ন করতে হবে। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি (ডিপিএম) হলো সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী একটি পদ্ধতি। পিপিআর-এর বিধি ৬৭ অনুযায়ী, কেবল কিছু বিশেষ ও জরুরি ক্ষেত্রে (যেমন– হঠাৎ দুর্যোগ মোকাবিলা, বিদ্যমান যন্ত্রাংশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ খুচরা যন্ত্রাংশ কেনা বা পেটেন্টযুক্ত পণ্যের ক্ষেত্রে যেখানে অন্য কোনো বিকল্প উৎস নেই) উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় না গিয়ে একক উৎস থেকে সরাসরি ক্রয় করা যায়। একটি নিয়মিত বা ওটিএমের কাজকে কোনো প্রকার প্রতিযোগিতা ছাড়া ডিপিএমে প্রদান করা পিপিআর-২০০৮-এর মূলনীতি এবং সরকারের ক্রয় বিধিমালার পরিপন্থী।

বাংলাদেশের পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন-২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর)-২০০৮ অনুযায়ী বিশেষ কিছু জরুরি ও সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই সরাসরি একটি উৎস থেকে পণ্য, কার্য বা সেবা ক্রয়ের আইনি বৈধতা রয়েছে। তবে অবাধ প্রতিযোগিতা এড়ানো এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিতের জন্য এই পদ্ধতির ওপর কঠোর আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

ডকইয়ার্ড মূলত এমন একটি কারখানা যেখানে নৌযান (যেমন– জাহাজ, লঞ্চ, কার্গো, বার্জ ইত্যাদি) নির্মাণ, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ এবং আধুনিকায়নের কাজ করা হয়।

পিপিআরের ৭৬ ধারায় বলা আছে, যদি পণ্য বা সেবা কারিগরি কারণে কেবল একজন নির্দিষ্ট সরবরাহকারীর কাছেই পাওয়া যায়; পেটেন্ট, কপিরাইট বা অন্য কোনো বিশেষ মালিকানা অধিকারের কারণে অন্য কোনো বিকল্প না থাকে; বিদ্যমান কোনো যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা বজায় রাখার জন্য মূল সরবরাহকারীর কাছ থেকে অতিরিক্ত যন্ত্রাংশ কেনার ক্ষেত্রে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী বা কোনো জরুরি রাষ্ট্রীয় সংকটে অতি দ্রুত ক্রয়ের প্রয়োজন হলে; বিশেষ ক্ষেত্রে সরকারি মালিকানাধীন শিল্প বা কারখানা (যেমন– সরকারি ডকইয়ার্ড বা কারখানা) থেকে সরাসরি পণ্য বা সেবা ক্রয়ের সুযোগ রয়েছে।

সরাসরি ক্রয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রতিষ্ঠানের ধরন ও বাজেটের ওপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট আর্থিক সীমা বেঁধে দেওয়া থাকে।

এ প্রসঙ্গে স্থপতি আদিলুর রহমান খান বলেন, খাল খনন ও পুনরুদ্ধার ডকইয়ার্ডের কাজ নয়। এই কাজটি ডকইয়ার্ডের মাধ্যমে করানো হলে তাৎক্ষণিক ফলাফল কিছু পজিটিভ পাওয়া যাবে। তবে টেকসই প্রক্রিয়ায় এটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকবে।

ডকইয়ার্ড মূলত এমন একটি কারখানা যেখানে নৌযান (যেমন– জাহাজ, লঞ্চ, কার্গো, বার্জ ইত্যাদি) নির্মাণ, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ এবং আধুনিকায়নের কাজ করা হয়।

মাঝপথে বদলে গেল ৯০০ কোটির দরপত্রের ধরন 3
রাজধানীর শ্যামপুর খালের বর্তমান দৃশ্য। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

জানতে চাইলে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের সাবেক নির্বাহী পরিচালক এবং বুয়েটের পানি সম্পদ প্রকৌশল বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. এম. মনোয়ার হোসেন বলেন, সরকার ইচ্ছা করলে যেকোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করতে পারে। হাতিরঝিল প্রকল্পের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সরকার সেনাবাহিনীর মাধ্যমে কাজটি সম্পন্ন করেছে। দেশের সীমান্ত, উপকূলীয় ও চট্টগ্রাম এলাকায় এই ধরনের কাজ নৌবাহিনীর সহায়তায় ইতোপূর্বে করানো হয়েছে।

খাল পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ তৈরির কাজ ডকইয়ার্ডকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার তদারকির দায়িত্বে থাকা সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ) সাবেক মহাপরিচালক মো. শোহেলের রহমান চৌধুরীর কাছে। তিনি সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, কোন পরিস্থিতিতে এটা দেওয়া হয়েছে সে বিষয়টি ডিটেইল না জেনে কোনো মন্তব্য করা যাবে না। এটা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক পর্যায় থেকে করা হয়েছে।

খাল পুনরুদ্ধার কাজের প্রথম প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খায়রুল বাকের। তিনি প্রথম দরপত্র আহ্বান করেন। পরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পিডির দায়িত্ব পান তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর/যান্ত্রিক) মোহাম্মদ সফিউল্লাহ সিদ্দিক ভুঁইয়া। তিনি ১২০-১৩০ কোটি টাকার বিল দিয়েছেন।

গত বুধবার (২৪ জুন) অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির ১৯তম সভায় খাল পুনরুদ্ধার খনন ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ ডককইয়ার্ডকে দেওয়ার বিষয়টির অনুমোদন দেওয়া হয়। সেই অনুযায়ী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাস্তবায়নাধীন ‘খাল পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি’ শীর্ষক প্রকল্পের ১৭, ১৮, ২০, ২১, ২২, ২৫ এবং ৩০ নম্বর প্যাকেজের আওতায় খালগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, সংস্কার এবং নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টির চলমান প্রকল্পের কাজ সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড বাস্তবায়ন করবে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ‘রাজধানীর চারটি খাল পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি’ শীর্ষক প্রকল্পের কাজ ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে শুরু হয়। প্রকল্পের কাজ ২০২৭ সালের জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৯৮ কোটি ৩৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা। এই প্রকল্পের আওতায় কালুনগর, জিরানী, মান্ডা ও শ্যামপুর খাল পুনরুদ্ধারসহ অন্যান্য কাজ হওয়ার কথা। ডিএসসিসি এই প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করছে। তবে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাঝপথেই ডকইয়ার্ডকে কাজটি দেওয়া হয়েছে।

খাল পুনরুদ্ধার কাজের প্রথম প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খায়রুল বাকের। তিনি প্রথম দরপত্র আহ্বান করেন। পরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পিডির দায়িত্ব পান তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর/যান্ত্রিক) মোহাম্মদ সফিউল্লাহ সিদ্দিক ভুঁইয়া। তিনি ১২০-১৩০ কোটি টাকার বিল দিয়েছেন।

মাঝপথে বদলে গেল ৯০০ কোটির দরপত্রের ধরন 1
আবর্জনায় ভরে গেছে শ্যামপুর খাল। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

এই প্রকল্পের মাধ্যমে বেশকিছু কাজ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে ২০ দশমিক ৫৯ কিলোমিটারে খাল খনন ও স্লাজ অপসারণ, ৩২ দশমিক ৫৬ কিলোমিটারে সীমানা নির্ধারণ, ৩৮ দশমিক ০৬ কিলোমিটারে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, ৩২ দশমিক ৪৪ কিলোমিটারে দৃষ্টিনন্দন সুরক্ষাবেষ্টনী নির্মাণ, ওয়াকওয়ে, ল্যান্ডস্কেপিং ও সবুজায়ন এবং দুটি পাম্প স্টেশন ও দূষণ লাঘবে ৮টি কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) নির্মাণ করার কথা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পরিবেশের উন্নয়নে এই প্রকল্প অত্যন্ত জরুরি। উন্মুক্ত দরপত্রের দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে এবং কাজের সর্বোচ্চ গুণগত মান নিশ্চিতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা অনুযায়ী বিশেষায়িত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার অবসরপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ কে এম সহিদ উদ্দিনের (শহীদ উদ্দিন) বলেন, সরকার ইচ্ছা করলে সবই সম্ভব। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, নিয়ম অনুসরণ ছাড়াই সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দিয়েছে। তবে এই কাজটি নৌবাহিনীর মাধ্যমে করানোর পক্ষ আমি না। কিন্তু তাদের কাছে গেলে অন্তত খালগুলো উদ্ধার হবে। মানুষ কিছুটা স্বস্তি পাবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঢাকা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এমএল সৈকত বলেন, খাল উদ্ধার ও সৌন্দর্যবর্ধনের বিষয়টি নিয়ে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। এটি সিটি করপোরেশন ভালো বলতে পারবে।

খাল খননের কাজ ডকইয়ার্ডকে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, ৩০টি প্যাকেজের মাধ্যমে ঢাকার ৪টি খাল খনন করা হচ্ছে। এর মধ্যে শ্যামপুর ও মান্ডা খালে বেশ কিছু অবৈধ দখলদার রয়েছে। এসব অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে হলে বিশেষ বাহিনীর প্রয়োজন। এজন্য ৭টি প্যাকেজ ডকইয়ার্ডকে দেওয়া হয়েছে। তবে অবৈধ দখলদার না থাকায় অন্যান্য প্যাকেজের কাজ সিটি কর্পোরেশন করবে।

/এফসি/