শিরোনাম

নীরব শ্রমে সচল জবি ক্যাম্পাস, স্বীকৃতি চান কর্মচারীরা

জবি প্রতিনিধি
নীরব শ্রমে সচল জবি ক্যাম্পাস, স্বীকৃতি চান কর্মচারীরা
জবি ক্যাম্পাসে নিরাপত্তার দায়িাত্বে থাকা শ্রমিক। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

দিনের ব্যস্ততা শেষ হয়ে সন্ধ্যা নামার পরও থেমে থাকে না জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) কর্মচাঞ্চল্য। শিক্ষার্থীরা যখন পড়াশোনা, আড্ডা কিংবা শিক্ষাজীবনের নানা ব্যস্ততায় সময় কাটান, তখন ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে নিরবচ্ছিন্ন দায়িত্ব পালন করেন নিরাপত্তাকর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ফটক, একাডেমিক ভবন, প্রশাসনিক এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পাহারায় থাকেন নিরাপত্তাকর্মীরা।

অন্যদিকে ভোর হতেই ক্যাম্পাসের সড়ক, করিডোর, শ্রেণিকক্ষ ও আশপাশের এলাকা পরিষ্কারের কাজে নেমে পড়েন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা।

অধিকাংশ শিক্ষার্থী যখন ঘুমিয়ে থাকেন কিংবা দিনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত থাকেন, তখনও নীরবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করে যান এসব কর্মীরা, যেন শিক্ষার্থীরা একটি নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কাটাতে পারেন। দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করলেও পর্যাপ্ত স্বীকৃতি, সম্মান ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথাই মহান মে দিবসে জানালেন তারা।

রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর উপস্থিতিতে সবসময়ই থাকে ব্যস্ততা। ক্লাস-পরীক্ষা, সাংস্কৃতিক আয়োজন, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে প্রায় সারাদিন ক্যাম্পাসে মানুষের চলাচল অব্যাহত থাকে। এই ব্যস্ততার আড়ালে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও বিভিন্ন দপ্তরের সহায়ক কর্মচারীরা। তবে নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেও তাদের জীবনসংগ্রাম, সীমাবদ্ধতা ও প্রত্যাশার গল্প খুব কমই সামনে আসে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব কর্মচারীদের প্রত্যাশা তাদের শ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি, ন্যায্য মজুরি এবং একটি মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত সহায়ক কর্মচারীরা জানান, তাদের কাজের চাপ অনেক বেশি হলেও সুযোগ-সুবিধা সীমিত। বিশেষ করে অস্থায়ী ও দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারীরা চাকরির অনিশ্চয়তা এবং কম পারিশ্রমিকের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে রয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মী মো. জিহান বলেন, ‘প্রায় তেরো বছর ধইরা এইহানে হাজিরা ভিত্তিতে কাম করতাছি। আমাগো কাম শুধু গেইটে দাঁড়াইয়া থাকা না। পুরো ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা দেখন লাগে। রাইতের বেলা বিভিন্ন ভবন, করিডোর আর ফটক ঘুইরা ঘুইরা দেখতে হয়। অনেক সময় মামাগো (শিক্ষার্থীদের) নানা সমস্যাতেও সাহায্য করতে হয়। কোনো জরুরি অবস্থা হইলে সবার আগে আমাগোই ওইখানে দৌড়াইয়া যাইতে হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাইতের ডিউটি সবচেয়ে কষ্টের। পরিবাররে ঠিকমতো সময় দিতে পারি না। শীত, গরম বা বৃষ্টি যেই অবস্থাই হউক, দায়িত্ব পালন করতেই হয়। কিন্তু এই বাজারদরের সাথে আমাগো বেতন একদমই মিলে না। সংসার চালাইতে অনেক কষ্ট হয়।’

একইভাবে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাও প্রতিদিন ক্যাম্পাস পরিচ্ছন্ন রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক, একাডেমিক ভবন, অফিসকক্ষ ও আশপাশের এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব তাদের কাঁধে। সকাল থেকে দুপুর, আবার প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত সময়ও কাজ করতে হয়।

এ বিষয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী রাজু মিয়া বলেন, ‘প্রতিদিন অনেক পরিশ্রম করতে হয়। ক্যাম্পাসে এত মানুষের চলাচল, তাই ময়লাও বেশি হয়। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়েই কাজ করতে হয়। কিন্তু সেই তুলনায় বেতন খুব কম। বাসায় ফিরে আবার সংসারের কাজ সামলাতে হয়। আমরা চাই অন্তত এমন একটা বেতন, যাতে পরিবারের খরচ ঠিকভাবে চালাতে পারি। আমাদের কাজেরও একটা মূল্যায়ন দরকার।’

জবি প্রশাসনের নিরাপত্তা শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনায় এসব কর্মচারীর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তা রক্ষা থেকে শুরু করে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা সবক্ষেত্রেই তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। প্রশাসন তাদের বিভিন্ন সমস্যা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।’

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব কর্মচারীদের প্রত্যাশা ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং তাদের শ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি। প্রতিদিন নীরবে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া এই মানুষগুলোর শ্রমেই সচল থাকে প্রাণচঞ্চল ক্যাম্পাস।

/জেএইচ/