শিরোনাম

এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে ৪০ বছর ধরে শিক্ষকতা

পাবনা প্রতিনিধি
পাবনা প্রতিনিধি
এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে ৪০ বছর ধরে শিক্ষকতা
এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে পড়াতে যান মোক্তার হোসেন। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

ছোটবেলায় পোলিওতে ডান পা অচল হয়ে যায়। ওই সময় অর্থের অভাবে চিকিৎসা করতে পারেননি। এরপর ক্র্যাচ, লাঠিই চলাচলের একমাত্র ভরসা তার। কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে শারীরিক অক্ষমতা যে তুচ্ছ, তার অনন্য উদাহরণ পাবনার বেড়া পৌর এলাকার মোক্তার হোসেন।

দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর কশাঘাত ও জীবনের প্রতিকূলতা- কোনো কিছুই দমাতে পারেনি তার ইচ্ছাশক্তিকে। বয়সের ভার ও শারীরিক জটিলতায় এখন আর আগের মতো ছুটতে পারেন না। তবুও থেমে থাকেনি তার পথচলা। প্রায় চার দশক ধরে বেড়া পৌর এলাকায় সাইকেল নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন মোক্তার হোসেন।

আলাপকালে তিনি বলেন, আমি যখন দশম শ্রেণির ছাত্র, তখন বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে আলাদা হয়ে যান। আমরা ছিলাম তিন ভাই ও আট বোন। বাবার সহযোগিতা না থাকায় আমার ওপর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে ।

জানা গেছে, সংসার চালাতে মুদি দোকান দিয়ে জীবনযুদ্ধ শুরু করেন। তখন দোকানদারির পাশাপাশি স্থানীয় শিশুদের নামমাত্র বেতনে পড়ানো শুরু করেন। একপর্যায়ে দোকান ছেড়ে তিনি পুরোদমে জড়িয়ে পড়েন শিক্ষকতায়। কিনে নেন একটি পুরনো সাইকেল। এক পায়ে সাইকেল চালানো তার জন্য ছিল কঠিন পরীক্ষা। প্রথমদিকে ভারসাম্য রাখতে গিয়ে সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু চেষ্টা আর আত্মবিশ্বাসের কাছে হার মানে কঠিন বাস্তবতাও। ধীরে ধীরে তিনি রপ্ত করেন এক পায়ে সাইকেল চালানোর কৌশল। এরপর থেকে সাইকেলই হয়ে ওঠে তার চলার সঙ্গী।

মোক্তার হোসেন বলেন, ছোটবেলা থেকেই কষ্টের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছি। পড়াশোনা করে ভালো কিছু করার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু সংসারের দায়িত্বের কারণে তা আর হয়ে উঠেনি। তবে কখনো থেমে যাইনি। যতদিন শরীর চলে, ততদিন শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে যেতে চাই। আমার কষ্টের জীবন থেকে যদি কেউ সাহস পায়, সেটাই আমার বড় পাওয়া।

প্রাইভেট পড়ানোর আয় দিয়েই চলে মোক্তার হোসেনের সংসার। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
প্রাইভেট পড়ানোর আয় দিয়েই চলে মোক্তার হোসেনের সংসার। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

প্রাইভেট পড়ানোর আয় দিয়েই চলে মোক্তার হোসেনের সংসার। আগে মাসে আট থেকে দশটি বাড়িতে পড়াতে পারলেও বয়সের কারণে এখন আর আগের মতো পারেন না। বর্তমানে পাঁচ-ছয়টি বাড়িতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ান। টিউশনির জন্য নির্দিষ্ট কোনো সম্মানী নেন না। পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী যে যতটুকু দেয়, সেটিই হাসিমুখে গ্রহণ করেন। তা দিয়েই চলে তার সংসার।

মোক্তার হোসেন থাকেন একটি টিনের ঘরে। অভাব এখনো তার জীবনের সঙ্গী। তার এক ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ছে। ধারদেনা করে ছেলেকে সিঙ্গাপুরে পাঠিয়েছেন।

মোক্তার হোসেনের স্ত্রী হেলেনা খাতুন বলেন, আমাদের সংসারে অভাব সবসময়ই ছিল। কিন্তু আমার স্বামী কখনো হাল ছাড়েননি। তিনি দিনের পর দিন কাজ করে যাচ্ছেন। আমি তার এই পরিশ্রম নিয়ে গর্ববোধ করি।

বেড়ার মনজুর কাদের মহিলা ডিগ্রি কলেজের ভূগোল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ। তিনি মোক্তার হোসেনের সাবেক ছাত্র। তিনি বলেন, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় মোক্তার স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়েছি। তার কাছ থেকে শুধু পড়াশোনা নয়, পরিশ্রম ও সাহসের শিক্ষাও পেয়েছি। নিজের জীবনের অনেক স্বপ্ন পূরণ করতে না পারলেও তিনি অন্যের স্বপ্ন পূরণ করে চলেছেন। একটি পা, একটি সাইকেল আর অসীম মনোবল নিয়ে তার এই পথচলা আমার কাছে শুধু একজন শিক্ষকের সংগ্রামের গল্প নয়, এটি হার না মানা জীবনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

/এসআর/