রাশেদ রাব্বির কলমে নজরুলের ‘বিদ্রোহীর বাণী’

রাশেদ রাব্বির কলমে নজরুলের ‘বিদ্রোহীর বাণী’
সিজেডএন ডেস্ক

সময়টা ২০০৯ কিংবা ২০১০। তখন আমি দৈনিক জনকণ্ঠে কাজ করি। পত্রিকাটির সম্পাদকীয় পাতায় প্রতিদিন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বাণী প্রকাশিত হতো। কিন্তু প্রায়ই দেখা যেত, একই বাণী বারবার ছাপা হচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে একদিন কথা হলো তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান ও প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক নিয়ামত হোসেনের সঙ্গে। আলোচনার একপর্যায়ে তিনি আমাকে বিশ্বভারতী প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের বাণী সংকলনটি দেখালেন। পাশাপাশি দেখালেন বাণী চিরন্তনী নামের একটি বই, যেখানে পৃথিবীর বহু গুণী মানুষের বাণী সংকলিত হয়েছে।
তখন আমার মনে একটি প্রশ্ন জাগল– নজরুলের বাণীর পৃথক কোনো সংকলন কি আছে?
নিয়ামত হোসেন জানালেন, এমন কোনো সংকলন নেই। বাংলাদেশ কিংবা পশ্চিমবঙ্গে কেউ এ ধরনের কাজ করেননি।
বিষয়টি সেদিন থেকেই আমার মাথায় গেঁথে গেল। ভাবতে লাগলাম– কেউ এই কাজটি কেন করেননি? নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা কি হারিয়ে গেছে? নাকি তাঁর বিপুল সৃষ্টির ভেতর থেকে বাণীগুলো আলাদা করে সংকলন করার প্রয়োজন কেউ অনুভব করেননি?
আবার মনে হলো, বড় বড় কবি-সাহিত্যিক যে কাজ করেননি, নজরুল ইনস্টিটিউট কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাংলা বিভাগও যে কাজ করেনি, সেই কাজ আমি করতে চাইছি– এ কি এক ধরনের ধৃষ্টতা নয়?
অনেক ভেবেচিন্তে শেষ পর্যন্ত মনস্থির করলাম– আমিই করব।
অনুজপ্রতিম শামসুজ্জামান বাংলাবাজার ঘুরে নজরুল রচনাবলীর এক সেট এনে দিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি নিজেও নজরুলের কিছু বাণী সংকলন করে দিলেন। এরপর রচনাবলী সামনে রেখে শুরু হলো আমার কাজ।
অফিস শেষে প্রতিদিন রাত জেগে জেগে একটু একটু করে এগিয়ে যেতে থাকলাম। কখনো কোনো একটি বাণীর উৎস খুঁজছি, কখনো একই বক্তব্যের ভিন্ন পাঠ মিলিয়ে দেখছি, আবার কখনো মনে হচ্ছে– এটিও তো রাখা দরকার। এভাবেই একসময় কাজটি শেষ হলো। সাল ২০১২।
এবার প্রকাশের পালা।
আজিজ সুপার মার্কেটে কয়েকজন প্রকাশকের সঙ্গে কথা বললাম। তাঁরা আমার উদ্যোগের প্রশংসা করলেন, উৎসাহও দিলেন; কিন্তু কেউ বইটি প্রকাশ করতে আগ্রহ দেখালেন না। একজন প্রকাশক অবশ্য আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। তাঁর কাছে প্রায় এক বছর পাণ্ডুলিপি পড়ে রইল। শেষ পর্যন্ত সেটিও প্রকাশ হলো না।
অবশেষে ২০১৪ সালে একটি নতুন প্রকাশনা সংস্থা আগ্রহ দেখিয়ে বইটি প্রকাশ করল। তবে প্রকাশনা সংস্থাটি নতুন এবং কিছুটা অপেশাদার হওয়ায় বইটিতে নানা ভুলত্রুটি রয়ে গেল, যা সহজেই চোখে পড়ার মতো। তবু ২০১৪ সালের বইমেলায় প্রকাশিত বইটির বেশিরভাগ কপি বিক্রি হয়ে যায়। সেটিই ছিল আমার জন্য বড় প্রাপ্তি।
এরপর কেটে গেল প্রায় ১০ বছর।
সময় পেরিয়ে গেলেও বইটির কথা আমার মাথা থেকে মুছে যায়নি। পুনঃপ্রকাশ করব কি না, তা নিয়ে প্রথম প্রকাশকের সঙ্গে কিছু কথাবার্তাও হলো। এমন সময় কথা হলো পাঞ্জেরীর ক্রিয়েটিভ বিভাগের প্রধানের সঙ্গে। তিনি পুরো বিষয়টি শুনে যথাযথ নিয়মে পাণ্ডুলিপি জমা দিতে বললেন।
তাঁর কথায় কিছুটা পুলকিত হয়ে আবার রচনাবলী ও পুরোনো পাণ্ডুলিপি নিয়ে বসে পড়লাম। এত বছর পর আবার শুরু হলো সেই পুরোনো কাজ। এর সঙ্গে যুক্ত হলো আরও কিছু নতুন বাণী। পুরোনো পাণ্ডুলিপি নতুন করে যাচাই করলাম, সংযোজন-বিয়োজন করলাম। শেষ পর্যন্ত পাণ্ডুলিপি জমা দিলাম পাঞ্জেরীতে।
প্রায় ছয় মাস পর পাঞ্জেরী জানাল, পাণ্ডুলিপিটি নির্বাচিত হয়েছে।
কিন্তু এরপর শুরু হলো অপেক্ষার নতুন অধ্যায়। অপেক্ষার প্রহর যেন শেষই হতে চায় না। দফায় দফায় সম্পাদনা চলল। একপর্যায়ে পাঞ্জেরীর রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগ থেকে জানানো হলো, সম্পাদনার কাজ শেষ হয়েছে; এখন বইটি ছাপানো সম্ভব।
এরপর ডাক পড়ল পাঞ্জেরীর শিল্প বিভাগের।
তাঁরা জানালেন, এটি শুধু দ্বিতীয় সংস্করণ হিসেবে প্রকাশিত হবে না; এটি হবে পাঞ্জেরী সংস্করণ। ফলে প্রচ্ছদ, পৃষ্ঠাসজ্জা, বর্ণবিন্যাস– সবকিছুই হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে।
তাঁরা আরও বললেন, বইটি শুধু রাশেদ রাব্বির নয়, এটি নজরুলের। এমন একটি বই, যা সব বয়সের, সব শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রয়োজন হতে পারে। তাই বইটির আকারও এমন হওয়া দরকার, যাতে কেউ চাইলে সবসময় সঙ্গে রাখতে পারেন।
সেই ভাবনা থেকেই প্রচ্ছদের পরিকল্পনা হলো– লাল কাপড়ের ওপর স্ক্রিন প্রিন্ট।
পাঞ্জেরীর শিল্প বিভাগের মেধা, শ্রম ও সৃজনশীলতায় আমার পাণ্ডুলিপি ধীরে ধীরে একটি শিল্পকর্মে পরিণত হতে থাকল।
তবু এখানেই শেষ নয়।
বইটিকে আরও নির্ভুল করার জন্য ক্রিয়েটিভ বিভাগ আবার পুরো পাণ্ডুলিপিটি পুনরীক্ষণের অনুরোধ জানাল। আবারও বসে পড়লাম নজরুল রচনাবলী এবং পুরোনো-নতুন পাণ্ডুলিপি নিয়ে। প্রতিটি বাণী, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি উৎস আবারও মিলিয়ে দেখলাম।
শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট হলো। বইটি ছাপার অনুমোদন পেল।
কাজের একটি পর্যায়ে আমার নিজেরই মনে হয়েছিল– একটু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না তো?
পরে মনে হলো, না।
কারণ এই সৃষ্টিকর্ম আসলে আমার নয়। আমি শুধু একজন সংগ্রাহক, একজন পাঠক, একজন অনুরাগী। যে মানুষটির বাণী নিয়ে এত আয়োজন, তিনি বিদ্রোহী, বিপ্লবী, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
তাই তাঁর বাণীর একটি সংকলনও তো এমনই হওয়ার কথা– যেখানে একটু বেশি যত্ন থাকবে, একটু বেশি মমতা থাকবে, একটু বেশি শ্রম থাকবে।
শেষ পর্যন্ত বুঝলাম, বিদ্রোহীর বাণী আমার তৈরি কোনো বই নয়; এটি নজরুলেরই একটি দীর্ঘ প্রতিধ্বনি। আমি শুধু সেই প্রতিধ্বনিগুলোকে এক জায়গায় এনে পাঠকের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেছি।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও প্রাবন্ধিক

সময়টা ২০০৯ কিংবা ২০১০। তখন আমি দৈনিক জনকণ্ঠে কাজ করি। পত্রিকাটির সম্পাদকীয় পাতায় প্রতিদিন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বাণী প্রকাশিত হতো। কিন্তু প্রায়ই দেখা যেত, একই বাণী বারবার ছাপা হচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে একদিন কথা হলো তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান ও প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক নিয়ামত হোসেনের সঙ্গে। আলোচনার একপর্যায়ে তিনি আমাকে বিশ্বভারতী প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের বাণী সংকলনটি দেখালেন। পাশাপাশি দেখালেন বাণী চিরন্তনী নামের একটি বই, যেখানে পৃথিবীর বহু গুণী মানুষের বাণী সংকলিত হয়েছে।
তখন আমার মনে একটি প্রশ্ন জাগল– নজরুলের বাণীর পৃথক কোনো সংকলন কি আছে?
নিয়ামত হোসেন জানালেন, এমন কোনো সংকলন নেই। বাংলাদেশ কিংবা পশ্চিমবঙ্গে কেউ এ ধরনের কাজ করেননি।
বিষয়টি সেদিন থেকেই আমার মাথায় গেঁথে গেল। ভাবতে লাগলাম– কেউ এই কাজটি কেন করেননি? নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা কি হারিয়ে গেছে? নাকি তাঁর বিপুল সৃষ্টির ভেতর থেকে বাণীগুলো আলাদা করে সংকলন করার প্রয়োজন কেউ অনুভব করেননি?
আবার মনে হলো, বড় বড় কবি-সাহিত্যিক যে কাজ করেননি, নজরুল ইনস্টিটিউট কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাংলা বিভাগও যে কাজ করেনি, সেই কাজ আমি করতে চাইছি– এ কি এক ধরনের ধৃষ্টতা নয়?
অনেক ভেবেচিন্তে শেষ পর্যন্ত মনস্থির করলাম– আমিই করব।
অনুজপ্রতিম শামসুজ্জামান বাংলাবাজার ঘুরে নজরুল রচনাবলীর এক সেট এনে দিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি নিজেও নজরুলের কিছু বাণী সংকলন করে দিলেন। এরপর রচনাবলী সামনে রেখে শুরু হলো আমার কাজ।
অফিস শেষে প্রতিদিন রাত জেগে জেগে একটু একটু করে এগিয়ে যেতে থাকলাম। কখনো কোনো একটি বাণীর উৎস খুঁজছি, কখনো একই বক্তব্যের ভিন্ন পাঠ মিলিয়ে দেখছি, আবার কখনো মনে হচ্ছে– এটিও তো রাখা দরকার। এভাবেই একসময় কাজটি শেষ হলো। সাল ২০১২।
এবার প্রকাশের পালা।
আজিজ সুপার মার্কেটে কয়েকজন প্রকাশকের সঙ্গে কথা বললাম। তাঁরা আমার উদ্যোগের প্রশংসা করলেন, উৎসাহও দিলেন; কিন্তু কেউ বইটি প্রকাশ করতে আগ্রহ দেখালেন না। একজন প্রকাশক অবশ্য আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। তাঁর কাছে প্রায় এক বছর পাণ্ডুলিপি পড়ে রইল। শেষ পর্যন্ত সেটিও প্রকাশ হলো না।
অবশেষে ২০১৪ সালে একটি নতুন প্রকাশনা সংস্থা আগ্রহ দেখিয়ে বইটি প্রকাশ করল। তবে প্রকাশনা সংস্থাটি নতুন এবং কিছুটা অপেশাদার হওয়ায় বইটিতে নানা ভুলত্রুটি রয়ে গেল, যা সহজেই চোখে পড়ার মতো। তবু ২০১৪ সালের বইমেলায় প্রকাশিত বইটির বেশিরভাগ কপি বিক্রি হয়ে যায়। সেটিই ছিল আমার জন্য বড় প্রাপ্তি।
এরপর কেটে গেল প্রায় ১০ বছর।
সময় পেরিয়ে গেলেও বইটির কথা আমার মাথা থেকে মুছে যায়নি। পুনঃপ্রকাশ করব কি না, তা নিয়ে প্রথম প্রকাশকের সঙ্গে কিছু কথাবার্তাও হলো। এমন সময় কথা হলো পাঞ্জেরীর ক্রিয়েটিভ বিভাগের প্রধানের সঙ্গে। তিনি পুরো বিষয়টি শুনে যথাযথ নিয়মে পাণ্ডুলিপি জমা দিতে বললেন।
তাঁর কথায় কিছুটা পুলকিত হয়ে আবার রচনাবলী ও পুরোনো পাণ্ডুলিপি নিয়ে বসে পড়লাম। এত বছর পর আবার শুরু হলো সেই পুরোনো কাজ। এর সঙ্গে যুক্ত হলো আরও কিছু নতুন বাণী। পুরোনো পাণ্ডুলিপি নতুন করে যাচাই করলাম, সংযোজন-বিয়োজন করলাম। শেষ পর্যন্ত পাণ্ডুলিপি জমা দিলাম পাঞ্জেরীতে।
প্রায় ছয় মাস পর পাঞ্জেরী জানাল, পাণ্ডুলিপিটি নির্বাচিত হয়েছে।
কিন্তু এরপর শুরু হলো অপেক্ষার নতুন অধ্যায়। অপেক্ষার প্রহর যেন শেষই হতে চায় না। দফায় দফায় সম্পাদনা চলল। একপর্যায়ে পাঞ্জেরীর রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগ থেকে জানানো হলো, সম্পাদনার কাজ শেষ হয়েছে; এখন বইটি ছাপানো সম্ভব।
এরপর ডাক পড়ল পাঞ্জেরীর শিল্প বিভাগের।
তাঁরা জানালেন, এটি শুধু দ্বিতীয় সংস্করণ হিসেবে প্রকাশিত হবে না; এটি হবে পাঞ্জেরী সংস্করণ। ফলে প্রচ্ছদ, পৃষ্ঠাসজ্জা, বর্ণবিন্যাস– সবকিছুই হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে।
তাঁরা আরও বললেন, বইটি শুধু রাশেদ রাব্বির নয়, এটি নজরুলের। এমন একটি বই, যা সব বয়সের, সব শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রয়োজন হতে পারে। তাই বইটির আকারও এমন হওয়া দরকার, যাতে কেউ চাইলে সবসময় সঙ্গে রাখতে পারেন।
সেই ভাবনা থেকেই প্রচ্ছদের পরিকল্পনা হলো– লাল কাপড়ের ওপর স্ক্রিন প্রিন্ট।
পাঞ্জেরীর শিল্প বিভাগের মেধা, শ্রম ও সৃজনশীলতায় আমার পাণ্ডুলিপি ধীরে ধীরে একটি শিল্পকর্মে পরিণত হতে থাকল।
তবু এখানেই শেষ নয়।
বইটিকে আরও নির্ভুল করার জন্য ক্রিয়েটিভ বিভাগ আবার পুরো পাণ্ডুলিপিটি পুনরীক্ষণের অনুরোধ জানাল। আবারও বসে পড়লাম নজরুল রচনাবলী এবং পুরোনো-নতুন পাণ্ডুলিপি নিয়ে। প্রতিটি বাণী, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি উৎস আবারও মিলিয়ে দেখলাম।
শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট হলো। বইটি ছাপার অনুমোদন পেল।
কাজের একটি পর্যায়ে আমার নিজেরই মনে হয়েছিল– একটু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না তো?
পরে মনে হলো, না।
কারণ এই সৃষ্টিকর্ম আসলে আমার নয়। আমি শুধু একজন সংগ্রাহক, একজন পাঠক, একজন অনুরাগী। যে মানুষটির বাণী নিয়ে এত আয়োজন, তিনি বিদ্রোহী, বিপ্লবী, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
তাই তাঁর বাণীর একটি সংকলনও তো এমনই হওয়ার কথা– যেখানে একটু বেশি যত্ন থাকবে, একটু বেশি মমতা থাকবে, একটু বেশি শ্রম থাকবে।
শেষ পর্যন্ত বুঝলাম, বিদ্রোহীর বাণী আমার তৈরি কোনো বই নয়; এটি নজরুলেরই একটি দীর্ঘ প্রতিধ্বনি। আমি শুধু সেই প্রতিধ্বনিগুলোকে এক জায়গায় এনে পাঠকের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেছি।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও প্রাবন্ধিক

রাশেদ রাব্বির কলমে নজরুলের ‘বিদ্রোহীর বাণী’
সিজেডএন ডেস্ক

সময়টা ২০০৯ কিংবা ২০১০। তখন আমি দৈনিক জনকণ্ঠে কাজ করি। পত্রিকাটির সম্পাদকীয় পাতায় প্রতিদিন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বাণী প্রকাশিত হতো। কিন্তু প্রায়ই দেখা যেত, একই বাণী বারবার ছাপা হচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে একদিন কথা হলো তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান ও প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক নিয়ামত হোসেনের সঙ্গে। আলোচনার একপর্যায়ে তিনি আমাকে বিশ্বভারতী প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের বাণী সংকলনটি দেখালেন। পাশাপাশি দেখালেন বাণী চিরন্তনী নামের একটি বই, যেখানে পৃথিবীর বহু গুণী মানুষের বাণী সংকলিত হয়েছে।
তখন আমার মনে একটি প্রশ্ন জাগল– নজরুলের বাণীর পৃথক কোনো সংকলন কি আছে?
নিয়ামত হোসেন জানালেন, এমন কোনো সংকলন নেই। বাংলাদেশ কিংবা পশ্চিমবঙ্গে কেউ এ ধরনের কাজ করেননি।
বিষয়টি সেদিন থেকেই আমার মাথায় গেঁথে গেল। ভাবতে লাগলাম– কেউ এই কাজটি কেন করেননি? নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা কি হারিয়ে গেছে? নাকি তাঁর বিপুল সৃষ্টির ভেতর থেকে বাণীগুলো আলাদা করে সংকলন করার প্রয়োজন কেউ অনুভব করেননি?
আবার মনে হলো, বড় বড় কবি-সাহিত্যিক যে কাজ করেননি, নজরুল ইনস্টিটিউট কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাংলা বিভাগও যে কাজ করেনি, সেই কাজ আমি করতে চাইছি– এ কি এক ধরনের ধৃষ্টতা নয়?
অনেক ভেবেচিন্তে শেষ পর্যন্ত মনস্থির করলাম– আমিই করব।
অনুজপ্রতিম শামসুজ্জামান বাংলাবাজার ঘুরে নজরুল রচনাবলীর এক সেট এনে দিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি নিজেও নজরুলের কিছু বাণী সংকলন করে দিলেন। এরপর রচনাবলী সামনে রেখে শুরু হলো আমার কাজ।
অফিস শেষে প্রতিদিন রাত জেগে জেগে একটু একটু করে এগিয়ে যেতে থাকলাম। কখনো কোনো একটি বাণীর উৎস খুঁজছি, কখনো একই বক্তব্যের ভিন্ন পাঠ মিলিয়ে দেখছি, আবার কখনো মনে হচ্ছে– এটিও তো রাখা দরকার। এভাবেই একসময় কাজটি শেষ হলো। সাল ২০১২।
এবার প্রকাশের পালা।
আজিজ সুপার মার্কেটে কয়েকজন প্রকাশকের সঙ্গে কথা বললাম। তাঁরা আমার উদ্যোগের প্রশংসা করলেন, উৎসাহও দিলেন; কিন্তু কেউ বইটি প্রকাশ করতে আগ্রহ দেখালেন না। একজন প্রকাশক অবশ্য আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। তাঁর কাছে প্রায় এক বছর পাণ্ডুলিপি পড়ে রইল। শেষ পর্যন্ত সেটিও প্রকাশ হলো না।
অবশেষে ২০১৪ সালে একটি নতুন প্রকাশনা সংস্থা আগ্রহ দেখিয়ে বইটি প্রকাশ করল। তবে প্রকাশনা সংস্থাটি নতুন এবং কিছুটা অপেশাদার হওয়ায় বইটিতে নানা ভুলত্রুটি রয়ে গেল, যা সহজেই চোখে পড়ার মতো। তবু ২০১৪ সালের বইমেলায় প্রকাশিত বইটির বেশিরভাগ কপি বিক্রি হয়ে যায়। সেটিই ছিল আমার জন্য বড় প্রাপ্তি।
এরপর কেটে গেল প্রায় ১০ বছর।
সময় পেরিয়ে গেলেও বইটির কথা আমার মাথা থেকে মুছে যায়নি। পুনঃপ্রকাশ করব কি না, তা নিয়ে প্রথম প্রকাশকের সঙ্গে কিছু কথাবার্তাও হলো। এমন সময় কথা হলো পাঞ্জেরীর ক্রিয়েটিভ বিভাগের প্রধানের সঙ্গে। তিনি পুরো বিষয়টি শুনে যথাযথ নিয়মে পাণ্ডুলিপি জমা দিতে বললেন।
তাঁর কথায় কিছুটা পুলকিত হয়ে আবার রচনাবলী ও পুরোনো পাণ্ডুলিপি নিয়ে বসে পড়লাম। এত বছর পর আবার শুরু হলো সেই পুরোনো কাজ। এর সঙ্গে যুক্ত হলো আরও কিছু নতুন বাণী। পুরোনো পাণ্ডুলিপি নতুন করে যাচাই করলাম, সংযোজন-বিয়োজন করলাম। শেষ পর্যন্ত পাণ্ডুলিপি জমা দিলাম পাঞ্জেরীতে।
প্রায় ছয় মাস পর পাঞ্জেরী জানাল, পাণ্ডুলিপিটি নির্বাচিত হয়েছে।
কিন্তু এরপর শুরু হলো অপেক্ষার নতুন অধ্যায়। অপেক্ষার প্রহর যেন শেষই হতে চায় না। দফায় দফায় সম্পাদনা চলল। একপর্যায়ে পাঞ্জেরীর রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগ থেকে জানানো হলো, সম্পাদনার কাজ শেষ হয়েছে; এখন বইটি ছাপানো সম্ভব।
এরপর ডাক পড়ল পাঞ্জেরীর শিল্প বিভাগের।
তাঁরা জানালেন, এটি শুধু দ্বিতীয় সংস্করণ হিসেবে প্রকাশিত হবে না; এটি হবে পাঞ্জেরী সংস্করণ। ফলে প্রচ্ছদ, পৃষ্ঠাসজ্জা, বর্ণবিন্যাস– সবকিছুই হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে।
তাঁরা আরও বললেন, বইটি শুধু রাশেদ রাব্বির নয়, এটি নজরুলের। এমন একটি বই, যা সব বয়সের, সব শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রয়োজন হতে পারে। তাই বইটির আকারও এমন হওয়া দরকার, যাতে কেউ চাইলে সবসময় সঙ্গে রাখতে পারেন।
সেই ভাবনা থেকেই প্রচ্ছদের পরিকল্পনা হলো– লাল কাপড়ের ওপর স্ক্রিন প্রিন্ট।
পাঞ্জেরীর শিল্প বিভাগের মেধা, শ্রম ও সৃজনশীলতায় আমার পাণ্ডুলিপি ধীরে ধীরে একটি শিল্পকর্মে পরিণত হতে থাকল।
তবু এখানেই শেষ নয়।
বইটিকে আরও নির্ভুল করার জন্য ক্রিয়েটিভ বিভাগ আবার পুরো পাণ্ডুলিপিটি পুনরীক্ষণের অনুরোধ জানাল। আবারও বসে পড়লাম নজরুল রচনাবলী এবং পুরোনো-নতুন পাণ্ডুলিপি নিয়ে। প্রতিটি বাণী, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি উৎস আবারও মিলিয়ে দেখলাম।
শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট হলো। বইটি ছাপার অনুমোদন পেল।
কাজের একটি পর্যায়ে আমার নিজেরই মনে হয়েছিল– একটু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না তো?
পরে মনে হলো, না।
কারণ এই সৃষ্টিকর্ম আসলে আমার নয়। আমি শুধু একজন সংগ্রাহক, একজন পাঠক, একজন অনুরাগী। যে মানুষটির বাণী নিয়ে এত আয়োজন, তিনি বিদ্রোহী, বিপ্লবী, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
তাই তাঁর বাণীর একটি সংকলনও তো এমনই হওয়ার কথা– যেখানে একটু বেশি যত্ন থাকবে, একটু বেশি মমতা থাকবে, একটু বেশি শ্রম থাকবে।
শেষ পর্যন্ত বুঝলাম, বিদ্রোহীর বাণী আমার তৈরি কোনো বই নয়; এটি নজরুলেরই একটি দীর্ঘ প্রতিধ্বনি। আমি শুধু সেই প্রতিধ্বনিগুলোকে এক জায়গায় এনে পাঠকের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেছি।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও প্রাবন্ধিক









