শিরোনাম

শুধু গোপন তথ্য নয়, প্রকাশ্য তথ্যও এখন কৌশলগত সম্পদ

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
শুধু গোপন তথ্য নয়, প্রকাশ্য তথ্যও এখন কৌশলগত সম্পদ
গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

একটি যুদ্ধ শুরু হলে আমরা সাধারণত রাডার, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন কিংবা সেনা মোতায়েনের কথা ভাবি। কিন্তু আমাদের চোখের সামনেই আধুনিক যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র

মেজর মোহাম্মদ জহির হাসান, পিএসসি
মেজর মোহাম্মদ জহির হাসান, পিএসসি

তৈরি হয়েছে– তথ্যের জগতে। কোনো সামরিক স্থাপনার স্যাটেলাইট ইমেজ, যুদ্ধক্ষেত্রের একটি ভিডিও, জাহাজ চলাচলের প্রকাশ্য তথ্য, স্থানীয় সংবাদ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বা পোস্ট কিংবা একটি সরকারি নথি– আলাদাভাবে এগুলো সাধারণ তথ্য। তবে একাধিক উৎস থেকে প্রাপ্ত এসব তথ্য একসঙ্গে যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণ করলে, তা থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা মূল্যায়ন তৈরি করা সম্ভব।

সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এই বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করেছে। সংঘাতের বিভিন্ন পর্যায়ে বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ইমেজ ব্যবহার করে সামরিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কোনো স্থাপনায় আঘাতের পর কী পরিবর্তন ঘটেছে, ক্ষতির মাত্রা কতটা, কোথাও নতুন প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না– এসব প্রশ্নের কিছু উত্তর গোপন নথি ছাড়াই খুঁজে বের করা সম্ভব হয়েছে। আর এই পরিবর্তন বোঝার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স বা ‘ওসিন্ট’ (ওএসআইএনটি)।

‘ওসিন্ট’ আসলে কী

সহজ ভাষায়, সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, বিশ্লেষণ এবং সেই তথ্যকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপযোগী গোয়েন্দা মূল্যায়নে রূপ দেওয়াই ‘ওসিন্ট’।

এখানে একটি পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। কোনো বিচ্ছিন্ন/একক সংবাদ প্রতিবেদন, একটি স্যাটেলাইট ইমেজ বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কোনো তথ্য স্বতন্ত্রভাবে ‘ওসিন্ট’ নয়। এগুলো হলো উন্মুক্ত তথ্যের উৎস মাত্র।

যখন একজন প্রশিক্ষিত বিশ্লেষক বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন, উৎসের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করেন, সময় ও স্থান নির্ধারণ করেন, অন্য উৎসে প্রাপ্ত তথ্যের সঙ্গে সমন্বয় করেন, অসঙ্গতি খুঁজে বের করেন এবং শেষে একটি নির্ভরযোগ্য মূল্যায়ন তৈরি করেন– তখন সেটি ‘ওসিন্ট’-এর অংশ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ ‘ওসিন্ট’-এর আসল শক্তি তথ্য সংগ্রহে নয়, বিচ্ছিন্ন তথ্যকে অর্থবহ করে তোলায়।

নাগোরনো-কারাবাখ সংঘর্ষও দেখিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিও এবং স্যাটেলাইট চিত্র একত্র করে যুদ্ধক্ষেত্রের বিভিন্ন দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়। ফলে কোনো পক্ষের সরকারি বিবৃতিই তথ্যের একমাত্র উৎস থাকে না।

ধরা যাক, একটি ভিডিওতে কোনো সামরিক স্থাপনার আশপাশে ধোঁয়া দেখা গেল। শুধু ভিডিওটি দেখে খুব বেশি কিছু বলা যায় না। কিন্তু ভিডিওটির অবস্থান নির্ধারণ করে যদি স্যাটেলাইট চিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় সংবাদে একই ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় এবং আগের ও পরের স্যাটেলাইট চিত্রে স্থাপনাটির পরিবর্তন দেখা যায়, তাহলে ওই স্থাপনার অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য চিত্র পাওয়া সম্ভব। এটাই ‘ওসিন্ট’-এর মূল দর্শন– তথ্য নয়, যাচাইকৃত তথ্যের সমন্বয়।

পুরোনো ধারণা থেকে নতুন সক্ষমতা

‘ওসিন্ট’ নতুন কোনো ধারণা নয়। ইন্টারনেটের আসার আগেও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সংবাদপত্র, রেডিও, বই, সরকারি প্রতিবেদন, বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা ও বাণিজ্যিক তথ্য বিশ্লেষণ করতো। পার্থক্য হলো, তখন তথ্যের পরিমাণ ও গতি ছিল সীমিত। ইন্টারনেট সেই সীমা ভেঙে দিয়েছে। এরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ডিজিটাল মানচিত্র এবং বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট চিত্রের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও বদলে দিয়েছে। যে ধরনের ভৌগোলিক তথ্য একসময় মূলত রাষ্ট্রীয় সংস্থার নাগালের মধ্যে ছিল, এখন তার একটি অংশ বাণিজ্যিকভাবেও পাওয়া যায়। ফলে তথ্য আর শুধু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের হাতে তৈরি হচ্ছে না; সাধারণ মানুষ, সংবাদমাধ্যম, গবেষক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মও প্রতিনিয়ত বিপুল তথ্য তৈরি করছে।

এই বিবর্তনের সর্বশেষ ধাপে যুক্ত হয়েছে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। বিপুল পরিমাণ ছবি, ভিডিও, লেখা ও ভৌগোলিক তথ্য দ্রুত বাছাই, শ্রেণিবিন্যাস, তুলনা এবং পরিবর্তন শনাক্ত করতে এটি সহায়তা করতে পারে। ফলে একজন বিশ্লেষক যে কাজ করতে অনেক সময় নিতেন, প্রযুক্তির সহায়তায় তার একটি অংশ অনেক দ্রুত করা সম্ভব। তবে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্লেষকের বিকল্প নয়। ভুল তথ্যকে দ্রুত বিশ্লেষণ করলেও ফল ভুলই হবে। তাই প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে উৎস যাচাই, যুক্তিবোধ এবং বিশ্লেষকের পেশাগত দক্ষতার গুরুত্ব আরও বাড়ছে।

আধুনিক যুদ্ধ কী দেখাচ্ছে?

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ‘ওসিন্ট’-এর সামরিক গুরুত্ব বুঝতে সাহায্য করে। যুদ্ধক্ষেত্রের ছবি ও ভিডিও, স্যাটেলাইট ইমেজ এবং জিওলোকেশন নির্ধারণের মাধ্যমে বিভিন্ন ঘটনা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে। বেলিংক্যাটের মতো গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্য তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে যুদ্ধের ঘটনা ও ক্ষয়ক্ষতি বিশ্লেষণ করেছে। একইসঙ্গে বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট চিত্র যুদ্ধের আগে ও পরে কোনো এলাকার পরিবর্তন বোঝার সুযোগ করে দিয়েছে।

নাগোরনো-কারাবাখ সংঘর্ষও দেখিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিও এবং স্যাটেলাইট চিত্র একত্র করে যুদ্ধক্ষেত্রের বিভিন্ন দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়। ফলে কোনো পক্ষের সরকারি বিবৃতিই তথ্যের একমাত্র উৎস থাকে না।

গাজা যুদ্ধের ক্ষেত্রেও ‘ওসিন্ট’-এর গুরুত্ব গভীরভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। এতে স্যাটেলাইট ইমেজ, ভিডিও এবং নির্দিষ্ট স্থানের ভৌগোলিক তথ্য বিশ্লেষণ করে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক মাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি, পুরোনো ছবি বা ভিন্ন ঘটনার ভিডিওকে নতুন বলে চালিয়ে দেওয়ার যে প্রবণতা রয়েছে, তা শনাক্তকরণেও এটি ভূমিকা রাখছে। ফলে ‘ওসিন্ট’ যেমন তথ্য সংগ্রহের পরিধি বাড়িয়েছে, তেমনই তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতাকেও দৃশ্যমানভাবে শক্তিশালী করেছে।

এসব সংঘাতের একটি অভিন্ন শিক্ষা আছে। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্র এখন সম্পূর্ণ অদৃশ্য নয়। বরং বিভিন্ন উৎস থেকে যুদ্ধ সম্পর্কে অসংখ্য তথ্য প্রতিনিয়ত বাইরে আসছে। ফলে সামরিক সক্ষমতার একটি নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে– কে সেই তথ্য দ্রুততম সময়ে সংগ্রহ, যাচাই ও বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপযোগী করতে পারছে?

অন্যদিকে, ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত এই প্রবণতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। সামরিক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি, পরিকাঠামোগত পরিবর্তন এবং হামলার পরবর্তী বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণে বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ইমেজসহ বিভিন্ন উন্মুক্ত তথ্য এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে উঠেছে।

এসব সংঘাতের একটি অভিন্ন শিক্ষা আছে। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্র এখন সম্পূর্ণ অদৃশ্য নয়। বরং বিভিন্ন উৎস থেকে যুদ্ধ সম্পর্কে অসংখ্য তথ্য প্রতিনিয়ত বাইরে আসছে। ফলে সামরিক সক্ষমতার একটি নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে– কে সেই তথ্য দ্রুততম সময়ে সংগ্রহ, যাচাই ও বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপযোগী করতে পারছে?

বাংলাদেশের জন্য ওসিন্টের গুরুত্ব কোথায়?

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ‘ওসিন্ট’-এর গুরুত্ব কেবল যুদ্ধের সময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, দীর্ঘ স্থল সীমান্ত, বঙ্গোপসাগর উপস্থিতি, ঘনবসতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি– সব মিলিয়ে একটি শক্তিশালী তথ্য-সচেতনতা সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি। সীমান্ত এলাকার রাস্তা, সেতু, স্থাপনা কিংবা ভৌগোলিক পরিবর্তন সংক্রান্ত উন্মুক্ত তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশের সামরিক মহড়া, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার প্রকাশ্য তথ্য ও পরিস্থিতি মূল্যায়নে ‘ওসিন্ট’ অতিরিক্ত উৎস হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। অবশ্য এসব তথ্য প্রথাগত গোয়েন্দা তথ্যের বিকল্প নয়; বরং অন্যান্য উৎসের সঙ্গে সমন্বয় ও যাচাইকরণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

বঙ্গোপসাগরেও এর ব্যবহার রয়েছে। জাহাজ চলাচল, বন্দর, সামুদ্রিক অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যিক গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে প্রকাশ্য তথ্য সার্বিক সামুদ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সামরিক বাহিনীর প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ার একটি স্বাভাবিক ও কৌশলগত ধাপ হতে পারে ‘ওসিন্ট’ সক্ষমতা বৃদ্ধি। এজন্য পৃথক বা বিচ্ছিন্ন কোনো কাঠামোর প্রয়োজন নেই; বরং প্রয়োজন বিদ্যমান গোয়েন্দা কাঠামোর সঙ্গে এর কার্যকর সংযোগ।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় এর প্রয়োগ আরও প্রত্যক্ষ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বে সেই দুর্যোগের গতিপ্রকৃতি, ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো দুর্যোগের পর স্যাটেলাইট চিত্র, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, স্থানীয় সংবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ভূ-স্থানিক উপাত্ত একত্র করে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক চিত্র তুলে ধরা সম্ভব। একইভাবে, যেকোনো জাতীয় সংকটে গুজব, বিভ্রান্তিকর ছবি বা অসত্য তথ্যের সত্যতা যাচাইয়েও (ফ্যাক্ট-চেকিং) ‘ওসিন্ট’ বিশেষভাবে সহায়ক।

সামরিক বাহিনীর জন্য এর প্রয়োগ আরও বিস্তৃত হতে পারে– সামরিক ভূ-স্থানিক তথ্য বিশ্লেষণ, অবকাঠামো মূল্যায়ন, রসদ পরিকল্পনা, আঞ্চলিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, শান্তিরক্ষা মিশন এবং দুর্যোগ মোকাবিলায়।

সামরিক বাহিনী কীভাবে ‘ওসিন্ট’-কে গ্রহণ করতে পারে?

সামরিক বাহিনীর প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ার একটি স্বাভাবিক ও কৌশলগত ধাপ হতে পারে ‘ওসিন্ট’ সক্ষমতা বৃদ্ধি। এজন্য পৃথক বা বিচ্ছিন্ন কোনো কাঠামোর প্রয়োজন নেই; বরং প্রয়োজন বিদ্যমান গোয়েন্দা কাঠামোর সঙ্গে এর কার্যকর সংযোগ।

প্রথমত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন। নির্বাচিত কর্মকর্তাদের ভূ-স্থানিক বিশ্লেষণ, চিত্র বিশ্লেষণ, উপাত্ত বিশ্লেষণ, তথ্যের উৎস যাচাই, ডিজিটাল অনুসন্ধান এবং সমসাময়িক তথ্য-পরিবেশ/পরিস্থিতি সংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে কর্মকর্তাদের ‘ওসিন্ট’-এর মৌলিক ধারণা ও উৎসের নির্ভরযোগ্যতা নিরূপণ শেখানো, মধ্যমেয়াদে বিশেষায়িত বিশ্লেষক তৈরি এবং উন্নত পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-সহায়ক বিশ্লেষণ ও বহুমাত্রিক তথ্যের সমন্বয় ঘটানোর দক্ষতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, একটি কেন্দ্রীয় ‘ওসিন্ট’ বিশ্লেষণী সেল গড়ে তোলা যেতে পারে। এর দায়িত্ব শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়; কোন তথ্য গুরুত্বপূর্ণ, কোনটি যাচাইযোগ্য, কোন তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা কত এবং কোন তথ্যের সঙ্গে অন্য তথ্যের সম্পর্ক রয়েছে– এসব বিশ্লেষণ করা।

তৃতীয়ত, ‘ওসিন্ট’-কে অন্যান্য গোয়েন্দা পদ্ধতির পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে। মানবসূত্র, কারিগরি গোয়েন্দা তথ্য, ভূ-স্থানিক ও চিত্রভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য এবং মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনের সঙ্গে প্রকাশ্য উৎসের তথ্য সমন্বয় করলে একটি ঘটনার ওপর আরও শক্তিশালী সমন্বিত মূল্যায়ন তৈরি হতে পারে।

চতুর্থত, প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নিয়মিত অনুশীলন প্রয়োজন। কমান্ড পোস্ট অনুশীলন ও গোয়েন্দা অনুশীলনে ‘ওসিন্ট’-কে একটি তথ্য-উৎস হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ৩০ মিনিট, দুই ঘণ্টা বা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একটি দল কতটা নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে পারে, তা পরীক্ষা করা যেতে পারে।

পঞ্চমত, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে। ভূ-তথ্য, উপাত্তবিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, দূর অনুধাবন ও সাইবার নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রে দেশের বেসামরিক গবেষণা সামরিক বিশ্লেষণী সক্ষমতাকে সমৃদ্ধ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সামরিক প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা ও একাডেমিয়ার মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

নিজস্ব তথ্য-সুরক্ষা ও দৃশ্যমানতা নিয়ন্ত্রণ

‘ওসিন্ট ’-এর সবচেয়ে বড় শক্তিই এর প্রধান ঝুঁকি– এখানে তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত।

ভুল তথ্য, বিকৃত ছবি, পুরনো ভিডিও, ভুয়া অবস্থান কিংবা পরিকল্পিত অপপ্রচার কোনো বিশ্লেষণকে সম্পূর্ণ ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে। তাই কোনো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক মূল্যায়নে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটিমাত্র উপাত্তের ওপর নির্ভর করা অনুচিত। এক্ষেত্রে একাধিক স্বাধীন উৎসের তথ্যের মিলসাধন বা ক্রস রেফারেন্সিং, উৎসের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই এবং নির্ভরযোগ্যতার মাত্রা নির্ধারণ করা অপরিহার্য।

গোপন গোয়েন্দা তথ্যের প্রয়োজন কখনো শেষ হবে না। ‘ওসিন্ট’ তার বিকল্পও নয়। কিন্তু প্রতিদিন আমাদের চোখের সামনে তৈরি হওয়া বিপুল তথ্যভাণ্ডারকে কাজে লাগাতে পারলে এটি বিদ্যমান গোয়েন্দা সক্ষমতার একটি শক্তিশালী সহায়ক হয়ে উঠতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজস্ব আভিযানিক কার্যক্রমের নিরাপত্তা (অপারেশন্স সিকিউরিটি)। সামরিক সদস্যদের প্রকাশিত ছবি বা সামরিক স্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেকোনো ভিডিও প্রতিপক্ষের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান গোয়েন্দা তথ্য হয়ে উঠতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে কোনো একটি ছবিতে হয়তো কেবল একজন সদস্য, একটি সামরিক যানবাহন বা কোনো স্থাপনা দৃশ্যমান হওয়া; কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে এমন অসংখ্য ছবি ও উপাত্ত বিশ্লেষণ (প্যাটার্ন এনালাইসিস) করে প্রতিপক্ষ বাহিনীর সুনির্দিষ্ট অবস্থান, সক্ষমতা বা রণকৌশল সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি করে নিতে পারে। তাই ‘ওসিন্ট’ সক্ষমতা অর্জনের পাশাপাশি নিজেদের ‘ডিজিটাল দৃশ্যমানতা বা ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট’ নিয়ন্ত্রণ ও এই বিষয়ে সার্বিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। মনে রাখা প্রয়োজন, উন্মুক্ত তথ্য-পরিবেশে আমরা প্রতিপক্ষকে যেভাবে পর্যবেক্ষণ করবো, তারাও আমাদের ঠিক সেভাবেই পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পাবে।

এখন প্রয়োজন একটি বাস্তব রূপরেখা

‘ওসিন্ট’ সক্ষমতা অর্জনের প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। প্রথম ৬ থেকে ১২ মাসের প্রাথমিক পর্বে একটি ছোট বিশেষজ্ঞ দল গঠন, মৌলিক প্রশিক্ষণ প্রদান, প্রয়োজনীয় ওপেন সোর্স টুলসের ব্যবস্থা করা এবং কয়েকটি পরীক্ষামূলক অনুশীলনের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব। পরবর্তী ধাপে একে মূল গোয়েন্দা কার্যপ্রবাহের সঙ্গে একীভূত করা, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে উপাত্ত বিনিময় বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনানুসারে উন্নত ভূ-স্থানিক বিশ্লেষণ, স্যাটেলাইট ইমেজ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-ভিত্তিক প্রযুক্তি সংযোজন করা যেতে পারে। এভাবে একটি ছোট পাইলট প্রজেক্ট থেকে পর্যায়ক্রমে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলা সম্ভব।

এই অগ্রগতির সুফল নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট মূল্যায়ন সূচক নির্ধারণ করা জরুরি। কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের সময়সীমা, স্বাধীন উৎস দ্বারা মূল্যায়নের নির্ভরযোগ্যতা, প্রশিক্ষিত জনবলের সংখ্যা এবং গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ‘ওসিন্ট’-এর চূড়ান্ত ব্যবহারের শতকরা হার পর্যবেক্ষণ করেই এই সক্ষমতার প্রকৃত উন্নয়ন পরিমাপ করা সম্ভব।

আধুনিক যুদ্ধের শিক্ষা পরিষ্কার। একসময় কৌশলগত সুবিধার বড় উৎস ছিল কার কাছে কত গোপন তথ্য আছে। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি প্রশ্ন– কারা প্রকাশ্য তথ্যের বিশাল সাগর থেকে দ্রুত নির্ভরযোগ্য তথ্য খুঁজে বের করতে, যাচাই করতে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপযোগী গোয়েন্দা মূল্যায়নে রূপ দিতে পারে।

গোপন গোয়েন্দা তথ্যের প্রয়োজন কখনো শেষ হবে না। ‘ওসিন্ট’ তার বিকল্পও নয়। কিন্তু প্রতিদিন আমাদের চোখের সামনে তৈরি হওয়া বিপুল তথ্যভাণ্ডারকে কাজে লাগাতে পারলে এটি বিদ্যমান গোয়েন্দা সক্ষমতার একটি শক্তিশালী সহায়ক হয়ে উঠতে পারে।

সামরিক বাহিনীর প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ায় ‘ওসিন্ট’ কেবল একটি নতুন প্রযুক্তির সংযোজন নয়, বরং এটি তথ্যকে সুনির্দিষ্ট ও কৌশলগত সিদ্ধান্তে রূপান্তরের একটি কার্যকর মাধ্যম।

আধুনিক তথ্যযুদ্ধের যুগে নিরাপত্তা প্রতিযোগিতা কেবল গোপনীয়তা রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উন্মুক্ত ও বিশাল উপাত্তের মধ্য থেকে প্রয়োজনীয় সত্য দ্রুত শনাক্তকরণ, নির্ভুলভাবে যাচাইকরণ এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্তে রূপান্তর করার ক্ষমতাই এখন কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বের নতুন মাপকাঠি।

লেখক: মেজর মোহাম্মদ জহির হাসান, পিএসসি

/এফসি/