শিরোনাম

ইরান যুদ্ধে ইসরায়েলের ভয়াবহ পরাজয়

সিটিজেন ডেস্ক
ইরান যুদ্ধে ইসরায়েলের ভয়াবহ পরাজয়
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: সংগৃহীত

ইসরায়েল ও ইরানের সাম্প্রতিক সংঘাত এমন এক অবস্থায় গিয়ে ঠেকেছে, যেখানে কোনো পক্ষই স্পষ্ট বিজয় অর্জন করতে পারেনি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ধাক্কা খেয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে প্রধান হুমকি হিসেবে তুলে ধরে আসছিলেন নেতানিয়াহু। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে নাটকীয় উপস্থাপন, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিভিন্ন অভিযোগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ধারাবাহিক কূটনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে তিনি ইরানবিরোধী একটি কঠোর অবস্থান তৈরি করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে সেই কৌশল প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। তাই এ যুদ্ধে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভয়াবহ রাজনৈতিক পরাজয় ঘটেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ইসরায়েলের প্রত্যাশা ছিল, সংঘাত স্বল্প সময়ের মধ্যেই শেষ হবে এবং তেহরানের ওপর বড় ধরনের কৌশলগত চাপ তৈরি হবে। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয় এবং শেষ পর্যন্ত একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিতে গড়ায়, যা অনেকের কাছে ইসরায়েলের ব্যর্থতার ইঙ্গিত বহন করছে।

মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনেও এই ইস্যুতে নেতানিয়াহুর অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে, ইসরায়েলের আপত্তি তেমন গুরুত্ব পায়নি বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এমনকি ইসরায়েলি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি ঠেকানোর চেষ্টাও করেছিলেন নেতানিয়াহু, কিন্তু তা সফল হয়নি।

দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ মন্তব্য করেছেন, জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সময় ইসরায়েল কার্যত আলোচনার বাইরে ছিল, যা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। তিনি আরও বলেন, সামরিক বাহিনী তাদের দায়িত্ব পালন করলেও রাজনৈতিক নেতৃত্ব কৌশলগতভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

একই সুরে কথা বলেছেন বামপন্থী নেতা ইয়ার গোলান। তার মতে, যে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তা পরিণত হয়েছে এক বড় কৌশলগত পরাজয়ে।

যুদ্ধের লক্ষ্যগুলোও পূরণ করতে পারেনি ইসরায়েল—এমন মূল্যায়ন দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। ইরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা যায়নি, তাদের সামরিক সক্ষমতাও পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব হয়নি। বরং ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরস (আইআরজিসি) এই সংঘাতের পর আরও শক্ত অবস্থানে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাজা পরিস্থিতি ঘিরে আগেই সমালোচনার মুখে থাকা দেশটি, নতুন করে লেবাননে হামলা চালিয়ে সেই চাপ আরও বাড়িয়েছে। দক্ষিণ লেবাননে নতুন ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ গঠনের প্রচেষ্টাও নতুন সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করছে, যেখানে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষের সম্ভাবনা রয়েছে।

কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান ইসরায়েলপন্থী রাজনৈতিক ঐক্যে ফাটল দেখা যাচ্ছে। প্রগতিশীল ও কট্টর ডানপন্থী—উভয় শিবির থেকেই নেতানিয়াহুর সমালোচনা উঠছে, এমনকি ইহুদি ভোটারদের মধ্যেও সমর্থন কমার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য সমঝোতা আলোচনায় এমন কিছু বিষয় উঠে আসছে, যা যৌথ সমন্বিত কর্ম পরিকল্পনার (জেসিপিওএ) কাঠামোর কাছাকাছি বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। উল্লেখ্য, এই চুক্তির বিরোধিতায় অতীতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন নেতানিয়াহু।

ইসরায়েলের গণমাধ্যম হারেৎজের সামরিক বিশ্লেষক আমোস হারেল মনে করেন, এই ব্যর্থতার মূল কারণ নেতানিয়াহুর পরিকল্পনাগত দুর্বলতা। তার মতে, অবাস্তব কৌশল, অপর্যাপ্ত পরিকল্পনা এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত উপেক্ষা করার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

সব মিলিয়ে, এই সংঘাত ইসরায়েলের জন্য সামরিকের চেয়ে রাজনৈতিক দিক থেকেই বড় ক্ষতির কারণ হয়ে উঠেছে—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

/এমআর/