শিরোনাম

ইরানের ‘ক্ষেপণাস্ত্র নগরী’ কেশম দ্বীপ

সিটিজেন ডেস্ক
ইরানের ‘ক্ষেপণাস্ত্র নগরী’ কেশম দ্বীপ
ইরানের কেশম দ্বীপ। ছবি: এএফপি

পারস্য উপসাগরের বুকে অবস্থিত কেশম দ্বীপ একসময় পরিচিত ছিল গ্রিক পুরাণের চরিত্র এরিথ্রাসের সমাধিস্থল হিসেবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এই দ্বীপের পরিচয় বদলে গেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এটি ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কৌশলগত ঘাঁটি।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর আবারও আলোচনায় এসেছে এই দ্বীপ। এর মূল কারণ, দ্বীপটির প্রবালপ্রাচীরের নিচে গড়ে তোলা ভূগর্ভস্থ ‘ক্ষেপণাস্ত্র নগরী’, যা ইরানের সামরিক শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে পরিণত হয়েছে।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের ওপর চলমান হামলার প্রেক্ষাপটে কেশম দ্বীপের চরিত্রও পাল্টে গেছে। একসময় মুক্ত বাণিজ্য ও পর্যটনের জন্য পরিচিত এই দ্বীপ এখন সামনের সারির প্রতিরক্ষা অবস্থানে পরিণত হয়েছে। লম্বায় প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই দ্বীপটি এখন মার্কিন বাহিনীর সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবেও বিবেচিত।

প্রায় ১ হাজার ৪৪৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের কেশম দ্বীপটি হরমুজ প্রণালীর প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই দ্বীপে প্রায় ১৪ লাখ ৮০ হাজার মানুষের বাস, যাদের অধিকাংশই সুন্নি মুসলিম এবং ‘বান্দারি’ উপভাষায় কথা বলেন। সমুদ্রনির্ভর জীবনযাপনই এখানকার মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রতি বছর ‘নওরোজ সায়্যাদি’ উপলক্ষে তারা মাছ ধরা বন্ধ রেখে সমুদ্রের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

কেশম দ্বীপের কূপ থেকে পানীয় জল সংগ্রহ করছেন ইরানিরা। এই এলাকায় মোট ৩৬৬টি কূপ রয়েছে। ছবি: এএফপি
কেশম দ্বীপের কূপ থেকে পানীয় জল সংগ্রহ করছেন ইরানিরা। এই এলাকায় মোট ৩৬৬টি কূপ রয়েছে। ছবি: এএফপি

তবে যুদ্ধের ছায়া এখন এই দ্বীপের জীবনযাত্রাকেও প্রভাবিত করছে। যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহ পর, ৭ মার্চ মার্কিন বিমান হামলায় দ্বীপের একটি গুরুত্বপূর্ণ লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে অন্তত ৩০টি গ্রামে পানির সংকট দেখা দেয়।

তেহরান এই হামলাকে বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে অন্যায্য পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দিয়ে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায়।

১৯৮৯ সাল থেকে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল হিসেবে পরিচিত কেশম এখন ইরানের ‘অডুবন্ত বিমানবাহী রণতরী’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বন্দর আব্বাস শহর থেকে মাত্র ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দ্বীপটিকে ইরানের নৌবাহিনীর অন্যতম প্রধান ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, দ্বীপটির ভেতরে থাকা গোলকধাঁধার মতো কাঠামোর মধ্যে দ্রুত আক্রমণ সক্ষম নৌযান ও উপকূলীয় অস্ত্রভাণ্ডার গোপনে সংরক্ষিত রয়েছে, যদিও এর সঠিক পরিমাণ প্রকাশ করা হয়নি।

লেবাননের অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা হাসান জুনি মনে করেন, কেশম দ্বীপে অবস্থিত ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের মূল লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। তাঁর ভাষায়, ‘ইরান ইতোমধ্যেই এই সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। তাদের হুমকির পর জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।’

কেশম দ্বীপের ম্যাপ। ছবি: সংগৃহীত
কেশম দ্বীপের ম্যাপ। ছবি: সংগৃহীত

অন্যদিকে, মার্কিন প্রশাসন এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ সচল রাখতে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করছে বলেও জানা গেছে।

ঐতিহাসিকভাবে কেশম দ্বীপ বহু সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের সাক্ষী। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের নৌ-অধিনায়ক নিয়ারকাস এই দ্বীপের নাম দিয়েছিলেন ‘ওরাকটা’। পরে ইসলামি ভূগোলবিদরা একে ‘আবরকাওয়ান’ নামে উল্লেখ করেন।

১৩শ শতকে হরমুজের শাসকরা আক্রমণের মুখে তাদের দরবার এখানে স্থানান্তর করেন। ১৬শ শতকে অটোমান নৌ-অধিনায়ক পিরি রেইস এই দ্বীপে অভিযান চালান। পরবর্তীতে পর্তুগিজ, পারস্য ও ব্রিটিশদের দখলদারিত্বের মধ্য দিয়ে দ্বীপটির ঔপনিবেশিক ইতিহাস গড়ে ওঠে।

বর্তমানে দ্বীপটিতে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনা রয়েছে, যা সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকেও কেশম অনন্য। এখানে রয়েছে লবণের গুহা, ম্যানগ্রোভ বন, চুনাপাথরের গিরিখাত এবং বিখ্যাত ‘তারার উপত্যকা’। প্রায় ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ নামাকদান গুহা বিশ্বের দীর্ঘতম লবণগুহাগুলোর একটি।

ইউনেসকোর স্বীকৃতি পাওয়া কেশম জিওপার্ক ও ম্যানগ্রোভ বন এই দ্বীপকে পরিবেশগত দিক থেকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। প্রায় ৩৭০ প্রজাতির উদ্ভিদ ও বহু প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে ভরপুর এই দ্বীপ একসময় পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্র ছিল।

কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় কেশম দ্বীপ এখন আর শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেই আলোচিত।

/এমআর/