শিরোনাম

যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় ইসরায়েলের হামলায় ঝরছে প্রাণ

যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় ইসরায়েলের হামলায় ঝরছে প্রাণ
গাজা শহরের পূর্বাঞ্চলে শুজাইয়া পাড়ায় 'হলুদ রেখা'র সীমানার মধ্যে একটি ইসরায়েলি সামরিক ফাঁড়ি থেকে বিধ্বস্ত ভবনগুলো দেখা যাচ্ছে ছবি: রয়টার্স

যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পরও ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধ হয়নি। গত বছরের ১০ অক্টোবর ওই চুক্তি কার্যকরের পর থেকে ইসরায়েলের হামলায় নিহতের সংখ্যা ৬১২ ছাড়িয়েছে। আহত হয়েছে ১ হাজার ৬৪০ জনেরও বেশি।

হামাস এবং গাজার সরকারি গণমাধ্যমের সূত্রগুলো বলছে, যুদ্ধবিরতির পর গাজার বিভিন্ন বেসামরিক এলাকা, হাসপাতাল, শরণার্থীশিবিরে ও ত্রাণকেন্দ্রে ইসরায়েলি বাহিনীর বিমান, ড্রোন এবং স্থল অভিযানে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটছে। আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিরতি আইনের তোয়াক্কা না করে বেপরোয়াভাবে এসব হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। এসব হামলার ছবি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েলের দুই বছরের বেশি সময়ের আগ্রাসনে গাজায় অন্তত ৭২ হাজার ৭০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে অন্তত ১ লাখ ৭১ হাজার ৪৮৩ জন।

বাফার জোন তৈরি

২০২৪ সালের পর ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় প্রায় ১ কিলোমিটার প্রশস্ত একটি বাফার জোন (সংঘাতের প্রভাব এড়াতে বিশেষ অঞ্চল) তৈরি করেছে। এই অঞ্চলের সব ভবন বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়ে গাজার উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত এই বাফার জোন তৈরি করা হয়। এখানে ফিলিস্তিনিরা পা রাখা মাত্রই ইসরায়েলি বাহিনীর বুলেটের নিশানায় পরিণত হয়।

যুদ্ধবিরতি ঘোষণা ও বাস্তবতা

গাজা উপত্যকার খান ইউনিসে বাস্তচ্যুত ফিলিস্তিনিদের একটি শরনার্থীশিবির ছবি রয়টার্স
গাজা উপত্যকার খান ইউনিসে বাস্তচ্যুত ফিলিস্তিনিদের একটি শরনার্থীশিবির ছবি রয়টার্স

২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হয়। তথ্যমতে, এই চুক্তির শর্ত ছিল চলমান যুদ্ধকে স্থগিত রাখা, শরণার্থী ও ত্রাণ কার্যক্রম সহজতর এবং বেসামরিক এলাকায় আক্রমণ বন্ধ করা। তবে বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। যুদ্ধবিরতির পরও প্রায় প্রতিদিনই বিমান হামলা, ড্রোন হামলা, স্থল অভিযান ও আর্টিলারি হামলা চলছে। এতে হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় অন্তত ৬১২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। যাদের মধ্যে রয়েছে শরণার্থীশিবিরে থাকা শিশু, বয়স্ক নারী এবং ত্রাণ কার্যক্রমে নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবীরাও। প্রথম এক মাসেই অন্তত ৬৭ জন শিশু নিহত হয়। ২০২৬ সালের শুরু থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আরও ৩৭ জন শিশুর মৃত্যু নথিভুক্ত করা হয়েছে।

যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হচ্ছে যেভাবে

গাজা উপত্যকার দেইর আল-বালাহতে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় নিহতদের কবরস্থান ছবি: রয়টার্স
গাজা উপত্যকার দেইর আল-বালাহতে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় নিহতদের কবরস্থান ছবি: রয়টার্স

হামাস এবং গাজার সরকারি গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনী এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৬২০ বার যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে হামলা চালিয়েছে। ফলে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি বেড়েই চলেছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত তথ্যানুযায়ী, গত কয়েক সপ্তাহে গাজার জাবালিয়া, খান ইউনিস, গাজা সিটি ও বেইত লাহিয়াতে ইসরায়েলি বাহিনীর বিমান হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছে।

গাজা কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব হামলা ‘যুদ্ধবিরতির পরিপন্থী’ এবং বেসামরিক নাগরিকদের জীবন ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে।

ত্রাণকেন্দ্র এবং বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা

যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী গাজা অঞ্চলে মানবিক ত্রাণ পৌঁছানো একটি অন্যতম শর্ত ছিল। কিন্তু বাস্তবে ত্রাণ পৌঁছানোর পথে বিভিন্ন বাধা লক্ষ্য করা গেছে। স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো বলছে, ইসরায়েলি বাহিনীর বাধায় ত্রাণবাহী স্বল্পসংখ্যক ট্রাক গাজায় প্রবেশ করতে পারছে। এতে অনেক পরিবার খাবার ও ওষুধের সংকটে পড়েছে।

একাধিক সময় ত্রাণভাণ্ডার, ত্রাণবাহী যানবাহন ও শরণার্থীশিবির লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও স্থানীয় প্রতিবেদনে এমন কিছু ঘটনার বর্ণনা পাওয়া গেছে, যেখানে ত্রাণের জন্য অপেক্ষায় থাকা ফিলিস্তিনিরা আক্রান্ত হয়েছে। বেসামরিক প্রাণহানি ও ত্রাণ কার্যক্রমে বাধা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দাতা সংস্থাগুলোর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ

জাতিসংঘসহ অনেক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন, বেসামরিক লোকজনের ওপর হামলা ও ত্রাণ কার্যক্রমে লাগাতার বাধা দেওয়ার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই পক্ষেরই অস্ত্র ব্যবহার এবং জনবহুল এলাকায় হামলার জন্য দায় রয়েছে। ওই প্রতিবেদনে হামাস ও ইসরায়েল দুই পক্ষকেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘনের জন্য দায়ী করা হয়েছে।

অন্যদিকে কিছু দেশ ও মানবাধিকার সংস্থা ইসরায়েলের ওপর যুদ্ধবিরতি চুক্তি মানতে চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গাজার হাসপাতালগুলোতে বিদ্যুৎ, পানি ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ত্রাণ-সংকটে গাজায় পুষ্টিহীনতা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। এতে শিশু ও বৃদ্ধদের জীবন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

যুদ্ধবিরতি কার্যকরে যেসব দেশ ভূমিকা রাখতে পারে

গাজা উপত্যকায় সংঘাত থামাতে যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, তার পেছনে ছিল একাধিক শক্তির সক্রিয় মধ্যস্থতা। বিশেষ করে মিশর, কাতার এবং যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আলোচনায় যুক্ত ছিল। পাশাপাশি জাতিসংঘ, তুরস্ক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন কূটনৈতিক ও মানবিক পর্যায়ে সহায়তা করেছে।

গাজার সঙ্গে রাফাহ সীমান্তের নিয়ন্ত্রণকারী দেশ হিসেবে মিশরের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে কায়রো একাধিক গোপন ও প্রকাশ্য বৈঠকের আয়োজন করেছিল। এ লক্ষ্যে মিশর পুনরায় হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে পরোক্ষ সংলাপ চালু রাখার ব্যবস্থা করতে পারে।

কাতার দীর্ঘদিন ধরে গাজার পুনর্গঠন ও মানবিক সহায়তায় অর্থায়ন করে আসছে। কাতার এই সহায়তা অব্যাহত রাখতে পারে। পাশাপাশি যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখতে বন্দী বিনিময় চুক্তিতে সহায়তা করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ায় তার অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটন যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখলেও তা কার্যকরে কোনো ভূমিকা রাখছে না। সামরিক সহায়তার বিনিময়ে মানবিক আইন মেনে চলতে ইসরায়েলকে চাপ প্রয়োগ করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের দেশগুলোতে মানবাধিকার প্রশ্নে তুলনামূলক সরব। গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখতেও তারা ভূমিকা রাখতে পারে।

গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে তুরস্ক। এর আগেও তারা গাজা ইস্যুতে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছে। গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তুরস্ক আন্তর্জাতিক আদালতে অভিযোগ দায়ের করতে পারে।

যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে যেসব দেশ ভূমিকা রেখেছিল, তাদের সামনে এখন দুইটি চ্যালেঞ্জ—একদিকে মানবিক বিপর্যয় কমানো, অন্যদিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা। মিশর ও কাতার মধ্যস্থতায় সক্রিয় থাকলে যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে পারে। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন মানবাধিকার ইস্যুতে সরব আর জাতিসংঘ তদন্ত ও সহায়তায় ভূমিকা রাখবে।

তবে চূড়ান্ত বাস্তবতা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতির ওপর। যদি সংঘাতের মাত্রা কমে, তাহলে এই দেশগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা যুদ্ধবিরতিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে। আর যদি তা লঙ্ঘন অব্যাহত থাকে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য আরও বড় আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।

যুদ্ধবিরতি কার্যকরের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের সবচেয়ে দৃশ্যমান ভূমিকা আসে তার নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা, মানবিক করিডোর নিশ্চিত করা এবং বেসামরিক নাগরিক সুরক্ষার জন্য প্রস্তাব গ্রহণে নিরাপত্তা পরিষদ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এখানে বড় সীমাবদ্ধতা হলো ভেটো ক্ষমতা। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলে প্রস্তাব কার্যকর করা কঠিন হয়ে যায়। ফলে অনেক সময় এ ধরনের প্রস্তাব পাসই হয় না।

বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে জাতিসংঘ যদি কার্যকর ভূমিকা রাখতে চায়, তাহলে তাকে ‘সম্মিলিত কূটনৈতিক চাপ’ তৈরিতে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। যেখানে আঞ্চলিক জোট ও প্রভাবশালী দেশগুলোকে একসঙ্গে যুক্ত করা হবে।

জাতিসংঘ নিজে বিচার প্রক্রিয়া পরিচালনা না করলেও তার তদন্ত প্রতিবেদন আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে বাস্তবতা হলো জাতিসংঘের কার্যকারিতা নির্ভর করে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। নিরাপত্তা পরিষদের ঐকমত্য না থাকলে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন। তবুও মানবিক সহায়তা ও তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে সংস্থাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

/বিবি/