মার্কিন পেট্রোডলার সাম্রাজ্য কি ভাঙতে পারবে চীনের ইউয়ান

মার্কিন পেট্রোডলার সাম্রাজ্য কি ভাঙতে পারবে চীনের ইউয়ান
সিটিজেন ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরু করার পর যুদ্ধের দুই সপ্তাহ পেরিয়ে এসে ইরান তার ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক’ চালটি চেলেছে। এটি কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন নয়, শুধু একটি বাক্য। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সেই বার্তা এখন আলোচনায়।
তিনি বলেছেন, ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল করতে দেবে, তবে একটি শর্তে। ডলারে নয়, তেলের দাম পরিশোধ করতে হবে চীনের মুদ্রা ইউয়ানে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ওই একটি বাক্য যুদ্ধক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া গত দুই সপ্তাহের যে কোনো ঘটনার চেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে। কারণ ‘পেট্রোডলার’ ব্যবস্থার জোরে গত ৫০ বছর ধরে বিশ্ব অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের যে একক আধিপত্য তৈরি হয়েছে, এটা তার ওপর ‘সরাসরি আঘাত’।
ইউটিউব চ্যানেল 'প্রেডিক্টিভ হিস্ট্রির' সঞ্চালক অধ্যাপক জিয়াং জুয়েকিন বলেন, অনেকের কাছে ‘পেট্রোডলার' কেবল একটি অর্থনৈতিক তাত্ত্বিক শব্দ মনে হতে পারে, কিন্তু এটাই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির মূল ভিত্তি।
তিনি বলেন, পেট্রোডলার ব্যবস্থার কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এমন পরিমাণ ঘাটতি বাজেট নিয়ে চলতে পারে যা অন্য যেকোনো দেশকে দেউলিয়া করে দিত। যুদ্ধে ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করার পরেও ডলার এখনো বিশ্বের প্রধান মুদ্রা হিসেবে টিকে আছে, কারণ বিশ্বের প্রতিটি দেশের তেলের জন্য ডলারের প্রয়োজন হয়। এই ব্যবস্থাটি ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বশক্তির ভিত্তিও ধসে পড়বে। আর ইরান সেখানেই একটি ঢিল ছুড়ে দিয়েছে।

ইরানের ‘কিছু’ তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ভাবনা
ইরানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যৌথভাবে হামলা শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বে প্রতিদিন ব্যবহৃত প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হত। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই পথে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। পরিবহন ও উৎপাদনে প্রভাব পড়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়ছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরানের ‘কিছু’ তেলের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) ফক্স বিজনেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি একথা বলেন ।
তিনি আরও জানান, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে তাদের নিজস্ব তেল মজুদ থেকেও বিশ্ববাজারে ছাড়তে পারে। এতে বৈশ্বিক ক্রেতাদের জন্য আরও তেল সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ পদক্ষেপ তেলের দামে খুব কমই প্রভাব ফেলবে এবং ইরানের বর্তমান শাসন ব্যবস্থার তহবিল বাড়ানোর পথ তৈরি করবে, যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে যুক্তরাষ্ট্র।
মেরিটাইম নিষেধাজ্ঞা বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকস্টোন কমপ্লায়েন্স সার্ভিসেসের পরিচালক ডেভিড ট্যানেনবাউম বলেন, এটা একেবারেই অদ্ভুত সিদ্ধান্ত। মোটাদাগে আমরা ইরানকে তেল বিক্রি করতে দিচ্ছি, যা পরে তাদের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় অর্থ জোগাতে পারে।
যুদ্ধের আগে ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা ছিল চীন, তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যদের নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা কম দামে তেল কিনত।
সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট বলেন, এই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হলে ভারত, জাপান ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো ইরানের তেল কিনতে পারবে, আর চীনকে ‘বাজারমূল্য’ দিতে বাধ্য করা যাবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে সাগরে থাকা প্রায় ১৪ কোটি ব্যারেল ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে, যা বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০ থেকে ১৪ দিনের জন্য কমাতে পারে। তবে কীভাবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে বা তেলের বিক্রির অর্থ ইরান সরকারের কাছে যাওয়া ঠেকানো যাবে কি না– সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি।
পেট্রোডলারের গোড়াপত্তন
পেট্রোডলারের গুরুত্ব বুঝতে হলে ১৯৭১ সালে ফিরে যেতে হবে। এর আগে ডলারের মান ধরে রাখার বিষয়টি সরাসরি স্বর্ণের সঙ্গে যুক্ত ছিল। প্রতিটি ডলারের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের ভল্টে সমপরিমাণ স্বর্ণ সংরক্ষণ করতে হতো।
এরপর প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন সেই ব্যবস্থা বন্ধ করে দিলেন। স্বর্ণভিত্তিক নিশ্চয়তা উঠে যাওয়ার পর প্রশ্ন উঠল, তাহলে ডলারের ওপর কেন মানুষ ভরসা রাখবে?
সমাধান এলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে। বিশ্বজুড়ে তেল সংকটের মধ্যে ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের সঙ্গে একটি চুক্তি করে। চুক্তির শর্ত ছিল, সৌদি আরব তাদের সব তেল ডলারে বিক্রি করবে এবং বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক সুরক্ষা দেবে।
ওপেকভুক্ত দেশগুলোও পরে সেই পথ অনুসরণ করে। ফলে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্য ডলারে স্থানান্তরিত হয়। ওই চুক্তির মাধ্যমেই ‘পেট্রো-ডলার’ ব্যবস্থার গোড়াপত্তন হয়, যা বদলে দেয় পুরো পৃথিবীকে।
অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে তেল ছাড়া গতি নেই। আর যাদের নিজেদের পর্যাপ্ত তেল নেই, তাদের বিদেশ থেকে কিনতে হবে। আর চীন, জাপান, ভারত কিংবা জার্মানি– তেল কিনতে সবারই লাগবে ডলার।
এভাবে বিশ্বজুড়ে মার্কিন ডলারের বিরাট এক চাহিদা তৈরি হয়। আর যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তা তুলে দেয় বিশ্ব অর্থনীতি শাসন করার ক্ষমতা। সেই ক্ষমতার বলেই যুক্তরাষ্ট্র যে কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করতে পারে। কিংবা বিরোধ বাঁধলে কোনো দেশকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে একঘরে করে দিতে পারে।
ডলারের ওই চাহিদাই যুক্তরাষ্ট্রকে সীমাহীন ঋণ নেওয়ার এবং বৈশ্বিক আধিপত্য ধরে রাখার সুযোগ করে দেয়।

পেট্রোডলার ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার পরিণতি
ইরানই প্রথম দেশ নয় যারা পেট্রোডলার ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করেছে। যারা সেই সাহস করেছে, সেজন্য তাদের মূল্যও দিতে হয়েছে।
২০০০ সালে সাদ্দাম হুসেইন ঘোষণা দেন, ইরাক তেল বিক্রির দাম ডলারে নয়, ইউরোতে নেবে। তিন বছর পর যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে হামলা চালায়। ইরাকের তেল বাণিজ্য আবার ডলারে ফিরে আসে।
লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি তেল বাণিজ্যের জন্য স্বর্ণভিত্তিক একটি প্যান-আফ্রিকান মুদ্রার প্রস্তাব করেন। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর অভিযানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হন এবং তার প্রস্তাবটিও সেখানেই শেষ হয়ে যায়।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোও ডলার ব্যবস্থার বাইরে এসে তেল বিক্রির চেষ্টা করেছিলেন। গত ৩ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেনা পাঠিয়ে তাকে তুলে নিয়ে গেছেন।
অধ্যাপক জিয়াং জুয়েকিন বলেন, যুদ্ধের মধ্যে থাকা ইরান এবার ওই ঝুঁকি নিয়েছে চীনের সমর্থন নিয়ে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এরইমধ্যে ‘আইআরজিসি সার্টিফিকেট’ নামে অনুমতিপত্র দিচ্ছে, যার মাধ্যমে জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি পার হতে পারবে। প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে, আর এখন তারা ঠিক করছে, তেলের জাহাজ পার করতে দাম চুকাতে হবে ইউয়ানে, ডলারে হলে চলবে না।
চীনের জন্য এটি বড় সুযোগ। বেইজিং বহু বছর ধরে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়াতে চাচ্ছে।
ডলার কি আধিপত্য বজায় রাখতে পারবে
বর্তমানে হরমুজ আংশিক বন্ধ থাকায় এবং প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। তেলের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর সামনে বাস্তব প্রশ্ন তৈরি হয়েছে– তারা কি যুক্তরাষ্ট্রের অপেক্ষায় থাকবে, নাকি চুপচাপ ইরানের ইউয়ান শর্ত মেনে তেল কেনা শুরু করবে?
ভারত এরইমধ্যে তেহরানের রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকে নিরাপদ যাতায়াতের আশ্বাস পেয়েছে। দেশটি এখন হিসাব কষছে– জ্বালানি আমদানি সচল রাখতে ইউয়ান শর্ত মেনে নেওয়া হবে কি না। তুরস্কও একই পরিস্থিতিতে রয়েছে।
স্বাভাবিক সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন হয়। এই ঘাটতিই ইরানকে প্রভাব খাটানোর সুযোগ দিচ্ছে। যত বেশি সময় প্রণালি বন্ধ থাকবে, তত বেশি ইউয়ানভিত্তিক প্রস্তাব আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
যুক্তরাষ্ট্র বোমা ফেলে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। চীনকে ইউয়ানে তেল কেনা থেকে বিরত রাখা কিংবা ভারতের নীরব অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ থামানো যুদ্ধের মাধ্যমে সম্ভব নয়।
অধ্যাপক জিয়াং বলেন, অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় আগে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের একটি চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক শক্তির আর্থিক ভিত্তি গড়ে তুলেছিল। এখন ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ এক জলপথে সেই ভিত্তির একটি অংশ নীরবে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।
তিনি বলেন, তেহরানের আকাশে কী ঘটছে– তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে আগামী ৫০ বছর ডলারের আধিপত্য বজায় থাকবে কি না– সেই প্রশ্নের উত্তর মেলানো।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরু করার পর যুদ্ধের দুই সপ্তাহ পেরিয়ে এসে ইরান তার ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক’ চালটি চেলেছে। এটি কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন নয়, শুধু একটি বাক্য। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সেই বার্তা এখন আলোচনায়।
তিনি বলেছেন, ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল করতে দেবে, তবে একটি শর্তে। ডলারে নয়, তেলের দাম পরিশোধ করতে হবে চীনের মুদ্রা ইউয়ানে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ওই একটি বাক্য যুদ্ধক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া গত দুই সপ্তাহের যে কোনো ঘটনার চেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে। কারণ ‘পেট্রোডলার’ ব্যবস্থার জোরে গত ৫০ বছর ধরে বিশ্ব অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের যে একক আধিপত্য তৈরি হয়েছে, এটা তার ওপর ‘সরাসরি আঘাত’।
ইউটিউব চ্যানেল 'প্রেডিক্টিভ হিস্ট্রির' সঞ্চালক অধ্যাপক জিয়াং জুয়েকিন বলেন, অনেকের কাছে ‘পেট্রোডলার' কেবল একটি অর্থনৈতিক তাত্ত্বিক শব্দ মনে হতে পারে, কিন্তু এটাই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির মূল ভিত্তি।
তিনি বলেন, পেট্রোডলার ব্যবস্থার কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এমন পরিমাণ ঘাটতি বাজেট নিয়ে চলতে পারে যা অন্য যেকোনো দেশকে দেউলিয়া করে দিত। যুদ্ধে ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করার পরেও ডলার এখনো বিশ্বের প্রধান মুদ্রা হিসেবে টিকে আছে, কারণ বিশ্বের প্রতিটি দেশের তেলের জন্য ডলারের প্রয়োজন হয়। এই ব্যবস্থাটি ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বশক্তির ভিত্তিও ধসে পড়বে। আর ইরান সেখানেই একটি ঢিল ছুড়ে দিয়েছে।

ইরানের ‘কিছু’ তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ভাবনা
ইরানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যৌথভাবে হামলা শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বে প্রতিদিন ব্যবহৃত প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হত। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই পথে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। পরিবহন ও উৎপাদনে প্রভাব পড়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়ছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরানের ‘কিছু’ তেলের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) ফক্স বিজনেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি একথা বলেন ।
তিনি আরও জানান, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে তাদের নিজস্ব তেল মজুদ থেকেও বিশ্ববাজারে ছাড়তে পারে। এতে বৈশ্বিক ক্রেতাদের জন্য আরও তেল সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ পদক্ষেপ তেলের দামে খুব কমই প্রভাব ফেলবে এবং ইরানের বর্তমান শাসন ব্যবস্থার তহবিল বাড়ানোর পথ তৈরি করবে, যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে যুক্তরাষ্ট্র।
মেরিটাইম নিষেধাজ্ঞা বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকস্টোন কমপ্লায়েন্স সার্ভিসেসের পরিচালক ডেভিড ট্যানেনবাউম বলেন, এটা একেবারেই অদ্ভুত সিদ্ধান্ত। মোটাদাগে আমরা ইরানকে তেল বিক্রি করতে দিচ্ছি, যা পরে তাদের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় অর্থ জোগাতে পারে।
যুদ্ধের আগে ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা ছিল চীন, তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যদের নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা কম দামে তেল কিনত।
সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট বলেন, এই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হলে ভারত, জাপান ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো ইরানের তেল কিনতে পারবে, আর চীনকে ‘বাজারমূল্য’ দিতে বাধ্য করা যাবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে সাগরে থাকা প্রায় ১৪ কোটি ব্যারেল ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে, যা বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০ থেকে ১৪ দিনের জন্য কমাতে পারে। তবে কীভাবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে বা তেলের বিক্রির অর্থ ইরান সরকারের কাছে যাওয়া ঠেকানো যাবে কি না– সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি।
পেট্রোডলারের গোড়াপত্তন
পেট্রোডলারের গুরুত্ব বুঝতে হলে ১৯৭১ সালে ফিরে যেতে হবে। এর আগে ডলারের মান ধরে রাখার বিষয়টি সরাসরি স্বর্ণের সঙ্গে যুক্ত ছিল। প্রতিটি ডলারের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের ভল্টে সমপরিমাণ স্বর্ণ সংরক্ষণ করতে হতো।
এরপর প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন সেই ব্যবস্থা বন্ধ করে দিলেন। স্বর্ণভিত্তিক নিশ্চয়তা উঠে যাওয়ার পর প্রশ্ন উঠল, তাহলে ডলারের ওপর কেন মানুষ ভরসা রাখবে?
সমাধান এলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে। বিশ্বজুড়ে তেল সংকটের মধ্যে ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের সঙ্গে একটি চুক্তি করে। চুক্তির শর্ত ছিল, সৌদি আরব তাদের সব তেল ডলারে বিক্রি করবে এবং বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক সুরক্ষা দেবে।
ওপেকভুক্ত দেশগুলোও পরে সেই পথ অনুসরণ করে। ফলে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্য ডলারে স্থানান্তরিত হয়। ওই চুক্তির মাধ্যমেই ‘পেট্রো-ডলার’ ব্যবস্থার গোড়াপত্তন হয়, যা বদলে দেয় পুরো পৃথিবীকে।
অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে তেল ছাড়া গতি নেই। আর যাদের নিজেদের পর্যাপ্ত তেল নেই, তাদের বিদেশ থেকে কিনতে হবে। আর চীন, জাপান, ভারত কিংবা জার্মানি– তেল কিনতে সবারই লাগবে ডলার।
এভাবে বিশ্বজুড়ে মার্কিন ডলারের বিরাট এক চাহিদা তৈরি হয়। আর যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তা তুলে দেয় বিশ্ব অর্থনীতি শাসন করার ক্ষমতা। সেই ক্ষমতার বলেই যুক্তরাষ্ট্র যে কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করতে পারে। কিংবা বিরোধ বাঁধলে কোনো দেশকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে একঘরে করে দিতে পারে।
ডলারের ওই চাহিদাই যুক্তরাষ্ট্রকে সীমাহীন ঋণ নেওয়ার এবং বৈশ্বিক আধিপত্য ধরে রাখার সুযোগ করে দেয়।

পেট্রোডলার ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার পরিণতি
ইরানই প্রথম দেশ নয় যারা পেট্রোডলার ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করেছে। যারা সেই সাহস করেছে, সেজন্য তাদের মূল্যও দিতে হয়েছে।
২০০০ সালে সাদ্দাম হুসেইন ঘোষণা দেন, ইরাক তেল বিক্রির দাম ডলারে নয়, ইউরোতে নেবে। তিন বছর পর যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে হামলা চালায়। ইরাকের তেল বাণিজ্য আবার ডলারে ফিরে আসে।
লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি তেল বাণিজ্যের জন্য স্বর্ণভিত্তিক একটি প্যান-আফ্রিকান মুদ্রার প্রস্তাব করেন। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর অভিযানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হন এবং তার প্রস্তাবটিও সেখানেই শেষ হয়ে যায়।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোও ডলার ব্যবস্থার বাইরে এসে তেল বিক্রির চেষ্টা করেছিলেন। গত ৩ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেনা পাঠিয়ে তাকে তুলে নিয়ে গেছেন।
অধ্যাপক জিয়াং জুয়েকিন বলেন, যুদ্ধের মধ্যে থাকা ইরান এবার ওই ঝুঁকি নিয়েছে চীনের সমর্থন নিয়ে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এরইমধ্যে ‘আইআরজিসি সার্টিফিকেট’ নামে অনুমতিপত্র দিচ্ছে, যার মাধ্যমে জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি পার হতে পারবে। প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে, আর এখন তারা ঠিক করছে, তেলের জাহাজ পার করতে দাম চুকাতে হবে ইউয়ানে, ডলারে হলে চলবে না।
চীনের জন্য এটি বড় সুযোগ। বেইজিং বহু বছর ধরে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়াতে চাচ্ছে।
ডলার কি আধিপত্য বজায় রাখতে পারবে
বর্তমানে হরমুজ আংশিক বন্ধ থাকায় এবং প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। তেলের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর সামনে বাস্তব প্রশ্ন তৈরি হয়েছে– তারা কি যুক্তরাষ্ট্রের অপেক্ষায় থাকবে, নাকি চুপচাপ ইরানের ইউয়ান শর্ত মেনে তেল কেনা শুরু করবে?
ভারত এরইমধ্যে তেহরানের রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকে নিরাপদ যাতায়াতের আশ্বাস পেয়েছে। দেশটি এখন হিসাব কষছে– জ্বালানি আমদানি সচল রাখতে ইউয়ান শর্ত মেনে নেওয়া হবে কি না। তুরস্কও একই পরিস্থিতিতে রয়েছে।
স্বাভাবিক সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন হয়। এই ঘাটতিই ইরানকে প্রভাব খাটানোর সুযোগ দিচ্ছে। যত বেশি সময় প্রণালি বন্ধ থাকবে, তত বেশি ইউয়ানভিত্তিক প্রস্তাব আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
যুক্তরাষ্ট্র বোমা ফেলে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। চীনকে ইউয়ানে তেল কেনা থেকে বিরত রাখা কিংবা ভারতের নীরব অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ থামানো যুদ্ধের মাধ্যমে সম্ভব নয়।
অধ্যাপক জিয়াং বলেন, অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় আগে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের একটি চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক শক্তির আর্থিক ভিত্তি গড়ে তুলেছিল। এখন ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ এক জলপথে সেই ভিত্তির একটি অংশ নীরবে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।
তিনি বলেন, তেহরানের আকাশে কী ঘটছে– তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে আগামী ৫০ বছর ডলারের আধিপত্য বজায় থাকবে কি না– সেই প্রশ্নের উত্তর মেলানো।

মার্কিন পেট্রোডলার সাম্রাজ্য কি ভাঙতে পারবে চীনের ইউয়ান
সিটিজেন ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরু করার পর যুদ্ধের দুই সপ্তাহ পেরিয়ে এসে ইরান তার ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক’ চালটি চেলেছে। এটি কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন নয়, শুধু একটি বাক্য। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সেই বার্তা এখন আলোচনায়।
তিনি বলেছেন, ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল করতে দেবে, তবে একটি শর্তে। ডলারে নয়, তেলের দাম পরিশোধ করতে হবে চীনের মুদ্রা ইউয়ানে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ওই একটি বাক্য যুদ্ধক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া গত দুই সপ্তাহের যে কোনো ঘটনার চেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে। কারণ ‘পেট্রোডলার’ ব্যবস্থার জোরে গত ৫০ বছর ধরে বিশ্ব অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের যে একক আধিপত্য তৈরি হয়েছে, এটা তার ওপর ‘সরাসরি আঘাত’।
ইউটিউব চ্যানেল 'প্রেডিক্টিভ হিস্ট্রির' সঞ্চালক অধ্যাপক জিয়াং জুয়েকিন বলেন, অনেকের কাছে ‘পেট্রোডলার' কেবল একটি অর্থনৈতিক তাত্ত্বিক শব্দ মনে হতে পারে, কিন্তু এটাই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির মূল ভিত্তি।
তিনি বলেন, পেট্রোডলার ব্যবস্থার কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এমন পরিমাণ ঘাটতি বাজেট নিয়ে চলতে পারে যা অন্য যেকোনো দেশকে দেউলিয়া করে দিত। যুদ্ধে ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করার পরেও ডলার এখনো বিশ্বের প্রধান মুদ্রা হিসেবে টিকে আছে, কারণ বিশ্বের প্রতিটি দেশের তেলের জন্য ডলারের প্রয়োজন হয়। এই ব্যবস্থাটি ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বশক্তির ভিত্তিও ধসে পড়বে। আর ইরান সেখানেই একটি ঢিল ছুড়ে দিয়েছে।

ইরানের ‘কিছু’ তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ভাবনা
ইরানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যৌথভাবে হামলা শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বে প্রতিদিন ব্যবহৃত প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হত। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই পথে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। পরিবহন ও উৎপাদনে প্রভাব পড়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়ছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরানের ‘কিছু’ তেলের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) ফক্স বিজনেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি একথা বলেন ।
তিনি আরও জানান, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে তাদের নিজস্ব তেল মজুদ থেকেও বিশ্ববাজারে ছাড়তে পারে। এতে বৈশ্বিক ক্রেতাদের জন্য আরও তেল সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ পদক্ষেপ তেলের দামে খুব কমই প্রভাব ফেলবে এবং ইরানের বর্তমান শাসন ব্যবস্থার তহবিল বাড়ানোর পথ তৈরি করবে, যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে যুক্তরাষ্ট্র।
মেরিটাইম নিষেধাজ্ঞা বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকস্টোন কমপ্লায়েন্স সার্ভিসেসের পরিচালক ডেভিড ট্যানেনবাউম বলেন, এটা একেবারেই অদ্ভুত সিদ্ধান্ত। মোটাদাগে আমরা ইরানকে তেল বিক্রি করতে দিচ্ছি, যা পরে তাদের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় অর্থ জোগাতে পারে।
যুদ্ধের আগে ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা ছিল চীন, তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যদের নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা কম দামে তেল কিনত।
সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট বলেন, এই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হলে ভারত, জাপান ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো ইরানের তেল কিনতে পারবে, আর চীনকে ‘বাজারমূল্য’ দিতে বাধ্য করা যাবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে সাগরে থাকা প্রায় ১৪ কোটি ব্যারেল ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে, যা বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০ থেকে ১৪ দিনের জন্য কমাতে পারে। তবে কীভাবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে বা তেলের বিক্রির অর্থ ইরান সরকারের কাছে যাওয়া ঠেকানো যাবে কি না– সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি।
পেট্রোডলারের গোড়াপত্তন
পেট্রোডলারের গুরুত্ব বুঝতে হলে ১৯৭১ সালে ফিরে যেতে হবে। এর আগে ডলারের মান ধরে রাখার বিষয়টি সরাসরি স্বর্ণের সঙ্গে যুক্ত ছিল। প্রতিটি ডলারের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের ভল্টে সমপরিমাণ স্বর্ণ সংরক্ষণ করতে হতো।
এরপর প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন সেই ব্যবস্থা বন্ধ করে দিলেন। স্বর্ণভিত্তিক নিশ্চয়তা উঠে যাওয়ার পর প্রশ্ন উঠল, তাহলে ডলারের ওপর কেন মানুষ ভরসা রাখবে?
সমাধান এলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে। বিশ্বজুড়ে তেল সংকটের মধ্যে ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের সঙ্গে একটি চুক্তি করে। চুক্তির শর্ত ছিল, সৌদি আরব তাদের সব তেল ডলারে বিক্রি করবে এবং বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক সুরক্ষা দেবে।
ওপেকভুক্ত দেশগুলোও পরে সেই পথ অনুসরণ করে। ফলে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্য ডলারে স্থানান্তরিত হয়। ওই চুক্তির মাধ্যমেই ‘পেট্রো-ডলার’ ব্যবস্থার গোড়াপত্তন হয়, যা বদলে দেয় পুরো পৃথিবীকে।
অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে তেল ছাড়া গতি নেই। আর যাদের নিজেদের পর্যাপ্ত তেল নেই, তাদের বিদেশ থেকে কিনতে হবে। আর চীন, জাপান, ভারত কিংবা জার্মানি– তেল কিনতে সবারই লাগবে ডলার।
এভাবে বিশ্বজুড়ে মার্কিন ডলারের বিরাট এক চাহিদা তৈরি হয়। আর যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তা তুলে দেয় বিশ্ব অর্থনীতি শাসন করার ক্ষমতা। সেই ক্ষমতার বলেই যুক্তরাষ্ট্র যে কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করতে পারে। কিংবা বিরোধ বাঁধলে কোনো দেশকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে একঘরে করে দিতে পারে।
ডলারের ওই চাহিদাই যুক্তরাষ্ট্রকে সীমাহীন ঋণ নেওয়ার এবং বৈশ্বিক আধিপত্য ধরে রাখার সুযোগ করে দেয়।

পেট্রোডলার ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার পরিণতি
ইরানই প্রথম দেশ নয় যারা পেট্রোডলার ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করেছে। যারা সেই সাহস করেছে, সেজন্য তাদের মূল্যও দিতে হয়েছে।
২০০০ সালে সাদ্দাম হুসেইন ঘোষণা দেন, ইরাক তেল বিক্রির দাম ডলারে নয়, ইউরোতে নেবে। তিন বছর পর যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে হামলা চালায়। ইরাকের তেল বাণিজ্য আবার ডলারে ফিরে আসে।
লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি তেল বাণিজ্যের জন্য স্বর্ণভিত্তিক একটি প্যান-আফ্রিকান মুদ্রার প্রস্তাব করেন। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর অভিযানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হন এবং তার প্রস্তাবটিও সেখানেই শেষ হয়ে যায়।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোও ডলার ব্যবস্থার বাইরে এসে তেল বিক্রির চেষ্টা করেছিলেন। গত ৩ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেনা পাঠিয়ে তাকে তুলে নিয়ে গেছেন।
অধ্যাপক জিয়াং জুয়েকিন বলেন, যুদ্ধের মধ্যে থাকা ইরান এবার ওই ঝুঁকি নিয়েছে চীনের সমর্থন নিয়ে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এরইমধ্যে ‘আইআরজিসি সার্টিফিকেট’ নামে অনুমতিপত্র দিচ্ছে, যার মাধ্যমে জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি পার হতে পারবে। প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে, আর এখন তারা ঠিক করছে, তেলের জাহাজ পার করতে দাম চুকাতে হবে ইউয়ানে, ডলারে হলে চলবে না।
চীনের জন্য এটি বড় সুযোগ। বেইজিং বহু বছর ধরে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়াতে চাচ্ছে।
ডলার কি আধিপত্য বজায় রাখতে পারবে
বর্তমানে হরমুজ আংশিক বন্ধ থাকায় এবং প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। তেলের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর সামনে বাস্তব প্রশ্ন তৈরি হয়েছে– তারা কি যুক্তরাষ্ট্রের অপেক্ষায় থাকবে, নাকি চুপচাপ ইরানের ইউয়ান শর্ত মেনে তেল কেনা শুরু করবে?
ভারত এরইমধ্যে তেহরানের রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকে নিরাপদ যাতায়াতের আশ্বাস পেয়েছে। দেশটি এখন হিসাব কষছে– জ্বালানি আমদানি সচল রাখতে ইউয়ান শর্ত মেনে নেওয়া হবে কি না। তুরস্কও একই পরিস্থিতিতে রয়েছে।
স্বাভাবিক সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন হয়। এই ঘাটতিই ইরানকে প্রভাব খাটানোর সুযোগ দিচ্ছে। যত বেশি সময় প্রণালি বন্ধ থাকবে, তত বেশি ইউয়ানভিত্তিক প্রস্তাব আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
যুক্তরাষ্ট্র বোমা ফেলে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। চীনকে ইউয়ানে তেল কেনা থেকে বিরত রাখা কিংবা ভারতের নীরব অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ থামানো যুদ্ধের মাধ্যমে সম্ভব নয়।
অধ্যাপক জিয়াং বলেন, অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় আগে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের একটি চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক শক্তির আর্থিক ভিত্তি গড়ে তুলেছিল। এখন ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ এক জলপথে সেই ভিত্তির একটি অংশ নীরবে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।
তিনি বলেন, তেহরানের আকাশে কী ঘটছে– তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে আগামী ৫০ বছর ডলারের আধিপত্য বজায় থাকবে কি না– সেই প্রশ্নের উত্তর মেলানো।




